ফিকশন যেহেতু পুরোপুরি রিপোর্টিং নয়

প্রকাশিত: ১:১২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০১৭

ফিকশন যেহেতু পুরোপুরি রিপোর্টিং নয়

অদিতি ফাল্গুনী

গত শুক্রবার দৈনিক ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য সাময়িকী পাতায় আমার গল্প ‘পদার্থবিদের হাতে থ্রি নট থ্রি’ পড়ার পর অধ্যাপক অজয় রায় মুঠোফোনে আমাকে এই শুভেচ্ছা বাণী জানান। আমার এই গল্পের পদার্থবিদ ত’ অজয় স্যার নিজেই। স্যারের বাসায় এক শুক্রবার সকালে গিয়ে বিশদ ভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ, প্রথম সন্তান ও নামী মুক্তচিন্তক অভিজিতের জন্ম- সব গল্পই ত’ শুনেছি। স্যারকে বলেওছি এটি আমার একটি উপন্যাসের অংশ হিসেবে তাঁর ইন্টারভিউ নিচ্ছি। তবে, ফিকশন যেহেতু পুরোপুরি রিপোর্টিং নয়, নাম-ধাম কিছু বদলে দেব। হ্যাঁ, সব চরিত্র কাল্পনিকই হবে। কেমন কাল্পনিক জানেন? ঐ যেমন ‘আন্না কারেনিনা’য় প্রিন্স অবলোনস্কির চরিত্র পড়ে তলস্তয়ের এক বন্ধু যেমন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘একটা জিনিষ ভুল লিখেছ। চায়ের কাপ আমি ডান হাতে নয়- বাম হাতে ধরি।’ লেখকেরা অবশ্যই বাস্তব জীবন, সমাজ-রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার ভিত্তিতেই লেখেন, তবে অবশ্যই ফিকশনে খানিকটা বদলেও দেন। ধরেন আপনার ফুটবলার বন্ধুকে আপনি গল্পে হকি খেলোয়াড় বানাতেই পারেন।
২০১৫-এর ‘ইত্তেফাক’ ঈদ সংখ্যায় বাংলাদেশে ক্রমাগত মুক্ত চিন্তক হত্যা নিয়ে লেখা আমার উপন্যাসিকা ‘ক্রমাগত হত্যার সেরেনাদে’ প্রকাশিত হবার পর ইচ্ছা ছিল ২০১৬-এর মেলাতেই বইটা করব। তবে, উপন্যাসটি লেখার পরপরই আমাদের প্রকাশক বন্ধু দীপন সহ অনেকের আরো আরো মৃত্যুর প্রেক্ষিতে অনেকেই আমাকে মানা করেন এটি প্রকাশ করতে। গত বছর ঘটলো ‘হলি আর্টিজান’ সহ আরো কিছু হত্যাকান্ড। বন্ধুরা পুনরায় সতর্ক করল বইটি প্রকাশ না করতে। এবছর অন্য একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় আমার খুব শ্রদ্ধেয় আর এক লেখক একই বিষয়ে উপন্যাস লিখেছেন। তিনি অবশ্য নাম-চরিত্র হুবহু এক রেখেছেন। এক বিষয়ে দু’জন লিখতে পারবেন না বা পরে শুরু করেও কেউ আগে শেষ করতে পারবেন না এমন নয়। আর আমি সময় নিয়ে লিখতে ভালবাসি। গ্র্যান্ড রাশান নভেল পড়ে বড় হয়েছি বলে সেই ১৯-২০ বছর বয়স থেকে পত্রিকার পাতায় গল্প প্রকাশ শুরু করেও আর ২৫-এ প্রথম গল্পের বইয়ের পরও এত বছরেও ‘উপন্যাস’ প্রকাশ করার সাহস করিনি। এছাড়া চাকরির চাপ, ঢাকার যানজটের সাথে যুদ্ধ। তবু, একই বিষয়ে আমার পরে কোন লেখক উদ্যোগ নিয়ে আমার আগে শেষ করবেন এটা ভেবে ভাবলাম এবারই শেষ করি। চাপাতি গলায় বসলে কি আর করা? ইতোমধ্যে ফেসবুক-ফোনে হুমকি পেয়েছি, আমাদের পারিবারিক গাড়ি ফলো করা হয়েছে। গতবছর একবার বিদেশে যাবার কথা ভাবছিলামও। তবে, তখন মাত্রই ‘বাংলা একাডেমি’তে যোগ দেয়ায় শেষমেশ নিয়োগকর্তার প্রতি শ্রদ্ধাবশত: হুট করে কাজ ছেড়ে বিদেশ আর যাইনি।
হ্যাঁ, আমি এনজিওর পেইড আর ভাড়াখাটা লেখক বলেই এবং কখনো আওয়ামি লীগের চরমপন্থীরা আমাকে জামাতের টাকা খাওয়া, বামরা আমাকে আওয়ামি লীগের টাকা খাওয়া ইত্যাদি নানা অভিধায় ভূষিত করলেও সত্যি বলতে ২০১৫-তে শেষ প্রাইভেট জব একটি সার্জারির কারণে ছেড়ে দেবার পর, বাসার অনুরোধে খানিকটা সরকারী চাকরির ধাঁচের একাডেমির কাজ নেবার পর (এতে সার্জারি উত্তর আমার স্বাস্থ্যের উপর ধকল কম পড়বে বলে বাসার সদস্যরা বিবেচনা করছিলেন) এবং মোটা বেতনের প্রাইভেট জবে থাকার সময়ে কেনা দামি স্মার্ট ফোন হারানোর পর গত দুই বছরে এই দু’হাজার টাকার মোবাইল সেট বদলাতে পারিনি। আমি স্ক্রিন শট নিতে পারিনা। আমার ছোট ভাগ্নি স্ক্রিন শট নিতে নিতে লজ্জা পাচ্ছিল। এত ‘পুওর’ মোবাইলের ছবি ফেসবুকে সবাই দেখবে? যে গল্প পড়ে অজয় স্যার আমাকে আশীর্ব্বাদ করেছেন, সেই গল্প পড়েই গুটিকয়েক ব্লগারের আমাকে রাস্তার কুকুরের চেয়েও অধম মনে হয়েছে এবং সেটা তারা একটি প্রবন্ধ আকারে লিখে তাতে অনেক বাজে মন্তব্য করেছেন এবং আমাকে ফেসবুকে সেগুলো গায়ে পড়ে এসে জানিয়েছেন- এসবের প্রেক্ষিতে আমার ভাগ্নিই বলল এই স্ক্রিনশটটি দিতে। নয়তো এই আশীর্ব্বাদকে খুব ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে নিভৃতেই রেখে দিতাম।

ছড়িয়ে দিন