পাহাড়ি জনপদে বাড়ছে নারী শিক্ষা

প্রকাশিত: ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২১

পাহাড়ি জনপদে বাড়ছে নারী শিক্ষা

আলম শামস

রিসা চাকমা। রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। রিসা বলেন, আকর্ষণীয় পাঠদান, শিক্ষকদের বন্ধুসুলভ আচরণ ও সরকারের শিক্ষাবান্ধব উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদির কারণে আমরা নিয়মিত পড়াশুনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ পাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি শিক্ষার প্রতি সরকার এভাবে সজাগ দৃষ্টি রাখলে অনিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া দূর হবে।

রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী হাসিনা আক্তার বলেন, এই উপজেলায় প্রায় ২২% শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিকূলাতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং মাদ্রাসা পর্যায়ের উচ্চ শিক্ষা পাঠ সমাপ্ত করতে পারে না। তবে এখন এই হার ধীরে ধীরে কমে আসছে।

পাহাড়ি জনপদে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এবং মাদ্রাসা পর্যায়ের উচ্চ শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার বিষয়ে রামগড় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফয়েজ আহম্মদ বলেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাসস্থান থেকে স্কুল-কলেজ অধিক দূরত্ব, শিক্ষক স্বল্পতা, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, পারিবারিক কাজে সহযোগিতা, অনিয়মিত উপস্থিতি ইত্যাদি কারণে পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। তবে বর্তমান সরকারের শিক্ষাবান্ধব বিভিন্ন প্রকল্পের সহযোগিতায় আমরা এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০১৭-১৮ সালে নারী শিক্ষার্থী সংখ্যা-১৫৬ জন, ২০১৮-১৯ সালে-১৭৪ জন, ২০১৯-০২০ সালে ২০৫ জন। রামগড় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পর্যায়ে ২০১৭-০১৮ সালে ১১৮৫ জন, ২০১৮-০১৯ সালে ১২৪৩ জন, ২০১৯-০২০ সালে ১২৫০ জন। এতে দেখা যায় প্রতি বছর নারী শিক্ষার্থীর হার বাড়ছে।

একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আগে মার (নারীর) সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া জরুরি। বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশে নারী শিক্ষার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রের সংখ্যার সমতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে একজন নারীও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা সমাজ ও জাতিকে আলোকিত করবে এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) দেশের শিক্ষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে মোট ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী। মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ শতাংশের বেশি ছাত্রী। এইচএসসি পর্যায়ে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও এ ক্ষেত্রে সমতা প্রায় প্রতিষ্ঠার পথে। ওই স্তরে ছাত্রীর অংশগ্রহণের হার ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। বিগত সময়ের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জেএসসি-জেডিসি এবং এসএসসি পরীক্ষার পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে, অংশগ্রহণেই শুধু বেশি নয়, সফলতা অর্জনের দিক থেকেও নারীরা এগিয়ে।

গত ২০১৯ ডিসেম্বরে পিইসি এবং জেএসসি-জেডিসির ফল প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, পিইসিতে মোট অংশগ্রহণকারী ছাত্রীর মধ্যে ৯৫ দশমিক ৪০ শতাংশই উত্তীর্ণ হয়েছে। সর্বোচ্চ সাফল্যের মানদ- হিসেবে বিবেচিত জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ভালো করেছে। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধারার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রফেশনাল, কারিগরি ও শিক্ষক শিক্ষায়ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে ধর্মকে অনেকেই প্রতিবন্ধক মনে করে থাকেন। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষায় ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর অংশগ্রহণ ১০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে মাদ্রাসার মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি ছাত্রী। উচ্চ শিক্ষায়ও দিন দিন বাড়ছে নারীর হার।
-০২-
জরিপে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই, আর্থিক সহায়তা, প্রাথমিক স্কুলে ‘মিডডেমিল’ কর্মসূচি চালু, নিয়মিত মনিটরিং, মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে বৃত্তি প্রদানের মতো জনপ্রিয় ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু থাকার সুফলই হচ্ছে দেশে ক্রমাগত নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি। বর্তমানে নারী শিক্ষার হার যেভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। আর এমন পরিকল্পনা গ্রহণের ফলেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমহারে শিক্ষিত হয়ে পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির বৃহত্তর উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

দেশের কোনো কাজে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঐকমত্য থাকলে তার ফলাফল কী হতে পারে এর অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে নারী শিক্ষা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময়ে সরকার নারীদের শিক্ষামুখী করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় দেশে ক্রমেই নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। কয়েক বছর আগেও পাহাড়ি জনপদে যে ছেলেমেয়েরা সময় কাটাতো বনে-বাদাড়ে, মাঠে-ঘাটে, গো-চারণে, পাহাড়ি দুর্গম জঙ্গলে, কিংবা মা-বাবার কাজে সহযোগিতা করতো, আজ তারাই বিদ্যাপীঠে। সমতল ভূমির পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদে শিক্ষায় যে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে এটা তার দৃষ্টান্ত।

চারদিকে উঁচু-নিচু ছোট-বড় পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা বন জঙ্গলই এসব এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিদের জীবন-জীবিকা। এসব পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার হার ছিল অনেক কম। স্কুলগামী শিক্ষার্থীর চেয়ে ঝরে পড়ার হারই ছিল বেশি। এর প্রধান কারণ ছিল বিদ্যালয় সংকট, শিক্ষক সংকট, অনুন্নত রাস্তাঘাট, দরিদ্রতা, কুসংস্কার, অবহেলা-অসচেতনতা, সর্বোপরি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। সংগত কারণেই প্রত্যন্ত এলাকার বসবাসকারীদের স্বপ্নের মধ্যেও ছিলনা তার ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়বে, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে দেশ সেবায় নিয়োজিত হবে।

শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে পাহাড়ি জনপদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিতকরণের এই অসম্ভব কাজটিকেসম্ভব করতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। মাত্র এক দশক আগেও এ জনপদে যেখানে স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র হাতেগোনা কয়েক জন, সেখানে এখন তা বেড়ে প্রায় শতভাগে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক মাতৃভাষায় পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই তাদের নিজস্ব ভাষার শিক্ষক। আবার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকলেও নেই ওই ভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ। ফলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাতৃভাষায় পাঠ্যবই পাঠদান কিছুটা হলেও ব্যাহত হচ্ছে। এই সব ছোটখাট সমস্যা দূর হলে পাহাড়ি জনপদে শতভাগ শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে।

রামগড় সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ নুরুন্নবী জানান, বিনামূল্যে বইপ্রদান, উপবৃত্তিপ্রদান, কলেজভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, শিক্ষক-অধ্যক্ষ ও প্রভাষকদের নানামূখী প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বর্তমান সরকার নানা কার্যক্রম গ্রহণ করায় দিনদিন নারী শিক্ষার্থী ভর্তি-উপস্থিতি ও ঝরে পড়া পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে অভিভাবকদের অসচেতনতা, সামাজিক কাঠামোতে কণ্যা শিশুদের প্রান্তিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অসঙ্গতি ও বাল্য বিয়েসহ ইত্যাদি কারণে সংকুচিত হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবন। এসব কারণে মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রীরা পড়াশুনা অসম্পন্ন রেখে ঝরে পড়ছে।

রামগড় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবু কাউছার বলেন, এ এলাকায় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-১টি, মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় ২টি, সরকারি কলেজ ১টি, অনার্স কলেজ ১টি এবং ১টি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকার শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যাচ্ছে।

পার্বত্যাঞ্চলে নারী শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষক, অভিভাবক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আন্তরিকতাপূর্ণ শিক্ষা প্রকল্পগুলো নারী শিক্ষা প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে, যার উজ্জল দৃষ্টান্ত পাহাড়ি জনপদ।