ফিরে আসে

প্রকাশিত: ১১:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০১৮

ফিরে আসে

লুনা হাসান

( সেলিম মামা তুমি ভালো থাকো।)

ফিরে আসা শব্দটি আমার কাছে খুব আবেগময়… নাড়া দেবার মত শব্দ। কিছু ফিরে আসা হাসায়… কিছু ফিরে আসা এক ঝটকায় বহু দূরে নিয়া যায়। হৃদস্পন্দন অন্য ভাবে সাড়া দেয়। কিছু ফিরে আসা বুক চেপে ধরে… নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় । কে যেন গলা চেপে ধরে।

কিছু ফিরে আসা শেখায়… সে নিজেকে হোক বা অন্য জনকে । বহু বহু বছর পর একই ভাবে ফিরে আসে।

আজ তেমনই একটা সত্য গল্প শোনাব….

আমার কিশোরী বেলা….

আমি তখন সেভেন বা এইটে পড়ি। আগেই বলি আমার ছিল এক দুরন্তপনা শৈশব ও রঙঢঙ ভরা কিশোরী সকাল সাঁজ। ছিল না কোন ধরা বাঁধা নিয়ম। অবশ্য নিয়মের বাইরে আমি যেতাম না। তাই বোধ হয় ।
আমার গণ্ডিতেই সব দুষ্টামি করতাম।

তো আসি….

একদিন পানিতাল মানে তালশাঁস খাব দুপুর বেলা। আমার ছোট মামা আর আমি গেলাম তালশাঁস খেতে। কেউ পেড়ে দিবে আর আমরা খাব। দাও / বটি নিয়ে রওয়ানা। লোকজন হাজির। তো আমার মত বদ বুদ্ধিওয়ালা মেয়ে সাথে থাকলে তো সেই কাজ সহজে হবে না। মেজাজ সাত আসমানে তুলে… মামা এই সব খামু না।
ভাল্লাগে না। আরো কত কি?? মানে মামাকে তো নরম করতে হবে।
আমার অবচেতন মন বলে দিছিল…
লুনা রে সাবধান….. হাসিস না… কেউ একজন তাড়া দিছিল ভিতর হতে।
মামা…. কেউ কিছু বলছে তোরে??
কষ্ট পাইছ?? শরীর খারাপ লাগে?? কত প্রশ্ন। আমি তো গাল ফুলায়ে আরেক দিক। মামার দিক তাকালেই হাসি আসবে।

অনেক সময় পর জানালাম… তালগাছের মাথায় উঠে খাব। নিচে বসে খাব না।
মামা এবার চিন্তিত। বললেন.. রাখ দেখি…
অতঃপর বাঁশ… দড়ি এলো। গাছে বাঁধা হল। মোটা কাপড় এলো… যাতে গাছের মাথায় আমি আরাম করে বসতে পারি। আমি বাঁশ বেয়ে বেয়ে গাছে উঠলাম। তাল খেলাম। এবার আর এক বদমাইশি বুদ্ধি। তালশাঁস খেয়ে এর খোসা কারো গায়ে মারব… আর হি হি হি করে হাসব। মানে শয়তানে মারছে। যে নিচ দিয়া যায়… তাকেই মারতে চাই। মামা হাত ধরে রাখেন।

এর পর আমাকে বলল…. আচ্ছা মার যা মনে কয়। তবে এই খানে কিন্তু লোকে তোকে কিছু বলবে না। বলবে আমাকে… যে আমি তোকে শিখাইনি। এখন তোর যা ভাল্লাগে কর। মার… মার যত খুশী।
তাতে আমার কি লোকে তোর মামারে যা খুশী তাই বলবে। মামা তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। প্রাণী বিদ্যা তার বিষয় ছিল। কোন দিন তাকে শব্দ করে পড়তে দেখি নাই। জীবনে প্রথম তার কাছে সিট দেখি। আমার খুব অবাক লাগত ইহা কেমনতর বই??

সেদিন আমি আর মারতে পারি নি। জীবনের তরে সেই বদশয়তান বিদায় হইছিল। এমন কি আমার জীবনে প্রচন্ড রকম ঝড়ের সময় ও এই কথাটা আমায় তাড়া করে। বিনা কারনে শ্রেফ বিনা কারনে অপমানিত হই। তাও পারি না কিছু বলতে। বিবেক সামনে আসে… বলে কি কর?? কি কর??
এইতো তুমি শেখ নাই। যার যা রুচি সে তাই বলবে। তুমি কোথায় নামছ??

যে ভাবে ফিরে এল….

আমার ছেলে এখন নাইনে পড়ে। সে যখন ফাইভে পড়ে তখন একদিন ছাদে গেছি। ভাড়া বাড়ির ছাদ ছিল তখন খুব ঠেকায় না পরলে যেতাম না। তালা দেয়া থাকত। চাবি এনে খুলে… মহা ঝামেলা।অনেক নিয়ম কানুন পেন্ডুলামের মত ঝোলে চোখের সামনে। তো সেই খানে কিছু ইট ভাংগা ( খোয়া) ছিল। আমার ছেলে বলে কথা…. তবে মায়ের মত এত খারাপ না। সে তার বাবার মত ভদ্র…. শান্ত….. সামাজিক।
সে এক টুকরা ইট হাতে নিয়া তাকাচ্ছে যে দিকে মানুষ নাই সেই দিকে মারবে। কারো মাথায় মারা তার মাথায় ঘুরে নাই। বারবার আমার কাছে জানতে চায়… দেখে শুনে মারবে কিনা??

আমার মাথায় খেলে গেল সেই সময়। আমি যেন সেই কিশোরী…. একরাশ সোনালী চুল খোলা। সাই সাই করে বইছে বাতাস। মুখে কথার খই ফুটছে।
আমি চট করে বলে দিলাম.. আমার মামার সেই কথা গুলি। ছেলে আমার মুখের দিক তাকায়ে ছিল অনেকক্ষন। বললাম… আমার সে দিনের কথা। ও তাকায়ে থেকে ইটের টুকরা ফেলে দিয়ে বলছিল…
মা আমার মনে থাকবে। তারপর থেকে ও যাই করে/ করতে চায় আগেই জানতে চায়…মা এই কাজে কোন অন্যায় নাইতো??

প্রথম বুঝলাম মরণ কি??

আমার সেই মামা তার এই দুনিয়ার সব পাট চুকায়ে দিয়ে ৯০ সালের ১৮ অক্টোবর পাড়ি দিয়েছেন ওই পাড়ে। তখন তার বয়স ৩৩ বছর। আমার দেখা সেরা মানুষ… যে আমায় শিখিয়েছেন হাতে ধরে। আর একদিন লিখব আমার মামাদের নিয়ে।

দোয়া করবেন আমার সন্তানদের জন্য।
ওদের কথায় যেন কারো কলিজায় দাগ না কাটে। কারো চোখের পানি যেন না পরে।
আমি খুব সম্মান করি এই অমূল্য পানিকে।
বিপদের সময় কেউ যেন ওদের কাছে কষ্ট না লুকায়। ওরা হয়ে উঠুক আস্থার প্রতীক।

ভালো থেকো স্বপ্নীল…. সালমান ও তাদের বাবা।