বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামান্য দলিল

প্রকাশিত: ১১:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০২১

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব  ঐতিহ্যের  প্রামান্য দলিল

 তাপস হালদার

চব্বিশ বছর পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের পটভূমিতে মুক্তি পাগল বাঙ্গালিদের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার চুড়ান্ত দিকনির্দেশণাই ছিল ৭ মার্চের ভাষণ ।ভাষা আন্দোলন,ছয় দফা,উনসত্তরের গনঅভ্যুথ্থান,‘৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ,প্রতিটি সফল পদক্ষেপের পরেই আসে সেই শুভক্ষনটি।জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসন পাওয়ার পরও পাকিস্তানী শাসক গোষ্টী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে । সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ‘৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকেন। কিন্তু পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সামরিক সরকারের ষড়যন্ত্রে ১মার্চ সেই অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন সারা বাংলা। প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ২ ও ৩ মার্চ দেশ ব্যাপী হরতাল এবং ৭ মার্চ পরবর্তী দিকনির্দেশনা দিবেন বলে ঘোষণা দেন। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সেদিন বঙ্গবন্ধুর চুড়ান্ত নির্দেশনা শোনার জন্য দশ লক্ষাধিকেরও বেশি মানুষ উপস্থিত হয়।একদিকে জনতার চাপ স্বাধীনতা ঘোষণা,অন্য স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পুরো রেসকোর্স ময়দান শ্মশান ভূমিতে পরিনত হওয়ার আশংকা।এমন কঠিন পরিস্থিতি তিনি কৌশলী ভূমিকা নেন। তিনি চারটি শর্ত দিয়ে শাসক গোষ্টীর কাছে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন (১)মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করতে হবে (২) সেনা বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে (৩) এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে (৪) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।এই শর্ত গুলো মানা না হলে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, তিনি সেদিন যুদ্ধের ঘোষণা যেমন পরোক্ষভাবে প্রদান করেন- আবার যুদ্ধে কিভাবে জয়ী হতে হবে সে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈধ সরকার প্রধানের মতো এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, “২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইলো প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে”। সেসময় জনগণ যা জানতে চেয়েছেন বক্তব্যে তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবই বলে দিয়েছেন।তিনি শুধু চেয়েছিলেন আঘাতটা পাকিস্তানী শাসক গোষ্টীই আগে করুক।পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় যাতে তাঁর উপর না পড়ে। ভাষণটিতে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের যাবতীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।একদিকে তিনি কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন,অন্যদিকে তাঁকে যাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বিছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেন।পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়িত্ব তিনি কৌশলে শাসক গোষ্টীর ওপর চাপিয়ে দেন।এ প্রসঙ্গে পরবর্তীতে ১৮ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে তিনি যখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিট ফ্রষ্ট তাকে প্রশ্ন করেছিলেন ৭ মার্চ আপনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি কী ঘটতো?উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বিশেষ করে আমি ওই দিনটা কিছু করতে চাইনি।কেননা বিশ্বকে তাদেরকে(পাকিস্তান) আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে,শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তাই আঘাত করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত করুক এবং জনগন আঘাতকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত আছে’।জনগনের প্রতি এ বিশ্বাস আমার ছিল।ভাষণটিকে বিশ্বের বরেণ্য রাজনীতিগন ও প্রভাবশালী গনমাধ্যম গুলোও যুদ্ধের রণকৌশল ও স্বাধীনতা যুদ্ধের চুড়ান্ত দিকনির্দেশনা হিসেবে অভিহিত করেছেন।কিউবার জাতীয়তাবাদী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো ভাষণটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণটি শেখ মুজিবুর রহমানের শুধু ভাষনই নয়,এটি একটি অনন্য রণকৌশল দলিল।যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে,ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা হয়ে শক্তি জোগাবে। প্রভাবশালী গনমাধ্যম ‘নিউজউইক’ তার রিপোর্টে বলেছে, ‘ ৭ মার্চের ভাষণ কেবলমাত্র একটি ভাষণ নয়,অনন্য কবিতা।এবং বঙ্গবন্ধুকে অভিহিত করা হয়েছে রাজনীতির কবি(The poet of politics) হিসেবে।ওয়াশিংটন পোষ্টে মন্তব্য করা হয়- ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা।পরবর্তীকালে স্বাধীনতা হয়েছে ঐ ভাষণের আলোকে’। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ গুলোর মধ্যে ১৮৬৩ সালে আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস’ যা ছিল ২৭২ শব্দের দুই মিনিটের স্থায়িত্ব কাল ও ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ যা ১৬৬৬ শব্দের ১৭ মিনিট স্থায়িত্বের দুইটি ভাষণের সাথে তুলনা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ১৯ মিটিটের ভাষণটিকে ।কিন্তু ওই দুটো ভাষণ ছিল লিখিত।প্রেক্ষাপটও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি পৃথিবীর অনন্য ভাষণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও ব্যতিক্রম।অন্যসব গুরুত্বপূর্ন ভাষণ গুলো ছিল লিখিত,বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল স্বতঃস্ফুর্ত মনের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বের আর কোন ভাষণই এতবার বাজানো হয়নি।এটি ১২ টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।ভাষণটি এখন বিশ্ব ঐতিয্যের প্রামান্য দলিল। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণটি জাতিসংঘের একটি বিশেষ সংস্থা ইউনেস্কো( শিক্ষা,বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা) বিশ্বের গুরুত্বপূর্ন প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।ভাষণটি ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিষ্টারে’ অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।বিশ্বজুড়ে যেসব গুরুত্বপূর্ন ঐতিয্য আছে সেগুলো সংরক্ষণ করে ইউনেস্কো। যুক্তরাজ্য থেকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত জ্যাকব এফ ফিল্ড সংকলিত ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস-দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টরি’ বইটিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সাল থেকে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের সেরা ভাষণ গুলো স্থান পেয়েছে।২২৩ পৃষ্ঠার বইটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের ভাষণ দিয়ে শুরু ও শেষ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যানের ভাষণ দিয়ে।বইটির ২০১ পৃষ্ঠায় ‘দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইনডেপেনডেনস’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি স্থান পেয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সার্বজনীনতা। ভাষণে গনতন্ত্র,স্বাধীকার,আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবিকতার কথা বলা হয়েছে।তিনি বিশ্বাসের জায়গা থেকে বলেছেন।মানুষ যা জানতে চেয়েছেন তাই-ই বলেছেন।মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণরূপে সমর্থ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় মুক্তিপাগল বাঙ্গালির অনুপ্রেরণা হয়ে শক্তি জুগিয়েছে।ভাষণের মধ্যদিয়ে সমগ্র জাতিকে একটি মোহনায় নিয়ে এসেছিলেন।সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল ভাষণটি। ভাষণটি আমাদের জাতীয় জীবনের অনুপ্রেরণা।যতই দিন যাচ্ছে ভাষণটি ততই বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে আরো তাৎপর্যপূর্ন ও প্রাসঙ্গিক হচ্ছে ।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা। ইমেইল: haldertapas80@gmail.com

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com