পূর্ব বাংলার বাম ও কমিউনিস্ট আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৭১) সাফল্য ও ব্যর্থতা : ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশিত: ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২০

পূর্ব বাংলার বাম ও কমিউনিস্ট আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৭১) সাফল্য ও ব্যর্থতা : ড. মাহবুব উল্লাহ্

 

 

 

 

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার :

 প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহর লেখা এই গ্রন্থটি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসকে ঘিরে রচিত হলেও এর মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রকাশিত অধ্যায়কে উন্মোচিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। তুখোড় মেধাবি মাহবুব উল্লাহ্র ছাত্র রাজনীতি, পাকিস্তান বিরোধি গণআন্দোলনে সক্রিয় ভ’মিকা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন এবং স্বাধীনতা পরবর্তি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকার প্রতিচ্ছবি এই গ্রন্থে উঠে এসেছে। বিষয় সূচি হিসেবে উল্লেখিত নিবন্ধগুলো হচ্ছে- রাজনীতি: বাম ও ডান ধারা, সমাকালীন বিশ্ব পুঁজিবাদ, ধ্রুপদী মার্ক্সবাদের তিনটি প্রশ্ন, ভারত ও চীনে কমিউনিজম, তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভারত ও পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি, ভাষা আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টির মতিভ্রম, আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যুত্থান, শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান থেকে একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিগত শতকে আমাদের জাতীয় ইতিহাস এবং উপমহাদেশের রনাজনীতির প্রতিটি সংগ্রামি গৌরবময় অধ্যায়ের সাথে প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততার বস্তুনিষ্ঠ প্রামান্য বর্ণনা ও বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ রয়েছে এই গ্রন্থে। পূর্ববাংলা ছাত্রইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঊনসত্তুরের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট রচনা ও জনমত গঠনে ড.মাহবুব উল্লাহর অসামান্য ভূমিকার সচিত্র তথ্য পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। ইতিহাস ও রাজনীতি সচেতন জ্ঞান বিপাসুদের জন্য এটি অবশ্য পাঠ্য এবং সংগ্রহে রাখার মত বই। গ্রন্থের শেষদিকে অর্ধশতাধিক পৃষ্ঠাব্যাপী পরিশিষ্ট এবং তথ্যসুত্র বইটিকে একটি গবেষণামূলক আকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যবান করেছে। সৃজনশীল প্রকাশনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে প্রকাশনার অন্যতম প্রতিষ্ঠান দি ইউনিভার্সেল একাডেমি থেকে প্রকাশিত পৌনে তিনশ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ৪০০ টাকা।

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ঘটলে সমগ্র সমাজে সৃষ্টি হয় হিংসা – প্রতিহিংসার দূরপণের কালিমা, হিংসা – বিদ্বেষ এবং অবিশ্বাস – অনাস্থার হিংস্র পরিবেশ। দেশের অর্থনীতি দূর্বৃত্তায়িত সমাজের একাংশ সীমাহীন ক্ষতির মধ্যে পড়ে । রাজনীতি দূর্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণে এলে সমগ্র সমাজ জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এতে সভ্য জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে । বর্তমানে দেশের যে সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে তা দিয়ে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করাও সম্ভব নয়। এসব প্রতিষ্ঠান এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে, যে উদ্দেশে রাজনীতির জন্ম হয়েছে তা অর্জিত হবে না যদি না রাজনীতির দূর্বৃত্তায়ন বন্ধ হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো মেধা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে সুসংগঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জার্মান দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবারের ( Max Weber ldear – Typical framework -) বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংগঠিত হয়েছে প্রধানত সরকারের সহযোগী সংগঠন সমূহ থেকে সংগৃহীত দলীয় ক্যাডার বা অনুগতদের দ্বারা। গণতন্ত্র তাই এত কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতি পরিচালনার জন্যে এমন এক নেতৃত্ব দরকার যা আকাশের মতো উদার, সমুদ্রের মতো গভীর, সর্বংসহ মাটির মতো সহিষ্ণু । প্রফেসর ইংরাজিম কোহাকের ( Erazim Kohak ) কথায় ” গণতন্ত্র হলো পরিপূর্ণতার, অসম্পূর্ণতার নয়,” গণতন্ত্র হলো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের, সংঘাত বা সংঘর্ষের নয়। গণতন্ত্র হলো আদর্শের লোভে নয়,, [ Democracy is about maturity, not pettiness,, goodwill, not contentiousness ; idealism, not greed ; ]
যে কোনো রাষ্ট্রের সুষ্ঠু শাসন – প্রশাসনের মূলে থাকে নৈতিকতার সুদৃঢ় এক বাতাবরণ। সাময়িকভাবে কোনো কোনো ক্ষেতে সংকট দেখা দিতে পারে । পূর্ব বাংলার বাম ও কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৪৭ – ১৯৭১, গবেষণা ও বিশ্লেষনের বিষয় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকে বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের জন্য ছিল এক সুবর্ণ যুগ। এই সময়ে শত- সহস্র মুসলিম যুবক ও তরুণরা বাম আন্দোলনে ঝুঁকে পড়ে । এরা ছিল মেধাবী এবং সাহসী। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয়, কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই সুবর্ণ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের কাছে বইটি দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আমার বিশ্বাস । এই বইটিতে লেখক দেশবরেণ্য প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবি প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ তিনি যে সমস্ত বিষয়ে ঘটনাবলী উল্লেখ করে তুলেছেন সেই বিষয়টি সাহিত্যের বিচারে বইটি একটি উৎকৃষ্ট ও সুখপাঠ্য বই এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই বলে আমি মনে করি। এ বইটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু এই ভূ-রাজনীনির কৌশলগত প্রেক্ষাপটের নির্দেশনা একটাই এবং তা হলো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য এই বইটি অত্যন্ত জরুরি হলো সব দিকে প্রখর দৃষ্টি রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখার ক্ষেতে কৃতসংকল্প থাকার পাশাপাশি এই পূর্ব বাংলার বাম ও কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৪৭ – ১৯৭১ সাফল্য ও ব্যর্থতা সুখপাঠ্য বইটি প্রত্যেকের কাছে একটা বুক সেলফ হিসেবে সংগ্রহ করে রাখা অতিব জরুরি। এই বইটি পড়ে পাঠক দর্শক শ্রোতারা আধুনিক অনেক তথ্যবহুল বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবেন।

একনজরে লেখকঃ প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ- তিনি ১৯৪৫ সালে ৯ ডিসেম্বর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার তিতাহাজরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শিক্ষাবিদ মরহুম হাবীব উল্লাহ এবং মাতা মরহুমা ফয়জুন নিসা বেগম। বৈচিত্র্যময় বর্ণাঢ্য জীবনের মানুষ তিনি। সক্রিয় রাজনীতি থেকে অধ্যাপনা ও গবেষণা পর্যন্ত কর্মজীবন বিস্তৃত। ৬৯ – এর গণঅভ্যুত্থান অন্যতম নেতা।

১৯৭০ – এর ২২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ‘ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি উত্থাপনের অপরাধে ইয়াহিয়ার সাময়িক আদালতে কারাদন্ডে দন্ডিত হয়ে দীর্ঘ ২২ মাস কারারুদ্ধ থাকার পর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন। রাজনৈতিক জীবনে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, জুলফিকার আলি ভুট্টো, অলি আহাদ, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, কমরেড আমজাদ হোসেন, কমরেড শামসুজ্জোহা মানিক, মোহাম্মদ তোহা, কমরেড আবদুল হক, কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার ও দেবেন শিকদারের সাহচর্যে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পাটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন,।ছাত্র নেতাদের মধ্যে তিনি একমাত্র ব্যতিক্রম, যিনি ছাত্রজীবন শেষে বছর কয়েক রাজনীতি করার পর শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন।

শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র, অর্থনীতিতে পিএইচডি মাহবুব উল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন । ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন,।এছাড়া তিনি কানাডার ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার ( আইডিআরসি ), ডেনমার্কের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় গবেষণার কাজ করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রো- ভাইস চ্যান্সেলর, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে ও দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১৩ টি। দেশে ও বিদেশে তাঁর অনেকগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ তিন কন্যা সন্তানের জনক। মিসেস উম্মে সালমা তাঁর সহধর্মিণী। ছাত্রজীবন থেকেই ইংরেজি ও বাংলা সংবাদপত্রের লেখালেখির সঙ্গে জড়িত মাহবুব উল্লাহ। বর্তমানে জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছেন এবং টেলিভিশন টক শো’তে অংশ গ্রহণ করছেন।

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রেডটাইমস ডটকম ডট বিডি | কাউন্সিলর ( বিএফইউজে-বাংলাদেশ ) ও সদস্য ডিইউজে।

 

ছড়িয়ে দিন