পিতৃকথন

প্রকাশিত: ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৩

পিতৃকথন

 

 

শামীমা সুলতানা

২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। খুব প্রস্তুতি চলত কয়েকদিন ধরে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে ২০ ফেব্রুয়ারি দিনটিতে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় আমরা কাটাতাম।

বিকাল থেকে আমরা ছুটতাম ফুলের সন্ধানে। নিজেদের বাড়ির ভালো ফুল না ছিঁড়ে অন্যের বাগানে খোঁজ করতাম ফুল। কোনভাবে কিছু ফুল যোগাড় হত। সারারাত কাঞ্চন মিয়া দাদা (দারোয়ান) আমাদের বাগান পাহারা দিত যেন কেউ ফুল চুরি করতে না পারে। ভাইয়ারা অন্ধকার থাকতে চলে যেত শহীদ মিনারে। আমি কোনদিন স্কুলের প্রভাতফেরি তে যোগ দিতে পারি নি। আমার কাছে আকর্ষণীয় ছিল আব্বুর সাথে প্রভাতফেরি তে যাওয়া টা।
খুব ছোটবেলায় একবার ভোর চারটায় অন্ধকার থাকতে আব্বুর সাথে বের হলাম। তখন আমার বয়স হবে বছর পাঁচেক। প্রথমে গেলাম খালিশপুর বি আই ডি সি রোড পার্টি অফিসে। সেখানে বড় মালা তৈরি করা হয়েছে, তোড়া বানানো হয়েছে। দলীয় মিছিল শুরু হল ৫.০০ টায়। ছোট্ট আমি সেই মিছিলে যোগ দিলাম। আব্বু লিড দিচ্ছে। রাজনৈতিক মিছিল বেশ গতিসম্পন্ন হয়। ছোট ধাপে দ্রুত হাঁটা হয়। আমার জীবনে সেই প্রথম সেই শেষ কোন মিছিলে যোগ দেওয়ার ঘটনা। সাথে আব্বু!
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙান একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
রক্ত টগবগ করানো এই গান, প্রভাতফেরি, অনেক বড় দলীয় মিছিল রাস্তায় চলেছে, বিপরীতমুখী অনেক মিছিলকে অতিক্রম করছে- সামনে আমার মহীরুহ আব্বু; চোখের পাতায় সাদাকালো এই দৃশ্যায়ন আমার সারাজীবনের সাথী। বিএল কলেজ শহীদ মিনারে আব্বু ভাষণ দিল, সেখান থেকে কাশীপুর, খালিশপুর হয়ে বাসায় ফিরলাম আমরা সকাল ১০ টায়। ছোট্ট পা দুটি নিরাভরণ। আব্বু জিজ্ঞেস করছে ‘কষ্ট হয়েছে মা’? আমি না সূচক মাথা নাড়লাম। আব্বুর হাত ধরে ঘরে ফিরলাম। গুছিয়ে বলতে যদি জানতাম তাহলে বলতাম ‘আমার সারাজীবনের অর্জন হল আজ বাবা!’ এর চেয়ে বড় কোন রাজনৈতিক দীক্ষা হতে পারে না।।
সারাটা জীবন আব্বু আমাকে সাথে নিয়ে প্রভাতফেরি তে গিয়েছে। আব্বু নড়াইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরে আমাকে নিয়ে পদব্রজে মিছিলে অংশ নেয় নি, আমরা রিকশায় যেতাম। খালিশপুর, দৌলতপুরের সবগুলো শহীদ মিনার ঘুরে দৌলতপুর শামীম হোটেলে নাস্তা করে বাসায় ফিরতাম। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং শোক দিবসে আব্বু নিজ হাতে পতাকা তুলত বাড়ির ছাদে। সাথে থাকতাম আমি আর মা।
সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছেন। তিনি খুলনায় আসবেন। খালিশপুর দৌলতপুর থেকে পাঁচ বাস ভর্তি নেতা কর্মী গেল যশোর এয়ারপোর্ট এ নেত্রীকে রিসিভ করতে। আমি সাথী হলাম আব্বুর। ১৯৮৩ সাল।
যশোর এয়ারপোর্টে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। আমার চারবছরের জীবন তো কিছুই না; চল্লিশের কোঠায় পৌঁছেও চার বছর বয়সে দেখা সেই দৃশ্য অদ্বিতীয় হয়েই রয়ে গেল! নিজের চোখে দেখেছি মানুষের উন্মাদনা, ভালোবাসা, চিৎকার করে কাঁদা, কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারানো।।
এগিয়ে গেলাম ভিড় ঠেলে সামনে। আমার হাত আব্বুর হাতে। বিমানের দরজা খুলে নেমে এলেন নেত্রী। আমি ছাই কি বুঝি আর কাকেই বা চিনি। এগিয়ে এলেন শাড়ি পরিহিতা এক ছিপছিপে ভদ্রমহিলা। এগিয়ে গেলাম আমি হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে। কোন গ্রুমিং না, ট্রেনিং না, কেউ কিছু বলে দেয় নি, শেখায়ও নি! আব্বু শুধু বলল ‘যাও মা’। পাশ থেকে কেউ আমার হাতে ফুলের তোড়াটি দিল। আমি এগিয়ে গেলাম আব্বুর ‘যাও’ কে সাথে নিয়ে। যাওয়াটাই শুধু আমার কাজ ছিল!
নেত্রী নতজানু হলেন। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসলেন, আমার হাত থেকে ফুল নিলেন, আমাকে চুমু খেলেন। পূর্বাপর আর কিছু নেই। সেদিন থেকে খালিশপুর দৌলতপুরের অনেকের কাছে আমি হয়ে গেলাম ইন্দিরা গান্ধী! আমাকে এই নামেই তারা ডাকত।
রাজনীতি কি আমি জানি না। কোনদিন একটা স্লোগান আমি দেই নি। কিন্তু আমি জানি ভালোবাসা কি! রাজনৈতিক দীক্ষা আমার রক্তে বপন করেছে আমার বাবা।
দৌলতপুর রেললাইনের পাশে সেলুনে চুল কাটাতাম আব্বুর সাথে গিয়ে। কাঠের চেয়ারে তক্তা বসিয়ে তার উপরে আমাকে বসানো হত। একদিকে বাটার দোকান আর সংসার নামক দোকান, অপর দিকে রাস্তা পার হলে হোসেন বেকারি, ডাক্তার হালিম কাকার চেম্বার। চুল কাটানো হলে আব্বুর সাথে হোসেন বেকারির পাশে চায়ের দোকানে গিয়ে বসতাম। আকতার বন্দসহ অন্যান্য দলীয় কর্মীর সাথে কথা আলোচনা সেরে হোসেন বেকারিতে ফান্টা খেয়ে সিভিটার প্যাকেট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম আমি।
নাকজ্বলা প্রস্রাবের গন্ধ সয়ে রেললাইনের পাশে কালুর দোকানে চা খেত আব্বু। দোকানের সব লোকের চায়ের বিল মেটাত। আব্বু যেখানে, ভিড় সেখানে। নেতা একদিনে গড়ে ওঠে না। বহু বছরের সাধনায় নেতা গড়ে ওঠে। বহু ত্যাগ, বহু তিতিক্ষা, বহু বাউণ্ডুলেপনা একসাথে জড়ো হয়ে নেতার অবয়বকে প্রস্ফুটিত করে তোলে।

 

শামীমা সুলতানা ঃ লেখক , বিশেষ প্রতিনিধি রেডটাইমস

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

April 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930