হুমায়ন আহমেদের সাথে প্রথম দর্শনের মুগ্ধতা

প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২১

হুমায়ন আহমেদের সাথে প্রথম দর্শনের মুগ্ধতা
শরীফুল ইসলাম, বিনোদন রিপোর্টারঃ আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ এর ৭৩তম জন্মবার্ষিকী ঘিরে শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনসহ নানা অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে নিয়ে চমৎকার কিছু  লেখা লিখেছেন । বাংলা একাডেমির পদকে ভূষিত লেখক শাকুর মজিদ এর ভেরিফাইড ফেসবুকে প্রকাশিত লিখাটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলামঃ
১৯৮৬ সালের ২১ জানুয়ারি। বেলা পৌনে তিনটায় আমাদের রিকশা এসে থামে আজিমপুর গোরস্তানের উত্তর পাশের একটা রাস্তায়। ছোট গলিপথের ভেতর দুটি বাড়ির মাঝখানের সরু গলিপথ দিয়ে কিছু দূর হেঁটে বাড়িটা পেয়ে যাই। পেছনের একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজায় বেল টিপতেই এক তরুণ হাসিমুখে দরজা খুলে বেতের সোফায় বসতে বলেন।
তরুণের দাদাভাই তাকে আগেই জানিয়ে রেখেছেন যে এখন একজন সাংবাদিক বাসায় আসতে পারে। নিজের পরিচয় দেন তিনি, নাম আহসান হাবীব। কার্টুন আঁকেন। উম্মাদ নামে একটা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। ড্রয়িংরুমের এক পাশে একটা ছবি আঁকার কাগজ। রং-তুলি ছড়ানো। এক কিশোরী বসে ছবি আঁকছে। অতিথি আসায় ছবি আঁকা বন্ধ করে সে ভেতরে চলে যায়।
আহসান হাবীবের সঙ্গে আলাপচারিতার মধ্যেই প্রায় ৪০ বছর বয়সী এক যুবক ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে কিছু কাগজপত্র। একটা ফুলহাতা শার্টের ওপর পরেছেন বগলকাটা সোয়েটার, চোখে চশমা। মনে হলো, তিনি খুবই ব্যস্ত। এসেই বলেন, ‘বলুন ভাই, কী করতে পারি?’
ব্যাগের ভেতর থেকে নোটবুক বের করি। টের পাই, আমি বেশ নার্ভাস। কিন্তু প্রকাশ করতে চাই না। শক্ত করে বসে সাংবাদিকের মতো কঠিন গলা নিয়ে বলি, ‘প্রথমেই ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্ন দিয়ে শুরু করব, তারপর আমরা অন্য প্রসঙ্গে আসব।’
হুমায়ূন আহমেদ রাজি তাতে। নোটবুকের মধ্যে টুকে নিলাম তাঁর জীবনবৃত্তান্ত। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জে তাঁর জন্ম । এটা তাঁর মামার বাড়ি। বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ, মা আয়েশা আক্তার খানম। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনিই বড়। পুলিশ অফিসার বাবার সঙ্গে ছোটবেলাতেই অনেক জায়গা ঘুরেছেন, অর্জন করেছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
সিলেটের মীরাবাজারে কিশোরীমোহন পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সেরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় যথাক্রমে বগুড়া জিলা স্কুল আর ঢাকা কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বোর্ড থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। মেধা তালিকায় স্থান লাভের বিষয়টি অবশ্য না লেখার জন্য অনুরোধ করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রসায়ন বিভাগে। এমএসসিতে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় হন। বেশ কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এরপর আমেরিকায় যান। আমেরিকার নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়নে ডক্টরেট করে ১৯৮২ সালে দেশে ফেরত আসেন। এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন।
প্রাথমিক পরিচয়পর্ব শেষে প্রশ্ন করা শুরু করি। বাবু টেপ-রেকর্ডার অন করে।
‘আমেরিকায় থেকে না গিয়ে দেশে ফিরলেন কেন?’
‘ফিরলাম, যাতে আপনাদের জন্য এইসব দিনরাত্রি লিখতে পারি। না ফিরলে কে লিখত?’
প্রশ্নের উত্তর শুনে একটু ঘাবড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু আমাকে ঘাবড়ালে চলবে না। তাঁর কথাগুলো হুবহু লিখে ফেলার চেষ্টা করি।
প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখতেও যথেষ্ট সময় লাগে। তিনি তখন ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকান এবং একসময় বলেন, ‘ভাই, এক কাজ করেন, আপনার এই খাতাটা রেখে যান। কাল একসময় এসে নিয়ে যাবেন, আমি রাতে আপনার সব প্রশ্নের জবাব লিখে রাখব।’
এটুকু বলে তিনি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ান। তিনি এখন বাংলাবাজার যাবেন। অনিন্দ্য প্রকাশনী থেকে তাঁর এইসব দিনরাত্রি উপন্যাস হিসেবে বেরোবে। আজ প্রকাশককে পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ দেবেন। প্রেসে বসে বসে আগের কম্পোজ হওয়া অংশগুলোর প্র“ফ কাটবেন। তিনি আমাদের নিয়ে নেমে আসেন নিচে এবং হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেটের পেছন দিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করেন। হুমায়ূন আহমেদ রিকশায় উঠে একটা সিগারেট ধরান। তিনি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত আমরা তাঁর চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে থাকি।
পরের দিন যথারীতি এসে আবার হাজির হই তাঁর নিউ পল্টন লাইনের বাসায়। বাবুর উৎসাহ শেষ। হুমায়ূন আহমেদকে তার দেখা হয়ে গেছে। আজ সে এল না। আমি টেপ-রেকর্ডার বগলদাবা করে তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হই এবং মুগ্ধ হয়ে দেখি, আমার নোটবুকটা তিনি ফেরত দিচ্ছেন। পাতা উল্টে দেখি, সব প্রশ্নের জবাব তাঁর নিজের হাতের লেখা। এ উত্তরপত্রের সঙ্গে মিল রেখে আরও কিছু কথাবার্তা হয়। পরবর্তী সময়ে পত্রিকায় যেভাবে ছাপা হয়েছিল, তা ছিল অনেকটা এ রকম:
‘লেখালেখির প্রতি অনুরাগ কখন থেকে?’
‘বানান করে করে প্রথম গল্পটি যেদিন পড়লাম মনে হয় সেদিন থেকেই। তবে সুদূর শৈশবের স্মৃতি মনে নেই।’
‘প্রথম লেখা কীভাবে ছাপা হলো?’
‘নন্দিত নরকে লেখা খাতাটি বন্ধু আনিস সাবেত মুখপত্র পত্রিকার সম্পাদককে দিয়ে এলেন। সেটা ছাপা হলো। প্রথম লেখা ছাপানোর পেছনে কোনো মজার গল্প নেই। এরপর আহমদ ছফা প্রথম বইটির জন্য প্রকাশক জোগাড় করেছেন। খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি।’
‘দ্বিতীয়টা?’
‘প্রকাশক নিজেই চেয়ে নেন।’
‘নন্দিত নরকে আর শঙ্খনীল কারাগার-এর পাত্র-পাত্রীদের নাম একই কেন?’
‘নতুন নাম খুঁজে পাইনি।’
‘ওই দুটোর খোকা চরিত্রের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিজীবনের কি সাদৃশ্য আছে?’
‘আমি বোধ হয় অত ভালো নই। তবে আমিও মাঝে মাঝে খোকার মতো হতে চাই। তা ছাড়া লেখকও খোকার মতো খানিকটা বোকা।’
‘এ দুটোর প্লট কী করে পেয়েছেন?’
‘মনে নেই। তবে আমি আগে কখনো প্লট ভেবে লিখতে বসি না।’
হুমায়ূন আহমেদ জানালেন, লিখতে লিখতেই পাত্র-পাত্রীরা এসে যায়, চরিত্র সৃষ্টি হয়, কাহিনি গড়ায়। লেখার জন্য কোনো রকম পরিবেশ কিংবা মুডের জন্য কোনো রকমের উপকরণের প্রয়োজন হয় না। চাপের মুখে একটানা সাত-আট ঘণ্টা লেখার অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। তবে সাধারণত অবসর পেলেই লেখেন, আর পড়েন।
‘নির্জনে লেখেন না?’
‘আমার একটা বড় বাড়ি হলে চেষ্টা করে দেখতাম।’
‘বড় বাড়ির জন্য ইচ্ছা হয় না?’
‘মাঝে মাঝে হয়।’
হুমায়ূন আহমেদের গল্পের পাত্র-পাত্রীরা মধ্যবিত্ত পরিবারের। তাঁর কথায়, ‘মধ্যবিত্তকেই তো ভালো করে দেখেছি সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতায় এর বাইরে লিখব কীভাবে?’
‘কেন? উচ্চবিত্ত পরিবারের প্লটেও কিছু কিছু তো লিখেছেন, যেমন “একা একা”।’
‘কিছু উচ্চবিত্তদেরও দেখেছি।’
‘গল্প-উপন্যাস ছেড়ে নাটক লিখতে এলেন কখন?’
‘১৯৭৪ সনে নন্দিত নরকে উপন্যাসটিকে মঞ্চনাটকে রূপ দিই। রেডিওর জন্য শঙ্খনীল কারাগার-এর বেতার নাট্যরূপ দিই ১৯৭৫-এ। টিভির জন্য প্রথম নাটক লিখি প্রথম প্রহর ১৯৮৩ সনে।’
‘কেন নাটকে এলেন?’
‘টাকার জন্য।’
এর পর কথা হলো বাংলাদেশ টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রি নিয়ে। জানালেন যে মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের আগ্রহে এক সপ্তাহের একটি নাটককে বড় করে দেওয়া হলো সিরিজ নাটকে। দর্শক হিসেবেও তাঁর কাছে নাটকটি উপভোগ্য ছিল। তবে এইসব দিনরাত্রি লিখে বিটিভি থেকে যে সম্মানী পেয়েছিলেন, সেটা দিয়ে একটা রঙিন টেলিভিশন কিনেছিলেন।
‘এরপর সিরিজ নাটক লেখার ইচ্ছে আছে?’
‘আর্থিক ঝামেলায় পড়লে হয়তো লিখব।’
‘সিনেমার জন্য কাহিনি লেখার ইচ্ছে আছে?’
‘যদি কেউ মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভালো ছবি করতে চায়, তাহলে লিখব।’
হুমায়ূন আহমেদ এমন অনেক উপন্যাসও লিখেছেন, যেগুলোর শিরোনামে গল্প বেরিয়েছিল অনেক আগে। অথচ উপন্যাসকেও যে গল্পের পরিবর্ধিত রূপ বলা যাবে, এমনও হয় না। তবে কেন? হুমায়ূন আহমেদের জবাবÑনতুন নাম খুঁজে পান না। তাঁর মতে, নাম দেওয়ার জন্যই দেওয়া।
‘আচ্ছা, আপনি এত বেশি লেখার সময় কখনো আপনার লেখার মান সম্পর্কে সন্দিহান হন না?’
‘হ্যাঁ, আমি প্রচুর লিখি। আবার না লিখেও থাকতে পারি। প্রথম চারটি উপন্যাস প্রকাশের পর আমি সাত বছর কিছুই লিখিনি। আবার হয়তো একটা সময় আসবে, যখন কিছুই লিখব না।’
‘একঘেয়ে ঠেকায় একসময় যদি কেউ আপনার লেখা না পড়ে, তখন আপনি কী করবেন?’
‘কী আর করব? মন খারাপ করা ছাড়া কিছু করার আছে কি?’
‘আচ্ছা, আপনি লেখেন কেন?’
‘বলা মুশকিল, তবে লিখতে ভালো লাগে।’
‘অমরত্ব পাওয়ার বিন্দুমাত্র আশায়ও কি আপনি লেখেন?’
‘না। অমরত্ব মহাপুরুষদের জন্য। আমি মহাপুরুষ নই, সাধারণ মানুষ।’
‘আপনি কি নিজেকে কোনো সময় জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক বলে মনে করেন?’
‘যখন জানলাম, আমার একই বইয়ের প্রথম মুদ্রণ এক মাসে বিক্রি হয়ে গেছে।’ এটুকু বলে, আস্তে করে বলেন, ‘তবে এটা হালকা ধরনের ভৌতিক উপন্যাস, গর্ব করার মতো কোনো রচনা নয়।’
‘নিজের কাছে আপনার পরিচয় কি একজন লেখক, না শিক্ষক?’
‘লেখক।’
‘উপন্যাসের শিরোনামে রবীন্দ্র-জীবনানন্দ থেকে ধার করেন কেন?’
‘এঁদের কাছ থেকে ধার করতে লজ্জা লাগে না বলেই।’
‘যদি বলা হয়, তোমাকে প্রেমের উপন্যাস (কভারে লেখা আছে) হিসেবে সার্থক নয়- আপনি কী বলবেন?’
‘কিছু বলব না।’
‘আচ্ছা, একটু অন্য ধরনের প্রশ্ন, “প্রেম” ছাড়া ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব হতে পারে?’
‘পারবে না কেন?’
‘দুটো ছেলে বা দুটো মেয়ের মধ্যে যে রকম বন্ধুত্ব হয়, একটা ছেলে আর একটি মেয়ের মধ্যেও কি একই রকম বন্ধুত্ব হতে পারে?’
‘তা অবশ্য নয়, কারণ এখানে ফ্রয়েডীয় কিছু ব্যাপার-স্যাপার আছে।’
‘তাহলে যে বললেন?’
‘আসলে ব্যাপারটা একটু জটিলÑআপনি অন্য প্রশ্ন করুন।’
‘আপনার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা কোনটা?’
‘তিনটে উপন্যাস লিখে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়াটা আমার কাছে একটা স্মরণীয় ঘটনা। না না, এটা লিখবেন না, তাহলে লোকজন মনে করতে পারে আমার গর্ব হচ্ছে- লিখুন গুলতেকিনের সঙ্গে পরিচয়।’
‘দুঃখজনক ঘটনা?’
‘বাবার মৃত্যু।’
এর মধ্যে সালোয়ার-কামিজ পরা এক তরুণী নাশতার ট্রে হাতে ড্রয়িংরুমের ঢোকেন। বুঝতে বাকি থাকে না, তিনিই হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদ। চায়ের সঙ্গে নাশতা এসেছে – বিস্কুট, চানাচুর আর মিষ্টি। নিজেই তুলে দিচ্ছিলেন সাংবাদিকের পিরিচে। তাঁর চোখেমুখে অনেক আনন্দ। সাংবাদিক এসেছেন তাঁর স্বামীর সাক্ষাৎকার নিতে। হুমায়ূন আহমেদই সুযোগ করে দিলেন কথা বলার। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিন আহমেদ। গুলতেকিন নামটা তাঁর দাদা ইব্রাহীম খাঁ রেখেছেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার পড়ার পর ক্লাস এইটের ছাত্রী গুলতেকিন একটা চিঠি লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রভাষক হুমায়ূন আহমেদকে। এর পর দেখা হয়। মেলামেশা বাড়ে। ঘনিষ্ঠতার পরিণতিতে ১৯৭৩ সালে এসএসসি পাস করার পর তাঁদের বিয়ে হয়।
এরপর স্বামীর সঙ্গে চলে যান আমেরিকা। ফিরেছেন সাড়ে তিন বছর আগে ১৯৮২ সালে। আবার শুরু করেছেন পড়াশোনা। কিছুদিন আগে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। তিন মেয়ে- নোভা, শীলা আর বিপাশার মা। নিজেই মেয়েদের দেখাশোনা করেন। মেয়েরা বড় হয়ে কে কী হবে – এ নিয়ে তাঁর কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। যে যা হতে পারে, হবে।
তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আচ্ছা, আপনি বিয়ের আগে যখন হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে কিংবা শঙ্খনীল কারাগার পড়লেন, তখন কি এ দুটোকে লেখকের আÍজীবনীমূলক লেখা মনে করতেন?’
‘কিছুটা মনে হতো।’
‘নন্দিত নরক-এর “খোকা” নিখুঁতভাবে একটা মেয়েকে ভালোবাসত। সে ভালোবাসার কথা কোনো দিন মেয়েটিকে জানানোর সাহস পায়নি – তার ভালোবাসা আজীবন নিভৃতেই থেকে গেল। আচ্ছা, সেই খোকাটির জন্য কি তখন আপনার দুঃখ হতো?’ (হুমায়ূন আহমেদ তখন মিটমিট করে হাসছেন)।
‘তা তো হতো।’
‘বিয়ের পরও যদি কোনো নায়িকার প্রতি লেখকের অতিরিক্ত অনুভূতি দেখা দিত, আপনি কী করতেন?’
‘গল্প তো গল্পই। তবে সত্যি সত্যি সে কিছু করলে তো খারাপ লাগতই।’
‘আচ্ছা, তাঁর কোনো গল্প-উপন্যাসে আপনার কোনো চরিত্র এসেছিল?’
‘খণ্ড খণ্ড এসেছে, পুরোপুরিভাবে নয়।’
হুমায়ূন আহমেদ জবাব দিলেন, ‘এইসব দিনরাত্রিতে নীলুর চরিত্রের সঙ্গে ওর অনেক মিল ছিল।’
‘আচ্ছা, লেখালেখির ব্যাপারে আপনি হুমায়ূন আহমেদকে কীভাবে সহযোগিতা করেন?’
‘কখনো চা বানিয়ে দিই। তা ছাড়া ও লেখার সময় প্রচুর বানান ভুল করে, সেগুলোও ঠিক করে দিই।’
‘তাঁকে নিয়ে আপনার গর্ব হয়?’
‘কিছুটা তো হয়ই।’
‘আচ্ছা, মনে করেন, একদিন এমন হলো যে তাঁর লেখা কেউ আর পড়ছে না – তখন আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হবে?’
‘তখন যদি ও লেখা ছেড়ে সংসারে দিকে কিছুটা মন দেয়, তাহলে ভালোই হবে।’
‘একজন পাঠক হিসেবে ওনার লেখা আপনার কেমন লাগে?’
‘তার লেখা আমার সব সময়ই ভালো লাগে।’
হুমায়ূন আহমেদের একটা বৈশিষ্ট্য যে তাঁর বেশির ভাগ কাহিনিতেই বিশেষ কয়েকটি নাম বারবার ঘুরে ঘুরে আসে। অথচ প্রতিটি চরিত্রই স্বতন্ত্র। এটা কেন হয়- শুনতে চাইলে সহজ উত্তর দেন, ‘নতুন নাম খুঁজে পাই না।’ সাংবাদিকের বিশ্বাস হতে চায় না। পাশে বসা তাঁর স্ত্রী জানালেন, ‘ও উপন্যাস লিখতে বসে আমাকে নাম জিজ্ঞেস করে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলতে না পারলে বলে, আমি তাহলে আগের নামটিই লিখি? এভাবেই একই নাম বারবার আসে – আসলে অন্য কিছু নয়।’
‘আচ্ছা “নীলু”কে আপনি চেনেন?’
‘না।’
‘এ নামটা কেন বারবার আপনার গল্পে-উপন্যাসে আসে?’
‘নামটা সুন্দর।’
এ সময় তাঁর স্ত্রী জানালেন যে তাঁরা যখন আমেরিকায় ছিলেন, তখন পাশের বাসায় এক শ্রীলঙ্কান পরিবার থাকত। ওই বাসার একটি মেয়ের নাম ছিল নীলু। হুমায়ূন আহমেদ হাত দিয়ে দেখালেন এবং বললেন, ‘এতটুকু, চার-পাঁচ বছরের মেয়ে।’
‘নীলগঞ্জই বা কেন আসে?’
‘সম্ভবত নীল থেকে।’
গুলতেকিন আহমেদ ভেতরে চলে যান।
একসময় টের পাই, আমি পরিণত হয়ে গেছি এক মুগ্ধ সাংবাদিকে। কিন্তু এখন এই সাংবাদিকের নোটবুকে লেখা সব প্রশ্নপত্রের সব উত্তর নেওয়া শেষ। এবার তাহলে কী নিয়ে আলাপ হবে? নাকি উঠে চলে যাব? ভাবছি, আরও কিছু সময় এখানে কাটানো যায় কীভাবে। এবার আমি জানতে চাই শঙ্খনীল কারাগার বিষয়ে। লেখককে বলি, ‘হোস্টেলে আমার এক বন্ধু আছে যে ১৮ বার পড়েছে এই বইটি। এবং এই বইয়ের অনেক অংশ সে মুখস্থ বলে দিতে পারে।
এ বইয়ের উৎসর্গপত্রের পর এক পাতাজুড়ে কবিতার দুটো লাইন:
দিতে পারো একশ’ ফানুশ এনে
আজš§ সলজ্জ সাধ, একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই
তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘ওটা কার কবিতা, স্যার?’
‘আমার।’
তাহলে হুমায়ূন আহমেদ কবিও!
শোনা গেল নতুন কাহিনি।
কবি হওয়ার সম্ভাবনা তাঁর ছিল, কিন্তু হননি। ১৯৬৭-৬৮ সালের দিকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র, তখন ‘ফানুস’ নামে এ কবিতাটি লেখেন। কবিতা লিখে পাঠিয়ে দেন দৈনিক পাকিস্তান-এর ‘মহিলা অঙ্গন’ পাতার সম্পাদকের কাছে। কবি হিসেবে নাম লেখেন তাঁর বোন সুফিয়া আহমেদ শেফুর। ছাপাও হয় কবিতাটি। এটাই ছিল ছাপার হরফে তাঁর প্রথম লেখা, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ নামে নয়, বোনের নামে। শেফু তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী।
‘কেন স্যার?’
‘এর আগে দু-একটা কবিতা পাঠিয়েছিলাম, ছাপা হয়নি। পরে ভাবলাম, দেখি, মহিলা অঙ্গন বিভাগে মহিলার নামে পাঠালে ছাপে কি না। কাজ হলো, এই তো।’
‘বাংলা সাহিত্যে কার কার লেখা আপনার প্রিয়?’
‘বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, বিমল কর, সতীনাথ ভাদুড়ী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।’
‘শংকর কেমন লাগে?’
‘ভালো। ওঁর প্রথম দিকের কিছু উপন্যাস খুবই ভালো।’
‘বাংলা সাহিত্য ছাড়া বিদেশি কোনো সাহিত্য পড়েন?’
‘একসময় প্রচুর পড়েছি। এখনো কিছু পড়ি।’
‘প্রিয় কে?’
‘প্রিয় হচ্ছেন জন স্টেইনবেক।’
‘আপনার মতে, বড় গল্প আর উপন্যাসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’
‘জানি না।’
‘শঙ্খনীল কারাগার-এর মুখবন্ধে নন্দিত নরকেকে ‘গল্প’ বলে উলে­খ করলেন। অথচ এটা ‘উপন্যাস’ হিসেবে বিবেচিত এবং পুরস্কৃত। তাহলে “গল্প” বললেন কেন?’
‘আমাকে এসব জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। এ-জাতীয় প্রশ্ন করা উচিত সাহিত্যের ছাত্রকে। আমি একবার একটি বইয়ের সমালোচনা লিখেছিলাম রোববার পত্রিকায়। পরবর্তী সময়ে সবাই তাকে গল্প বলতে লাগল এবং আমিও আমার গল্পগ্রন্থে (আনন্দ বেদনার কাব্য) ঢুকিয়ে দিলাম।’
‘আপনাকে যদি উপন্যাসের সংজ্ঞা দিতে বলা হয়, তাহলে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?’
‘কোনোভাবেই করব না। আমি যদি জানতাম, উপন্যাস কী, তাহলে তো নিজেই লিখতাম। যা লিখেছি তার কোনোটিই কি সত্যিকার অর্থে উপন্যাস হয়েছে?’
‘ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে?’
‘হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধের ওপর বৃহৎ ক্যানভাসে একটা উপন্যাস লিখব এবং এ জন্য আমি পড়াশোনাও করছি।’
‘বঙ্কিম, শরৎ থেকে বর্তমানকালের উপন্যাসগুলোর ধারা অনেকখানি পরিবর্তিত – এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?’
‘সময়ের প্রভাব। উপন্যাস তো সময়েরই ছবি। সময় বদলালে উপন্যাস বদলাবে।’
‘উপন্যাস সৃষ্টিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা কতটুকু প্রয়োজনীয় বলে আপনি মনে করেন?’
‘অনেকখানি।’
‘একটা সার্থক উপন্যাসের কী কী গুণ থাকা আবশ্যক বলে মনে করেন?’
‘একটা সার্থক উপন্যাসে সমাজ ও কাল উঠে আসবে। লেখক একটি দর্শন দিতে চেষ্টা করবেন। উপন্যাস মানে তো শুধু গল্প নয়। গল্পের বাইরেও কিছু।’
‘সুন্দর গল্পের জন্য সুন্দর কাহিনিই কি অত্যাবশ্যকীয়?’
‘না।’
‘আচ্ছা, সাহিত্য দিয়ে সমাজ-সংস্কার কীভাবে করা যায়?’
‘জানি না। আমি নিজে সমাজ-সংস্কারের কথা ভেবে কিছু লিখি না।’
‘যখন লেখেন, তখন আপনি কোন শ্রেণীর পাঠকের কথা বিবেচনা করেন?’
‘সায়েন্স ফিকশনগুলি কম বয়সীদের জন্য লেখা। অন্য সব যখন লিখি তখন কোন শ্রেণীর পাঠকের জন্য লিখছি, তা মনে থাকে না। যাদের ইচ্ছা হয় পড়বে।’
‘আপনার লেখায় রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য দেখা যায় না কেন?’
‘এখন থেকে দেখতে পারবেন।’
‘তার মানে, রাজনীতি আসবে?’
‘হুঁ।’ মাথা নাড়েন হুমায়ূন আহমেদ।
‘এটা কী ধরনের হতে পারে?’
‘আগেভাগে কিছু বলতে চাই না।’
‘এত দিন না আসার কারণ?’
‘এত দিন আমার ঝোঁক ছিল গল্প বলার দিকে। যে সমাজ যে কাল এই গল্প তৈরি করেছে তাকে অবহেলা করেছি। মনে হয়েছে, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখই সব।’
‘আপনি কি মনে করেন যে প্রতিটি মানুষেরই রাজনীতি করা উচিত?’
‘অফকোর্স, ইটস আ পার্ট অব আওয়ার লাইফ।’
‘ব্যক্তিগতভাবে আপনি কোন রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী?’
‘আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান।’
‘আপনি রাজনীতি করেন?’
‘না, আমি রাজনীতি করি না।’
‘ছাত্রাবস্থায়ও কি করেননি?’
‘আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন বই পড়া ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না; এখন বুঝতে পারছি কী ভুলই-না করেছি।’
‘আপনি এরশাদকে সমর্থন করেন?’
‘কে? এরশাদ? সে আবার কে? সে কি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট যে তাঁকে আমি সমর্থন করব? নাটক লিখেছি নৃপতি, সামনের মাসেই (ফেব্র“য়ারি ১৯৮৬) মঞ্চস্থ হচ্ছে, দেখবেন কেমন নৃপতি তাঁকে বানিয়েছি।’
‘বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের মধ্যে কে আপনার প্রিয়?’
‘ইমদাদুল হক মিলন, মঞ্জু সরকার।’
‘প্রিয় ঔপন্যাসিক?’
‘সৈয়দ হক, শওকত ওসমান, শওকত আলী।’
‘কবি?’
‘শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ।’
‘নাট্যকার?’
‘হুমায়ূন আহমেদ।’
‘কবিতা?’
‘জীবনানন্দ দাশের “আট বছর আগে একদিন”।’
‘নাটক?’
‘নৃপতি ।’
‘“বাবা” আপনার উপন্যাসে আসেনি?’
‘“বাবা” আমার গল্প-উপন্যাসে অনেকবার অনেকভাবে এসেছেন (শঙ্খনীল কারাগার)।
সে হিসেবে মা কিন্তু কম এসেছেন’
‘সম্ভবত আপনার কথা সত্যি নয়।’
‘নতুন লেখকদের জন্য আপনার কী উপদেশ?’
‘নতুন লেখকদের জন্য আমার একটাই কথা- পড়তে হবে, প্রচুর পড়তে হবে সব লেখকের লেখা পড়তে হবে। তাতে ভাষার ওপর দখল আসবে – কোন লেখক কীভাবে চরিত্রগুলো নিয়ে ট্রিট করছেন, সেটাও পরিষ্কার হবে। আবার চোখ-কানও খোলা রাখা দরকার। যেমন, কোন পেশার লোক কীভাবে কথা বলে, কীভাবে হাঁটে, চলে – এসবও দেখতে হবে। তা ছাড়া, কবিতা পড়া থাকলে বোধ হয় ভাষার প্রতি দখলটা তাড়াতাড়ি আসে।’
আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইনের দোতলার এই ছোট্ট বাসাতে লোকজন গিজগিজ করছে। এর মধ্যে তাঁর তিন শিশুকন্যা ছাড়াও ছোট ভাই আহসান হাবীব (শাহীন) আর ছোট এক বোনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাবার কাছে ছোট্ট কন্যা শীলা এসে ঘুরঘুর করে কিছুক্ষণ পর পর। শীলাকে দেখিয়ে বলেন, ‘ওর একটা ছবি তুলে দেন, ভাই, পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েন। মেয়েটার খুব শখ, পত্রিকায় তার ছবি যেন ছাপে। নিচে ক্যাপশন লিখে দেবেনÑবড় হয়ে আমি অভিনেত্রী হতে চাই।’
শীলাকে কোলে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ পা তুলে বসে থাকেন বেতের সোফার ওপর। এর মধ্যে মধ্য-তিরিশের এক জোড়া তরুণ-তরুণী সামনে দিয়ে বেরিয়ে যান। লেখক বলেন, ‘আমার ছোট ভাই আর তার বউ। ওর নাম ইকবাল, খুব ব্রিলিয়ান্ট। আর ওটা তার বউ। ওরা আমেরিকায় আছে। পড়াশোনা করছে। দুজনই ডক্টরেট।’
কিছুক্ষণ পর শ্মশ্র“মণ্ডিত একজন এসে ঢোকেন ঘরে। তাঁকে চিনতে সমস্যা হয় না। পত্রিকায় অনেক ছবি দেখেছি তাঁর। কবি নির্মলেন্দু গুণ। এই কবিকেও এখানে সামনাসামনি দেখব, এমনটা আশা করিনি। আমার মুগ্ধতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অটো ফোকাস ক্যামেরাটা লেখকের ছোট ভাই আহসান হাবীবকে ডেকে এনে ধরিয়ে দিই। এই দুজনের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি।
সাক্ষাৎকার পর্ব প্রায় শেষ। প্রশ্ন করার মতো নতুন কিছু খুঁজে পাই না। লেখকের সাক্ষাৎকার নিতে এসে তাঁর স্ত্রীর সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়ে গেছে। এবার মনে হলো, তাঁর মায়ের একটা সাক্ষাৎকার নিতে পারলে খারাপ হয় না। মুগ্ধ সাংবাদিক তার প্রিয় লেখককে অনুরোধ করে তাঁর মাকে ডেকে আনার জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ইস্তিরি করা সাদা কাপড়ের লাল ডোরা শাড়ি পরে এসে হাজির হন লেখকজননী।
গল্প শুরু হলো মিসেস আয়েশা আক্তার খানমের সঙ্গে।
‘আপনার ছেলেমেয়েরা কে কী করেন?’
‘বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদ। মেজো ছেলে জাফর ইকবাল- আমেরিকাতে পোস্ট ডক্টরেট করছে, সে বাচ্চাদের জন্য লেখে, তিনটা বই বেরিয়েছে। ছোট্ট আহসান হাবীব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ‚গোলে এমএসসি পাস করেছে এবার, সে আবার ভালো কার্টুন আঁকে।উš§াদ না কী যেন কার্টুন পত্রিকাÑএটার সহকারী সম্পাদক। বড় মেয়ে সুফিয়া হায়দার, পিরোজপুর মহিলা কলেজের বাংলার অধ্যাপিকা। ওর বর উকিল। মেজো মেয়ে বিএসসি পাস করে ঢাকায় আছে, ওর বর আর্মির মেজর। ছোট মেয়ে রোকসানা আহমেদও খুব ভালো ছবি আঁকে; শংকর পুরস্কার পেয়েছে। ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, ডিফ অ্যান্ড ডাম্প স্কুলে; ও আবার বোবা, কথা বলতে পারে না।’
‘আপনার সব ছেলেমেয়েই প্রতিভাবান এবং সমাজে সুপরিচিত। এঁদের এ সাফল্যের পেছনে আপনার কী অবদান আছে বলে মনে করেন?’
‘না, আমার কোনো অবদান নেই। ওরাই ওদের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে।’
‘আচ্ছা, আপনার বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদ ছোটবেলায় কেমন ছিলেন?’
‘ও খুব চালাক ছিল। কথা বলত বুড়ো লোকের মতো এবং সে বুঝতও অনেক বেশি। তা ছাড়া লেখাপড়ায়ও অত্যন্ত ভালো ছিল। ক্লাস এইটে সে বৃত্তি পেয়েছিল, মেট্রিকে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করেছিল। ওর বাবা ওর সব কাগজপত্র জমিয়ে রাখতেন ফাইলের ভেতর। যে কাগজগুলোতে ওর ছবি উঠেছিল, নাম উঠেছিল, সে কাগজগুলো আমার কাছে এখনো আছে। তার বাবা বলত যে ওগুলো আলমারির মধ্যে যতœ করে রেখো, তোমার ছেলে একদিন খুব বিখ্যাত হবে, তখন কাগজের লোকেরা এসব খুঁজতে আসবে।’
‘হুমায়ূন আহমেদ যে একদিন বড় লেখকই হবেনÑএটা আপনারা বুঝতে পেরেছিলেন?’
‘ওর বাবা বুঝেছিল।’
‘কীভাবে?’
‘ও তখন ঢাকায় চলে এসেছে – মুহসীন হলের ছাত্র। একবার একটা উপন্যাস লিখে আনল। সম্ভবত শঙ্খনীল কারাগার। বাসার সবাই আমরা পড়লাম কিন্তু তার বাবাকে পড়ানোর সাহস তার ছিল না। একদিন আমাকে দিয়ে সে লেখাটি তার বাবার কাছে পাঠাল। তারপর, আমার পাশ দিয়ে শুধু ঘুরঘুর করে, অর্থাৎ জানতে চায়, তার বাপ এটা পড়ে কী বললেন। এ রকম দু-এক দিন যাওয়ার পর এক রাতে সবাই যখন শুয়ে গেছে, তখন তার বাবা তাকে ডাকলেন। খুব ভয়ে ভয়ে সে গেল। আমিও তখন সঙ্গে ছিলাম। তার বাবা পাণ্ডুলিপিটা তার হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, “এটা যত্ন করে রেখে দিস – তুই একদিন খুব নামকরা লেখক হবি।”’
‘তাঁর বাবা কি তাঁর প্রকাশিত কোনো লেখা পড়েছেন?’
‘না, উনি তো একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হলেন।’
‘হুমায়ূন আহমেদের লেখা আপনার কেমন লাগে?’
‘খুব ভালো। মনেই হয় না যে এটা ও লিখেছে।’
‘কোনোটা খারাপ লাগেনি?’
‘না।’
‘আচ্ছা, তাঁর কোনো গল্প-উপন্যাস কিংবা নাটকের “মা”র চরিত্রে আপনার চরিত্র কিংবা তার খণ্ডাংশ এসেছে বলে আপনার মনে হয়?’
‘কী জানি, (হেসে) আমার চরিত্র আমি বুঝতে পারি না, তবে এইসব দিনরাত্রির সেই মা নাকি আমিÑতো, এটা অনেকেই বলেন। আমার তো মনে হয় না।’
‘আপনার চোখে হুমায়ূন আহমেদকে কী মনে হয়, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাকি লেখক?’
‘লেখকই বেশি।’
‘তাঁর চরিত্রের একটা দোষের কথা বলুন।’
‘সে রাগে খুব বেশি। আবার রাগ থাকেও না বেশি সময়।’
‘তাঁর ছোটবেলাকার একটা মজার ঘটনা বলুন।’
‘আমরা তখন সিলেট মীরাবাজারে ছিলাম। আমাদের বাসার পাশেই ছিল গরুর ঘর। একদিন রাত্রিবেলা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে কি, “মা, শুনে যাও, গরুরা কথা বলে।” সে কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে বলে যে গরুর কথা সে শোনে। এ কি ওর পাগলামি, না অন্য কিছু, কিছুই বোঝা যায় না।’
‘আপনার সব ছেলেমেয়ের ওপর কি আপনি সন্তষ্ট?’
‘অবশ্যই।’
এবার সত্যি সত্যি উঠে আসার পালা। তিনি দুটো বই বের করেন। প্রথম প্রহর নামে একটা উপন্যাস বেরিয়েছে কিছুদিন আগে। একটি আমার আর অপরটি গতকাল তার সঙ্গে আসা অপর তরুণের (বাবু) জন্য। এর আগে লেখক জেনেছিলেন, সাংবাদিক যে হোস্টেলে থাকেন, সেখানে তাঁর এক ভক্ত আছে, যে শঙ্খনীল কারাগার বইটি ১৮ বার পড়েছে। সেই তরুণের জন্য নিয়ে এলেন আরেকটি বই শঙ্খনীল কারাগার।
লেখক বই বের করে কলম হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করার আগে নাম জানতে চাইলেন ওই মুগ্ধ পাঠকের। বলি, ‘স্যার, নাম লিখতে হবে না, শুধু সই করে দিলেই হবে।’
তিনি লেখা বন্ধ করে তাকান আমার দিকে। জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার নাম কী?’
‘শাকুর মজিদ।’
হুমায়ূন আহমেদ শঙ্খনীল কারাগার বইটিতে লিখলেন ‘শাকুর মজিদ, আমার বইয়ের মুগ্ধ পাঠককে’ লিখে সই করে বই তিনটি দিয়ে দেন।
রাতে ঢাকা মেডিকেলের হোস্টেলের ‘প্যারাসাইট’ এই মুগ্ধ ‘সাংবাদিক’ এক দিস্তা নিউজপ্রিন্ট খাতা নিয়ে লিখতে বসে যায় এবং ২৪ পাতা লিখে পরদিন সকালবেলা অভয় দাস লেনের সেই বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়।
প্রায়বৃদ্ধ এই সম্পাদক মহোদয় এত ভারী খাতার লেখা হাতে নিয়েই বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি আস্তে আস্তে পাতা ওল্টান, মাঝে মাঝে দু-চার লাইন পড়েনও। এবং একপর্যায়ে খুব দ্রুত পাতা ওল্টানোর কাজ শেষ করে এই বিজ্ঞ সম্পাদক লেখাটি প্রায় ফিরিয়ে দেবার মতো করে টেবিলে রেখে দেন। মুখে বলেন, ‘এটাকে ছয়-সাত পৃষ্ঠার মধ্যে নিয়ে আসেন। আমরা দুই পৃষ্ঠার বেশি এ লেখকের জন্য দিতে পারব না। আপনি বরং এক কাজ করুন, এই রিডার্স ডাইজেস্টটা নিয়ে যান, আপনার জন্য আমি আর্টিকেল ঠিক করে রেখেছি, ওটা বরং ট্র্যানসলেট করে কাল দিয়ে যান। আর এই লেখাটি যদি অন্য কোথাও দিতে চান, আমার আপত্তি নেই।’
বিধ্বস্ত সাংবাদিক খুব দ্রুত অভয় দাস লেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, রিডার্স ডাইজেস্টটি সে আর নিয়ে আসে না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বায়তুল মোকাররমের সামনে ফুটপাতে বিছিয়ে রাখা এক পত্রিকার স্টলের সামনে এসে দাঁড়াই। অনেক পত্রিকা সেখানে। নামী পত্রিকা হচ্ছে বিচিত্রা, রোববার, সন্ধানী। এরা কি এই নতুন লেখকের লেখা ছাপবে?
অখ্যাত পত্রিকা খুঁজতে খুঁজতে একটা পত্রিকা হাতে নিই। তার নাম পাক্ষিক দিশা। পত্রিকায় সম্পাদকের নাম লেখা শামসুন্নাহার জ্যোৎসনা, ঠিকানা ৭৮/বি কাকরাইল, চতুর্থ তলা। পাতা উল্টিয়ে দেখি এখানে আর্ট-কালচারের কিছু লেখা আছে। ছয় টাকা দিয়ে পত্রিকাটি কিনে এই ঠিকানা অনুযায়ী হেঁটে হেঁটে এসে উপস্থিত হই এবং দেখা হয়ে যায় সেই সম্পাদিকার সঙ্গে।
তিনি লেখাটি রেখে দেন এবং আগামীকাল সন্ধ্যার পর তাঁর অফিসে আসতে বলেন। পরদিন সন্ধ্যায় এসে আমার মন ভালো হয়ে যায়। অপর এক ভদ্রলোক এবার বসেছেন এই চেয়ারে, তিনি বাংলাদেশ টাইমস-এর বড় সাংবাদিক। এই পত্রিকাটা তিনি দেখে দেন। তিনি এই তরুণ সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনার কাছে যেসব ছবি আছে, কাল নিয়ে আসেন। রঙিন ছবি থাকলে দেবেন, আমরা কভারে দেব। আর সামনের সংখ্যায় বইমেলার ওপর আমরা স্টোরি করব। আপনি বইমেলাটা কভার করুন, লেখকদের ছবিসহ একটা বড় রিপোর্ট দেবেন আপনি।’
পরদিন আবার হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হই, ফটোর ফ্রেম খুলে একটা রঙিন ছবি নিয়ে আসি। আমেরিকায় তোলা লেখক দম্পতির ছবি, তাঁদের কোলে দুই শিশুকন্যা, নোভা ও শীলা।
এর সপ্তাহ খানেক পর নীলক্ষেতের ফুটপাথে আবিষ্কার করি, এই পত্রিকার (পাক্ষিক দিশা, ১৯৮৬ সালের ২ ফেব্র“য়ারি) নতুন সংখ্যাটি। সংখ্যাটির কভার দেখে মন খারাপ। সামনে একুশে ফেব্র“য়ারি, তাই পলাশ ফুলের ছবি কভারে। যে রঙিন ছবিটা লেখকের বাড়ি থেকে ফ্রেম খুলে নিয়ে এসেছিলাম, তা কভারে নেই। ভয়ে ভয়ে পাতা ওল্টাই এবং দেখি যে সাত পৃষ্ঠায় পুরা লেখাটিই ছাপা হয়ে গেছে। দুই কপি কিনে নিই। এক কপি দিশা আর ফ্রেম থেকে খুলে আনা ছবিটা নিয়ে সন্ধ্যায় হাজির হই নিউ পল্টন লাইনের বাসায়। লেখক বাড়িতে নেই, বাংলাবাজারে। লেখকপত্নী খুবই খুশি। তিনি ইতিমধ্যে পাঁচ কপি দিশা কিনে এনেছেন নীলক্ষেতের ফুটপাথ থেকে।
টীকা (ভ্যাক্সিন নয় কিন্তু) ঃ
১। ছবি দু’টি সেদিন , ২১ জানুয়ারি ১৯৮৬ তুলেছিলো আমার বন্ধু বাবু । বহু বছর ধরে ছবিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
২। এই লেখাটি ‘যে ছিলো এক মুগ্ধকর’ (প্রথমা) বইতে আছে। বোধ হয় বইটির ৪র্থ মুদ্রণ এখনো বেরোয় নি, তবে ‘কথাপ্রকাশ’ থেকে বেরুনো ‘হুমায়ূননামা ট্রিলজি’তে বাকী গল্প আছে। ট্রিলজি সম্পুর্ণ রঙিণ।
ছড়িয়ে দিন