বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা

প্রকাশিত: ১২:২১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২১

বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা

মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম

 

বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা । পাকিস্তান আমলের অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটা সত্য স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তান সরকার বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শক্তি বলে বিবেচনা করত।

পূর্ববাংলার বেলায় এই কথাটি আরও বেশি সত্য। দেশভাগের পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিছু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও পরবর্তীতে সেগুলোকেও বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করে দেয়। পাকিস্তান আমলের গৃহীত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সরকার প্রতিটি পরিকল্পনাই এমনভাবে প্রণয়ন করেছিল যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিটা যেন বেসরকারি খাতেই থাকে- অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ অবদান বেসরকারি খাত থেকে অর্জিত হয়। আমরা পাকিস্তান আমলের কথিত ২২ পরিবারের কথা জানি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের একচেটিয়া প্রভাবের কথাও সুবিদিত। শুরুতে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শিল্পকারখানা, ব্যাংক-বিমাসহ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিপালন করলেও ক্রমে সরকারি উদ্যোগ সংকুচিত করে ফেলে এবং খোলাবাজার অর্থনীতির ধারা অনুসরণ করে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়।

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক ফরমান বলে ক্ষমতায় আরোহণ করার পর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দিকে কিছু মনোযোগ দিলেও তা পূর্ববাংলার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না। কারণ, সবটাই এমনভাবে করা হয় যাতে পূর্ববাংলার অংশগ্রহণ গৌণ হয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থের প্রায় পুরোটাই পশ্চিম-পাকিস্তানের উন্নয়নে কাজে লাগায়। শুরু থেকেই পাকিস্তান সরকারের বেসরকারি খাতে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করার কতগুলো কারণ অনুমান করা যায় – এক. বেসরকারি খাতে শিল্পকারখানা থাকলে তার ওপর সংগত কারণেই নিয়ন্ত্রণ থাকবে পশ্চিম-পাকিস্তানি বা অবাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে; দুই. ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা থেকে সরকার মুক্ত থাকবে কিন্তু শুধু লভ্যাংশ এবং ট্যাক্স পাবে; তিন. সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় পূর্ববাংলার প্রতিনিধিত্ব আইনসিদ্ধ এবং সেই দাবি পূর্ববাংলার জনগণ শুরু থেকেই করে আসছিল- সেটি প্রতিহত করা; চার. নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি পূর্ববাংলার নিয়মতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় তা হলে অর্থনৈতিক শোষণটা সরল ও অব্যাহত গতিতে চালাতে পারবে না; এবং পাঁচ. পূর্ববাংলার দরিদ্র শ্রমিকদের শোষণ করা। একদিকে তারা কৌশলে এদেশের কৃষিব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে শুরু করে ব্রিটিশদের মতো, অন্যদিকে কৃষিতে বিমুখ হওয়া দরিদ্র কৃষকদের শিল্পকারখানায় কম মজুরিতে খাটিয়ে অধিক মুনাফা লাভ করতে থাকে। সুতরাং, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ববাংলাকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই যে তাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা সাজিয়েছিল সেটি এখন প্রমাণিত সত্য। এই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধেই বঙ্গবন্ধু নিজে সোচ্চার হয়েছিলেন, জীবনভর সংগ্রাম করেছেন এবং এদেশের মানুষের মধ্যেও অধিকার আদায়ের আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি পশ্চিম-পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করে।

গণমানুষের উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য ছিল নৃতাত্ত্বিকভাবেই। আর ২৪ বছরের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছিল সুপরিকল্পিতভাবে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপরই।

পাকিস্তানি শাসকরা পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের পথ উন্মুক্ত করেছিল অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার স্বরূপ। কারণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই জনগণের অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানিরা জনগণের অধিকার সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল, পূর্ববাংলা তো বটেই পশ্চিম-পাকিস্তানের গণমানুষের অধিকার নিশ্চিত করতেও তারা যত্নবান ছিল না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিপতিদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের সদস্য থাকাকালে অধিবেশনে পশ্চিম-পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা বারবার তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। পশ্চিম-পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকচক্র যে নিজের দেশের গণমানুষের উন্নয়নের কথা ভাবেনি কখনো, তার প্রমাণ অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের গ্রন্থে উল্লিখিত অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশভাগের সময় পূর্ববাংলার সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পশ্চিম-পাকিস্তানের চেয়ে ভালো ছিল। গণমানুষের চিন্তাটা তাদের মাথায় কোনোকালেই ছিল না বলে পূর্ববাংলাকে তারা শুরু থেকেই তাদের উপনিবেশ হিসাবে গণ্য করেছিল। এখানে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে গণমানুষের পক্ষে যাবে না সেটি বঙ্গবন্ধু কলকাতাপর্বেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তখনই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গণমানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকে যখন সরকার গণমানুষের উন্নয়নের কথা সত্যিকার অর্থে ভাবে। পাকিস্তান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই ভাবনার কোনো প্রতিফলন তাদের ২৪ বছরের শাসনামলে দেখা যায়নি। তারা পুঁজিবাদের বিকাশের পথ উন্মুক্ত রেখে দেশের আর্থিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ছিল। পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছিল। ১৯৫৮ সালে পশ্চিম-পাকিস্তানে মোট শিল্প-মূলধন ছিল ৫০৮.৬ কোটি টাকা সেখানে পূর্বপাকিস্তানে মোট শিল্প-মূলধন ছিল মাত্র ১১৪.৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার ছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রের শিল্পখাতের মোট সম্পদের শতকরা ৬৬ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করত কথিত বাইশ পরিবার। সুতরাং পাকিস্তান রাষ্ট্রের সরকার কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিপুষ্টি সম্ভব ছিল না।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও এর গতি সচল রাখে, কিন্তু ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানে মালিককে সবসময় লাভের চিন্তা করতে হয় এবং সেটি করতে গিয়ে বিভিন্ন উপায়ে উৎপাদন ব্যয় (কাঁচামাল সংগ্রহে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা না দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়া ইত্যাদি) সংকোচন করার পথ অবলম্বন করে থাকে। আবার উৎপাদিত পণ্য বেশিমূল্যে সেই শ্রমিক-কৃষকের কাছেই বিক্রিও যেভাবেই হোক নিশ্চিত করে।

এভাবে পুঁজিপতিরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয় তেমনি সাধারণ মানুষ তাদের নানামুখী কৌশলের শিকার হয়ে ক্রমে দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্রতর হয়। কিন্তু জনবান্ধব সরকার সে অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকে। কারণ, জনবান্ধব সরকারের কাছে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন একটি অঙ্গীকারের মতো কাজ করে। সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে গিয়ে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে এর বিকাশ ও পরিচালনার পদ্ধতি জনগণের প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ রেখে প্রণয়ন করে। বঙ্গবন্ধুর সরকার সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা পুঁজিবাদী অর্থনীতির করাল গ্রাস থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে রক্ষার আন্তরিক প্রত্যয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সিংহভাগ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসে।

বঙ্গবন্ধুর জাতীয়করণ কর্মসূচি

মানবচরিত্রে অন্তর্গত চেতনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চেতনার মর্মমূলে কল্যাণকর ভাবনা বজায় না থাকলে বাইরে তার প্রকাশ ঘটান কিংবা সুদীর্ঘসময় ধরে তা লালন করা প্রায় অসম্ভব। দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও বেশি প্রযোজ্য। কারণ, দেশপ্রেম না থাকলে দেশের কিংবা দেশের মানুষের জন্য কখনো কল্যাণকর কিছু চিন্তা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন- ‘দেশকে ভালো না বাসলে তাকে ভালো করে জানবার ধৈর্য থাকে না, তাকে না জানলে তার ভালো করতে চাইলেও তার ভালো করা যায় না।’ [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোরা]

রবীন্দ্রনাথ তার স্বদেশী ভাবনায় প্রত্যাশা করেছিলেন-

স্বদেশকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে আমরা উপলব্ধি করিতে চাই। এমন একটি লোক চাই, যিনি আমাদের পুরো সমাজের প্রতিমাস্বরূপ হইবেন। তাহাকে অবলম্বন করিয়াই আমরা আমাদের বৃহৎ স্বদেশীয় সমাজকে ভক্তি করিব, সেবা করিব। তাহার সঙ্গে যোগ রাখিলেই সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষিত হইবে। [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘স্বদেশী সমাজ’, প্রবন্ধসমগ্র, সময় প্রকাশন, ঢাকা ২০০০, পৃ. ৯৮]

এই প্রবন্ধেই তিনি আবার বলেছেন-

আমাদের প্রত্যেকের নিকটে তাহারই মধ্যে সমাজের একতা সপ্রামণ হইবে। আজ যদি কাহাকেও বলি সমাজের কাজ করো, তবে কেমন করিয়া করিব, কোথায় করিব, কাহার কাছে কী করিতে হইবে, তাহা ভাবিয়া তাহার মাথা ঘুরিয়া যাইবে।… এমন স্থলে ব্যক্তিগত চেষ্টাগুলিকে নির্দিষ্ট পথে আকর্ষণ করিয়া লইবার জন্য একটি কেন্দ্র থাকা চাই। আমাদের সমাজের কোনো দলই সেই কেন্দ্রের স্থল অধিকার করিতে পারিবে না। … আমাদের দলের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মধ্যে দলের ঐক্যটিকে দৃঢ়ভাবে অনুভব ও রক্ষা করিতে পারে না- শিথিল দায়িত্ব প্রত্যেকের স্কন্ধ হইতে স্খলিত হইয়া শেষকালে কোথায় যে আশ্রয় লইবে, তাহার স্থান পায় না। [ঐ]

বঙ্গবন্ধুর স্বরূপ উপলব্ধি করার জন্য এই উদ্ধৃতি দুটো উপস্থাপন করা হলো। বাঙালি তার স্বদেশকে উপলব্ধি করার জন্য যেমন মানুষের প্রত্যাশা করে আসছিল হাজার বছর ধরে, বঙ্গবন্ধুর মধ্যে সেই ব্যক্তিকে তারা খুঁজে পেয়ে নিশ্চিন্তে ভরসা করে এগিয়ে ছিল। আর দেশের কাজ করার যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন আপনা থেকেই, সেই দায়িত্ব তিনি আজীবন নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। স্মর্তব্য যে, ১৯৭৪ সালের পরে যখন তিনি দেখলেন বাঙালির একতায় ফাটল দেখা দিয়েছে তখনই তিনি নিজের কর্তব্য ঠিক করে আবার তাদের সংযোগ পুনস্থাপন করার জন্য সবাইকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন করলেন। অবশ্য এই ফাটল ধরার জন্য তার কোনো ভূমিকা ছিল না, কাজটি করেছিল পরাজিত শক্তির লেজুড়বৃত্তি গ্রহণ করা এদেশের কিছু ভুল-পথযাত্রী মানুষ। এর সঙ্গে অবশ্য আন্তর্জাতিক চক্রান্তের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত সক্রিয় ছিল।

আলোচনার মূল বিষয় গণমানুষের উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে। ভূমিকা স্বরূপে বঙ্গবন্ধুকে আরও একবার চিনে নেওয়ার প্রয়াস পাওয়া গেল। এটি এই জন্য যে, এত নিবিড়ভাবে স্বদেশকে স্বদেশের মানুষকে যখন অনুভব করেছেন তখন তাদের কল্যাণ কামনাই যে তার একমাত্র লক্ষ্য হবে সে সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে দেশ গঠনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন- কোনোটা স্বল্পমেয়াদি কোনোটা দীর্ঘমেয়াদি। আর্থিক ও শিল্পখাত মিলে ৮৫ ভাগের অধিক প্রতিষ্ঠান যখন তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে এলেন তখন বোঝা যাচ্ছে যে, পুঁজিবাদীদের থাবা যাতে তার কৃষক-শ্রমিকের রক্ত পূর্বের মতো আর শোষণ করতে না পারে, সেই পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। পাকিস্তানিরা খোলাবাজার অর্থনীতির পথ অনুসরণ করে পুঁজিবাদী বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। কারণ, তাদের কাছে জনগণ কোনো ধর্তব্য বিষয় ছিল না, বিশেষ করে পূর্ববাংলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিষয়ে তাদের ভাবনাটা ছিল ‘যা হয় হোক’ ধরনের। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো তেমন ছিলেন না, তিনি গণমানুষকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার সংগ্রামী জীবনের মধ্যে, রাজনীতি করতেনই তাদের জন্য। পাকিস্তানি শাসকদের এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন গণমানুষের পক্ষাবলম্বন করার জন্য।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনার তার গণমানুষ পেশাগতভাবে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল- এক. যারা কৃষিকাজ করে, ফসল উৎপাদন করে নিজের ও অন্যদের অন্নের জোগান দেয়। তারাই আবার কৃষি উৎপাদনে এমন সব পণ্য উৎপাদন করে যা ক্ষুদ্র-মাঝারি এবং বৃহৎ শিল্পের কাঁচামালের জোগান দেয়; দুই. যারা কলে-কারখানায় কাজ করে, কৃষিখাত থেকে সংগ্রহকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে নানা রকম পণ্য উৎপাদন করে দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গের জোগান দেয় এবং সেই পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণ করে এই দুই শ্রেণির গণমানুষের অধিকার সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রের সব আর্থিক ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠান যদি ব্যক্তিগত খাতে থাকে তা হলে সরকারের কাজ কমে এবং সরকার নির্দিষ্টহারে ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। কিন্তু গণমানুষের অধিকার সংরক্ষিত হয় না। একদিকে যেমন কাঁচামাল উৎপাদনকারী কৃষক এবং কৃষিকাজে নিযুক্ত শ্রমিক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় তেমনি কলকারখানায় শ্রমিকদের যোগ্য মজুরি না দিয়ে শ্রমিক শোষণের নজির তৈরি হয়। তখন খেটে খাওয়া এই দুই শ্রেণির মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন দূরে থাক ন্যূনতম জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষিকে যেমন প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে তেমনি উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করে কলকারখানায় উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে। প্রতি বিপ্লবী শক্তির নানা অপকর্ম, অপপ্রচারণা এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের আত্মোপলব্ধির অভাব, ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা সর্বোপরি সে সময় নানা অপতৎপরতায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচির মাহাত্ম্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছিল বটে কিন্তু এখন নানামুখী গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা দিবালোকের মতো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর গৃহীত সব পদক্ষেপ প্রকৃত অর্থেই গণমানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার নিমিত্তেই গৃহীত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর জাতীয়করণ কর্মসূচির রূপরেখা

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন করা হলো। এদিন বঙ্গবন্ধুর সরকার জাতীয়করণ আইন পাশ করে। Bangladesh Nationalization Act 1972-এর আওতায় দেশের প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়। কারণ, বেশিরভাগ শিল্প-কারখানা, তফসিলি ব্যাংক, বিমার মতো প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান সরকার ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা পূর্ববাংলা ত্যাগ করে নিজের দেশে চলে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অনেকেই ভারতীয়ও ছিল। বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জনের নিরাপদ পন্থা হিসাবে পাকিস্তান সরকার ক্রমে বেশিরভাগ আর্থিক ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ছিল এবং তাতে যে সরকারের সুবিধাই হচ্ছিল সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এসব মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প-কারখানা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনোটারই মালিকানা বাঙালির হাতে ছিল না। পূর্ববাংলার কোনো কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি যৌথ-মালিকানায় অংশীদার থাকলেও সামগ্রিক অর্থে তা না থাকারই শামিল। কাজেই এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বঙ্গবন্ধু এসব প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের আওতায় নিয়ে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সচল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার হঠাৎ করেই যে স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় জাতীয়করণের কর্মসূচি হাতে নেন, তা নয়। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের মধ্যে সেটি ছিল না। পাকিস্তান সরকারের অর্থনৈতিক শোষণের এজেন্ডা তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেই এজেন্ডায় তার দেশের গণমানুষই যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেটিও তিনি জানতেন বলেই ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি ইশতেহার থেকে শুরু করে পরবর্তী সব কর্মসূচিতে তিনি কৃষক-শ্রমিককে বাঁচানোর এজেন্ডা অন্তর্ভুক্ত করেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশের তৎকালীন সবচেয়ে অর্থকরী ফসল সোনালি আঁশ পাটের বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পাট চাষের ওপর যেমন এদেশের কৃষকদের ভাগ্য নির্ভর করত তেমনি পাটকলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের ন্যূনতম জীবনযাপনের ব্যবস্থা নির্ভরশীল ছিল। কাজেই তিনি যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনেও পাটশিল্প জাতীয়করণের কর্মসূচি যুক্ত করেছিলেন- কৃষিখাত উন্নয়নের অন্যান্য ব্যবস্থার কথা তো ছিলই। ’৭০-এর সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার দাবি অন্তর্ভুক্ত করেন। কাজেই জাতীয়করণের কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর পূর্বপরিকল্পনারই প্রয়াস ছিল। অন্যদিকে অবাঙালি মালিকদের পরিত্যক্ত এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানায় নিয়োজিত পূর্ববাংলার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, বহুসংখ্যক শ্রমিক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা তাদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে চাইবে বা স্বাধীন দেশে তারা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার অপেক্ষায় ছিল- কাজেই এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে অর্থনীতিকে সচল করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয় তাৎক্ষণিকভাবেই। বঙ্গবন্ধু সেদিক থেকেই বিবেচনা করেছিলেন। আরেকটা কথা হলো- বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে কৃষিসংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাতে কৃষির অবস্থা অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু কৃষিনির্ভর শিল্প-কারখানা সচল করতে না পারলে, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা যাবে না- সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করে যে অবস্থায় দেশের পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হয় তাতে এমন কোনো খাত ছিল না যে তার পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়নি। সবচেয়ে অসুবিধার কথা ছিল যে, প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই জনজীবনে ন্যূনতম স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ভবন পুনর্নির্মাণ না করলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল- এমনিতেই ৯ মাসের যুদ্ধের সময় তাদের লেখাপড়া বন্ধ ছিল; খাদ্য ঘাটতি নিয়ে দেশ পরিচালনা শুরু করে কৃষির চাকা গতিশীল করাও জরুরি ছিল; শিল্প-কারখানা সচল করে শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা সচল করতে না পারলে রপ্তানিযোগ্য পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন বিপণন ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও শ্রমিকদের মজুরি পাওয়া নিশ্চিত করারও কোনো বিকল্প ছিল না। ব্যাংক-বিমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান সচল করাও ছিল অতীব জরুরি কাজ। বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে সব কাজই শুরু করেন। সংবিধান রচনা তখন মাত্র শুরু হয়- কাজেই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই তিনি যেখানে যেভাবে শুরু করা প্রয়োজন তাই করেন। জাতীয়করণ কর্মসূচির জন্যও তিনি নির্বাহী আদেশ জারি করেন ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি। প্রথম পর্যায়ে ৬৭টি পাটকল, ৬৪টি বস্ত্রকল এবং ১৫টি চিনিকল জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণ আদেশে প্রতিষ্ঠানের একটি ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ন্যূনতম ১৫ কোটি টাকা মূল্যমানের স্থায়ী সম্পদ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকেই জাতীয়করণের আওতাভুক্ত করা হয়।

ব্যাংকব্যবস্থা গতিশীল না থাকায় আর্থিক লেনদেন বিঘ্নিত হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয়করণের কর্মসূচিতে এই সেক্টরকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন-

নজর দিতে হলো ব্যাংকিং খাতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ছিল না। তাই প্রথমদিকে কোনোমতে চলে বাংলাদেশ ব্যাংক। অতঃপর মি. একেএন আহমদ ও শ্রী সন্তোষ গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৭৩ সালের শুরুতে দেশে ফিরে এলে প্রথম জনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করে ব্যাংকিং সিস্টেম পুনর্স্থাপন করলেন জাতির পিতা। মালিক পরিত্যক্ত তফসিলি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। বলাবাহুল্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিশ্বস্ত সহচর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিমত্তা প্রয়োগ করেন। সৃষ্টি হলো রাষ্ট্রখাতে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, পূবালী ও উত্তরা ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্পব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন বাংলাদেশ। জন্ম নিল রাষ্ট্র খাতে জীবন বিমা ও সাধারণ বিমা কর্পোরেশন। আলোর মুখ দেখল বাংলাদেশ বিমান। শিল্প খাতে সৃষ্টি করা হলো ১০টি সেক্টরে কর্পোরেশন। [ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ‘জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান : কেন তিনি প্রাসঙ্গিক কেন তিনি প্রেরণা, কেই বা তিনি বঙ্গবন্ধু’, নূহ-উল-আলম (সম্পা.), ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা ২০১১, পৃ. ২৮৫]

সাবেক ব্যাংকগুলোকে সরকারি ব্যাংকে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের নামকরণ প্রসঙ্গে এইচ টি ইমাম বলেন-

সাবেক পাকিস্তান আমলের ১২টি ব্যাংককে একত্রিত করে নতুন নাম দিয়ে মোট ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা উল্লেখ না করে পারছি না। বাংলাদেশ সচিবালয়ে পুরনো ক্যাবিনেট রুমে ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্তকরণ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আলোচনায় এসে যায়। আলোচনার বিষয় ছিল, নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বাংলা নামকরণ কীভাবে হবে? প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করছিলেন। আকস্মিকভাবেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তৎকালীন ক্যাবিনেট সচিব আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনিই কয়েকটি নাম সুপারিশ করুন।’…

পাকিস্তান আমলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান মূলত পাট রপ্তানি ব্যবসায় অর্থায়ন করত। সোনালি আঁশরূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিত পণ্য পাটের প্রসারের ব্যাপক অবদানের জন্য এই ব্যাংকের নতুন নামকরণ ‘সোনালী ব্যাংক’ করার প্রস্তাব করলাম। পাকিস্তান আমলের অত্যন্ত ব্যবসা-সফল এবং আধুনিক ব্যাংক হিসাবে সমাদৃত ছিল ‘হাবিব ব্যাংক’। নতুন ব্যাংকও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সে-রকমই অগ্রণী ভূমিকা যেন রাখতে পারে সেই চিন্তা মাথায় রেখে এর নামকরণের প্রস্তাব করেছিলাম। প্রস্তাব গ্রহণ করে এই ব্যাংকের নাম রাখা হলো ‘অগ্রণী ব্যাংক’। ‘ইউনাইটেড ব্যাংক’ ব্যাংকিং ব্যবসায় একটি নতুন ধারা প্রচলন করেছিল। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাবে এই ব্যাংকটি পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এ বিষয়টি ভেবে নতুন ব্যাংকের নাম প্রস্তাব করলাম ‘জনতা ব্যাংক’। এরপর, বাংলার সবচেয়ে প্রিয় মাছ ইলিশ যে বর্ণের, সেই নামটি ব্যবহার করে ‘মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক’ এবং অন্য দুটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত নতুন ব্যাংকের নাম প্রস্তাব করলাম ‘রূপালী ব্যাংক’। তৎকালীন পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানি (বাঙালি) উদ্যোক্তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’-এর নাম স্বভাবতই ‘পূবালী ব্যাংক’ রাখা সংগত হবে বলে মত দিলাম। যেহেতু উত্তরবঙ্গের কোনো ব্যাংক ছিল না এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে এ অংশ অনেকটা পিছিয়ে ছিল, তাই এমন চিন্তা মাথায় রেখে ‘ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশন’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘উত্তরা ব্যাংক’ রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করলাম।…

বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই আমার উপরোল্লিখিত সব প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করা হয়, যার প্রতিফলনই ঘটে The Bangladesh Banks (Nationalization) Order, 1972 শিরোনামে প্রণীত রাষ্ট্রপতির আদেশে। জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলো সেই নামেই বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। [এইচ টি ইমাম, ‘স্মৃতির মণিকোঠায় বঙ্গবন্ধু’, মাসিক উত্তরণ, ঢাকা ডিসেম্বর ২০২০, পৃ. ৩৯]

বঙ্গবন্ধুর এই রাষ্ট্রীয়করণের আরও একটি মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল অবাধ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধ করা। কারণ, তিনি অনেকটাই সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মিশেলে একটি মিশ্র অর্থনীতির পথ অনুসরণ করে দেশ পুনর্গঠনের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, পুঁজিবাদীদের এখানে পুনর্গঠনের কাজে অংশগ্রহণমূলক চাতুরীপূর্ণ মহৎ উদ্দেশ্য যাতে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত না হয় সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি জাতীয়করণের পরিকল্পনাটি করেন। তার উপলব্ধি ছিল, আবার পুঁজিবাদী অর্থনীতি এখানে বহাল হলে বাস্তবে তিনি গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ধারণা ও বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি করেছেন, দেশ স্বাধীন করেছেন- সেই পথ ক্রমে রুদ্ধ হয়ে যাবে। পাকিস্তান আমলের মতো দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে প্রকারান্তরে পুঁজিবাদের কাছে। এম এম আকাশ বলেন-

স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমাদের দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ (মতান্তরে ৯০ শতাংশ) শিল্প কারখানা পরিসম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অধীনে ন্যস্ত হয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ১১টি বৃহৎ শিল্প ইউনিট, বাঙালি আংশিক মালিকানাধীন ৭৫টি পাট ও বস্ত্র কল, সাবেক ই.পি.আই.ডি.সি.-র মালিকানাধীন ৫৩টি বৃহৎ শিল্প ইউনিট এবং পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ৪০০টি ক্ষুদ্র ইউনিট (যাদের মূল্য ১৫ লাখ টাকার কম)।

… অবাধ পুঁজিবাদী বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ লাখ টাকায় বেঁধে দেওয়া হলো। ১৯৭২-এর সিলিং প্রস্তাবে আরও বলা হলো যে অর্জিত মুনাফার পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র পুঁজিপতিরা সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পদের অধিকারী হতে পারবেন। অর্থাৎ সামগ্রিক বিচারে ব্যক্তিগত খাতের ভূমিকাকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখার আইন প্রণীত হলো। [এম এম আকাশ, বাংলাদেশের অর্থনীতি : অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, প্যাপিরাস, ঢাকা ২০১৭, পৃ. ১০৪]

স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কোন পথে পরিচালিত হবে তার একটা সুস্পষ্ট রূপরেখা নিয়েই বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণ পরিকল্পনা করেন। আরেকটি বিষয় ছিল, সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা পুনরায় সচল করার যে বাস্তবানুগ পন্থা গ্রহণ জরুরি ছিল, তা হলো জাতীয়করণ। আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন-

বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর শিল্প ও বাণিজ্য জাতীয়করণ সঠিক হয়নি। কিন্তু মনে রাখা উচিত, তখন বিশ্বব্যাপী যে মতবাদ উন্নয়নশীল দেশে প্রচলিত ছিল সেখানে সমাজতন্ত্র ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি প্রধান বিষয়। তা ছাড়া তিনি দেখলেন, এ দেশের ৪৭ শতাংশ শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পরাজিত পাকিস্তানিরা পরিত্যাগ করে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের ঋণ ছিল আরও ৩৭ শতাংশ। সুতরাং প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণ ছাড়া তখন কোনো উপায় ছিল না। [আবুল মাল আবদুল মুহিত, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’, নূহ-উল-আলম (সম্পা.), ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা ২০১১, পৃ. ৮১]

বর্তমান পৃথিবীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবপুষ্ট। বাংলাদেশও এর বাইরে যেতে পারে না। বঙ্গবন্ধুও শেষের দিকে বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য ব্যক্তিখাতে নির্দিষ্ট করা মূলধনের আকারও বৃদ্ধি করেছিলেন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানামুখী শিল্প-কারখানা, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করে চলেছে। বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে সেটি বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে। একসময় বাংলাদেশ পাট বা পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। এখন তৈরি পোশাক রপ্তানি করে সেই অভাব পূরণ হয়েছে। কারণ, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের যুগে পণ্য উৎপাদনের গতিপ্রকৃতিও পাল্টে গেছে। বাংলাদেশের অন্যতম উৎপাদন ক্ষেত্র কৃষির ধরনও পূর্বের জায়গায় নেই। কৃষকের কর্মপদ্ধতি এবং উৎপাদিত পণ্যের ধরন পাল্টে গেছে। কৃষিও এখন শিল্পায়নের আদলে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে উৎসাহিত হয়েছে।

বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন- ব্যাংক-বিমা ইত্যাদি এখন আর শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেই। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সেবাপ্রদান অব্যাহত রেখেছে। যদিও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা এখন খুব স্বস্তিকর অবস্থায় নেই, নানা রকম জটিল আবর্তে পড়ে ক্রমেই লোকসানের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবুও গণমানুষের আর্থিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের শেষ ভরসাস্থল হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় যদি অহেতুক বাইরের হস্তক্ষেপ না হয় এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় যদি দক্ষতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করা যায় তা হলে এখনো মুনাফা করার পাশাপাশি এগুলোই মানুষের সেবাদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিগণিত হবে। বঙ্গবন্ধু যে প্রত্যাশা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতে জোর দিয়েছিলেন গণমানুষের আর্থিক সংগতি বৃদ্ধি ও তাদের সেবাদান নিশ্চিত করার জন্য সে প্রত্যাশাও পূরণ করা যাবে। তাতে গণমানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসবে এবং তার স্বপ্নের সোনার বাংলার এই অগ্রযাত্রা আরও গতিশীল হবে।

মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ,অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড