ফখরুল ইসলাম ও তার বর্ণাঢ্য প্রবাসজীবন

প্রকাশিত: ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, মে ২, ২০২১

ফখরুল ইসলাম ও তার বর্ণাঢ্য প্রবাসজীবন

 

কামরুল হাসান
ফখরুল ইসলাম দেশ ছেড়েছিলেন ভাগ্যান্বেষণে। অনেক জায়গা ঘুরে থিতু হয়েছেন স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায়। সেখানে সেন্ট জোনস রোডে তার একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর নাম ইস্টার্ণ প্যাভেলিয়ন। এই ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়ন হলো এডিনবরার সংস্কৃতিপ্রিয় বাঙালিদের আড্ডাস্থল ও প্রাণকেন্দ্র। ফখরুল ইসলাম একদিন আমাকে ও আমার সহকর্মী আসিফকে তার বাসায় দাওয়াত করেছিলেন। রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন যাওয়া হয়নি, খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল রেস্তোরাঁতেই।
মনে আছে সেসময়ে মাহমুদুর রহমান মান্না গ্রেফতার হয়েছিল। মান্নার গ্রেফতার প্রসঙ্গে ফখরুল ইসলামের অভিমত ছিল, বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি বিপথগামী করার জন্য সে সময়কার ডাকসুর ভিপি মান্না অনেকটা দায়ী। কেননা জাসদ ছাত্রলীগের ব্যানারে নির্বাচন করে ভিপি হয়ে তার নতুন দল বাসদ করা ছিল উদ্দেশ্যমূলক, কেননা তাতে প্রবল শক্তিশালী ছাত্রফ্রন্ট জাসদ ছাত্রলীগ ভেঙে যায় ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফখরুল ইসলামের মতে, মান্না এটা করেছিলো জেনারেল এরশাদের প্রলোভনে। আজও সে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। ফখরুল ইসলাম ছাত্র রাজনীতি করতেন, চেতনায় তিনি বামপন্থী এবং বর্তমানের অনেক প্রাক্তন বামপন্থীর মতো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক।
সেদিন আড্ডা দিতে দিতে রাত এগারোটা বেজেছিল। আমাকে ও আসিফকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি স্থানীয় একজনকে অনুরোধ করলেন। বিদায় নিয়ে ভদ্রলোকের ঢাউস মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে এসে চড়েছিলাম। আসিফ গাড়িটি দেখে বেশ মুগ্ধ হয়েছিল। এডিনবরার বিখ্যাত বাংলাদেশী ড. ওয়ালি তছরউদ্দিন ব্যতীত আর কোনো বাংলাদেশীকে সে এত দামী গাড়ি চালাতে দেখেনি। ‘দাম কত’? আসিফ জিজ্ঞেস না করে পারে নি। গাড়িটির চালক প্লাস মালিক জানিয়েছিলেন, ৭৫ হাজার পাউন্ড। শুনে আমরা বিস্মিত। বিদেশে বাংলাদেশিরা তবে ভালোই আছে। আমাদের বিস্ময়ের রেশ কাটতে না কাটতেইেআমাদের আবাস ক্রেইগেনটিনি রোড এসে পড়েছিল।
ওই যে সেদিন বাড়ি নিতে পারেননি, আরেকদিন বিকেলে ফখরুল ইসলাম বাসায় নিয়ে গেলেন। তার বাসা কাছেই ক্লারমিস্টন এলাকায়। তিনি একটি সুপরিসর গাড়িতে চড়িয়ে সেখানে নিয়ে যান। এখানে অনেক গৃহের প্রবেশপথ রান্নাঘর দিয়ে, সেটি পেরিয়ে ডাইনিং আর সেটা পেরিয়ে ড্রইংরুম। বেশিরভাগ বাড়ির নিচতলাটি হলো সদরমহল, আর দোতালাটি অন্দরমহল, শোবার ঘরগুলো দোতালায়, কার্পেট মোড়ানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উঠতে হয়। ফখরুল ইসলামের তিন সন্তান, বড়টি ছেলে, পরের দুটি মেয়ে। বড় মেয়ে নীহারিকা ক্লাস এইটে পড়ে আর ছোট মেয়ে অরুন্ধতী নার্সারিতে। ছেলে কোচিংএ থাকায় দেখা হলো না। ওদের বাবা সাহিত্যঘেষা, সংস্কৃতিমনা, সুতরাং ওদের নামকরণে আমি বিস্মিত হই না, কিন্তু আসিফ বিস্মিত হয়। ভাবী আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন, খাবার প্রস্তুতই ছিলো, তিনি আমাদের ডাইনিং স্পেসে নিয়ে যান।
খাবার শেষে ড্রইংরুমে আড্ডা। ফখরুল ইসলাম রাজনীতি সচেতন মানুষ। তিনি বলেছিলেন, ড. কামাল হোসেন এডিনবরা এসে ফখরুল ইসলামকে তার দলে নেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, সফল হননি। তিনি ড. কামাল হোসেনকে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ বলে আখ্যায়িত করলেন। তার কাছ থেকে জানতে পারি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যারা এডিনবরায় আসেন অবলীলায় এদের আতিথ্য গ্রহণ করেন, চেষ্টা করেন দলে ভেড়াতে। প্রবাসী জীবনে দেশের জন্য উন্মুখ এরাও স্বদেশী কাউকে পেলে উদার আতিথেয়তায় জড়ান। ফখরুল ইসলাম নিজে এখানকার বিভিন্ন বাঙালি অনুষ্ঠানের জন্য নাটক ও গান লিখেন, তাই নাট্যকার মামুনুর রশিদ তার গৃহে কাটিয়ে যান তিন সপ্তাহ। আবু মেরন, যিনি আমাদের প্রথম ইস্টার্ন প্যাভেলিয়নে নিয়ে গিয়েছিলেন আমায় জানিয়েছিল ভ্রমণলেখক শাকুর মজিদ স্কটল্যান্ড নিয়ে লিখিত তার ভ্রমণগ্রন্থ ‘নদীর নাম টে’ উৎসর্গ করেছেন মেরনকেই, কেননা মেরন তাকে সাধ্যমতো বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল।
বিলেতে অভিবাসী হয়ে আসা বিভিন্ন দেশের মানুষদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ত্রিশের দশকে এদেশে প্রথম আসতে শুরু করে জ্যামাইকার লোকেরা। প্রথম মহাযুদ্ধে, যাকে এরা বলে গ্রেট ওয়ার, তাতে ব্রিটেনের প্রচুর সৈন্য মারা যায়। ব্রিটেন অনেকটা পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ললনাদের প্রেম পাওয়ার সবচেয়ে অকৃত্রিম সৌভাগ্য জোটে এই কালো মানুষদের। বিভিন্ন জাতির ভেতর বিবাহের সেই শুরু। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অভিবাসী আসা শুরু হয় চল্লিশের দশকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, ব্রিটেন তখনো প্রায় পুরুষশূণ্য। প্রথম আসে ভারতীয়রা, পঞ্চাশের দশকে পাকিস্থানীরা আর ষাটের দশকে বাংলাদেশ, বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট থেকে, মানুষ জীবিকা ও ভাগ্যান্বষণে বিলেতে পাড়ি দিকে থাকে। মৌলভীবাজার জেলা থেকে চা-বাগানের মালিক ইংরেজ সাহেবরা কিছু শ্রমিক নিয়ে এসেছিলো আর লন্ডনের পোর্টে এসে অনেক ডাঙায় নেমে হেঁটে হেঁটেই চলে এসেছে বৃহত্তর পরিধিতে, আর ফিরে যায়নি। জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়তে হয়নি তেমন একটা, কেননা ব্রিটেনে কর্মজীবি মানুষের সঙ্কট ছিল। দক্ষিণ এশীয়রা, বিশেষ করে পাকিস্তানীরা, ম্যানচেস্টার ও ব্রাডফোর্ডের আশেপাশের টেক্সটাইল ও উলেন মিলগুলোতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। ভারতীয়রা গ্রোসারি শপ, যেগুলোকে এদেশে ‘কর্ণার শপ’ বলা হয়, সেগুলো ইহুদিদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে ব্যবসা করতে থাকে। টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পাকিস্তানী শ্রমিকরাও গ্রোসারি শপ খুলতে থাকে। বাংলাদেশীরা মূলত লেগে থাকে রেস্তোঁরা ব্যবসায়। ফখরুল ইসলাম জানালেন সমগ্র ব্রিটেনে ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’-এর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি নয়। উদাহরণস্বরূপ তিনি বল্লেন এডিনবরায় ৪০ থেকে ৫০টি রেস্তোরাঁ আছে। এসব কারি রেস্তোরাঁর নব্বই ভাগের মালিক বাংলাদেশীরা; বাংলাদেশ থেকে আসা বেশিরভাগ অভিবাসী এসব রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। কেবল সেদ্ধ খাবার খাওয়া ব্রিটিশদের মশলা-মেশানো কারি ফুডে অভ্যস্ত করাতে এসব দোকান মূখ্য ভূমিকা রেখেছে। তিনি কারি ব্যবসার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলেন ব্রিটেনে প্রথম ভারতীয় রেস্তোঁরা প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে, ১৯৩৫ সালে। প্রতিষ্ঠা করেন একজন আসামী ব্যারিস্টার যিনি এদেশে আইনব্যবসা করতেন, কিন্তু দেশ থেকে আসা ছোট ভাইয়ের জন্য কর্মসংস্থান করতে তিনি ‘বীর আসামী’ নামের রেস্তোরাঁটি খোলেন। আজও লন্ডনে এই ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁটি রয়েছে, যেখানে মেম্বার না হলে খাবার খাওয়া যায় না।
অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে, চা পান, ছবি তোলা শেষে আমরা বেরিয়ে পড়ি। ফখরুল ইসলাম এবার একটি ছোট গাড়ি নেন। তার বাড়ি থেকে বেরুতেই ড্রামব্রে নামের একটি গ্রন্থাগার, প্রদর্শনী হল, অডিটোরিয়াম, গ্যালারি সমৃদ্ধ (একে বলা হয় হাব) বৃহদকায় ভবন দেখে আমাদের কৌতুহল হয়। ফখরুল ইসলাম জানান, একজন স্কটিশ ভদ্রলোক (তিনি নামটি স্মরণে আনতে পারলেন না ) এখানে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান, কিন্তু সফল হননি। মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন। একসময়ে সরকার এগিয়ে আসে, বরাদ্দ হয় দুই মিলিয়ন পাউন্ড, যা দিয়ে নির্মিত হয়েছে এই জনকল্যাণকর, জ্ঞানের আলোক ছড়ানো প্রতিষ্ঠানটি। ফখরুল ইসলাম মন্তব্য করলেন, সরকার একা কোনো দেশ গঠন করতে পারে না। এমনি অসংখ্য আত্মত্যাগী, দেশপ্রেমী মানুষের একাগ্রতা ও পরিশ্রমে এদেশ এগিয়েছে।
তিনি আমাদের জানান এই এলাকায় বসে রবার্ট লুই স্টিভেনসন তাঁর বিখ্যাত কিশোর গ্রন্থ কিডন্যাপ লিখেন। ক্যামো গ্রামে রবার্ট লুই স্টিভেনসনের বাড়িটির পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যান তিনি। অন্ধকারে বাইরের কুঞ্জবীথিঘেরা বাড়িটির কিছুই আমাদের চোখে পড়ে না, সময়ের অভিঘাতে বাড়িটি ভেঙে পড়েছে, ফখরুল ইসলাম আমাদের জানান। কাছেই এডিনবরা এয়ারপোর্ট। আলোহীন গ্রামীণ ক্যামো ওয়াক ধরে গাড়ি চালিয়ে তিনি আমাদের বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যান। পাশেই একটি ঝলমলে শহর, তার এত কাছে এমন একটি গ্রামীণ পরিবেশ আছে, ভাবা যায় না। আর শহর বর্ধিত করার কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকলে এদের জায়গার কোনো কমতি নেই।
নৈশভ্রমণ সমাপ্ত করে তিনি আমাদের তার রেস্তোরাঁ ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়নে নিয়ে এসেছিলেন, উদ্দেশ্য পুনর্বার আড্ডা এবং ভুবনবিখ্যাত স্কটিশ হুইস্কির সুধা পান করানো। ওল্ড পুলটেনি নামের পেটমোটা বোতল থেকে তিনি ঢেলে দেন সোনালী তরল। বোতলের গায়ে লেখা সিঙ্গেল মাল্ট স্কচ হুইস্কি; লেবেলের উপর ১৮২৬ সাল মুদ্রিত দেখে বুঝি এ কোম্পানির বয়স দু’শ বছর হতে চলেছে।
তার সাখে সখ্য বাড়তে থাকে। এর কারণ আমাদের দুজনের প্রিয় বিষয় সাহিত্য। একদিন দুপুরে ইস্টার্ন প্যাভিলিয়নে তিনি অমর একুশে উদযাপনের আয়েজন করেন। আমন্ত্রণ জানান আমি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আমার চার সহকর্মীকে এবং এডিনবরার কিছু বাছাই করা বাংলাদেশীকে, যাদের তিনি সংস্কৃতিঘেষা মনে করেন। । সেদিন লিভারপুল থেকে আসা কবি তানভীর রাতুলকেও সেখানে আসতে বলেছিলাম। দেয়ালে ওয়াল পেপারের উপর বসানো পেইন্টিং, মাথার উপরে ঝাড়বাতি আর টেবিল জোড়া দিয়ে দিয়ে লম্বা করে বানানো টেবিলে প্রথমে খাওয়া-দাওয়া ও পরে একুশের আলোচনা দুটোই হয়েছিল। দু-একজন বিদেশি অতিথি থাকা সত্ত্বেও রেস্তোরাঁটি হয়ে উঠেছিল একখণ্ড বাংলাদেশ।
আরেকদিন ফখরুল ইসলাম আমাকে যে পাবে নিয়ে যান তার নাম উইনস্টন পাব, এ এলাকার সবচেয়ে পুরনো পাব। ফখরুল ইসলামের যুক্তি হলো আমি যদি বিলেতে এসে পাবে (পাবলিক থেকে পাব) না যাই তবে আমার বিলেত ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, কেননা ব্রিটিশ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শুড়িখানা বা পাব। এটি তাদের সামাজিক মেলামেশা ও আড্ডার জায়গা। তবে ১৮ বছরের কমবয়সী কেউ এলে মদ সার্ভ করা হয় না। ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়ন রাস্তার যে পার্শ্বে তার উল্টো পার্শ্বে মূল সড়ক থেকে একটু ভেতরে পানশালাটির অবস্থান। ঢুকেই একটি ভিন্ন পরিবেশ খুঁজে পেলাম, অনুজ্জ্বল বাতিমালার মোহময় পরিবেশ। পাবটি চালাচ্ছেন স্টেফি নামের এক দীর্ঘদেহী রমণী। ফখরুল ভাই তাকে চেনেন বহুবছর ধরে, একসময়ে দুজনের মাঝে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো। এই পাবটি একসময় স্টেফির বাবার মালিকানাধীন ছিল, তিনি সেটি বিক্রি করে দিলেও স্টেফি এখানে কাজ করে। আমরা দু পাইন্ট বিয়ার নিয়ে এক কোণায় এসে বসি। আমাদের কাছের টেবিলে চারজন যুবক আড্ডা দিচ্ছে, চোখ তাদের বৃহদাকৃতির টেলিভিশন পর্দায়। সেখানে চেলসি ও পিএসজির মধ্যকার চ্যাম্পিয়ন লীগের কোয়ার্টার ফাইনালের খেলা চলছিলো। পাবের তিনদিকে তিনটি বড় টেলিভিশন স্ক্রীন, সব পর্দাতেই ওই একই খেলা। ওই চার যুবক ছাড়া বাকি সকলেই বয়স্ক মানুষ, বুড়োরা যুবকদের মতোই বিভিন্ন টেবিল ঘিরে পানরত। আশ্চর্য যে স্টেফি ছাড়া আর একজন রমণীও নেই পাবটিতে। ফখরুল ইসলাম বললেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার মদবিরোধী প্রচারণা জোরদার করায় পাবগুলোতে ভিড় কমে গেছে। একজন বয়স্ক মানুষকে দেখলাম কাউন্টারের কাছে উচু টুলে বসে বই পড়ছেন, সমুখে পানপাত্র রাখা। স্টেফি একবার এসে আমাদের সাথে গল্প করে যায়, প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের বন্ধুর সাথে পরিচিত হয়। সে আজও বিয়ে করেনি অথচ ফখরুল ভাই তিন সন্তান, স্ত্রী নিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী। আমরা আরও একবার গ্লাস পূর্ণ করে নেই।
ফখরুল ইসলামের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। ‘এডুকেশনাল সাইকোলজি’ কোর্সে আমি কী শিখছি তা তাকে সংক্ষেপে জানালে তিনি তার প্রথম জীবনে কিছুদিন কলেজে শিক্ষক ছিলেন। তার সে আদর্শ জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নিজের অজান্তেই তিনি সেই এ্যাপ্রোচ নিয়েছিলেন, অর্থাৎ ভয় নয়, আনন্দময়তার ভেতরে শেখা, যা আধুনিক মনঃস্তত্ত্ব সমর্থন করে। তিনি তখন থেকেই ‘স্যার’ সম্বোধনের বিরোধী এবং ছাত্রদের নিষেধ করে দিয়েছিলেন কেউ যেন তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন না করে।
সন্ধ্যের পাব থেকে ফিরে সে রাতে চমৎকার ডিনার হয়েছিল ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়নে। তার মতো বন্ধুপ্রিয় উদার মানুষ কম দেখেছি। সন্ধ্যারাতেও মাংশের টুকরো ভেজে এনেছিলেন আমার জন্য। দুপুরে আবদুর রশিদের গৃহে সুস্বাদু লাঞ্চ, রাতের এই ভুরিভোজ- গোটা দিনটি কাটে পরিতৃপ্তিময় আহারে, সন্ধ্যের ওই পান তাতে যোগ করে অন্য মাত্রা। প্রতিরাতের মতোই ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পেরিয়ে গেলে ইস্টার্ণ প্যাভিলয়নের কর্মীরা এক এক করে বাড়ি ফিরে যান আর ফখরুল ইসলামের বন্ধুরা এক এক করে নিজ নিজ রেস্তোরাঁ বন্ধ করে জড়ো হন। ফিরোজ ও আইয়ুব নামের দুজন বোধকরি একসঙ্গেই ঘোরেন, তাদের দেখেছি এক গাড়ি চড়ে আসতে। এদের মিলটি হলো দুজনেই বেশ ভারী শরীরের অধিকারী, দুজনেই ননসিলেটীদের সাথেও সিলেটী ভাষায় কথা বলেন। আজ তাদের গাড়িতে করেই বাড়ি ফিরি। ফখরুল ইসলামের উদ্দেশ্য আমাকে রাত্রিকালীন ফার্থ অব ফোর্থের তীরভূমি দিয়ে বেড়িয়ে নিয়ে আসা। রাতের সে ।্রমণ অন্য এক এডিনবরাকে দেখিয়েছিল। ক্রেইগএনটিনি রোডে এসে যখন নামি, তখন রাত দেড়টা। যে বাড়িটিকে মনে হয়েছিলো ৮০ নম্বর, তার দরোজায় লেখা ৩। অর্থাৎ ভুল জায়গায় নেমেছি। গাড়ি ততক্ষণে অদৃশ্য। কোনদিকে যাবো স্থির করতে পারি নি, রাত্রির মায়াবী কুহকে সকল দিক সমান মনে হয়েছিল। এডিনবরা বলে ভয় পাইনি, কিন্তু ঢাকা হলে?
এডিনবরায় প্রথমদিকে ঘনিষ্ঠ ছিলাম ড. ওয়ালি তছরউদ্দিনের সাথে। আমরা তিন বাংলাদেশি থেকেছি জনাব হুমাযুন কবিরের বাড়িতে কিন্তু বেশি আড্ডা দিয়েছি ফখরুল ইসলামের সাথে। তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন সন্ধ্যারাতে আমি যেন ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়নে যাই। আবদুর রশিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ২৬ নম্বর বাস ধরি সেন্ট জোনস রোডে নামার জন্য। তখন বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল স্ট্রিটলাইট, ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের আলোয় স্থানে স্থানে সে অন্ধকার সরানো। এখানে প্রিন্সেস স্ট্রিটের দক্ষিণ প্রান্ত ছাড়ানোর কিছু পরেই জনবসতি ও আলোর পরিমান কমে আসে। আমি ঠিক ঠাহর করতে পারি না চিড়িয়াখানাটি ছাড়িয়ে এসেছি কিনা। একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞস করি, কিন্তু কিছুতেই তাকে zoo শব্দটি বোঝাতে পারি না। আমি ভাবি এটা কি ইংরেজি শব্দ নয়? অনেক কসরতের পর তিনি বুঝতে পারেন এবং ইংরেজি বর্ণ জেড-এর উপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে উচ্চারণ করেন zoo । আমার z উচ্চারণটি হচ্ছিল ইংরেজি j-এর মতো। স্কটিশদের ইংরেজি উচ্চারণ ইংরেজদের চেয়ে আলাদা, আমাদের মতো বিদেশীদের সে ইংরেজি দুরূহ নয়, অস্পষ্ট।
ফখরুল ইসলামের ইচ্ছা আমাকে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পাবে যাবেন। এখানকার রেস্তোরাঁ ও পাবগুলো সন্ধ্যেবেলাতেই জমজমাট হয়ে ওঠে। ভেবেছিলাম তিনি বোধহয় তার প্রাক্তন প্রেমিকার পাবেই নিয়ে যাবেন। কিন্তু না, আজ আমরা অন্য একটি পাবে গেলাম। সেদিন পান করেছিলাম বিয়ার, আর আজ পান করলাম ভোদকা। রাশিয়ান উপন্যাসে এই বিখ্যাত রুশীয় মদের প্রচুর উল্লেখ থাকলেও তা পান করে আমার তেমন পরিতৃপ্তি হলো না, তুলনায় সেদিনের বিয়ার ছিলো তৃপ্তিময়, সে পাবটিও ছিলো অধিকতর প্রাণপূর্ণ। দুটি পাবের মধ্যে মিল হলো নারীহীন সুরালয়ে একশতভাগ সুরাসক্ত পুরুষ খদ্দেরের উপস্থিতি আর বিশাল টিভি স্ক্রীনে ইউরোপিয়ান ফুটবলের বর্ণিল আয়োজন। আজ ছিলো বার্সিলোনা বনাম ম্যাসসিটির ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগের ম্যাচ। কাছেই কজন যুবক বসেছিলো, আশ্চর্য তারা সমর্থন দিচ্ছিলো বার্সেলোনাকে, ম্যানসিটিকে নয়। লিওনেল মেসির জাদুকরি ড্রিবলিং দেখে মুগ্ধ হই সকলেই। একটু দূরের একটি টেবিলে প্রৌঢ়রা তাস খেলছে। ওপাশে ঘুরে দেখলাম পাবটিতে আরও খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু ওপাশে কেউ নেই।
খেলা দেখতে দেখতে ফখরুল ইসলামের সাথে গল্প করে চলি। তিনি তার জীবনের গল্প বলেন। আজীবন প্রেমিক মানুষটি প্রেমে পড়েছেন বহুবার। তিনি তার প্রথম জীবনে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, কিছু প্রেমের কাহিনী, বিয়ে করার নাটক আমায় অবলীলায় বলে যান। এসব হলো সেইসব ঘটনা যা মানুষ ঘনিষ্ঠ কারও কাছে বলতে চায়। তিনি আমাকে বলছেন। তিনি কেবল সংস্কৃতিমনা নন, সংস্কৃতির চর্চ্চা করেন। গান লিখেন, নাটক লিখেন ও নির্দেশনা দেন। সাহিত্যের সুবাসে আমি তার প্রিয়, তারও বাইরে মানুষটি উদার ও আড্ডাপ্রিয়।
ইস্টার্ণ প্যাভিলিয়নে ফিরে ডা. দুলাল চৌধুরীকে পাই। ইনি এডিনবরায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মাঝে অন্যতম প্রবীণ। প্রথম দেখায় আমি না বুঝে তার বয়স জিজ্ঞেস করেছিলাম, করার কারণ হলো এ বয়সেও তিনি বেশ সতেজ আছেন।সে প্রশ্ন যে ঠিক হয়নি তা বুঝি তিনি অন্য একজনের উদাহরণ দিয়ে জানালেন সেই লোক তাকে বয়স কত জিজ্ঞেস করে রাগান্বিত করে তুলেছিলো। বুঝি বয়স্ক মানুষ মেনে নিতে পারে না সংখ্যার বিপুল হয়ে ওঠা, নিজেকে তরুণ দেখাতেই তিনি আগ্রহী। ইনি প্রাণে ও চেতনায় বেশ নবীন, মেশেন তার চেয়ে কমবয়স্ক মানুষদের সাথে। নিজের দুটি উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত পিতার স্মার্ট ফোনে প্রাণপ্রিয় কণ্যাদের ছবি ও ভিডিও। বড় মেয়েটি ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করেন, একটি সেমিনারে তার দেওয়া বক্তৃতার ভিডিও আমাকে দেখালেন। এদেশে জন্ম নেয়া ও বড় হয়ে ওঠা মেয়েটির ইংরেজি উচ্চারণ পুরোপুরি এদেশের মানুষদের মতো।
রাত বাড়লে আবু মেরন, ইয়াহিয়া খান, ফিরোজ খান প্রমুখ জড়ো হয়। বিবিধ বিষয়ে আলোচনা জমে ওঠে, এর মাঝে বিবাহিত পুরুষের বৌ কেন চলে যায়, তা নিয়ে রসজ্ঞ আলাপ হলো। আমরা মজা করলেও ভুক্তভোগীরা নিশ্চয়ই তা উপভোগ করবেন না। ডেল কার্নেগী বেঁচে থাকলে হয়তো “সংসার টিঁকিয়ে রাখার কৌশল ও পরিতৃপ্ত দম্পতি” নামে বই লিখে সাহায্য করতে পারতেন। ফখরুল ইসলাম চমৎকার হোস্ট, আজ দু’বেলাই তৃপ্তিকর আহার হলো। গভীররাতে তারা আমায় নামিয়ে দেন ক্রেইগএনটিনি রোডে।শীতের দেশে পাওয়া এদের উষ্ণ সাহচর্য আমি চিরকাল মনে রাখবো।
ব্রিটেনে তখন নির্বাচনের ঘনঘটা। স্কটল্যান্ডে ঐতিহ্য অনুসারে লেবার পার্টির সমর্থন বেশি, বেশিরভাগ বাঙালি লেবার পার্টিকে সমর্থন করতো্ তবে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি)র আর্বিভাবের পরে হাওয়া বদলাতে শুরু করে। ফখরুল ইসলাম, আবু মেরনরা এসএনপির সমর্থক ছিল। ফলে এসএনপির সভা হতো ইস্টার্ন প্যাভিলিয়নে। আমি নিজেও সেসব সভায় যোগ দিয়েছি। এসএনপির এমপি, এমনকি মন্ত্রীর সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে বিভিন্ন সভায়। ফখরুল ইসলাম আামাকে এতটাই ভালোবেসেছিলেন যে তিনি আমাকে স্কটণল্যান্ডে থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেলেন। কাগজপত্র তিনি বের করে দিবেন বলে প্রতিশ্রতিও দিয়েছিলেন। সেটা মোটেই অসম্ভব ছিল না। সেবছর বিপুল ভোটে এসএনপি স্কটিশ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও তাদের উপস্থিতি বেড়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ইস্টার্ন প্যাভিলিয়নে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন ফখরুল ইসলাম। নির্ধারিত দিনটি ছিলো আগামীকাল, কিন্তু আমরা চলে যাবো বলে তিনি তা একদিন এগিয়ে এনেছিলেন। রাতে এই অসামান্য উষ্ণহৃদয়ের মানুষটি ও আবু মেরন প্রমুখ এডিনবরার আরও কিছু মানুষের আন্তরিক সাহচর্যে আমাদের বিদায়আসন্ন সময়টি মধুর কাটে। তাদের ইচ্ছে আমরা যেন যাত্রা বাতিল করে থেকে যাই, যেভাবে থেকে গেছেন তাদেরই কেউ কেউ। সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এদেশে আসার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, একবার তীরে এসে তরী ভেড়াতে পারলেই হয়। আর আমরা ডাঙ্গায় উঠেও ফিরে যাচ্ছি! কেউ কেউ হয়তো আমাদের অদূরদর্শী ভাবেন, তবে বুঝি স্বদেশী হিসেবে তারা ভালোবাসেন আমাদের। একটি ভীষণ জনবহুল দেশ থেকে এসে জনবিরল দেশে তারা সঙ্গকাতর।
তুমুল আড্ডা হয় আমাদের, আড্ডার প্রধান কথক ফখরুল ইসলাম। রসিক ও প্রাণবান মানুষটির জীবনঝুলি অভিজ্ঞতার সোনাদানায় পরিপূর্ণ! ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বললেন গ্রেট ব্রিটেন মূলত জেলেদের দেশ। চারপাশের সমুদ্রে মাছ ধরেই এদের পূর্বপুরুষেরা কালাতিপাত করতো। ইউরোপে তার দেখা হয়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সরাসরি অংশ নেয়া এক সৈনিকের সাথে, যে তখন বৃদ্ধ। তারও একই দৃষ্টিভঙ্গি, সেও বলেছিল ’ফিশারম্যান কান্ট্রি’। কথাটি একাধিকবার তিনি শুনেছেন একাধিক মানুষের মুখ থেকে। এই জেলেরা নৌকা বানাতে বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলো, যা তাদের সাহস জোগায় মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে। ভাগ্যান্বেষণে তারা বেরিয়ে পড়েছিল গ্রহটির চতুর্দিক যার ফলে গোটা দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ডকে উপনিবেশ বানাতে সমর্থ হয় ইংরেজরা। উন্নত সমরাস্ত্রের আবিস্কার, বিশেষ করে কামান ও বারুদ ব্যবহারে নির্দয় সফলতা, কূটনীতি আর কূটবুদ্ধি সহায়ক হয়েছিলো সাম্রাজ্য বিস্তারে। তবে তারা যে সাহসী ও বুদ্ধিমান জাতি সেকথাও অনস্বীকার্য!
ব্রিটেনে যারা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এসেছিলেন তাদের কেউ কেউ রেস্তোরাঁ ব্যবসা করে বিপুল ধনী হয়েছেন। এমনি এক জনৈক চৌধুরীর কথা কী এক প্রসঙ্গে উঠে আসে। টল ক্রস নামক জায়গায় ভদ্রলোকের ৪২টি ফ্লাট আছে, যা থেকে মাসিক ভাড়াই পান ৫৬ হাজার পাউন্ড। ধনী হলেও পর্যাপ্ত উদার নন মানুষটি। একটি মসজিদের জন্য ১০০০ পাউন্ড অনুদান দিবেন বলেছিলেন, কিন্তু যখনি টাকা সংগ্রহে কেউ গিয়েছে, তিনি নানা টালবাহানায় এড়িয়ে গেছেন। শেষাবধি টাকাটা আর দেননি এই অজুহাতে যে মসজিদ ফান্ডের টাকা ব্যাংকে রাখা হয়েছে, যা ব্যাংক থেকে সুদ উপার্জন করেছে। তিনি জেনেশুনে সেই ফান্ডে টাকা দিতে পারেন না, কেননা ইসলামে সুদ হারাম। অথচ তিনি নিজেও ব্যাংক থেকে সুদ নিচ্ছেন। ধর্মকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন!
ফখরুল ইসলাম নিজে যেমন প্রেমিক পুরুষ, তেমনি প্রেমে সাহায্য করেছেন অনেককে। এক বাঙালি যুবার কথা জানালেন যে বাংলাদেশের একটি খ্যাতিমান পরিবারের সন্তান। এদেশে পড়াশোনা করতে এসে এখানকার এক ডাকসাইটে সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় সে, পড়াশোনা লাটে ওঠে। সে মেয়েকে আবার ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন ফখরুল ভাই। তার ধারণা ছিলো মেয়েটি পটবে না। তার ভুল ভাঙলো যখন যুবা সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে তার রেস্তোরাঁয় খেতে এসেছিল, ফখরুল ভাইকে মেয়েটি জানালো সে যুবকের সাথে বাংলাদেশে চলে যেতে দু’ডানা মেলে (হবে দু’পায়ে) তৈরি। ডানা তার মেলাই ছিলো, উড়েও গেলো। খ্রিস্টান মেয়েকে পুত্রবধূ করে ঘরে তুলতে অনীহ হলেও মেয়েটির দ্যুতিময় রূপ আর নিজ পুত্রের বিবাহ উন্মাদনা দেখে যুবকের পিতা-মাতা রাজি হয়ে যান। বিয়ে হয় তাদের। বেকার যুবককে সেসময়ে নিজ রেস্তোরাঁয় কাজ দিয়ে, বাংলাদেশ যাবার সময়ে প্লেনের টিকেট কাটার টাকা দিয়ে তিনি সাহায্য করেছেন বড় ভাইয়ের মতোই। ফলাফল? এখন যুবক কোনো যোগাযোগ রাখে না, ধার করা টাকাও ফেরৎ দেয়ার তাগিদ অনুভব করে না। তবু ভালো, অকৃতজ্ঞ হলেও ভালো বংশের ছেলেটি কৃতঘ্ন হয়নি। দম্পতি হিসেবে তারা বেশ সুখে আছে। এদেশের মেয়েদের সাথে সম্পর্ক হলেও প্রেম পরিণয়ে গড়ায় খুব কম। এদের সম্পর্কটি ব্যতিক্রম! প্রেমে মত্ত যুবার পড়াশোনার ইতি ঘটে গিয়েছিলো প্রেম পর্বেই। স্কটিশ মেয়েটি বেশ ধনাঢ্য ঘরের, সুতরাং তাদের আটকায়নি। আর এদেশে একটি স্বচ্ছল জীবন যাপন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। এমনি অনেক অর্থশূন্য বা প্রেমে বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করেছেন ফখরুল ইসলাম, এডিনবরায় যিনি প্রবল জনপ্রিয়, সবার পছন্দের।
ব্রিটেনে বর্ণবিদ্বেষী দল আছে, এরা কখনো এশিয়ার বাদামী বা আফ্রিকার কালো মানুষদের একা পেলে মারধোর করে। চুল ছোট করে ছাটা বা কখনো ন্যাড়া মাথার এই নব্য ফ্যাসিস্টদের বলা হয় স্কিনহেড। একবার ফখরুল ইসলাম তার এক ইংরেজ প্রেমিকার সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময়ে ট্রেনে স্কিনহেডদের কবলে পড়েছিলেন। তারা যখন তাকে মারধোর করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন তিনি চালাকি করে তার ইংরেজ গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করে ঘটনাটি বলেন। সে মেয়ে টেলিফোনে স্কিনহেড চার যুবাকে এমন শাসানি দেয় যে তারা তাদের পরিকল্পনা ত্যাগ করে পরের স্টেশনে নেমে যায়। প্রেম বাঁচিয়ে দেয় আজীবন প্রেমিক পুরুষ ফখরুল ইসলামকে।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আলোচনা, কবিতাপাঠ ও স্বাধীনতার গান গীত হয়। সঞ্চালক আবু মেরন, মধ্যমণি ফখরুল ইসলাম। গিটার বাজিয়ে গান গাইলেন ঝাঁকড়া চুলের জন্য তাকে লাগে মাইকেল জ্যাকসেনের মতো। বস্তুত তাকে এখানকার বাঙালিরা জনি জ্যাকসন নামেই ডাকে। ইস্টার্ন প্যাভিলিয়নে আমি যেটা দেখেছি তা হলো স্কটিশদের সাথে বাংলাদেশিদের প্রাণের মিল, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এ মেলবন্ধনের অনেকখানি কুতিত্ব ফখরুল ইসলামের। সেখানে অনেকবারই ভুরিভোজন হয়েছে আমাদের, আজও হলো। আমরা মানে আমি, আবু সাদাত আসিফ ও বাসেত অলি মিসকাত, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির যে তিন সহকর্মী একসঙ্গে একগৃহে থাকতাম। অনেক রাতে ফখরুল ইসলাম তার বিশাল ভক্সওয়াগন গাড়িতে চড়িয়ে আমাদের তিনজনকে ক্রেইগএনটিনি রোডে নামিয়ে দিয়েছিল। কথা হয় কাল ভোরে এই বিরাট গাড়িতেই তিনি আমাদের এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিবেন।
টার্কিস এয়ারওয়েজের বিমান ছাড়বে দুপুর দুটায়, নিয়মমাফিক তিন ঘণ্টা আগে পৌঁছানোর কথা বিমানবন্দরে। ফখরুল ইসলাম যথাসময়েই তার বৃহদকায় মিতসুবিশি সোগান জীপ গাড়িটি নিয়ে চলে এসেছিলেন। আসিফ, মিসকাত ও আমি আমাদের বাক্সপেটরা গাড়িটির পেছনে তুলে দেই। এই আড়াই মাস যিনি আমাদের তার গৃহে থাকার জায়গা দিয়েছেন, সেই হুমায়ুন কবির ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চড়ি। পথে যেতে যেতে ফখরুল ভাই বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করে চলেন, চোখ তার সড়কে, মন তার গল্পের বিবিধ উপত্যকায়। বিমানবন্দরে নেমে তিনটি ট্রলিতে আমাদের স্ব স্ব লাগেজ তুলে দিয়ে আমরা ফখরুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেই। এই বৃহৎপ্রাণ মানুষটির কাছে আমাদের, বিশেষ করে আমার, কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। তিনি তার অকৃত্রিম কবিবন্ধুর জন্য দুবোতল ভোদকা দিতে চেয়েছিলেন, লাগেজ ভারি হয়ে যাবে বলে আমি একটি বোতল নেই। আমার উচিত ছিল সেটি সুটকেসের ভেতর রাখা। কাচের বোতল ভেঙ্গে জামাকাপড় নষ্ট হবে ভেবে আমি তা নেই হ্যান্ডলাগেজে। ভুল ঠিল সেটা। সিকিউরিটি সেটি নিতে দেয়নি। ফলে সেই বোতলটি বিমানবন্দরে রেখে আসতে হয়েছিল। এ বিষয়টি ক্ষুব্ধ করেছিল বাংলাদেশের সেই কবি বন্ধৃুকে । সে অন্য এক গল্প। আপাতত এ গল্প শেষ হোক এডিনবরায় বাঙালি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যমণি ফখরুল ইসলামের বিপুল বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে।