পাঠ প্রতিক্রিয়া ; অমর্ত্য সেনের হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড

প্রকাশিত: ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২১

পাঠ প্রতিক্রিয়া ; অমর্ত্য সেনের হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড

স্বপন নাথ

 

অনেকের লেখা প্রকাশিত হলে দ্রুত সংগ্রহ ও পাঠের চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে পছন্দের মধ্যে একজন হলেন অমর্ত্য সেন। নিশ্চয় অনেকেরই। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর – Home in the World A Memoir ইতোমধ্যে অনেকেই পড়েছেন। এ-গ্রন্থ পাঁচটি অংশ ও ২৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত। অর্থাৎ, বইয়ের পরিধি ছোট নয়। একইসাথে সংযোজিত হয়েছে – Notes, Name Index, Subject Index। এ তিনটি বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংযোজিত নির্ঘণ্টের এসব তথ্য, যে কোনো আগ্রহী পাঠকের কাজে লাগতে পারে।
যেসব অবস্থানে তাঁর বড় হয়ে ওঠা ও চলাফেরা, যেমন : ঢাকা, মান্দালয়, কলকাতা, শান্তিনিকেতন, যাদবপুর, কেম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানসহ বিভিন্ন স্মৃতি ও কর্মতৎপরতার বিবরণ দিয়েছেন তিনি। তবে যেসব বিবরণ একাডেমিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ। শান্তিনিকেতনেই তাঁর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। এ প্রভাব তিনি বারবার স্বীকারও করেছেন। নানাভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁর ব্যক্তিজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণে শান্তিনিকেতনের ভূমিকা। একসময় রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি ভিন্নরকম। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে সেখানে পাঠদান করা হতো। তাঁর কথায় – Schools without walls। যদিও সে আমলে নিকেতনের ভৌতকাঠামো তেমন ছিল না। সেসব সমস্যাও তিনি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
যে পরিবেশে বৈশ্বিক মানুষ হয়ে ওঠার বিবিধ আয়োজন ছিল। প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধনে বিদ্যা অর্জনের যে পরিবেশ থাকার কথা, সবই ছিল সেখানে। যে সুবিধা তিনি মনোযোগের সাথে গ্রহণ করেছেন। শিক্ষার মূলমন্ত্র, দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের প্রণোদনা তাঁর বাল্য- কৈশোরেই অর্জিত এ শান্তিনিকেতনে। এ শিক্ষা মূলত অমর্ত্য সেন-এ রপান্তরে সহায়ক হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও শিক্ষাদর্শন ভাবনার ভিত্তি নির্মিত হয় যেখানে। তিনি তার অংশবিশেষ বলেছেন, The Country of First Boys গ্রন্থে।
Home in the World গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয়ে আলাদা আলোচনা হতে পারে। এখানে শুধু নোট লিখে স্মরণ রাখা মাত্র। তাঁর জীবনের অনেক বিষয়ই বিবৃত করেছেন। বিশেষত ক্ষিতিমোহন সেনের চিন্তা, দর্শন, লেখালেখি বারবার এনেছেন। তা স্মরণ করাটাই স্বাভাবিক। ক্ষিতিমোহনের কাছেই তিনি দীক্ষিত হন বহুত্ববাদী দর্শনে। যা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দেয়। উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাহাত্মা গান্ধী, কার্ল মার্কস, গ্রামসি, লেনিন, তপনরায় চৌধুরী, নবনীতাদেব সেন, ও কমরেড মুজফফর আহমদসহ কেম্ব্রিজের পণ্ডিত- দব, স্রাফা, রবার্টসনসহ অনেকের কথা। যাঁদের সাথে তাঁর বিবিধ বিষয়ে তর্ক হয়েছে। যেখান থেকে তিনি মনস্থির করেছেন ‘সামাজিক চয়ন’ ধারণা ও গবেষণায়।
অবিভক্ত ভারতের রাজনীতি, সমাজ, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বাঙালির মন-মেজাজ ইত্যাদি চমৎকার লিখেছেন। সেকালে কলকাতা, ঢাকার ভয়াবহ দাঙ্গা নিজে অবলোকন করেছেন। ঢাকার দাঙ্গায় আক্রান্ত ‘কাদের মিয়া’র স্মৃতি তাঁর জীবনের অন্যতম অংশ। যা তিনি কখনোই ভুলতে চান না। বিধ্বস্ত, দহনে কাতর অসংখ্য মানুষের হাহাকার তিনি লক্ষ করেছেন হিংসা ও খাদ্যাভাবে। এ মলাটে হয়তো সবটুকু তুলে আনা সম্ভব নয়। যেটুকু এখানে উল্লেখ করা যায়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে আলাদভাবেই আলোচনা করেছেন। যা তাঁর অত্যন্ত আগ্রহ ও জীবনব্যাপী গবেষণার বিষয়। দুর্ভিক্ষের ঘটনাবলি তাঁর ভেতরে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা তিনি কখনোই সরিয়ে রাখতে পারেনি।
যা নিয়ে বলতে চাই- এ গ্রন্থভুক্ত বিষয়াবলি তাঁর অন্য গ্রন্থেও আমরা পেয়ে থাকি। যে বিষয়গুলো তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে পারতেন। অথবা অন্যভাবে বলা তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
এ স্মৃতিকথা পাঠে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আনন্দ পেয়েছি, শুধু ভাষার কারণে। অন্য কারও লেখা হলে তা হয়তো পড়তে পারতাম না ভাষিক বাধার যন্ত্রণায়। সহজ ভাষায় লেখার জন্য আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের এ বই পাঠ করতে কোনো অসুবিধা হয় না।
এ স্মৃতিকথা একহিসেবে তাঁর জ্ঞানবিদ্যা অর্জনের অভিযাত্রার বিবরণ। একেবারে একাডেমিক স্তরের স্মৃতিচারণ। এ বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে সব সময় নয়। মাঝে মাঝে তিনি লোকালয়ে এসেছেন, তবে সেখানে বিশ্রাম গ্রহণ করেছেন খুব অল্প সময়। আসলে তাঁর মতো বিশ্বশ্রুত একজনের কাছে কী কী জানতে চাই বা বুঝতে চাই। অন্য জায়গা থেকে চাহিদা খানিকটা বেড়ে যায় বৈকি।
আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা প্রসঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি তাঁর অন্য লেখা, বা বইয়ের মাধ্যমে আগেই অবগত হয়েছি।
অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এ বই পাঠ করতে শুরু করি, এবং খুব স্বল্প সময়ে শেষও করি। অবশেষে অংশত হতাশ হয়েছি। এমন জীবন পাঠ করে সাধারণ পাঠকের কী অর্জন হয়। এ পর্যন্ত বাঙালি ভূগোল, ভুবনের খুব কমসংখ্যক লেখকের আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা পড়ে আনন্দ পেয়েছি। সকলেই নিজের প্রতিষ্ঠা আর আলোকিত দুনিয়ার কথা প্রকাশ করেন। মাঝে মাঝে তো পা পিছলে যায়। চলার পথে অনেক খানাখন্দক থাকে। এসব আমরা সহজেই ভুলে যাই বা যেতে থাকি? জীবন শুধুই কি এত সাদা, উজ্জ্বল? অমর্ত্য সেনের জীবন হয়তো তাই। সমন্বিত এক জীবন। তাঁর মতো অভিজ্ঞতাও অনেকের নেই।
আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা লেখার সময় অনেকেই নিজের ভুল, ত্রুটি, অশুদ্ধতার অংশ একেবারে লুকিয়ে, এড়িয়ে গেছেন। জীবন তো একপাক্ষিক বা একমাত্রিক নয়। সবখানে শুভ্র, শুদ্ধ, সরল জীবনের কাহিনি। কিন্তু আমাদের সামনে তো রয়েছে- জাঁ জেনে, সার্ত্রে, গোর্কি, খুশবন্ত, নেরুদার জীবনী। বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে অকপট কথা বলার লোক পাইনি; একমাত্র মনোরঞ্জন ব্যাপারী ছাড়া। ‘জীবনের সবকিছু যায় না বলা’ সকলেই এ সীমানা এখনও অতিক্রম করতে পারেননি। বস্তুত, Home in the World A Memoir বইটি এ দেয়ালে আটকা পড়ে গেল কি? হয়তো তিনি সেসব বিষয়ে আলোকপাত করতে চাননি। তিনি যেমন বিশ্বনাগরিক, তেমন এ গোলকই তাঁর ঘর। অতএব তাঁর সামনে তো অবারিত দুনিয়া খোলা ছিল। তবে এ গ্রন্থে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি, দর্শন, সমাজ, সাহিত্যজগতের বিস্তর তথ্য। যা থেকে একজন পাঠক নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।

ছড়িয়ে দিন