প্লট বাগাতে ধনীরা স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছে ভূমিহীনদের খাতায়

প্রকাশিত: ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২১

প্লট বাগাতে   ধনীরা স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছে ভূমিহীনদের খাতায়

কামরুজ্জামান হিমু

ধনীরা স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছে ভূমিহীন হতদরিদ্রদের খাতায় । বাগিয়ে নিয়েছে প্লট ।
রাজধানীর অদূরে সাভার এলাকায় বিশাল আয়তনের সরকারি জমি আত্মসাতে মরিয়া প্রভাবশালী চক্র। ভূমিহীন হতদরিদ্রদের নামে বরাদ্দ দেওয়া জমিতে গোপনে চলছে ‘প্লট বাণিজ্য’। ভূমিহীন সেজে নামে-বেনামে একাধিক প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন কোটিপতিরা। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দিন কাটছে উচ্ছেদ আতঙ্কে।

ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা শিহাব উদ্দিন তার কার্যালয়ে বলেন, ‘সাভার থানা অসহায় পরিবার পুনর্বাসন বহুমুখী সমবায় সমিতিতে কোটিপতি সদস্য আছে। এটা সত্য। তবে এ ক্ষেত্রে সমবায়ের কিছু করার নেই। কেউ যদি ধনাঢ্য কারও কাছে তার সদস্য পদ বিক্রি করে দেয় তা হলে সমবায় অধিদপ্তর কী করতে পারে। এটা সমিতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সমিতির কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। সদস্যরা একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে সমিতির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেতে পারে।’ য়ামাদের  অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিনব কায়দায় শত কোটি টাকার সরকারি জমি লিজ নেওয়া হয়। এজন্য স্থানীয় ভূমিহীনদের নামে খোলা হয় সমবায় সমিতি। কিন্তু জমি বরাদ্দের পরপরই বদলে যায় নামের তালিকা, নথিপত্র। প্রকৃত ভূমিহীনদের নাম বাদ দিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নাম যুক্ত হয় তালিকায়। প্লট বাণিজ্যের এই মহোৎসব চলে নির্বিঘ্নে। রক্ষকরা হয়ে যান ভক্ষক। কেউ কেউ রাতারাতি নেতাও বনে যান।

সরেজমিন গান্ধারিয়া : সাভারের আমিন বাজার ব্রিজ থেকে বাসে বালিয়াপুর স্ট্যান্ড। সেখান থেকে অটোরিকশাযোগে গান্ধারিয়া। গেন্ডা চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তা পাকা। এরপর মাটির রাস্তা। আঁকাবাঁকা সরু পথের দুধারে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড। কাঁচা সড়ক ঘেঁষে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পরিত্যক্ত সরকারি জমি। এর মধ্যে প্রায় ১৬ একর জায়গা লিজ দেওয়া হয়েছে সাভার থানা অসহায় পরিবার পুনর্বাসন বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে।

সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটি কুঁড়েঘর, দোকান এবং একটি মসজিদ। বিশাল জায়গাজুড়ে সবজি চাষের বিস্তীর্ণ মাঠ। প্রকল্পের জমিতে ঢুকতেই এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ ইউসুফ আলী মিস্ত্রি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি আঙুল উঁচিয়ে প্রকল্পের সীমানা বোঝানোর চেষ্টা করেন। বলেন, ‘ওই যে দূরে খাল দেখা যায়-তার পাশ দিয়া যদি আগান তাইলে সীমানা। এর মধ্যে সব জমি সমিতির। তবে এখন রাস্তায় চিটা কাদা। হাঁটতে পারবেন না।

শুকনার সময় আইসেন দেখাইয়া দিব।’ ইউসুফ আলীর সঙ্গে কথা বলার সময় স্থানীয়দের আরও বেশ কয়েকজন এগিয়ে আসেন। তারা জানান, সমিতির নামে জমি বরাদ্দের পর থেকেই উচ্ছেদ আতঙ্ক শুরু হয়েছে। কারণ বহিরাগতরা জমি দখলে মরিয়া। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ কোটিপতিরা ভূমিহীন সেজে সমিতির সদস্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশকিছু জায়গা চলে গেছে তাদের দখলে।

কোটিপতি ভূমিহীনরা : রাস্তার পাশেই সমবায় সমিতির কার্যালয়। সেখানে গিয়ে ৪২০ জন সদস্যের একটি তালিকা পাওয়া যায়। সদস্য তালিকার ১৯৬ নম্বর নাম সাবিনা ইয়াসমিন। তার দখলে ৭টি প্লট। প্রাচীর ঘিরে সেখানে গরুর খামার করা হয়েছে। সাবিনা ইয়াসমিনের স্বামী দিদারুল ইসলাম সমবায় অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা। ফলে প্লট বরাদ্দ পেতে সমিতির সদস্য হিসাবে স্ত্রীর নাম ঢুকিয়ে দেন।

সমিতির ৩২৫ নম্বর সদস্য একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তার নাম জাহাঙ্গীর আলম। ৯টি প্লট তার দখলে। ইট দিয়ে সীমানা ঘিরে সবজি চাষ করছেন তিনি। ৪৭১ নম্বর সদস্য আমিনুর রহমানের দখলে ৪ প্লট। তার ভাই প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তিনিও সমিতির সদস্যভুক্ত হন। ৪৭৬ নম্বর সদস্য কেএম আইয়ুব এক প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তার চাচাতো ভাই। তার ৮টি প্লট একত্র করে সীমানা ঘেরা।

২২৬ নম্বর সদস্য ফারহানা আলম জিনিয়া হলেন সাভার থানার সাবেক ওসি কামাল হোসেনের শ্যালকের স্ত্রী। ২০০ নম্বর সদস্য রাজন আহমেদ ডিসিও’র (জেলা সমবায় কর্মকর্তা) গাড়িচালক। ৩৬৫ নম্বর সদস্য লোকমান আজাদ মিরপুর এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ৯০ নম্বর সদস্যের নাম এএফএম শাহজাহান। তিনি মিরপুর শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, তালিকার ৫৪ নম্বর সদস্য রুহুল আমিন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তার ছেলে রেজোয়ানুল আমিনও সমিতির সদস্য।

তালিকায় আছে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান, পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জবেদ আলীর ছেলে আওলাদ হোসেন, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ এবং স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার সিদ্দিকুর রহমানের নাম।

এছাড়া সমিতির সাবেক কয়েকজন নেতাও কোটিপতি। এদের মধ্যে সাবেক সভাপতি জহরুল ইসলাম বাবু ওরফে ডাক্তার বাবু মিরপুরে ৩টি বাড়ির মালিক। তিনি প্রতিষ্ঠিত আবাসন ব্যবসায়ী। সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান লালমাটিয়া এলাকায় বসবাস করেন নিজের বাড়িতে। স্বঘোষিত সভাপতি মেহেদী হাসানও কোটিপতি। নেতা পরিচয়ের প্রভাবে তারা একেকজন ৮-১০টি করে প্লট দখলে রেখেছেন। এমনকি সাবেক কয়েকজন নেতার বিস্তর প্লট বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। প্লট বিক্রির কথা বলে গণহারে টাকা নেন তারা। এদের মধ্যে সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান, জহরুল ইসলাম ওরফে ডাক্তার বাবু অন্যতম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ২০ বছর আগে সরকারি জমিতে বসবাসরত স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেন। ২০০২ সালে সাভার থানা অসহায় পরিবার পুনর্বাসন বহুমুখী সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৫.৭৪ একর জমি লিজ দেয় সরকার। এরপরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ছদ্মবেশী সদস্যদের সংখ্যা হু-হু করে বাড়তে শুরু করে।

নেতাদের দ্বন্দ্ব চরমে : প্লট ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে নেতাদের মধ্যে বিরোধ এখন চরমে। অন্তত চারটি গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। নেতাদের পাল্টাপাল্টি মহড়া আর সংঘাতে আতঙ্কিত স্থানীয়রা। হামলায় আহত অনেকে হারিয়েছেন স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। অনেকের নাম উঠেছে আসামির তালিকায়। জমি দখলের হামলায় আহত নির্মাণ শ্রমিক মিজানুর রহমান তার হাতে লম্বা সেলাইয়ের দাগ দেখান। বলেন, জমি দখল করতে এসে দুর্বৃত্তরা তার হাতে ধারালো অস্ত্রের কোপ দেয়। এতে হাড় ভেঙে যায়। ফলে এখন তিনি আর ভারী কাজ করতেন পারেন না। শ্রমিক আলামিনের মেরুদণ্ডে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আঘাত পান। এলোপাতাড়ি মারধরের শিকার হন কৃষক তাজুল ইসলাম।

এসি মিস্ত্রি রাজা মিয়ার ঘর ভেঙে দেয় স্থানীয় প্রভাবশালী মামলত আলী, কুটি চৌকিদার এবং নূর ইসলামের লোকজন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে অতিষ্ঠ ৭৫ বছরের বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আর কতদিন এইভাবে চলব- কন তো দেহি। চাঁন্দা তো দিতেই আছি। একবার হেই সমিতি, আরেকবার হেই নেতা। কিন্তু তারপরও বারবার ঘর ভাইঙ্গা দিয়া যাইতাছে। শান্তি তো পাইলাম না।’

আশ্রয়ের আকুতি : প্রকল্পের ভেতরে উঁচু একটা টিবির ওপর একচালা টিনের ঘর তুলে বাস করছেন নির্মাণ শ্রমিক হোসেন আলী। তাদের আদি বাড়ি পটুয়াখালী। ২৫ বছর আগে তার বাবা রাজা মিয়া এখানে এসে আশ্রয় নেন। হোসেন আলী বলেন, ‘ ছোট থাইক্ক্যা এহানে বড় হইছি। এখন আমার ৩ পোলা মাইয়াও হইতাছে। এইটাই আমাগো বাড়ি, গ্রাম। পেশায় দিনমজুর জসিম উদ্দিন বলেন, সমিতির নামে জমি বরাদ্দের পর থেকেই তারা উচ্ছেদ আতঙ্কে আছেন। অনেক নেতা। নিজেরাই মারামারি করে। একেকবার একেক নেতা আসে। তারা শুধু আমাগো নাম বিক্রি করে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, সমিতির নামে জমি বরাদ্দ দিয়ে বরং তাদের ক্ষতি হয়েছে। বাইরে থেকে লোকজন এসে গণহারে সমিতির সদস্য হয়েছে। সব প্লট তারাই পাচ্ছে। গৃহবধূ রিমা বেগম বলেন, তারা ২০-২৫ বছর ধরে এখানে বাস করছেন। হঠাৎ করে তাদের যেন উচ্ছেদ করা না হয়। একই দাবি হোসেন গাজী, রাজিব দেওয়ান, ঈশিতা আক্তার, নুরজাহান, সুমনা, নাজমুল হোসেন, ঝুমা, নাজমা, ফাতেমা, আসমা, শিমু ও ময়না আক্তারের। প্রতিবন্ধী কাউসার গাজী হাতজোড় করে বলেন, তারা সরকারি জমিতে একটু আশ্রয় চান। সরকার যদি প্রকৃত ভূমিহীনদের নামে প্লট বরাদ্দ দেয় তবে সবাই উপকৃত হবে।

 

ছড়িয়ে দিন