পাখ পাখালির সুখানুভূতি

প্রকাশিত: ১২:২৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২০

পাখ পাখালির সুখানুভূতি

মোজাফফার বাবু

পাখপাখালি প্রেমিক সাজ্জাদ মিয়া । জীবনের উষলগ্ন থেকে প্রকৃতি উপর তাদের বিচারণ , এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ প্রচন্ড , কখন ডিম পাড়বে কখন বাচ্চা ফুটবে, কি খাবার তাদের পছন্দ ইত্যাদি ।

চিরচরিত ভাবে পাখিদের পরিপাটি ও আদার দেওয়া, খরা ও মাঘ মাসের প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে সূদুর আকাশে গিরিবাজ পায়রা উড়ায় এবং পায়রা ডিগবাজীসহ বিভিন্নরকমের কসরতের প্রদর্শনী করে । মনোযোগ সহকারে দেখেন আর অন্যদের দেখিয়ে তৃপ্তি পান।বালকবেলা থেকে জীবনের সূর্য যখন গোধূলির দিকে যাচ্ছে তার কোন বাত্যয় ঘটেনি।

ভাদ্রের তালপাকা দূর্বিষহ তাপদাহের ক্রমান্বয়ে বিদায়ের বাঁশি বাজছে ।আশ্বিনের বার্তা শুরু হতে চলেছে । সেটা এখন প্রকট ভাবে সামনে আসছে । দুইদিন ধরায় অঝোরে শ্রাবণের মত বৃষ্টি হয়েছে।রিমঝিম বৃষ্টির অঝোর ধারায় সয়লাব। পথঘাট খানা খন্দে ব্যাঙ ডাকছে।ঋতুচক্রের প্রভাব পড়েছে।নিশিরাত্রের দিকে ধরায় শীতের আলামত দেখা যাচ্ছে। শীতের সময় পাখ পাখালীদের আনাগোনা বেশী থাকে, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসে,শস্য শ্যামল এই বাংলায়। গোধুলী লগ্নে গগনে শ্বেত বক উড়ে যাচ্ছে যার যার নীড়ে।

বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছেন সাজ্জাদ মিয়া।তার শয়নকক্ষের পাশে দক্ষিনা বারান্দায় পাখিদের অভয়ারণ্য । সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পযন্ত ঐ বারান্দায় যাতায়ত বন্ধ যাতে তারা মুক্ত ভাবে চলাচল করতে পারে।

পূবালী আকাশে রং ছড়ালে তামসী তমাস থেকে প্রভাতে রং ছড়াতে পাখিরা মিষ্টি মধুর ছন্দে ডাকে ও প্রভাতের বার্তা দিয়ে নিজেরা ফ্রেশ হয়ে, সখা সখীদের নিয়ে খালে বিলে ধানক্ষেত বা শস্যভান্ডার নিভৃত কুঞ্জে দিকে চলে যায়। আবার সারা দিন আনন্দ ভালোবাসা শেষে গীর্জার ঘন্টা বাজে, গোধুলী লগনে আবীরের রং ছড়ানোর সাথে সাথে ঠিক তার নিজস্ব স্বাধীন আস্তানায় ফিরে আসে । নিয়মের কোন বাত্যয় হয় না, তারা নিয়মের প্রতি যত্নশীল। তিনি এ সব দেখে আসছেন ।

একরাতে তিনি শুনতে পেলেন পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ।তাদের মিষ্টি ছন্দের কোন আওয়াজ নেই বরং কর্কশ ডাক প্রকট আকার ধারণ করেছে একটা পিনের শব্দ পযর্ন্ত হয়না, কি হল ঝগড়া কিসের ? নাকি কোন সাপ বা হন্তারক এসেছে।বিষয়টা সাজ্জাদ মিয়া মনে দানা বেধেছে , রাত্রি অনেক ঘড়ির কাটাটা ঘুরেই চলেছে।দূর থেকে ট্রেনের শব্দটা ভেসে আসছে ।

গাছ গাছালি গুলো যেন ঘুমিয়ে পড়েছে । কিন্তু পাখিগুলো সদর্পে ডাকছে , সতর্কভাবে দরজা খুলেই সাজ্জাদ মিয়া দেখতে পেল পাখিগুলো যেখানে থাকে সেখানে অন্য জাতের নিকষ কালো বাদুড় এসে ঘাটি গেড়েছে। সেটা ওরা মেনে নিতে পারছে না।স্বাধীনচেতা পাখি তারা তাদের জায়গায় অন্য পাখি আসবে কেন ? বিষয় টা সাজ্জাদ মিয়া কে ভাবিয়ে তুলেছে, কাল ক্ষেপণ না করে দরজা খোলে, শব্দে সবায় উড়ে চলে যায় ।কিন্তু কিছুক্ষণ পড়েই চড়ুই পাখি দুইটি নির্দিষ্ট স্থানে চলে আসল । তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচলেন ।

সাদা পরে ছায় রঙ দুইটা চড়ুই পাখি ঘুরঘুর করে ঘুরছে এঘর,ওঘর কার্নিশ,বারান্দা, ছাদ। আর দুজনে কত কথা গল্পসল্প করছে।মাঝে মাঝে ডাকের শব্দ জোরে করছে আনার আস্তে।ওরা দুজনে ওদের ভাষায় প্রেম প্রণয়, আবেগ, অনুভূতি কতনা মধুর যা পাচ্ছে দুজনে ভাগ করে নিচ্ছে। হিংসা,বিদ্বেষ, শঠতা নেই,বিপুল ঐশ্বয্য নেই । পরষ্পরের পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা ভক্তি আছে।কেউ কাউকে বিপদে ফেলে না। যে খাবার খায় সকলে ভাগ করে খায়। মুনাফার দৌরাত্ব নেই, এ যেন সাম্যবাদী সমাজ।

বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ঈশান আকাশে কালো কালো মেঘ কালনাগিনীর মত মূর্তি ধারণ করেছে।কিছুক্ষণ প্রচন্ড গতিতে আশি /নব্বই মাইল বেগে ধূলিঝড় সাথে সাথে বড় ফোটার প্রচন্ড বৃষ্টি সন্ধ্যার পর থামলো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অব্যাহত । বারান্দার যে তারের ওপর তারা থাকে সেখান থেকে জোরে জোরে ডাকছে । ডাকের মধ্যে মনে হল ভয়ার্ত আর্তনাদ। ওরা সাধারণত রাতে ডালে না চুপচাপ থাকে।

জানালা আস্তে আস্তে ফাকা করে দেখল দুইটি পাখির জায়গায় একটা পাখি আছে । সাথি আসে নি বাইরে যাচ্ছে আবার আসছে। সাথির জন্য আহাজারি। যেমন কর্মক্ষম বাবার রাত্রে ফিরতে দেরী হলে সবাই খোজ খবর নিতে থাকে। কোন দুর্ঘটনা আবদ্ধ হলো কিনা ।

সবার ঘুমকাতুরে চোখের ঘুম ভেঙ্গে যায়।ঠিক তেমনি পাখিটি তার সাথির জন্য একবার বাইরে যায় আবার আসে। তার ডাকে মনে মনে তিনি ভাবছে চড়ুই পাখিটি ঝড়ে মারা গেল কিনা।না কি ভদ্র সমাজের কোন বালক শিকারের নিশানা পরীক্ষা করলো, কি বিচিত্র জগৎ । চড়ুই পাখিটির জন্য সাজ্জাদ মিয়া নিজের মনটাও আনচান করতে লাগলো।

কোথায় নিরুদ্দেশ হল।পাখির করুন আর্তনাদ আকাশ বাতাস ভারী হয়ে গেল।হঠাৎ ঘুৃমকাতুর চোখে কখন নিদ্রামগ্ন যেন সাজ্জাদ মিয়া হলেন।ভোরের সুর্য উঠেছে আবিরের রঙ ছড়াচ্ছে।কাথাটা গায়ে টেনে নিল।ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে করতে ভাবছিলেন পাখিটি গেল কই।তার আহাজারি মনকে স্পর্শ করলো।হঠাৎ দেখি আনন্দের বার্তা বেজে গেল। কদম গাছে কদম ফুটেছে কাশফুল দোলায় দুলছে , মেহগনি জাম জামরুল গাছে ডানা দুলিয়ে তার সাথি আগমনের জানান দিচ্ছে ।

চড়ুই আগমনের পর মনে হল দুজনের কতদিন পর দেখা হল। এঘর ওঘর জানালা দরজায় আনন্দের ডাক ডাকছে।এর ওর বিলি কেটে দিচ্ছে, আলো ঝল মল করছে মুখে মুখ দিচ্ছে।আনন্দের শব্দে সারা ঘর মাতোয়ারা। সিলিং ফ্যানটা ঘুরেছিল ওটা মুনির হোসেন বন্ধ করে দিলেন, যাতে বারি না লাগে।অনেক দিন আগে ঘরের ভিতরে একটি পাখি ঢুকেছিল।পরে সে ডানায় আঘাত পেয়ে পরে যায়।পাখিটি নিবিড় পরিচর্যা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন।সেই বিষাদের কথা মনে করেই ফ্যানটা বন্ধ করে দিলেন।

দুজনার যে আনন্দঘন পরিবেশ প্রকৃতি দেখতে কার্পণ্য করে নি । ও দূরে পত্রপল্লবের শ্যামা, ঘুঘু মিটমিট করে হাসছিল।গগণে শত শত বকগুলো সারিবদ্ধভাবে ডানা মেলে হাততালি দিল ।

মোজাফফার বাবু ঃ কবি ও সংগঠক

ছড়িয়ে দিন