প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২১

প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা

শাকিল বিন মুশতাক

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র তার নিজস্বতা দিয়ে টিকে থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ ৭৫ পরবর্তী সময় যে সঠিক পথে সবসময় চলেনি তা আজ স্বীকৃত, স্পষ্ট। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামল অনেকটাই ব্যতিক্রম। ‘ভারতের দালাল, তাঁবেদার’ এরকম নানান গালি হজম করেই শাসনামলে হরেক পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন দলটির নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা পরিস্থিতি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে ভারতের স্পস্টতই অসন্তোষকে দাবার ভাষায় একরকম ‘চেক’ দিয়েই চলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর এটি করতে কৌশলে নিজের ট্রাম্প কার্ডগুলো একে একে ছাড়েছন তিনি। অতিমারীর মধ্যেই অবিশ্বাস্য অর্থৈনতিক প্রবৃদ্ধি, নানা সূচকে আশপাশের নানা দেশ থেকে এগিয়ে থাকা আর দারুন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তাঁর নিজের এবং বাংলাদেশ –দুটোরই মর্যাদা বাড়িয়েছে বহুগুন। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। নয়াদিল্লীর সাথে সুর মিলিয়ে ঢাকা ইসলামাবাদকে একরকম কোনঠাসাই করে ফেলেছিল দক্ষিণএশীয় কূটনীতির জায়গাটিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে নয়াদিল্লীর কাছ থেকে ‘কাংখিত’ আচরণ না পাওয়া গেলে প্রধানমন্ত্রী তার বহুমূখী কূটনীতির উদ্যোগ তরান্বিত করেন। এর আগে দেশবাসী ‘লুক ইস্ট’ কূটনীতির কথা শুনলেও এখন এর পরিধি সত্যিকার অর্থেই বহুমুখী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতও। আচমকা নয়াদিল্লীর চিরশত্রু ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সে ইঙ্গিতই বহন করে। পাকিস্তান দূতাবাসের হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈশ্বিক সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ আশাব্যঞ্জক। ফলে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুধবার (১৩ জানুয়ারি) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি ‘যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন’ স্থাপন করা হয়েছিল, যার সর্বশেষ সভা ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয়ভাবে চালু করার প্রস্তাব করেন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুদেশের মধ্যকার সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপন এবং করাচি ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মধ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহন কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুকরণের আহ্বান জানান পাকিস্তানের হাইকমিশনার। ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি ‘যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন’ স্থাপন করা হয়েছিল, যার সর্বশেষ সভা ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয়ভাবে চালু করার প্রস্তাব করেন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুদেশের মধ্যকার সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপন এবং করাচি ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মধ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহন কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুকরণের আহ্বান জানান পাকিস্তানের হাইকমিশনার।
অন্যদিকে সাক্ষাৎকালে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সংখ্যক উদ্যোক্তা ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘ডিসিসিআই বিজনেস কনক্লেভ ২০২১’-এর বিটুবি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ডিসিসিআই প্রতিবছরই এ ধরনের আয়োজন করবে।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রাপ্তিতে বিদ্যমান সকল বিধিনিষেধ তুলে দিয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি উল্লেখ করেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪৩.৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুদেশের মধ্যকার ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং উভয় দেশের বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার ওপর জোর দেন তারা।
এটিই প্রথম নয়, এর আগে এর আগে গেল ৪ ডিসেম্বর (২০২০) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী। সাক্ষাতের সময় তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শুভেচ্ছা শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেন। শেখ হাসিনাও হাইকমিশনারের মাধ্যমে ইমরান খানকে শুভেচ্ছা জানান।
সাক্ষাতকালে পাকিস্তানের অতীত কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরে পাকিস্তান যে নৃশংসতা চালিয়েছিল তা ভুলে যেতে পারে না বাংলাদেশ। একাত্তরের ঘটনাগুলো ভোলা যায় না। সেই ক্ষত চিরদিন রয়ে যাবে।
এসময় পাকিস্তানের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন সম্পর্কে জানতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাদের পরামর্শ দিয়েছেন। বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক ফোরামগুলোর নিষ্ক্রিয়তার বিষয় উল্লেখ করে হাইকমিশনার দুই দেশের মধ্যে ফরেন অফিস কনস্যুলেশন সক্রিয় করতে শেখ হাসিনার সহযোগিতাও চান। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়ায় এখানে কোনও বাধা নেই। ইমরান আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে কোনও রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।
পাকিস্তানই শেষ কথা নয়। চায়নাকে দেশের বৃহৎ নানা প্রকল্পে সম্পৃক্ত করার পরও তাদের নানা ‘অনুরোধ-উপরোধে’ বিকল্প চিন্তা করতেও ছাড়েননি প্রধানমন্ত্রী। সম্পৃক্ত করেছেন ভারতকে, জাপানকে। সামরিক খাতে চীন, রাশিয়ার বিকল্প যে হাতে আছে তা বোঝাতে তুরস্ক এবং অন্যান্য ইওরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলোর দিকে ঝুঁকেছেন তিনি। আবার তুরেস্কর দিকে ঝোঁকটা এক তরফাও নয়। বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান তারকা এবং পুরো বিশ্বের জন্য টেকসই উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠেছে।
বুধবার (২৩ ডিসেম্বর,২০২০) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এক যৌথ ব্রিফিংয়ে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করার জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রয়োজন হলে বাংলাদেশকে আমরা আরও সহায়তা প্রদান করবো।”
তিনি জানান, বাংলাদেশে তুর্কি হাসপাতাল তৈরি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং তারা বিভিন্ন মডেলের ওপর কাজ করছেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালের মার্চে উদযাপিত হতে যাওয়া দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই সফরের সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষনও উপেক্ষা করার মত নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশই তুরস্কের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় ভারত সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে তুরস্ক। কাশ্মীর ইস্যুতে তারা পাকিস্তানেরই পাশে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি জাতিসংঘেও উপস্থাপন তুরস্ক। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের জায়গায় বাংলাদেশকেই ভাবছে তুরস্ক।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক-কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশকে পাশে পেতে যে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তুরস্ক। তা দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসে ভারতীয় সাংবাদিক স্মৃতি চৌধুরীর একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছ। ঢাকায় তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর সফরের সময়ই ঐ বিশ্লেষনী প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সফরে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার কাছে নিজেদের উৎপাদিত অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবও করেন। বলে রাখা ভালো মাত্র দু’দশক আগে ১৯৯৯ সালেও তুরস্ক ছিলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানীকারক দেশ, আর সেই দেশটিই ২০১৮ সালে এসে বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
একদম সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিয়েই লেখার সমাপ্তি টানা যাক।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদার উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’র মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বুধবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পম্পেও’র সম্প্রতি করা এক মন্তব্যের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষিক হয়েছে। পম্পেও বলেছেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং ভুল ধারণাবশত তিনি মনে করছেন যে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে। একজন নেতৃস্থানীয় নেতার কাছ থেকে এ ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।’
উল্লেখ্য, গত ১২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে এক বক্তৃতায় পম্পেও একথা বলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, ‘বাংলাদেশ এ ধরনের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বক্তব্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশে আল কায়েদার অবস্থান সম্পর্কে কোনও প্রমাণ নেই।’
কাজেই শত নিন্দা, হাজারো অভিযোগের পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দিতেই হয় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা অর্জনের জন্য, যে উপলব্ধি ও সাহস অনুচ্চারিতই থেকে গিয়েছিল দীর্ঘকাল।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com