বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দেখতে হবে আগত ভবিষ্যত

প্রকাশিত: ১২:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২১

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দেখতে হবে আগত ভবিষ্যত

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

আজ পহেলা আগষ্ট, শুরু হলো বাঙালীর শোকের মাস। ৪৬ বছর পূর্বে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে  সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। ইংরেজ শাসিত বাঙালীর সমাজ সেসময় ছিল অবহেলিত ও পশ্চাদপদ। বিগত শতাব্দীতে বিশ্বে যখন উন্নয়ন ও প্রযুক্তি চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল তখন বাঙালীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না। আমাদের জনগনের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি দেশ ভাগের পূর্বে। নেতৃত্ব সৃষ্টি হলেও বাঙালীর স্বাধীনতার ও স্বার্বভৌমত্বের জন্য নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি। কী মাওবাদী মাওলানা ভাসানী, কী ফজলুল হক সাহেব, কী হোসেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব কেউই বাঙালীর চরম দূর্ভোগ মেটাতে পারলেন না এসময়। আমাদের মহান মহান নেতৃবৃন্দ স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য ঐক্য গড়ে তুলতে পারলেন না। দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষ একদিকে যেমন নিপিড়ীত ও শোষিত ছিল অন্যদিকে তাদের রাজনৈতিক গণ্ডিও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। এবং ১৯৪৭ সালের পূর্বে ইংরেজরা আমাদের মসলিন শিল্প ধ্বংস করে দিয়েছিল। তারা আমাদের নীল চাষিদের হাত কেটে দিয়েছিল। স্টেট লর্ডদের কারনে আমাদের কৃষাণরা কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়েও অধিক শোষিত ছিল। তাদের খাজনার অর্থ পরিশোধের পর দুই মুঠো আহারের সুযোগও ছিল না। দেশভাগের পরপরই বাঙালীদের নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত হতে হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের উপর জুলুম অত্যাচার শুরু হয়। দেশ ভাগের দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালী জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আশার বাতি জ্বালিয়েছিলো। ১৯৫৪ সালে বাঙালীর ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা অত্র অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছিল। মূল কথা বাঙালীর যে রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে ছয় দফা সেটা প্রমানিত করেছিল। পূর্বেই আমি বলেছিলাম ইংরেজ আমল থেকে বের হয়ে বাঙালী সমাজ পাকিস্তান সরকারের নব্য শাসক শ্রেনীর দ্বারা নিপিড়ীত হতে থাকে। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাঙালী বৈষম্যের স্বীকার হতে থাকে। বাঙালী সমাজে এসময় একমাত্র দাবী রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান তখন হয়ে উঠলেন পূর্ব-বাংলার গনমানুষের ‘মুজিব ভাই।’ তিনি এক পর্যায়ে পরিনত হলেন বাঙালীর ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বাঙালীকে এজন্য ঐক্যবদ্ধ করলেন ছয় দফার মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন, বাংলাদেশের জন্ম হলো। ধ্বংসাবশেষ থেকে বাংলাদেশকে তিনি পূণপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে হাত দিয়েছিলেন স্বাধীনতার পর। কিন্ত ৪৬ বছর পূর্বে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের একদল হায়েনা হত্যা করলো। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ১৯৯৬ সালে দক্ষিন আফ্রিকার শহর প্রিটোরিয়াতে যখন ইতিহাসের কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলার বাসভবনে তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে নিমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলেন তখন নেলসন ম্যান্ডেলা ওয়ালিউর রহমানকে দেখা মাত্রই বলেছিলেন, ‘হোয়াই ইউ কিল্ড শেখ মুজিবুর রহমান।’ শেখ মুজিবুর রহমান শুধুমাত্র নেলসন ম্যান্ডেলার প্রিয় নেতা ছিলেন না। বিশ্বের সুপরিচিত অনেক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসতেন। তার রাজনীতি ও দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি তবে দেখেছি শেখ মুজিবুর রহমান। ‘ বিশ্ব নেতাদের চোখে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সুপরিচিত ও এক মহান নেতা। শেখ মুজিবুর রহমানকে সাথে নিয়ে যেমন বাংলাদেশের অবহেলিত জনগোষ্ঠী স্বপ্ন দেখেছিলো ১৯৭১ সালে সেই জনগোষ্ঠী পুনরায় শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে জাতিস্বত্বার ভবিষ্যত দেখেছিলো ১৯৭২ সালে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিলেন ১৯৭১ পর্যন্ত তেমনই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য পুনরায় নেতৃত্ব দিলেন ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পরে। স্বাধীন বাংলাদেশেও ষড়যন্ত্র নির্মূল হয়নি। চলমান ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে ১৯৭৪ সালে বন্যার কারনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষ মারা যায়। কিন্ত মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আস্হাভাজন ছিলেন। কারন তখনও বঙ্গবন্ধুর বিকল্প নেতা এদেশে ছিল না। স্বাধীনতার পূর্বে যেমন শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালীর একমাত্র আস্হাভাজন নেতা স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতেও শেখ মুজিবুর রহমান একমাত্র আস্হাভাজন নেতা। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্হাপনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল। বাংলাদেশের মৌলিক ভীত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করছে সেটা বঙ্গবন্ধুর চিন্তার ফসল। আজ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক যতসব সংস্থাগুলোর সাথে সম্পর্কিত শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে সেইসব সংস্থাগুলোর সদস্যপদ লাভ করেছিলো বাংলাদেশ। আজ বাংলাদেশ যে কৃষি ভিত্তির উপর দাঁড়ানো শেখ মুজিবুর রহমান সেই ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ বিবেচনা করে সমবায় কৃষি ব্যবস্থার চিন্তা করেছিলেন। আজ থেকে এক যুগ আগে জাতীয় সংসদ ভবনে এডভোকেট মোঃ রহমত আলী সাহেব বঙ্গবন্ধুর একটি খামার একটি বাড়ির প্রকল্প সম্পর্কে আমাকে বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সত্তরের দশকে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন শোষিত মানুষকে শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে। তার স্বল্প সময়ের শাসনামলে তিনি যা করেছিলেন সেটা উন্নয়ন গবেষনার বিষয়বস্ত হওয়া উচিত আজ।

বঙ্গবন্ধু বাঙালীর সমাজে এতটাই অপরিহার্য ছিলেন যে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরও পঁচিশ দিন বাংলাদেশে কোন প্রকার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসলে ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের মিত্র শক্তি ভারতের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর। বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্ত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই সেই পথ রোধ করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দোসররা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টায় নেমে পরেছিল। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগকে পূনর্জীবিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। চল্লিশ বছর তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে চার বার সরকার গঠন করেছেন। বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে বিবেচিত। বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের একটি গ্রান্ড ডিজাইন নিয়ে আজ অগ্রসর হচ্ছে। এই গ্রান্ড ডিজাইন বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগকে স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে শুরু করে উন্নয়নের প্রতিটি স্তরের বীজ বপন করতে হয়েছে। এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একদিন সাত কোটি মানুষ জাতিস্বত্বার ভবিষ্যত দেখেছিল, স্বপ্ন দেখেছিল এদেশের স্বাধীনতার। আজকের বাংলাদেশে বিশ কোটি মানুষকেও আগত ভবিষ্যত দেখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে সাথে নিয়েই যিনি বারবার বাংলার মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে নিজের জীবন আত্মত্যাগ করেছিলেন।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ছড়িয়ে দিন