ছবির সাথে বাস

প্রকাশিত: ১:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২১

ছবির সাথে বাস

আগের পর্ব- ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ : পর্ব পাঁচ

এতক্ষণ যার জীবনের গল্প আমরা শুনলাম সে পৃথিবী বিখ্যাত এক শিল্পী চিত্রকর। তার জীবনের গল্পটাও নানা উত্থান পতনে, বৈচিত্রময়। তার ছবির মতনই বিখ্যাত।

দূর্ঘটনায় চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেলে, সময় কাটানোর জন্য রঙ, তুলি হাতে নিয়ে ছবি এঁকে যাচ্ছিল ফ্রিদা বিছানায় থেকে। তাও অদ্ভুত এক উপায়ে নিজেকে আয়নায় দেখে, নিজেকে আঁকছিল ।
নিজের জীবন নিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে নিজের দুঃখ এবং ভরাক্রান্ত জীবনের ছবি এঁকে কষ্ট ভুলে থাকার প্রচেষ্টার সাথে কিছু নিয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা ছিল ফ্রিদার। কিন্তু নিজের অজান্তে ফ্রিদা হয়ে উঠেছে পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী। স্বপ্রতিকৃতি আঁকা ছবি হয়েছে পৃথিবীর মানুষের কাছে প্রিয়, সাথে ফ্রিদার জীবনও হয়েছে বিখ্যাত।
নতুন এক ধারায় নিজেকে উপস্থাপন করা এক শিল্পী। অথচ নিজের প্রতিকৃতি এত বেশী বৈচিত্রময় এতবেশি ব্যাঙ্গময় হয়ে উঠে যে আজ পর্যন্ত মানুষের আগ্রহ ফ্রিদার ছবির প্রতি তার জীবন ধারনের প্রতি। স্বপ্রতিকৃতি কিন্তু ভিন্নমাত্রার প্রকাশ যা বিশিষ্টজনরা সুরিয়লিজমের সাথে তুলনা করেন। ফ্রিদা নিজেকে বিশ্লেষণ করে আমি আমার কথা বলি। আমার শৈশব, আমার, বেড়ে উঠা, আমার জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা কষ্ট এবং ব্যাথা সুখ এবং ভালোবাসার গল্পগুলো আমি ছবিতে আঁকি। আমি আমাকে আঁকি। আমার ছবি আমার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে আমার ক্যানভাসে।
নিজের জন্য ছবিগুলো আঁকে ফ্রিদা ছোট ক্যানভাসে নিজের মতন। এক ফুট বাই এক ফুটের ক্যানভাসে, একান্ত আপন বৈশিষ্ট্যে।
বিখ্যাত স্বামীর কোন ধারা গ্রহণ করতে রাজি না ফ্রিদা। দিয়াগোর ছবি যখন সবার মাঝে। দেশের নামী চিত্রশিল্পী দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে তার যুবক সময়ে সে অনেক পরিচিত হয়ে উঠেছে। তার ছবির অনুকরণের জন্য ফ্রিদার কোন আগ্রহ নেই। ফ্রিদার ছবিগুলো একান্ত নিজের জন্য। নিজের গল্প নিয়ে থাকে। ফ্রিদা নিজের ভাষ্যে বলে, আমার আর তেমন কিছু করার নাই তাই ছবি আঁকি। সময় কাটানোর জন্য। আর অন্য কিছু করার মতন অবস্থাও আমার নেই।
১৯০৭ সালে জন্ম নেয়া ফ্রিদা মেক্সিকান কিংবদন্তী চিত্রশিল্পীর মর্যাদা অর্জন করে, জীবিত কালেই প্রচার প্রসার গুরুত্ব পায় তার চিত্র শিল্প এবং কর্ম। শুধু ম্যাক্সিকোতে সীমাবদ্ধ থাকেনি ফ্রিদার পরিচয়। আর্ন্তজাতিক ভাবে তার নাম ছড়িয়ে পরে। শুরু থেকেই তার প্রর্দশণীতে ছবি বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়। মানুষ আগ্রহ ভরে কিনে নেয়।
অসুস্থতার সাথে পাল্লা দেয়া এক নারী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার কর্ম দিয়ে।
দুর্ঘটনায় ফ্রিদার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটলেও ভাগ্য যেন ফ্রিদাকে নিজের পথে হাত ধরে টেনে আনে।
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ছবি আঁকাতে শুরু করিয়ে দেয়।
বাকি জীবনের জন্য তার ব্যথা ও অসুস্থতা, আনন্দ ভালোলাগা নিজস্ব বিষয়গুলো তার কাজের মাধ্যম হয়ে উঠে। সৃষ্টি করে; নতুন কাঠামোয় নতুন কিছু আপনমনের প্রভাবে ভাবনায়।
যেমনটা নিজের চোখ দিয়ে দেখেছে সাথে উপলব্ধি করেছে প্রচণ্ড কষ্ট। শরীরিক এবং মানসিক দুই রকমের কষ্টই মিলে মিশে গেছে ফ্রিদার আঁকায়। আবার আনন্দ ভালোলাগা উজ্জল রঙের ব্যবহার সে যে আনন্দময়, উজ্ঝলতায় সৌন্দর্যে থাকতে চেয়েছে তাও প্রকাশ পায় তার ছবিতে।
ফ্রিদার ছবির অধিকাংশই নিজের স্বপ্রতিকৃতি, এছাড়া পরিপার্শ্বে প্রিয়জন পিতা মাতা,বোন এবং স্কুল বন্ধু পরিচিত চেনা মানুষেরদের প্রতিকৃতি ছিল। দিয়াগো, প্রেমিক, ভালোবাসা, স্বামী, দুঃখ কষ্ট এক সাথে থাকা , দূরে থাকার যন্ত্রনা গুলো নানা ভাবে ফুটে উঠেছে তার ছবিতে। ফ্রিদা নিজের বন্ধু, পরিচিত, পরিবার এবং চারপাশের প্রতিকৃতির সাথে নিজের ভাবনার বিন্যাসে ছবি তৈরি করেছে।
ফ্রিদা কাহলোর চিত্রকর্মগুলি নানান বৈশিষ্ঠ নিয়ে প্রতিটি ভিন্ন রূপে ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন গল্প বলে। তবু অনেকে কিছু ছবি বেশি বিখ্যাত মনে করেন। তারমধ্যে বিয়ের পর আঁকা ‘ফ্রিদা এবং দিয়েগো রিভেরা’ ১৯৩১
আমার জন্ম ১৯৩২
হেনরি ফোর্ড হাসপাতাল১৯৩২
মাই ড্রেস হ্যাংগিং ১৯৩২
এ ফিউ স্মল নিপস ১৯৩৫
মাই নার্স এণ্ড আই ১৯৩৭
মেক্সিকোর চারজন বাসিন্দা ১৯৩৮
বন্ধু দোরোথী হালের আত্মহত্যা নিয়ে সুইসাইড ১৯৩৮
.দ্য ব্রোকন কলাম ১৯৪৪
এ ছবিগুলো অনেকেই বেশি পছন্দ করেন। এছাড়াও হ’ল কাঁটা নেকলেস এবং হামিংবার্ডের সাথে তাঁর স্ব-প্রতিকৃতি বিখ্যাত শিল্পকর্ম।
তার কাজ তার বেদনা এবং আবেগ এবং এর তীব্র, প্রাণবন্ত রঙের জন্য স্বকীয়তা পেয়েছে।
১৯৩৪ সালে আমেরিকা থেকে মেক্সিকো সিটিতে ফিরে আসার পরে, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোনও নতুন ছবি আঁকতে পারেনি এবং পরের বছরে মাত্র দুটি ছবি এঁকে ছিল।
হেনরি ফোর্ড হাসপাতালে যখন গর্ভপাত হয়েছিল তখন ফ্রিদা তার অনুভূতির প্রতিফলন। তার চারপাশে ছয়টি জিনিস উড়ছে। একটি ভ্রূণ যা তার ও ডিয়েগোর ভ্রূণ, যা চিকিৎসার উদাহরণের ভিত্তিতে তৈরি। একটি অর্কিড যা জরায়ুর মতো দেখাচ্ছে। পেটটি লাল ফিতা দিয়ে সংযোগ করা এবং এগুলি দেখতে নাড়ির মতো লাগে। শামুকটি অপারেশনের মন্থরতার প্রতীক। এই ছবিটি এবং আরো বেশ কিছু ছবি মাস্টার পিস দেখেছিলাম যখন ফ্রিদার ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল এখানে।
এই চিত্রকলাটি বাস্তবতা এবং কল্পনার মিশ্রিণ দারুণ ভাবে করেছে, সুরিয়লিজম না জেনেই।
তার কাজ পরাবাস্তবাদে অর্ন্তগত করা হয়। পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের প্রধান আদ্রে ব্রেটন ১৯৩৮ সনে, ফ্রিদার এই কাজকে, ”রিবন এরাউন্ড এ বোম্ব” আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ফ্রিদা তার কর্মকে পরাবাস্তবের চেয়ে বাস্তব বেশী মনে করেন এবং ব্রেটনের দেয়া পরাবাস্তবাদী আখ্যাকে অস্বীকার করেন। তার প্রধান আকর্ষণ। রিয়েলিটি আঁকা কল্পনা প্রসুত কিছু নয় নিজের জীবনকে ছবির মাধ্যমে ধরে রাখা প্রকাশ করার চেষ্ট চলেছে অনুক্ষণ। পরাবস্তাব এবং কল্পনায় চিহ্নিত করাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ফ্রিদা নিজ কর্ম সম্পর্কে বলে, কল্পনা নয়, স্বপ্ন তো নয়ই। আমি আমার জীবনের কঠিন বাস্তবতা কষ্টের তীব্র যন্ত্রনা গুলোকে আঁকি। নিজের মতন করে আঁকা সুরিয়ালিজম নয় যা ভাবনার ভিতরে ভাবনার সাথে প্রথিত থাকে। অন্য ভুবনের সাথে যোগসাজস করার কোন চেষ্টা আমার ছিল না। আমি শুধু আমার কথা বলি।
যে সময়টা সে অসাধারন কিছু কাজ করতে পারত সে সময়টা নিজের শারীরিক ধকলের উপর মানসিক কষ্টের যন্ত্রনা সহ্য করতে নানা ভাবে নিজেকে প্রলোভনে ভুলিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করে গেছে। ফ্রিদা নামের বারবার দুঃখ পাওয়া মেয়েটি।
একদিকে তার জীবন দেখলে যেমন ঐশ্বর্যপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু সে ঐশ্বর্য পেতে তাকে কাটাতে হয়েছে প্রচণ্ড কষ্ট ও হতাসার মাঝে। আবার দারুণ শক্তিতে সকল অক্ষমতাকে জয় করে নেয়া নেশার নামই ফ্রিদা ।
ফ্রিদা কখনো শিখে নাই পরাবাস্তব শিল্প কর্ম। আপন কষ্ট এঁকেছে ভিন্ন ভঙ্গিতে যা বাস্তব নিজের জীবন। বন্ধুর আত্মহত্যার চিত্র অবিকল উঁচু দালান থেকে পরে যাওয়া সেই মেয়েটি শূন্যে পরন্ত মেঘের রাজ্যে ভাসা বন্ধুটিকে ধারন করে ক্যানভাসে বাস্তব সম্মত করে। আবার রক্তাক্ত ভূমির উপর নিথর দেহ যেন এই মাত্র পরল।
প্রাণীদের সাথে ভাব তাদের আচরণ খুঁজে পায় চেনা চরিত্রে। আর কষ্ট বাচ্চা অ্যাবরশন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা। মা হতে না পারার রক্তাক্ত বেদনা। ভিন্ন ভাবনার নিজের অবয়ব। আর সুখ ভালোবাসা স্বামী। প্রেমিকের জন্য নিবেদন।
শরীর যা সারা জীবন তার দূরন্ত ছুটে চলাকে শিকল দিয়ে রেখেছে, ক্লান্ত করেছে। যন্ত্রনা ব্যাথায় কাতর মেরুদণ্ড,পিঠ, রক্তাক্ত যৌনাঙ্গ থেকে বেরিয়ে পারা শিশু কষ্টের পাজর চেপে ধরা কার্স। জীবনের অধিক সময় যার সাপোর্টে সোজা করে রাখার চেষ্টা করেছে শরীর তাই চিত্রায়িত করেছে আপন মনে।
ফ্রিদার চিত্রকর্মে ব্যথা এবং যন্ত্রণা একটি স্থির বিষয়। দ্য ব্রোকন কলাম, এই চিত্রকলায় ফ্রিদা তার স্পর্শকাতর উত্তরগুলি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়াবহ উপায়ে প্রকাশ করেছে। তার মুখ এবং পুরো শরীরে আটকে রয়েছে পেরেক। তার দেহের মধ্যে একটি বিভক্তি যা ভূমিকম্পের বিপর্যয়ের মতো দেখায়। পটভূমিতে অন্ধকার নালা দিয়ে পৃথিবী। শুরুতে নিজেকে নগ্ন রঙে এঁকে তবে পরে তার নীচের অংশটি হাসপাতালের শীটের মতো দেখতে কিছুটা ঢেকে রাখে। তার মেরুদণ্ডের জায়গায় একটি ভাঙ্গা কার্স আঁকা। শক্ত আভরণের এই কার্স শরীরটাকে সোজা রেখে চলতে সাহায্য করত। এই শক্ত বন্ধনীর ক্রমাগত চাপে শরীরে নানারকম ক্ষত দেখা দিত। তাই আরমদায়ক কাপড়ের, ফোমের বিভিন্ন রকম কার্স সংগ্রহ করত। ধ্বংসস্তূপে ডুবে যাওয়ার পথে রয়েছে বলে মনে হয়। কোমর থেকে চিবুক পর্যন্ত আটকানো কার্সটি, এবং ফ্রিডার স্তন এবং দেহের সৌন্দর্যের কারণে যৌনতাও স্পষ্ট মনে হতে পারে অনেকের কাছে এই ছবি দেখে। কিন্তু যা প্রকৃতি, স্বাভাবিক একটি শরীর। যে শরীর সে বয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাথাগুলো সামাল দেয়ার জন্য একটা বন্ধনী পরে। তার সেই যন্ত্রনাগুলোই সে এঁকেছে সমস্ত হৃদয় দিয়ে।
মাই নার্স এণ্ড আই এই চিত্রকর্মটিতে দেখানো হয়েছে যে ফ্রিদা তার আদিবাসী নার্সের কোলে। নিজের মা তাকে দুধ পান করতে পারে নি। একজন সেবিকা রাখা হয় ফ্রিদাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য। ফ্রিদা এবং নার্সের মধ্যে সম্পর্কে, কোন আবেগ ছিল না অন্তত ফ্রিদা অনুভব করে নাই। তারই প্রতিফলন মাই নার্স এণ্ড আই ছবিটি। অর্থের বিনিময়ে শিশুকে দুধ পান করানো শীতল এবং দূরবর্তী একটি সম্পর্ক স্পষ্ট করে আঁকা হয়। কোনও আদর বা আলিঙ্গন নেই। নার্স মনে হয় কেবল স্তন্যদানের একটি ব্যবহারিক প্রক্রিয়া করছে। শিশু ফ্রিদার বয়স্ক মাথা মুখটি মুখোশে ঢাকা নার্সের মুখটি ভাবলেশহীন।
গ্রানিজো এই চিত্রে ফ্রিদা নিজের মাথা দিয়ে একটি অল্প বয়স্ক আহত হরিণ এঁকেছিল। তীরের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়েছিল হরিণ সাবকটি। পটভূমি হ’ল মরা গাছ এবং ভাঙ্গা ডাল সহ বন, যা ভয় এবং হতাশার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। দূরে ঝড়, বিদ্যুৎ-জ্বলন্ত আকাশ যা কিছু আশা নিয়ে আসে তবে প্রিয়রা কখনই কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হবে না।
ফ্রিদা যখন এই প্রতিকৃতি আঁকে তখন তার পোষা হরিণ “গ্রানিজো” কে মডেল হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। তার অনেক পোষা প্রাণী ছিল। নিজের শিশু না থাকার কষ্ট ভুলার জন্য হরিণ শিশুদের সরোগেট শিশু হিসাবে ভাবত। হরিণ তার প্রিয় ছিল। এ ছাড়া কুকুর, বানর, হামিংবার্ড ফুল প্রকৃতি প্রিয় ছিল ফ্রিদার।
১৯৪৬ সালে ফ্রিদা নিউ ইয়র্কে তার মেরুদণ্ডে অপারেশন করেছিল। আশা করেছিল, এই অস্ত্রোপচারটি তীব্র পিঠ ব্যথা থেকে মুক্তি দিবে কিন্তু অপারেশনটি ব্যর্থ হয়েছিল। ব্যাথা লাঘবে কোন সাহায্য করেনি। ব্রোকেন কোলাম
চিত্রকর্মটি অপারেশনের প্রতি তার হতাশা প্রকাশ করেছে। মেক্সিকো ফিরে যাওয়ার পরে, শারীরিক ব্যথা এবং মানসিক চাপ উভয়ই ভোগ সমান ভাবে ছিল। এই ছবিতে সারা মুখ এবং শরীরে পেরেক গেঁথে দিয়ে যন্ত্রনা বোঝানো হয়েছে । ছবির বাম কোণে,”কারমা” শব্দটি লেখা, যার অর্থ “নিয়তি” বা “ভাগ্য”। ঠিক তার অন্যান্য স্ব-প্রতিকৃতির মতোই এই চিত্রকলায় ফ্রিদা দুঃখ প্রকাশ করেছিল, নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না।
১৯৪৩ এ রুটস বা শিকড় এঁকে ছিল এই বিশ্বাসে, যে সমস্ত জীবন একক প্রবাহে যোগ দিতে পারে। এই চিত্রে ফ্রিদাকে চিত্রিত করা হয়েছে যেহেতু তার দেহ উইন্ডোর মতো খোলে এবং একটি আঙ্গুরলতার জন্ম দেয় বুকের ভিতর থেকে। নিঃসন্তান মহিলা হিসাবে জন্ম দেওয়ার পক্ষে তার স্বপ্ন। ফ্রিদার রক্ত লতার এবং পাতার শিরা ছাড়িয়ে যায় পৃথিবীকে খাদ্য বিলায়। বালিশে মাথা রেখে, কনুই দিয়ে জীবনের গাছ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে যেন মায়াবী চেখে।। এছাড়াও তার ক্যাথলিক ধর্মের পটভূমির সাথে, খ্রিস্টের আত্মত্যাগের অনুকরণ করার চেষ্টা করছে।
ফ্রিদার ছবিগুলো প্রতিটি বিভিন্ন জীবন দর্শন বাস্তবতা ব্যাখা করে ।
ফ্রিদা তার চিত্রকর্ম “মূসাস” এর জন্য জনশিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে কলা ও বিজ্ঞান জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে।
এই চিত্রটি প্যালাসিও দে বেলাস আর্টেসের বার্ষিক শিল্প প্রদর্শনীতে দ্বিতীয় পুরষ্কার অর্জন করে। এই ছবিটিকে অনেকে “নিউক্লিয়াস অফ ক্রিয়েশন” নামে ডাকা হয়। তবে ফ্রিদা এই চিত্রের লিখিত বিবরণে এটিকে “মূসাস” নামেই চিহ্নিত করে।
জন্ম একটি সূর্যের নীচে বীর, দেবতা, অন্যান্য মানুষ এবং মৃত্যুর হাত দ্বারা সজ্জিত। অগ্রভাগে শঙ্খের মধ্যে একটি শিশু এবং এটি শেলের মধ্যে জলে প্রস্ফুটিত ফুলের মতন। ফ্রিদার কাছে এই কাজটি “ভালোবাসার প্রতীক” ।
এছাড়া মরা গাছের কাণ্ড থেকে প্রসারিত শাখা রয়েছে। তার অন্যান্য অনেক ছবিতে ফ্রিদা বিশ্বের জীবন ও মৃত্যুর চক্র উল্লেখ করতে গাছের সাথে যুক্ত মানুষ এই উপমাটি ব্যবহার করে। আবার অনেক ছবিতে কপালে দিয়াগোর ছবি আঁকে যাকে সে ত্রিনয়ন হিসাবে ব্যাখ্যা করে। অদ্ভুত ভাবে ফ্রিদার ভাবধারা চিন্তা মিলে যায় ভিন্ন ধর্ম ভাবধারার সাথে।
১৯৫৩ সনের এপ্রিলে লোলা আলভারেজ ব্রাভো প্রথম ফ্রিডার ছবির একক প্রর্দশনির আয়োজন করেন। নিজের দেশ ম্যাক্সিকোতে তার একক ছবির এক্জিবিশন হচ্ছে। ফ্রিদা তখন প্রচণ্ড ব্যাথায় অস্থির। চলতে ফিরতে না পারা এক অসহায় মানুষ। ডাক্তারের কড়া নির্দেশ, হাঁটা চলা, বাইরে বেরুনোর উপর। ব্যাথা কমানোর জন্য বেশি ডোজের মরফিন ব্যবহার করছিল।
নিজের প্রথম একক প্রদর্শনি অথচ সে থাকতে পারছে না সেখানে। সবাই যখন ফ্রিদাকে ছাড়াই ছবির প্রদর্শনি করছে তখন বিছানা, একটা ট্রাকে তুলে শুয়ে থেকেই ফ্রিদা প্রর্দশনী হলে পৌঁছে অবাক করে দেয়। এটাই হলো ফ্রিদা নামের মেয়েটার অন্যরকম বৈশিষ্ট।
ফ্রিদাকে আসলে কিছুতেই অসহায় বলা যায় না। বারবার নিজের শরীরের উপর নানা রকম রোগের অত্যাচারে আক্রান্ত জর্জরিত হয়েও কখনো থেমে থাকেনি নিজের ভাবনা প্রকাশে। সময় কাটানোর আঁকা দিয়ে নিজের কষ্ট, ইচ্ছা স্বপ্ন প্রকাশ করে গেছে, যা এখনও পৃথিবীর মানুষকে আলোড়িত করছে। পিঠের মেরুদণ্ডের ব্যথায় এতটা কাবু করে ফেলল গলা উঁচু করে থাকার শক্তি নেই। অথচ নানা ভাবে নিজেকে শক্তিমান রাখার প্রচেষ্টা ফ্রিদার । বিছানায় শুয়ে নিজের মাথাটি বিছানার পিছনে ডাটের সাথে বেঁধে রেখে সোজা রাখার চেষ্টা। তবু সে কষ্ট সহ্য করে আঁকাঅব্যহত রেখেছে।
নিউইয়র্কে প্রথম ভ্রমণ এবং প্রদর্শণী করে, যেখানে তার রঙিন মেক্সিকান পোষাক “একটি উত্তেজনা সৃষ্টি করে” প্রেসে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। বেশিরভাগ সমালোচক তাদের সমীক্ষাগুলিতে সমীহ প্রকাশ করে। টাইম লিখেছিল “লিটল ফ্রিদার ছবি, ক্ষুদ্রচিত্রের সৌন্দর্য্য, মেক্সিকান ঐতিহ্যের উজ্জ্বল লাল রঙ এবং জাঁকজমক এবং একটি অপ্রত্যাশিত সন্তানের খেলোয়াড়ী রক্তাক্ত অভিনয়”। প্রদর্শনীর পঞ্চাশটি ছবির অর্ধেক বিক্রি হয়ে যায়। এটা বিশাল একটা সফলতা প্রথম প্রর্দশর্নীর ।
শুধু ছবি নয় আঁকিয়েও আকর্ষণের বিষয় ছিল।
তার চিত্রকর্ম ম্যাক্সিকোর লোকশিল্প হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।
ফ্রিদার ছবি প্রতিটির বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। কিছুটা দিলাম।
ফ্রিদা কাহলোর কাজ মেক্সিকোতে জাতীয় এবং আদিবাসী ট্রেডিশনাল ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে জাতীয় মর্যাদা দেয়া হয়। ১৯৫৩ সনে আগস্টে তার ডান পা, গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত, হাঁটুর নীচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।

(চলবে…..)

পরের পর্ব-  ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ : পর্ব ০৭


আগের পর্বগুলো পড়ুন-

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ : পর্ব ০৫

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ : পর্ব ০৪

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ – পর্ব ০৩

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ পর্ব ০২

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ, পর্ব ০১ 

ছড়িয়ে দিন