পুস্তক দাদুর গল্প

প্রকাশিত: ১:০৬ অপরাহ্ণ, মে ৩, ২০২১

পুস্তক দাদুর গল্প

ননীগোপাল দেবনাথ

আজ কানাডার একজন পিতামহের গল্প বলতে আগ্রহী হয়েছি। উনি পাঁচ কন্যার পিতা এবং সর্বসাকুল্যে ১২ জন নাতি-নাতনির পিতামহ। তাঁকে নাতি-নাতনিরা সর্বদাই লক্ষ্য করে, হাতে একখানা বই অথবা কলম হাতে বই সামনে দাদু কিছু লিখছেন। খুব কম সময়ই তাকে দেখা যায় হাতে কোন বই নেই। সবসময় তিনি গল্প, কবিতা, ইতিহাস, বিভিন্ন বই কিংবা জ্ঞানীদের উদ্ধৃতি পড়তে থাকেন এবং অন্যদের সাথে আলোচনা করতে ভালবাসেন। তাই নাতি-নাতনিরা সকলে মিলে যুক্তি করে একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দাদুকে সবাই পুস্তক দাদু বলে ডাকবে, সেই থেকে তিনি ‘পুস্তক দাদু’। তিনি নিজে পড়তে লিখতে ভালোবাসেন, সুযোগ পেলেই ভাল কোন বিষয় হলে নাতি-নাতনিদের নিকট সে বিষয় উপস্থাপন এবং আলোচনা করেন। এভাবে উপস্থাপন করতে গেলে বিষয়টি নতুন অভিজ্ঞতায় আর একবার পড়া হয়, আর যে সব বিষয় ছোটদের জানা নেই সেগুলোই তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন। অনেক সময় এমনও ঘটেছে নাতি-নাতনিদের যাহা উপস্থাপন করছেন, সেই বিষয়টি পাঁচবার ইতোপূর্বে পাঁচ মেয়েকে আলাদা আলাদা ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

যে কোন বিষয়ে পড়ার পরে সেটি নিয়ে বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলোচনায় নতুন অভিজ্ঞতার উদ্ঘাটন ঘটে, এর মাঝেই পড়ার সবচাইতে বেশী আনন্দ পাওয়া যায়। পুস্তক দাদুর ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি বরং আরো বেশী কিছু, জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ও ভাবোদ্দীপক মন তার, তাই ওনার নিকট আলোচনা মানে অধিক প্রীতিকর। তবে তিনিও কিছু বই পড়তে গিয়ে অধৈর্য হয়ে পড়েন, যদি না বইটির ২০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েও তাতে মন বসাতে না পারেন। তখন সেই বইটি পড়া তিনি পরিত্যাগ করতে ইতস্ততঃ করেন না। আবার বইটি যদি সাজানো কল্পকথার না হয় তবে তিনি প্রায়শই তন্নতন্ন করে সূচিপত্র পরীক্ষা করে দেখেন এবং শেষের দিকটায় চোখ বুলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তার মূল্যবান সময় দিয়ে মনযোগ সহকারে পুরো বইটি পড়বেন কী না। অনেক সময় তিনি একটি বই একাধিকবারও পড়েন, কার্যত তিনি উইলিয়াম ও অ্যারিয়াল ডুরান্টের বিশ্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস (১১ খন্ড) তিনবার পড়েছেন।

তার মতে আক্ষরিক ভাষা ও শব্দের যে শক্তি, একমাত্র মনোযোগ সহকারে পড়ার মাঝেই তাহা অনুভব করা সম্ভব । বিশেষ করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের সমগ্র রচনা দুর্বিনের মত আমাদের এমন কিছু পরিবেশন করে, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে এবং পরিবর্তিত এ বিশ্বকে দেখতে পারি। পড়া-লেখা এমনই একটি সহজাত গুণসম্পন্ন উপহার। যে কোন একটি বই নির্বাচন করে কেহ পড়তে থাকলে নিজস্ব গোপনীয়তায় নিজের মাঝেই হারিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন আমরা পড়ালেখার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক, বিশ্বজনীন নাগরিক হতে পারি, নিজের চেষ্টায় নানা সভ্যতা সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা জানতে পারি, ফলে মানবিক গুণাবলীও অর্জন করতে পারি। পড়ালেখা আমাদেরকে শিল্পকর্ম ও অপরের আবেগ অনুভূতির সঙ্গে একাত্ব হওয়ার ক্ষমতা দেয়, আমরা সহানুভূতিশীল হতে শিখি। তরুণ সমাজের নিকট বই পড়া খুব ভাল এক পন্থা যার মাধ্যমে তাদের জ্ঞানের আলো বিকশিত হতে পারে এবং তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতি গুলোকে অক্ষয় রাখতে সহায়ক হয়।

লেখা এমন একটি গুণ যার জন্য প্রয়োজন চিন্তাভাবনার ক্ষেত্র প্রসারিত রাখা, লেখক তার কলমের দ্বারা বা আজকাল কম্পিউটারের কিবোর্ডের দ্বারা চিন্তাশক্তিতে বিচরণ করে অনুভূতিকে অক্ষরে বিকশিত করতে সক্ষম হয়। লেখা সহজ কাজ নয়, এর জন্য চাই মনের দৃঢ়তা, সুচিন্তিত প্রয়াস, ধৈর্য ও নিষ্ঠা। লেখক তার টেবিলে বসলে তার ভাবনা কলমের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে অক্ষরে বর্ণিত হতে পারে। ভাল কোন কিছুই দৃঢ় উদ্যম ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। পুস্তক দাদু এ’ কথাটি যথার্থ উপলব্ধি করেছেন বিশ্ব বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময়। তিনি আগ্রহ ও ন্যায়-নিষ্ঠার দ্বারা লেখার গুণও আয়ত্ত করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাময়িকীতে নিজে লিখেছেন এবং সহকর্মীদের লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এমন এক সময়ে তার মনে বই লেখার আগ্রহ জাগে, লিখতে শুরুও করেছিলেন, দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় ডিন পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় বই প্রকাশকদের শিক্ষা অনুষদে ডেকে এনে তরুণ প্রফেসরদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বই লিখতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতি বছর নতুন নতুন বই প্রকাশিত হতে থাকে এবং নতুন বইয়ের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ধীরে ধীরে বিশ্ব বিদ্যালয়ে প্রতি বছর নতুন বইয়ের মেলার আয়োজন হয়, যাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘বই লেখা উদ্‌যাপন’। এই প্রক্রিয়ায় নতুন লেখকের সৃষ্টি হয়, ছাত্রদের মাঝে বইয়ের গুরুত্ব বাড়তে দেখা যায়, এমনকি অনেক ছাত্রও লেখায় আগ্রহী হয়। বই লেখা সত্যি এমন কিছু যার উদ্‌যাপন প্রত্যেক লেখকেরই করা উচিত। লেখক ছাড়া পাঠকও তৈরি হয় না। পুস্তক দাদু শুধু পড়া-লেখা করেন না, অন্যদের লিখতে পড়তে অনুপ্রাণিত করেন, লেখক পাঠক সৃষ্টির গবেষণায়ও মনোনিবেশ করেছিলেন।

এই অনুচ্ছেদে পাঠকদের মনে এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে পড়া-লেখার একনিষ্ঠ সাধক এই মহান ব্যক্তিটি কে? আদতে তাঁকে আজ সমগ্র কানাডার কিশোর-কিশোরীদেরও পুস্তক দাদু বললে অত্যুক্তি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন থেকে প্রেসিডেন্ট ও চ্যান়্সেলার হয়েছেন এবং মেধা ও জ্ঞানের সমৃদ্ধি এতটা প্রখর দেখে কানাডা সরকার পরবর্তীতে ওনাকে দেশের সর্বোচ্চ আনুষ্ঠানিক পদে অধিষ্ঠিত করেছিল। ইনি আর কেহ নন কানাডার স্বনামধন্য ২৮তম ( ২০১০-২০১৭ ) গভর্নর জেনারেল ডেভিড জনষ্টন। তিনি নিজে জীবনে অনেক বই লিখেছেন বার বার পুরস্কৃত ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তার চাইতেও বড় কথা বহু জ্ঞানী গুণীজনদের আপন প্রচেষ্টায় তিনি নিজ হাতে পুরস্কৃত ও সম্মানে ভূষিত করেছেন। লেখক, অনুবাদক, অঙ্কন শিল্পী সহ বিভিন্ন মেধার ব্যক্তিদের আমন্ত্রিত করে বিশেষ আয়োজিত আনুষ্ঠানিকতায় তাদের সম্মানিত করেছেন তার সরকারী বাসভবন রীডো হলে (অটোয়া, কানাডা)। রীডো হলের লাইব্রেরী ডেভিডের সবচাইতে সমাদৃত স্থান ছিল, কারণ সেখানে রয়েছে ১৯৩৬ সন থেকে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার প্রাপ্ত জ্ঞানগর্ভ সম্বলিত সকল প্রকারের উল্লেখযোগ্য যত বই। তাঁর মতে লেখকরা কানাডার স্বরূপতা কানাডিয়ানদের কাছে এমন কি বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক। কানাডার প্রখ্যাত লেখক রবার্ট ডেভিস্ একবার বলেছিলেন “একটি জাতি সাহিত্য ও সমগ্র রচনা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ জাতি হতে পারে না”। পুস্তক দাদু ডেভিড জনষ্টনের মতে কোন জাতি যদি তার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষাকে উপেক্ষা করে সে জাতি তার দেশের সন্তানদের লেখা-পড়ার অগ্রগতি রোধ করে। এবং কখনোই উন্নত জাতি হতে পারে না ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন হতে ব্যর্থ হয়।

 

এরই মাঝে পাঠকগণ অবশ্যই পুস্তক দাদু সম্পর্কে আর একটু জানতে আগ্রহী হবেন, কিছু না বলা হলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।পুস্তক দাদুর আসল নাম ডেভিড লয়্যাড জনষ্টন, জন্ম ১৯৪১ সাল, অন্টারিও, কানাডা। তিনি কানাডার একজন শিক্ষা ব্রতী, গ্রন্থকার, রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় দক্ষ ও সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে হার্বার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন, কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি অর্জন করেন। এর পর শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ে কাজ করেন, অবশেষে প্রশাসনিক পদে ডিন, ভাইস-চ্যান়্সেলার ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন ওয়টারলু বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাকগীল বিশ্ব বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে । একই সময়ে তিনি রাজনীতি ও জন প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট হন, রাজনৈতিক মতানৈক্যের সমঝোতা ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাছাড়াও সরকারী বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং নানা করপোরেশনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তাঁকে কুইন এলিজাবেথ-২ কানাডার গভর্নর জেনারেল পদে নিয়োগ করেন, তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের সুপারিশক্রমে এবং ২০১৭ সাল অবধি এই গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

তিনি কানাডার জাতীয় সম্মাননা “অর্ডার অব কানাডা” সহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, কানাডার প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানার্থে প্রদত্ত ডক্টর অব ল উপাধিতে ভূষিত করে। একজন দক্ষ হকি খেলোয়াড় ছিলেন বলে হার্বার্ডে পড়ার সময় তাকে হার্বার্ড স্পোর্টস হল অব ফেইম খেতাব দেয়া হয়।

পুস্তক দাদু নিজের পেশা আইন শাস্ত্র ছাড়াও বেশ কিছু বই লিখেছেন, তার লেখা বইয়ের মাঝে নিম্নের বই কয়টি কানাডায় বহুল পঠিত ও উল্লেখযোগ্য।

 

The Idea of Canada: Letters to a Nation.

Trust: Twenty Ways to Build a Better Country.

Ingenious: How Canadian Innovators Made the World Smarter, Smaller, Kinder, Safer, Healthier, Wealthier, and Happier.

Equality.

নিজের পেশা আইন শাস্ত্রে তার প্রধান প্রধান লেখা নিম্নোক্ত:

Cases and Materials on Corporate Finance and Securities Law (1967).

Computers and Law (1968).

Cases and Materials on Company Law (1969).

Cases and Materials on Securities Law (1971).

Business Associations (1979).

Canadian Companies and the Stock Exchange (1980).

Canadian Securities Regulation (1982, 2003, 2006).

Partnerships and Canadian Business Corporations, Vols. 1 and 2 (1983, 1989, 1992).

If Quebec Goes … The Real Cost of Separation (1995).

Getting Canada On-line: Understanding the Information Highway (1995).

Cyberlaw (1997).

Communications in Law in Canada (2000).

Halsbury’s Law of Canada (2007).

—————————————————————————————————–

Nani Gopal Debnath,P.Eng

48 Tordale Cres,Toronto

M1P 3X7, Canada

Phone:1-416-296-0958

Email: debnath48@hotmail.com

 

 

ছড়িয়ে দিন