প্রগতির পথে এক বাধার নাম সামাজিক পুলিশিং

প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০২৩

প্রগতির পথে এক বাধার নাম সামাজিক পুলিশিং

মুশফিকা লাইজু

শিকল ভাঙার গান আমি আমার পরিবার থেকে শিখে এসেছি। সমাজ কি বলবে সমাজ কি ভাব‌বে আ‌মি আমার বাবার কাছ থেকে কখনো এই বিষয়ে ধর‌নের  বার্তা কোন কথা বলতে শুনিনি।

সমাজকে তোয়াক্কা ক‌রে প্রধানত আমার পরিবারকেও তেমন কিছু করতে দে‌খি‌নি । সমাজ আস‌লে ধোঁয়াশা  অ‌লি‌খিত বাক‌্যবাণ কিছু প্রথা মু‌খে মু‌খে তৈরী, দে‌খে দেখে  চর্চ্চা । সম‌য়ের অ‌পেক্ষাকৃত ক্ষমতাবানরা বা ধ‌র্মের ধান্ধাবাজরা   চা‌পি‌য়ে দেয় ।  মা‌নি‌য়ে নেয় ভাসমান বা চলমান রী‌তি সমূহ।
যখনই কেউ প্রগ‌তির প‌থে মান্ধাতার  আম‌লের রী‌তিবদ্ধ চলমান কিছুর বিপরী‌তে যে‌য়ে প্রথা বিরোধী  কিছু ক‌রে এবং স্বাধীন ইচ্ছা প্রকাশ ক‌রে ঠিক তখনই ধ্বজ্জাধারী কিছু সামা‌জিক পু‌লি‌শেরা জাত গেল জাত গে‌লো ব‌লে হৈ চৈ শুরু ক‌রে । বি‌শেষ ক‌রে সমা‌জের নারীরাই এ‌দের প্রধান লক্ষ‌্য । নারী কে চা‌পি‌য়ে নারী‌কে দা‌পি‌য়ে  অদ্ভুত এক পাশ‌বিক আনন্দ তারা উপ‌ভোগ ক‌রে । সরকারী পু‌লি‌শের বাই‌রে বাংলা‌দে‌শের যত জনসংখ‌্যা আ‌ছে তার চারভা‌গের তিনভাগ জনসংখ‌্যাই মূলত সামা‌জিক পু‌লিশ। কোন বেতন ভাতা বা দা‌য়িত্ব ছাড়াই তারা নারী‌দের উপর পু‌লি‌শিং ক‌রে থা‌কে । নি‌জের আয়নায় নি‌জের মুখ না দে‌খে শুধু ত‌্যাড়া ব‌্যাকা ক‌রে অ‌ন্যের মুখ দেখ‌তে থা‌কে, দে‌খেই শেষ ক‌রে না চায় নিয়ন্ত্রন কর‌তে , হিংসা ছড়া‌তে , বি‌ভেদ ছড়া‌তে। প্রগ‌তি কে বাঁধা গ্রস্থ ক‌রে বিজ্ঞান কে অস্বীকার করে অন্ধকার কে হাতছা‌নি দি‌য়ে সরল , আধা শি‌ক্ষিত জন‌গো‌ষ্টি কে বৃ‌ত্তের চারপা‌শে নাগর‌দোলায় ঘোরা‌তে।
আমার মেয়ে বেলায় আমি অসাম্প্রদায়িকতা ধর্মনিরপেক্ষতা পরিবার থেকে শিখেছি। পহেলা বৈশাখ ছিল আমাদের বাড়ির প্রধান উৎসব। নতুন পোষাক পাওয়া, মেলায় গিয়ে কিছু কেনাকাটা করার জন্য আমরা প্রত্যেকবার নতুন টাকা পেতাম। বাবা চাচারা ওই এক দিনের জন্য নতুন টাকা সংগ্রহ করে রাখতে এবং আমাদের বয়স অনুযায়ী টাকা উপহার পেতাম। একান্নবর্তী পরিবার মুসলিম উৎসবে পাশাপাশি আমাদের বাড়িতে সনাতন উৎসব পালন করা হতো যেমন লক্ষী পূজা, কালী পূজা, সরস্বতী পূজা ইত্যাদি পূজা আমরা বাড়ির উঠানে ভাইবোনরা মিলে করতাম এবং তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আমার দাদী । ঈদ ভালো পূঁজা খারাপ ! পূঁজা খারাপ ঈদ ভালো এসব ধারণা আমরা বাড়ি থেকে আ‌মি পাইনি। সমাজ কি বলবে সমাজ মানবে না এই ধরনের কথা আমি বাড়ি থেকে শিখিনি। তাই মানিও না । সেই সময় আমাদের শহরে একটা মাত্র খ্রিস্টান পরিবার ছিল। দাদী সম্ভবত খ্রিস্টান আচার নীতিগুলো জানতেন না যদি জানতেন তাহলে হয়তো বা আমরা সেই আচরণের চর্চাও করতাম আমাদের বাড়িতে। আমার দাদী ফুপু কখনো বোরকা পরতেন না। আমার দাদী কোরআন শরীফ পড়তে জানতেন না শুধু শেষ বয়সে মা‌নে যখন তার বয়স ৯০ , আমি দেখেছি একজন মহিলা বান্ধবীর সঙ্গে বসে বসে তিনি সিপারা পড়তেন আ‌লিফ বে তে ছে, সেই জ্ঞান ঐ পর্যন্তই, কি জানি একদম শেষ বেলায় বিশ্বাস অ‌বিশ্বা‌সের দ্ব‌ন্দে ভূ‌গে‌ছি‌লেন কি না? আ‌মি তত‌দি‌নে বি‌শ্বের বিদ‌্যাল‌য়ে এ‌সে প‌ড়ে‌ছি তাই তার দ্বিধার‌ বিষয়ে জানা হয়‌নি । দাদীর কাছ থেকে বাবা শিখেছেন বাবার কাছ থেকে আমি শিখেছি। সমা‌জে রীতিনীতি আচার-আচরণ এক‌টি চলমান প্রক্রিয়া। আজ যা সত্য কাল তা ফিকে। আগামীকাল সেটাই হয়‌তো মিথ্যে। সমাজ কি বলল সমাজ কি বলবে সেই বিষয়ে লক্ষ্য করতে করতে আমরা আমাদের সুন্দর জীবনকে প্রায় দ্বিধার ফাঁসিতে ঝু‌লি‌য়ে দেই এবং জী‌বিত থে‌কেও মৃত‌্যূ কে গ্রহন। আজকাল প্রায় শুনি বাঙালির সংস্কৃতি আমা‌দের অবশ‌্যই মানা উচিত। ভু‌লে যাই মানুষ সংস্কৃ‌তি তৈরী ক‌রে‌ছে, সংস্কৃতি মানুষ তৈরী ক‌রে‌নি। য‌দি তাই হ‌বে ত‌বে খাবার-দাবার শিক্ষা দীক্ষা আচার আচরণ কি ১৯৫৩ সালে পড়ে থাকবে ! বাঙালি সংস্কৃতি যেদিন থেকে শুরু হয়েছে তারপরে বিভিন্ন বেনিয়ারা আমাদের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। এভাবে গ্রহণ বর্জন করতে করতে একটি জাতির সংস্কৃতি তৈরী হয় ,এগিয়ে চলে। এমন এক সময় ছিল যখন নিম্নবিত্ত প‌রিবা‌রের নারীরা ব্লাউজ পড়তে পারতো না। শাড়িকে বিভিন্ন ভাবে জড়িয়ে তারা তাদের আব্রু রক্ষা করতেন। পরবর্তীতে বুননশি‌ল্পের উৎকর্ষ হল ক্রমেই আমরা কাপ‌ড়ে সা‌থে কাপড় জোড়া লাগা‌তে শিখলাম অথ‌্যাৎ আমরা সেলাই শিখলাম এবং নারীরা তাদের শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ মতন একটি জামা পরতে শুরু করল। বাঙালি সংস্কৃতি য‌দি সেখানেই পড়ে থাকত আজ তাহলে সভ্যতার কাছে আমরা কি জবাব দিতাম।

সা‌লোয়ার কামিজ তারপর ঘরোয়া মহিলাদের ম্যাক্সি এখন বাইরে মেয়েদের জিন্স টপস ঈত‌্যদি প‌রিধেয় রী‌তি পুরা‌নো সংস্কৃতি ভেঙ্গে ভেঙ্গে গ্রহণ করে করে সামনে সামনে এগিয়েছে । সুতরাং যে সব মোরাল পুলিশেরা নারীদের প্রথাভাঙা কাজ , প্রথাভাঙা পোষাক এবং প্রথাভাঙা জ্ঞান দেখ তর্জনী উ‌চি‌য়ে বাধা ‌দি‌তে মূখর হ‌য়ে উ‌ঠেন তা‌দের জন‌্য সাবধান বানী ।

তর্জনী হে‌লে পড়‌বে মূখরতা মূখ হ‌য়ে যা‌বে সভ্যতা ও প্রগ‌তির জোয়ার ঠেকা‌নো যা‌বে না । সব কিছু দে‌খেশু‌নে ধাক্কা খাওয়ার আ‌গে থে‌মে যান ।

লাইভ রেডিও

Calendar

February 2024
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
2526272829