বইপ্রেমের হালচাল

প্রকাশিত: ৩:৪২ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০১৮

বইপ্রেমের হালচাল

নাজমীন মর্তুজা

সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই বাণী বলতে বলতে খুব কম বাঙ্গালী আছেন যে মুখস্ত করেননি , “ বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না “ তবে বই প্রকাশের সাথে যারা যুক্ত তাদের সকলের একই কথা বইয়ের ব্যবসায় লাভের অংক কমেছে , সেই সাথে এটাও শুনতে পাচ্ছি , একটা কথা মাঝে মাঝে এফ বি তে অনেকের পোষ্টে দেখি “ বই পড়ার অভ্যাস দ্রুত কমছে “ ব্যক্তিগত ভাবে আমি এই আশঙ্কাটি পুরোপুরি মেনে নিতে পারলাম না । বর্তমানে ই বুকস্ সহজ লভ্য হওয়ার জন্য ছাপা বইয়ের কেনাবেচা হয়ত আর আগের মত নেই , সেই সাথে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের ইংরেজী বইয়ের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি ও বাংলা বইয়ের চাহিদা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে । তবে ধ্রুপদী ও জনপ্রিয় কিছু বই ছাড়া আধুনিক বাংলা সাহিত্যর চাহিদা পড়তির দিকে , এটা যখন শুনি সত্যি মেনে নিতে কষ্ট হয় । গত চার বছর বই মেলায় গিয়ে বই কেনা বেচার সমাগম টা দেখিনি নিজ চোখে তাই হয়ত । যদি এমন হয়েই থাকে তবে বাংলাসাহিত্যিকদের আত্নসমীক্ষার দরকার আছে বৈকি । একটি বহুল আলোচিত বিষয় আসলে কেন কমছে তবে বাঙালির বই কেনার প্রবণতা ও পড়ার অভ্যাস । তার কারণ গুলো অবশ্যই আলাদা দৃষ্টিকোন থেকে দেখা দরকার ।
যদিও বলা হয় , বই আর পাঁচটা সামগ্রীর মত পণ্য , যা সাধারণত মল গুলিতে সাজানো থাকে । কিন্তু বই তো সে রকম অপরিহার্য জিনিস নয় । পাঠ্যপুস্তক ছাড়া ,তাই হয়ত জনপ্রিয় নয় , না কিনলেও কিছু যায় আসে না । আসল কথা হলো বিদ্যা চর্চার মানসিকতা , সময় সুযোগ দিন দিন কমে আসছে । এখন বই পড়তে নয় জামা কাপড়ে একটা ট্রেন্ড এসেছে কবিতা লেখা , গান , ছড়া , স্লোগান, রুপকথা , বাণী সব স্কীন প্রিন্টের ছাপ , এমন জামা কাপড় গায়ে চাপালেন ব্যস সব পড়া হয়ে যায় । নিজেকে রবীন্দ্র কিংবা শরৎবাবুর ভক্ত বানিয়ে ঘোরা যায় সহজেই , সে ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করে কে আর বই পড়ার দিকে ছুটবে শুনি ! বিদ্যাচর্চার মানসিকতা সময় সুযোগ দিন দিন কমে আসছে , এর মূল কারণটি হলো , বাঙালী যখন বই কিনে পড়ে , তখন সে লিখতেও চায় । সে ক্ষেত্রে ফেসবুকে চোখ রাখলেই দেখা যায় সবাই লেখক , কিন্তু ভালো মানের বই বের হচ্ছে কিনা , লেখা হচ্ছে কিনা , তেমন বাছ বিচার করার মত মানদন্ডের মাপকাঠিতে বিচার করবার মত দাড়ি পাল্লা কোন প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠান আজো কি জন্ম নিয়েছে ? তবে এটা ঠিক যে ব্যাঙের ছাতার মত প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠেছে , যদি লাভের অঙ্ক কমেই যাই তবে এই বানিজ্যে কেন আসা ? নামী লেখকদের কথা বাদ দিলে , নতুন বা নবীন লেখকদের কথা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে “ এখন ফেলো কড়ি মাখো তেল “ নীতি চালু করেছে অনেক প্রকাশনা সংস্থা । অনেকের দাবী প্রকাশনা র বেড়ে চলা খরচের ঝুঁকির সমান অংশীদার হতে বলা হচ্ছে সেই সব লেখকদের । বিনিময়ে তারা পাবেন সমমূল্যের বই , যা বিক্রিয় দায়ও তাঁদেরই । যত শত বই বের হয় , হচ্ছে সে ক্ষেত্রে বই সংরক্ষণ বা রক্ষণা বেক্ষণও খুবই গুরুত্ব পূর্ণ । ছোট ছোট ঘর গুলোতে বিরাট জায়গা জুড়ে থাকা বইয়ের সম্ভার পরবর্তী প্রজন্ম কি রাখতে চাইবে । কারণ নতুনদের পেশা বৃত্তি , শিক্ষা , রুচি , আলাদা , ফলে সব বিষয়ের বইয়ে তাদের আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক । নিজ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ফুটপাথেরপুরোনো বইয়ের দোকানে যখন যেতাম কত কত বিখ্যাতদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের সারি । তারা মারা যাওয়ার পর হয়ত বাড়ির লোক সব বেঁচে দিয়েছে । বইয়ের শেষ পরিণতি বা অনিবার্য নিয়তি মনে হয় তাই হয় । অনেকেই হয়ত মনে করেন বিপুল অর্থ ব্যয় করে বই কিনে ঘর জডো় করা অর্থহীন । আর পশুশ্রম তো বটেই ! যারা জোগাড় করে তাঁরাই জানে বিশেষ বিশেষ বই জোগাড় করা কতটা পরিশ্রম সময় ও টাকা লাগে । তবে নতুন প্রজন্মের পছন্দ ট্যাবলেটের বই , খুব সুবিধে তাতে তারা শক্তি চট্টাপাধ্যায়ের কবিতার ভাষায় , বই পড়ে বই মুছে ফেলে ! তাই জন্য হয়ত বা বই ক্রেতা বাঙালী পাঠক এক লুপ্ত শ্রেণীর প্রাণী হয়ে ওঠার পথে পা বাড়িয়েছে । বাংলাদেশে একসময় যখন আজীজ সুপার মার্কেটে যেতাম তখন বইয়ের গন্ধে মন ভরে যেতো এখন যায় পোষাকের গন্ধে । এমন পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল তবে কি বই বাজার বিলুপ্ত হয়ে যাবে ? যে হারে রাজধানীতে বিদেশী খাবারের রেঁস্তোরার বিপুল চাহিদার পাশাপাশি অঙ্গুলি পরিমেয় “ বুক স্টোর” বই বিপণি ক্রমবিলুপ্তির প্রমাণ স্বরূপ সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় সহজেই । ভবিষ্যতে বাঙালির বই প্রেম নিয়ে আর কিছু বলার জায়গা থাকবে না হয়ত ।
এ কথা অনস্বীকার্য, প্রকৃত পাঠক বা বই প্রেমীর সংখ্যা বর্তমানে কোনও পরিসংখ্যান দ্বারা পরিমেয় নয় ।
অথচ নিয়ম করে বই মেলা হয় , বইমেলা উপলক্ষে , এবং নববর্ষে বই প্রকাশ তো চিরায়ত রেওয়াজ আমাদের । কিন্তু বিশেষ কোন বই নিয়ে হামলে পড়া বা সেই সব বই সংগ্রহের জন্য বই- বিপণিতে সর্পিল লাইন পড়ার দৃশ্য কি চোখে পড়ে ? বাংলাদেশের একুশের বই মেলাতেই মনে হয় কেবল পাঠকের সাগ্রহ বিকিকিনি বা বই বিক্রির পরিসংখ্যান পাঠে বিশ্বাস করতে চমকে উঠতে হয় বই কি ।
আমরা দেখি যে বই দোকান না গিয়ে মানুষ , এমনি বহু চিত্রতারকা আঁকিয়ে , শিল্পী নামী রেঁস্তোরা খুলেছেন , বুটিক সাজিয়ে বসেছেন , কিংবা বিউটিপার্লার , কিন্তু কেউই একটা অভিজাত বই – বিপণি খোলার কথা স্বপ্নেও ভাবেন না । কিংবা ঢাকার মল গুলোতে ঝাঁ ঝকঝকে বিপণি গুলোতে হাজারো ক্রেতা এমনকি ভ্রমনকারি নিয়মিত উইন্ডো শপিং করেন । ভাবা যায় একটা মোহিত হওয়ার মত বুক স্টোর থাকলে কি হতো ? যতটা দেখা যায় মানুষ রেঁস্তোরা গিয়ে খাবারে নাক ডুবাচ্ছেন , তখন বিলক্ষণ কল্পনা করা যেতেই পারে ইস যদি এই রকম একটি বই বিপণির কথা , যেখানে মগ্ন পাঠক বই বাছছেন , কিনছেন বা দেয়ালে হেলান দিয়ে প্রিয় বইয়ে চোখ বুলাচ্ছেন । হাতে হাল্কা পানীয় চা কফির পেয়ালা । সেখানে খাবার রেঁস্তোরার সহাবস্থান থাকবে না । বাজবে মৃদু সঙ্গীত । ভেবে দেখতে পারেন কিন্তু ব্যবসায়ীরা । মনে হয় মাঠে মারা যাবেন না । পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলোর সাথে টেক্কা দিয়ে যদি মল বানাতে পারে , তবে আধুনিক বই বিপণি বানাতে কেন পিছিয়ে থাকবে ? যতটুকু ধারনা করা যায় থাই ইতালী চাইনিজ খাবার চেটেপুটে খাওয়ার লোক যেমন আছে , অপর দিকে জ্ঞান পিপাসু পাঠকও কিন্তু ডাইনোসরের মত বিলুপ্ত হয়ে যায় নি । ফলে প্রকাশকরা আর বলবেন না বই ব্যবসা নাশের ব্যবসা , সৈয়দ মুজতবা আলী মজা করে একটা কথা বলেছিলেন যে , ‘ বই সস্তা নয় বলে লোকে বই কেনে না , আর লোকে বই কেনে না বলে বই সস্তা করা যায় না ‘। হয়ত এটাই ঠিক ।