বঙ্গবন্ধু ও চা শিল্প

প্রকাশিত: ১২:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২১

বঙ্গবন্ধু ও চা শিল্প

দীপংকর মোহান্ত

জাতীয়তাবাদী ও জনমুক্তির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অন্তরের গহীনে অবহেলিত চা শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাসের স্পন্দন প্রতিধ্বনি হতে শোনা যায় নানাভাবে। ১৯৫৬ সালে চা শ্রমিকদের হাত ধরে তিনি প্রথম বলেছিলেন, ‘তোমাদের সকল দুঃখের খবরই রাখি। এসব দুঃখ দূর করবার জন্য আমরা খুবই চেষ্টা করিব’। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির বাহক হিসেবে চা শ্রমিকদের প্রতি তিনি কেন এমন দরদী ভাব দেখালেন? কেন তিনি গরিব শ্রমিকদের ভাঙা ডেরায় গেলেন? চা শ্রমিকরা এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতার কাছে এমন সবতস্ত্্বতঃস্ফূর্ত আত্ম সমর্পণ করার কারণ কী? বঙ্গবন্ধু এমনকী বীজমন্ত্র দিলেন যে, শ্রমিকরা সকল বাগানী আইন অমান্য করে তাঁরই কাফেলায় এগিয়ে এলো? আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষেÑএই সবে প্রশ্নের জবাব খোঁজা প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু পূর্ববঙ্গের শিল্প উন্নয়নে উদার নীতিমালার অংশ হিসেবে চা শিল্প ও ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ণে অল্প সময়ে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেনÑ এই দিকটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
জানা কথা যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮২৩-২৪ সালে সিলেটের পূর্বাঞ্চলের পর্বত বেষ্ঠিত টিলায় চা-গাছের সন্ধান পেয়ে ১৮৩৬ সালে মধ্যে পুরো আসাম, জৈন্তা, কাছাড় প্রভৃতি জনবিরল বনভূমি ছলে-বলে ও কৌশলে নিজেদের আইনি অধিকারে নিয়ে যায়। নীল চাষের পড়ন্ত বেলায় অঢেল পাহাড়ি অঞ্চল আবাদ করা তখন নব্য শিল্প-উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শ্রমিকের যোগান ছিল অপ্রতুল। ‘গাছ হেংলানেছেÑ পয়সা মিলেগা’ অর্থাৎ গাছে ঝাড়া দিলে বা হেলান করলে পয়সা পড়েÑ এমন অলীক লোভ দেখিয়ে ধুরন্দর ঔপনিবেশিক সরকার ‘আড়কাটি’দের মাধ্যমে দরিদ্রপীড়িত বিহার-উড়িষ্যা প্রভৃতি জায়গা থেকে প্রান্তিক সমাজের অসহায় কৃষকদের নিয়ে এসেছিল শ্রীহট্ট-আসামের গভীর জঙ্গলে। শতশত অদক্ষ কৃষি শ্রমিক শ্বাপদসংকুল পরিবেশে বড়-ই অসহায়ভাবে প্রাণ হারায়। তবুও মরে গিয়ে কিছু সংখ্যক বেঁচে থাকে সবুজ বনছায়ার আড়ালে। যাদের করুণ আর্তনাদ বন-পাহাড়ে আটকে থাকে সুদীর্ঘকাল। ‘গিরমিট’ প্রথায় তারা হয়ে যায় চিরকালের শ্রমদাস। এভাবে চা শ্রমিক ও চা শিল্প পরস্পর একই-সূত্রে বাঁধা পড়ে। ঔপনিবেশিক সরকার চা শিল্পের উৎপাদন ক্রিয়ার অংশবিশেষ যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপকদের দিকে যতটুকু নজর দিয়েছিলÑ তার চেয়ে বেশি অবহেলায় রেখেছিল মূল চালিকা শক্তি চা শ্রকিদের জীবন মান। তখন ধারণা ছিল শ্রমিকরা শিক্ষিত হলে এবং কিছু অর্থ সঞ্চয় করলে তারা বাগানে আর থাকবে না। চা শিল্পের সঙ্গে অন্য শিল্পের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। চা শ্রমিকরা ছিল ঘন অরণ্যের এক ‘নিষিদ্ধ জগৎ’-এর বাসিন্দা। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমও শিল্প মন্ত্রী থাকাকালে চা শ্রমিকদের বন্দিজীবনের বেড়াজাল ছিন্ন করতে তাঁদের কাছে ছুটেছিলেনÑ এমন মানসিকতা দেখানো কেবল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব ছিল। এখানেই বঙ্গবন্ধুর গণ-চরিত্রের দিকটি উদ্ভাসিত হয় বা খোলাসা করা যায়।
চা-শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে গেলো দেড়শত বছর ধরে অনেক আন্দোলন হয়েছে। সবুজ ঘাস দিয়ে বহু শ্রমিকের রক্ত-গঙ্গা বয়ে গেছে। কিন্তু শ্রমিকদের অধিকার ধুলায় লুটিয়ে পড়েছে। নেশায় বুদ হয়ে থাকা শ্রমিকদের পক্ষে এই অমানবিক উত্তুঙ্গ আইনের দেয়াল ও রক্তচক্ষুর সাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না। এমতাবস্থায় বস্তিবাসীদের সঙ্গে বাগানীদের কোনো ধরনের যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় লোকজন শ্রমিকদের ঘৃণার চোখে দেখেছিল। বিশ শতকের চল্লিশের দশক পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী রাজনেতিক নেতাদের বাগানে পৌঁছার সুযোগও ছিল না। বাগান সীমানার বাহিরে যাওয়া চা শ্রমিকের জন্য দ-ণীয় অপরাধ ছিল। ব্যবস্থাপকদের উৎসাহে চা-বাগানে উন্মুক্ত নেশার ব্যবহার [কারখানার মদ ও হাড়িয়া মদ] ও ‘বাগানী টাকা’র উদ্ভবের মধ্যে এই যন্ত্রণাময় জীবন-অধ্যায়ের বেদনা লুকিয়ে আছে।
চা শ্রমিকরা সুখের আলো না দেখলেও লাভের মুখ দেখেছিল কোম্পানির লোকজন। চা-শ্রমিকরা জীবন সংগ্রামের রুক্ষ খাঁচা ভাঙার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল নিজস্ব কায়দায়। কিন্তু সেই ঔপনিবেশিক আইন, ব্যবস্থাপনার চক্রব্যুহ স্তরে গিয়ে তাঁরা বার-বার আটকে পড়েছে একই ফাঁদে। আইন করে আগেই চা বাগানে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করা হয়। ভিন্ন সংস্কৃতি, বহুভাষা, অপ্রতুল যোগাযোগ, শক্ত আইনি পীড়ন এবং শিল্প বৈশিষ্ট্যের কারণে চা বাগানে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ারের ঢেউও চা বাগানে আছড়ে পড়েছিল। গান্ধীর নরম আন্দোলন জনবিচ্ছিন্ন চা বাগানকে উত্তপ্ত করে তোলে। তখন চা শ্রমিকরা মানসচক্ষে মহাত্মা গান্ধীকে উপলব্ধি করেছিল উদ্ধারকারী অবতার হিসেবে। ১৯২১ সালের ৩ মে চরগোলা ভ্যালির আনিপুর চা বাগান থেকে ৭৫০ জন শ্রমিক প্রথম ‘গান্ধী-কা জয়’ বলে আইন অমান্য পূর্বক ১৪৪ধারা উপেক্ষা করে পূর্বপুরুষের ভিটার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তখন যাতায়াতের সহজ পথ ছিল সিলেট-চাঁদপুর রেল পথ ধরে [চাঁদপুরের স্টিমার ঘাটÑ সেখান থেকে কলকাতা]। শ্রমিকদের বাগান ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে অধিকাংশ ব্রিটিশ অত্যাচারিত বাগান থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যায়Ñ যা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘মুল্লুকে চল’ অভিযান নামে পরিচিতি পায়। ব্রিটিশ সরকার রেল গাড়ি, মোটর গাড়ি, স্টীমার প্রভৃতি চা শ্রমিকদের জন্য নিষিদ্ধ করলে তারা পায়ে হেঁটে রেল লাইন ধরে অনিশ্চিত পথে রওয়া দেয়। অবশেষে চা শ্রমিকরা অনেক কষ্টে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে পৌঁছে। ২০ মে রাতের অন্ধকারে গুর্খা সৈন্যদের অত্যাচারে অনেক শ্রমিক প্রাণ হারায়, কিছু সংখ্যক পানিতে পড়ে নিখোঁজ হয় চিরতরে। পরে দেখা দেয় ভারতব্যাপি সংহতিমূলক শ্রমিক ধর্মঘট। আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘট স্থায়ী হয় প্রায় তিন মাস। এই পরিস্থিতিতে কিছু শ্রমিক নিরুপায় হয়ে চোখের জলে স্বজনদের চির বিদায় জানিয়ে ফিরে আসে। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ চাঁদপুরের চা শ্রমিক হত্যাকে ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ হত্যার সঙ্গে তুলনা করেছিল। যে গান্ধীকে তাঁরা নিজেদের নেতা হিসেবে কল্পনা করেছিলÑ অপরিকল্পিত আন্দোলনের ফলে শ্রমিকদের আশা নিঃশেষ হয়ে যায়। গান্ধীও আলাদাভাবে চা শ্রমিকদের জন্য কিছু করেননি। এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পরে সুরমা ভ্যালির চা-শ্রমিকরা বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে প্রত্যক্ষভাবে কাছে পেয়েছিল। অন্তত বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের জন্য বঙ্গবন্ধু কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন।

চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার ও ট্রেড-ইউনিয়ন: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে আসাম ব্যবস্থাপনা পরিষদে আসামের চা বাগানসমূহ থেকে চারজন প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ পায়। তন্মোধ্যে সুরমা-বরাক উপত্যকায় একজন, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় একজন এবং আসামের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দুইজন। প্রথম বছর চা প্লান্টার্সগণ শ্রমিকদের না জানিয়ে নিজেদের মনোনীত শ্রমিক প্রতিনিধি পাঠায়। ফলে আপত্তি ওঠে। পরে সনৎ আহির নামক [শিলিগুড়ি চা বাগান] একজন কংগ্রেস সমর্থক শ্রমিককে চা শ্রমিকরা ভোট দিয়ে এমএলএ নির্বাচিত করেন [তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন কমিউনিস্ট সমর্থক শিব মোহাতোক]। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস সমর্থক জীবন সাঁওতালকে [মাইজডিহি চা বাগান, শ্রীমঙ্গল] চা-শ্রমিকের প্রতিনিধি রূপে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হয়েছিলে। তিনি কংগ্রেস সমর্থক ছিলেন।
আগে চা বাগানে ট্রেড ইউনিয়ন করার নিয়ম ছিল না। অনেক কষ্ট করে ‘শ্রীহট্ট কমিউনিস্ট পার্টি’ ১৯৩৮সালে চা বাগানে ‘শ্রীহট্ট-কাছাড় চা-শ্রমিক মজদুর ইউনিয়ন’ গড়ে তোলে। আবার ‘শ্রীহট্ট কংগ্রেস’ ১৯৪৬ সালে ‘শ্রীহট্টজেলা চা-শ্রমিক কংগ্রেস’ [পরে ইউনিয়ন নাম হয়] গড়ে তোলে। এতকিছুর পরও শ্রমিকরা অধীকার পায়নি। জীবন সাঁওতালের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে সিলেটে গণভোটের সময় চা বাগানের শ্রমিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। সরকার নতুন করে সিলেটের চা শ্রমিকদের ‘ঋষড়ধঃরহম চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ’বলে অভিহিত করে [পূর্ণেন্দুকিশোর সেন, পৃ. ৪৮]। মুসলিমলীগও একই সুর মিলায়। আবার কংগ্রেসীরা শ্রমিকদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম ব্যর্থ হয়। চা-শ্রমিকরা বহিরাগত অনাগরিক হিসেবে কার্যত পড়ে থাকেন অর্থাৎ তারা ভোট দিতে পারেনি। নারীনেত্রী সুহাসিনী দাস তখন চা শ্রমিকের ভোটাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ২৯. ৬. ১৯৪৭ সালে তাঁর ডায়রিতে লিখেনÑ
‘গণ ভোটের আয়োজন চলিতেছে কিন্তু শ্রীহট্টের চা-বাগানের শ্রমিকরা এই ভোটে অংশ নিতে পারিবে না বলিয়া সরকার ঘোষণা দিয়াছে। কারণ হিসেবে তাহারা বলিতেছে যে চা-শ্রমিকরা এইখানকার স্থায়ী জনসাধারণ নয়। কিন্তু তাহারা প্রায় একশত বৎসর ধরিয়া অত্র প্রদেশে রহিয়াছে। তাহাদের ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন চলিতেছেÑ আজ মহকুমা অপিস ঘেরাও করা হইবে।…’
অনেক আন্দোলনের পরও চা শ্রমিকদের ভোটাধিকারের প্রশ্নে দিল্লির সাড়া পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ গণ ভোটের সময় চা শ্রমিকরা নাগরিক পরিচয় পায়নি। সিলেট পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে তখনকার মুসলিম সমাজের তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সিলেট এসেছিলেন। এই সময় চা শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা নয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর চা বাগানের অবস্থা অনেকটা নড়বড়ে অবস্থায় পড়ে যায়; আবার নাগরিক পরিচয় বিহীন চা শ্রমিকরা শাসকদের কাছে মূল্যহীন ঠেকে। অনেক হিন্দু চা বাগান মালিক, স্টাফ ও শ্রমিক দেশ ত্যাগ করেন। ফলে পুরোনো আইন দিয়ে বাগানগুলো চলতে থাকে। চা বাগানে কংগ্রেসীদের দ্বারা যে ইউনিয়ন গড়ে ওঠেছিলÑ কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে রাজি হয়নি। কার্যত শ্রমিকদের কোনো আইনী অধিকার থাকেনি।

বঙ্গবন্ধু ও চা শ্রমিকদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন
পাকিস্তানের শুরুতে কংগ্রেস নেতারা সংগত কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়লে তাঁরা তখনকার সরকারবিরোধী সংগঠন আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ও আওয়ামী মুসলিম লীগ এক লক্ষ্যে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল আলাদা-আলাদা প্রকৃতির [মুসলিম আসন, হিন্দু আসন, তফশিলি আসন ইত্যাদি। এই নির্বাচনে চা শ্রমিকরা আলাদাভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। সেই জীবন সাঁওতাল তখন শিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশন থেকে [চা বাগান অঞ্চল] এম এল এ নির্বাচিত হয়েছিলেন। উরৎবপঃড়ৎু ড়ভ ঃযব চৎড়ারহপরধষ অংংবসনষু, ঊধংঃ চধশরংঃধহ, ১৯৫৭-এর তালিকায় এম এল এ হিসেবে জীবন সাঁওতালের নাম ১৩৩ নম্বরে রয়েছে। তিনি পূর্ব-দক্ষিণ চা বাগান অঞ্চল থেকে চা শ্রমিকের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন [নির্বাচনের তারিখ ১৯৫৪ সালে ১০ মার্চ এবং ২৫ মার্চ ফলাফল প্রকাশ]। চুয়ান্নের নির্বাচনে প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত [১৮৯৫Ñ১৯৭৮] যুক্তফ্রণ্টের হয়ে এম এল এ নির্বাচিত হয়েছিলেন। মূলত তখন থেকে পূর্ববাংলার তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই প্রবীণ চা শ্রমিক নেতাদের একটা সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তখন মুসলিম আওয়ামী লীগের সম্পাদক হয়েছিলেন। অন্যদিকে সর্বত্যাগী পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত পূর্ববঙ্গের রাজনীতিবিদদের মধ্যে খুব পরিচিত মুখ ছিলেন।

চা শ্রমিকদের কল্যাণে বঙ্গবন্ধু
১৯৫৬ সালে প্রাদেশিক কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রীসভায় [আতাউর রহমানের মন্ত্রীসভা] বঙ্গবন্ধু দুর্নীতি দমন, বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প, পল্লিকৃষি ও শিল্প উন্নয়ন, মানবকল্যাণ ও সমাজ উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন [জনশক্তি, ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬]। তখন তিনি প্রথমবারের মতো চা শিল্প ও চা শ্রমিকদের কাছাকাছি আসার আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুকে আমরা চা শিল্প ও চা শ্রমিকদের বন্ধু হিসেবে তিনটি পর্বে দেখতে পাই। প্রথমতÑ মন্ত্রী হিসেবে ১৯৫৬-৫৭ সালের কার্যক্রম। দ্বিতীয়তÑ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে [১৯৫৬-৫৮] কার্যাবলী। তৃতীয়তÑ চা শ্রমিকদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত করে স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশীজন করা।
প্রথমতÑ ১৯৫৬ সালে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পকিস্তানের শিল্পনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। প্রথমত তাঁর শ্রমিক ও জনবান্ধব শিল্পনীতির কথা বলতে হয়। যা বহির্বিশ্বে ব্যবসার উপযোগী ছিল। বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন ও স্বনির্ভর শিল্প বিকাশের পক্ষে ছিলেন। তিনি শ্রমিক ও মালিক উভয়ের স্বার্থকে দেশের ভবিষ্যৎ কল্যাণের দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের শোষণ-বঞ্চণা থেকে চা বাগান ও চা শ্রমিকদের রক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু বাস্তব চিন্তা করে কাজে হাত দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারের চোখে চা শ্রমিকরা ছিল ‘হিন্দু’ ও ‘ভারতীয় চর’-এর মতো ‘বিপদজ্জনক’ বহিরাগত জনগোষ্ঠী। ফলে সরকারের কাছে অবহেলিত চা শ্রমিকরা পূর্ব পাকিস্তানে আরো হীন অবস্থায় পড়ার উপক্রম হয়। এই প্রতিকূলতায় বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিক ও চা বাগান উন্নয়নে বদ্ধ পরিকর ছিলেন। যা চা শ্রমিক নেতারা জ্ঞাত ছিলেন। তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি চারদিকে বাজতে থাকে। চাউলের জন্য চা শ্রমিকরা মহা বিপদে পড়ে যায়। অনেক বাগানে রেশন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই পরিস্থিতিতে চা শ্রমিক প্রতিনিধিরা বাণিজ্য, শিল্প-শ্রম মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তাদের একুশ দফা দাবী উপস্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু ধৈর্য্য সহকারে শ্রমিকদের কথা শোনেন। জনশক্তি পত্রিকা ১০ই আশ্বিন, বুধবার, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে [২৬ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬] ‘শ্রমিকের দুঃখ’ শিরোনামে লেখেÑ
‘আমরা গত সপ্তাহে চা বাগান শ্রমিকদের একুশ দফা দাবী পূরণের বিষয়ে নতুন শ্রম মন্ত্রী জনাব শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছি। বর্তমানে দেশে খাদ্য সমস্যা জটিল আকার ধারণ করিয়াছে। শ্রমিকগণসহ দেশের সকলেই এই সমস্যায় পীড়িত এবং মন্ত্রীম-লী স্বভাবতই দেশের এই সমস্যা সমাধানের উপর বিশেষ দৃষ্টি দিতে বাধ্য হইতেছেন। খাদ্য সমস্যার সুমীমাংসা হইলে তাহাতে শ্রমিকের সমস্যার সমাধানেও সাহায্য হইবে। কিন্তু খাদ্য সমস্যার গুরুত্ব স্বীকার করিয়াও আমরা ইহা বলিতে বাধ্য যেÑ যে কোন প্রকার গুরুতর সমস্যাকেই শ্রমিকদের একুশ দফা দাবী পূরণে বিলম্ব ঘটাইবার অজুহাত সৃষ্টি করিতে দেওয়া যাইতে পারে না।
একুশ দফা দাবী এক বৎসর যাবত গর্ভনমেন্টের নিকট দেওয়া হইয়াছে। বাগানের মালিকগণ নানা ভাবেই এই দাবীগুলি সম্পর্কে পাশ কাটাইয়া যাওয়ার চেষ্টা করিতেছেন।… ’
বাণিজ্য, শিল্প ও শ্রমমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু ২৪ নভেম্বর ১৯৫৬ সালে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। প্রবীণ শ্রমিক নেতাদের কাছ থেকে জানা যায় যে, মন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু ট্রেনে করে সিলেটে আগমনের সময় শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া রেল স্টেশনে গিয়ে শ্রমিকরা ফুল দিয়ে বরণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদের দাবী আদায়ের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছিলেন। ২৫ নভেম্বর সকাল ১০ ঘটিকার সময় বঙ্গবন্ধু সিলেট শহরে বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি খাদিমনগর চা বাগানে শ্রমিকদের সাথে সরাসরি কথা বলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। বঙ্গবন্ধু কোনো প্রটোকল ছাড়াই একজন সাধারণ শ্রমিক-বান্ধব নেতা হিসেবে চা শ্রমিকদের ডেরায় পৌঁছেছিলেন। এমন ঘটনা বাগানে কখনো ঘটেনি। তারা ‘প্রিয় নেতাকে’ বনফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু অনেক বাগানী আইন ও প্রথা উপেক্ষা করেছিলেন। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। একজন মন্ত্রী হয়ে শ্রমিকদের লাইনে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে যাওয়াকে শ্রমিকরা তাঁদের সঙ্কুচিত জীবন-নদে জোয়ারের আভাষ হিসেবে দেখেছে। বঙ্গবন্ধুকে কাছে পেয়ে শ্রমিকরা প্রাণ খুলে কথা বলেন। পুরাতন শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা যায় যে, শ্রমিকদের আপন করতে গিয়ে তিনি তাদের হাতের তৈরি চা খেয়েছিলেন। ‘বাবু’রা সাধারণত চা বাগানের শ্রমিকদের হাতের চা খেতেন না। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘক্ষণ শ্রমিকদের মনের কথা মনোযোগসহ   শুনেছিলেন। জনশক্তি ১৯ অগ্রহায়ণ, বুধবার, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের [৫ই ডিসেম্বর, ১৯৫৬] শিরোনাম ছিল নি¤œরূপÑ
খাদিমনগরে শ্রম মন্ত্রীর সহিত চা শ্রমিকের আলাপ
‘‘আমাদের দুঃখ বলিয়া হয়রান হইয়াছি’’ চা শ্রমিকের মন্তব্য”
‘গত ২৫/১১/১৯৫৬ইং তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রম মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব খাদিমনগর চা বাগানে পঞ্চায়েত ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তাঁহার প্রশ্নের জবাবে বাগানের শ্রমিকরা বলেন যে, “আমাদের অনেক দুঃখ আছে। বহুবার জানাইয়াছি আর কতবার বলিব। বর্তমানে আমরা যে রোজী পাই পরিবার পরিজনের খরচ কুলাইতে পারি না, ছেলেমেয়ের ভরণ পোষণ চালাইতে পারি না। কাপড়- ছোপড় দিতে পারি না। এই রোজীর দ্বারা ছেলেমেয়ের যতœ ও শিক্ষা দিয়া মানুষ বানাইতে পারি না। আমরা যে চাউল পাই তাহাতে সকলের খোরাক পোষায় না। সপ্তাহে অন্ততঃ ২দিন উপবাস করিতে হয়। শীতের কাপড় কিনিতে না পারিয়া ছেড়া বস্তা সংগ্রহ করিয়া শীত কাটাই” ইত্যাদি। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় পঞ্চায়েত সভাপতি শ্রীশ্যামচরণ ঘোষের হাতে ধরিয়া বলেন যে, “তোমাদের সকল দুঃখের খবরই রাখি। এসব দুঃখ দূর করবার জন্য আমরা খুবই চেষ্টা করিব”।
ঢাকায় ফিরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক ও সরকারিভাবে তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করেন। বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানে তিনি সর্বজনীন ভোটাধিকারের পক্ষে ছিলেন এবং আন্দোলনও করেছেন। ১৯৫৬ সালের ১২ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি গৃহীত হয়। ফলে চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার ও নাগরিক পরিচয় পাকাপোক্ত হয়ে যায়Ñ যা তাদের অন্যতম দাবী ছিল। ১৯৫৬ সালে সিলেটে চাউলে মন ২০টাকা থেকে এক লাফে ৩০-৩৫ টাকা হয়ে যায়। অনেক বাগান রেশন বন্ধ করে দেয়। তখন বঙ্গবন্ধু খাদ্য মন্ত্রণালয়ে হস্তক্ষেপ করে বাগানে রেশন সরবরাহ সঠিক রাখার চেষ্টা চালান। এবং বাগান মালিকদের তিনি মানবিক হওয়ার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর চোখ পড়েছিল শ্রমিকদের এক কক্ষবিশিষ্ট অতি ভাঙা ঘরের দিকে। তিনি এক ঘরের ভেতর শ্রকিদের একত্রে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, শ্বশুড়-শ্বশুড়ির ‘লজ্জা-শরম’ নিয়ে বসবাসের দৃশ্য দেখেছেন। পরে তিনি দুই কক্ষ বিশিষ্ট ঘর তৈরি করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়তÑ ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু চা শিল্প ও চা শ্রমিকদের মধ্যে গাঢ় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি মনে করতেন এই দু’য়ের মধ্যে মিলন না ঘটলে পূর্ববঙ্গের শিল্প বিকাশ হবে না। তাঁর স্বপ্ন ছিল এই জনপদের উন্নয়ন। তিনি মনে করতেন শ্রমিকরা উপেক্ষিত থাকলে উৎপাদন বাড়ে না। ইতোমধ্যে ‘চা-শ্রমিক ইউনিয়ন’ শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য মালিক-শ্রমিক চুক্তি করতে কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে কয়েক দফা লেখে; কিন্তু মালিক পক্ষ কোনো চুক্তি করতে চায়নি। এই কঠিন বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু বাগান মালিক পক্ষের প্রতিনিধি, শিল্প মন্ত্রণালয়ের [চা-শিল্প ব্যবস্থাপকসহ] কর্মকর্তাদের সঙ্গে চা-শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে এক ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর এই উদ্যোগকে জনশক্তি পত্রিকা ‘শিল্প-শান্তি’ হিসেবে দেখেছিল। ২৩ মে থেকে ২৫ মে ১৯৫৭ পর্যন্ত ঢাকায় এই ঐকিহাসিক সভা হয়। শ্রমিক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত এমএল এ। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টায় ২৫ মে সরকার পক্ষ, বাগান মালিক পক্ষ ও চা শ্রমিক প্রতিনিধির মধ্যে ৬টি বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা শ্রমিক অধিকারের একটি মাইল ফলক হিসেবে ধরা যায়। চা বাগানে আগে শ্রমিকদের জন্য নামমাত্র বেতন ছিল, কিন্তু চুক্তি ছিল না। বোনাস ও প্রভিডিয়েন্ট ফান্ডের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কারণ মালিক পক্ষের সঙ্গে এই বিষয়ে কখনো শ্রমিক প্রতিনিধিদের বসা হয়নি। ২৯ মে ১৯৫৭ জনশক্তি পত্রিকার শিরোনাম ছিলÑ ‘শ্রমিকদের সর্ব্বনি¤œ মজুরী, বোনাস ও প্রভিডেন্ট-ফ- চালুর পরিকল্পনা’। জনশক্তি পত্রিকা লেখেÑ
‘২৫ শে মে তারিখে ঢাকায় প্রাদেশিক শ্রম সচিব জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে পূর্ব্ব পাকিস্তান শ্রম উপদেষ্টা বোর্ডের তিন দিবসব্যাপী এক সম্মেলন সমাপ্ত হইয়াছে। প্রাদেশিক সরকারের শ্রম বিভাগীয় উর্দ্ধতন কর্ম্মচারীগণ, শিল্পপতিদের প্রতিনিধি ও শ্রমিক প্রতিনিধিগণ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। শ্রীহট্ট জিলার চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শ্রীযুক্ত পূর্ণেন্দুকিশোর সেনগুপ্ত মহাশয়ও বোর্ডের সদস্যরূপে মনোনীত হইয়া সম্মেলনে যোগদান করিয়াছিলেন। সভার সর্ব্ব-সম্মতিক্রমে এক ত্রিবার্ষিক শিল্প-শান্তি চুক্তি গৃহীত হয়। এই চুক্তি অনুয়ায়ী ১। শ্রমিক অথবা ইউনিয়নগুলি তাহাদের দাবীদাওয়ার বিষয় সরাসরি মালিকের নিকট পেশ করিতে পারিবে। ২। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার একটা সুষ্ঠ মান অর্জ্জনের জন্য সর্ব্বনি¤œ মজুরী নির্দ্ধারণের নীতি গৃহীত হয়। ৩। সর্ব্ব নি¤œ দুইশত শ্রমিক বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট-ফা- পরিকল্পনা চালু করা হয়। ৪। যেসব শিল্পে মুনাফা হয় তথায় বার্ষিক বোনাস দিবার নীতি গৃহীত হয়। ৫। শ্রমিকদিগকে গুরতর কোন অন্যায় ছাড়া পূর্ব্বাহ্নে সতর্ক বা সংশোধনের সময় না দিয়া বরখাস্ত করা যাইবে না। ৬। ধর্ম্মঘট অথবা তালাবদ্ধের হুমকি না দেখাইয়া সরাসরি আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই তাহা মীমাংসার চেষ্টা করিতে হইবে। পারস্পরিক মতৈক্য না হইলে এক মাসের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করা হইবে। আগামী ১লা জুন হইতেই তাহা কার্য্যকরী করা হইবে।’
৫ জুন ১৯৫৭ সালে জনশক্তি পত্রিকা ‘পূর্ব্ব-পাকিস্তান শ্রম উপদেষ্টা বোর্ডের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত’ সবিস্তারে দেওয়া হয়। একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদের স্বার্থ সর্বাগ্রে দেখেছিলেন। চা শ্রমিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চা শ্রমিক ও চা শিল্পের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু অল্প দিনে যে বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন। যেমন পুরাতন পদ্ধতির চাষাবাদ ও চারা রোপন প্রক্রিয়ায় নবীকরণে উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। এই উদ্দেশ্যে ১৯৫৭ সালে ‘পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন’ শ্রীমঙ্গলে স্থাপিত হওয়ার পেছনেও তাঁর অবদান রয়েছে। যা আজ ‘বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট’ রূপে সগৌরবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রথম দিকে এই গবেষণাগারে অর্থ বরাদ্দ, নির্মাণকাজ দ্রুত করা, গবেষণা চালুকরণে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ছিল। বঙ্গবন্ধু চা-গবেষণা কেন্দ্রের আধুনিকায়নের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞানের স্বনামধন্য অধ্যপক এ হাসানকে এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
চা শ্রমিকের জন্য বঙ্গবন্ধু অনেক বাস্তব পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করলেও রাজনৈতিক কারণে তিনি পদত্যাগ করার ফলে [১৯৫৭-এর শেষদিকে] সেই স্বপ্নগুলো অদৃশ্য জালে আটকা পড়ে। অথচ মালিকপক্ষ এবং প্রশাসন নিজেদের স্বার্থে বিল্ডিং ও অফিস সবই চালু করে দেয়। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থের সেই ছয়টি চুক্তি হিমাগারে পড়ে থাকে। আইয়ুবের সামরিক শাসন এবং বঙ্গবন্ধুর ঘন-ঘন জেলে থাকায় সরকারের প্রশ্রয়ে মালিকপক্ষ নতুন করে চা শ্রমিকদের প্রতিনিধি সংগঠন ‘চা শ্রমিক ইউনিয়নের’ গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। সে আরেক কাহিনি। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ৭৭ বাগানে ইউনিয়নের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে [মানা/ না মানা] ভোটের ফলাফলে দেখা যায় ‘চা শ্রমিক ইউনিয়নে’র পক্ষে ৯৯% ভোট পড়ে যায়।
সামরিক সরকারের আমলে ১৯৫৮-১৯৬০ পর্যন্ত বাগানে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। ১৯৬০ সালে সামরিক সরকারের শিল্প মন্ত্রী চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের অপসারণের জন্য নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চালায়। বিষয়টি বঙ্গবন্ধু জানতেন। চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতাগণ [কংগ্রেস নেতারা] ১৮.০৯.১৯৬০ থেকে ২৭.০২.১৯৬১ তারিখের মধ্যে সবাই পদত্যাগ করেন। তখন চা শ্রমিক ইউনিয়ন পরিচালনার ভার দেওয়া হয় ‘পাকিস্তান ফেডারেশন অব লেবার’ [পাকিস্তানপন্থি ফয়েজ আহমদ গ্রুপ]-এর একজন ধুরন্দর নেতা এম. সুলেমান-এর হাতে [বাড়ি: মতলব, চাঁদপুর, যিনি মন্ত্রীর কাছের লোক ছিলেন]। চা বাগানে এই সুলেমানের রাজত্ব চলে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত।
তৃতীয়তÑ সামরিক সরকারের কঠিন সময়েও বঙ্গবন্ধু স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের খোঁজ-খবর রেখেছিলেন। ১৯৬৬ সালে শ্রমিক পরিবারের সন্তান রাজেন্দ্রপ্রসাদ বুনারজী [পরে চা শ্রমিক নেতা] ঢাকায় ছাত্রাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর [পুরানা পল্টন অফিসে] সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন চা শ্রমিক পবিারের ছাত্রদের থাকার আলাদা ব্যবস্থা নাই। রাজেন্দ্রবাবু তখন বঙ্গবন্ধুকে চা শ্রমিক সন্তানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আলাদা সিট বরাদ্দের অনুরোধ করেছিলেন। একথা শোনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সময় আসলে সবকিছু করে দেব’। রাজঘাট চা বাগানের বিমল বুনার্জি আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৯৬৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই সময় আমরইলছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত নারীনেত্রী গুণাই তাঁতী বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা চা শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়। ১৯৬৯ সালে গণ অভ্যুত্থানকালে কার্যত বাগানগুলো অচল হয়ে পড়ে। ১৯২১ সালের মতো এবারও চা শ্রমিকরা জাতীয়তাবাদী নেতা ‘বঙ্গবন্ধু’কে ঘিরে অধিকার আদায় ও নতুন দেশ-মাটি পাওয়ার স্বপ্নজাল বুনে। তখন-ই তারা বঙ্গবন্ধুকে ‘বাবা’ হিসেবে মনের গহীনে বরণ করে নেয়। ১৯৬৯ সালে গণ-জাগরণ কালে চা শ্রমিকদের প্রতিরোধের মুখে ‘দালাল সুলেমান হটাও’ আন্দোলন ঘণীভূত হয়। অন্যদিকে শমসেরনগর চা বাগানে পুলিশের গুলিতে নীরা বাউরী নামে একজন শ্রমিক শহিদ হলে তীব্র আন্দোলনের মুখে সুলেমান রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে যায়। সমস্ত চা শ্রমিকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বীরত্ব ও মহত্বের কথা কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালে ‘এক ব্যক্তির এক ভোট’ নীতিমালার আলোকে নির্বাচনে চা শ্রমিকরা প্রথম গণ মানুষের সঙ্গে এককাতারে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার ও সুযোগ পায়Ñ যা তারা বঙ্গবন্ধুর দান হিসেবে আজো মনে করেছে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের [৭ ডিসেম্বর] আগে বঙ্গবন্ধু চা-শ্রমিকদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বাড়াতে থাকেন। প্রখ্যাত চা-শ্রমিক নেতা সীতারাম বর্মা [১৯১১-১৯৮৮] এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ৭০-এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ভোটে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে চা শ্রমিকদের সকল ধরনের নাগরিক সুবিধা ও অধিকার দেবেন। সত্তরের নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু সিলেট, কুলাউড়া, টেংরা বাজার, জুড়ি, মৌলভীবাজার, শমসেরনগর, শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জ জেলা নানা জায়গা সফরের সময় চা-শ্রমিকরা প্রতিটি সমাবেশে অংশ নিয়েছিল। তখন বাগানের আইন শিথিল হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের আইন শ্রমিকরা মানতে চায়নি। তারা বাগানের কাজে না গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মিটিং-এ দলেদলে যোগদান করতে থাকে। যে যে বাগানের ম্যানেজার সেদিন ছুটি দেয়নি বা সভায় আসতে বাধা দিয়েছেÑ সেখানে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করে বেরিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর সভায়। কয়েকটি বাগানের মালিকÑ যেমন আমীনূর রশীদ চৌধুরী ও নির্মল চৌধুরীÑ তাদের বাগান থেকে বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁদের হৃদ্যতা ছিল পারিবারিক আত্মীয়ের মতো। নির্মল চৌধুরীর মালিকানাধীন কমলগঞ্জ নন্দরাণী চা বাগানের বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন, রাত্রিযাপনও করেন। ১৯৭১ সালে নির্মল চৌধুরীকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে হত্যা করে। আমীনূর রশীদ চৌধুরীকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের মুখে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সখ্যতা থাকার প্রশ্ন ওঠায়। অনেক চা বাগানের ম্যানেজার বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করেন। রাজঘাট চা বাগানের ব্যবস্থাপক এ. জেড. এম. বি. মজুমদার [দরগা মহল্লা, সিলেট] বঙ্গবন্ধুর প্রিয় ছিলেন। তাঁর কারণেই বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী জনসভার পর নিরাপত্তার জন্য জাগছড়া ও ফুলছড়া চা বাগানে গোপনে রাত্রিযাপন করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু অক্টোবর মাসে [সম্ভবত] শমসেরনগর বাজার চৌমুহনায় চা শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সভায় চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে স্টেজে বসেছিলেন শ্রমিক নেতা সীতারাম বর্মা [১৯১১-১৯৮৮]। তিনি শ্রমিকদের পক্ষে ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুও শ্রমিকদের দুর্গতি লাঘবের কথা বলেন। সেদিনের স্মৃতি কথা এখনো ভুলতে পারেননি শমসেরনগর ইউপির প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও শহিদ পরিবারের সন্তান মো. আব্দুল মছব্বির। তিনি বলেন, ‘শত-শত চা-শ্রমিক নর-নারী ‘বঙ্গবন্ধু কী জয়’ ধ্বণি দিয়ে সমাবেশে মাঠে জড়ো হয়েছিল। উপস্থিত জনতার মধ্যে চা শ্রমিকরা ছিলেন সর্বাধিক। সে দিন চা শ্রমিকরা কাজে যায়নি। বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলেছিলেন। সীতারাম বাবু শ্রমিকদের পক্ষে বক্তৃতা দেন।’ এই জনপদে নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চা শ্রমিকদের সংযোগ ঘটানোর কাজে গুরুত্ব দিয়েছিলেন জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী [সিলেট], জননেতা মো. ইলিয়াস [কমলগঞ্জ], মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার [কুলাউড়া], কমান্ডেড মানিক চৌধুরী [হবিগঞ্জ], আজিজুর রহমান [মৌলভীবাজার শহর] প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। সিলেটের সীমান্তবর্তী চা বাগানগুলোতে বঙ্গবন্ধুর বার্তাকে পৌঁছানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন কিরণ বিশ্বাস [জাফলং চা বাগান], কীর্তন নায়েক [লালাখাল চা বাগান], বীরবল বাড়াইক [খান চা বাগান], ভরত বুনার্জি [খাদিম চা বাগান] প্রমুখ। কুলাউড়ায় বঙ্গবন্ধুর মিটিং-এ চা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে সাহায্য করেছিলেন প্রবীণ চা শ্রমিক নেতা নিকুঞ্জ চৌধুরী, শ্যামনারায়ণ গড় [লংলা চা বাগান], শ্যামনারায়ণ কালোয়ার [লংলা চা বাগান] প্রমুখ। টেংরা বাজারে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় শতশত চা শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রামনারায়ণ কালোয়ার [রাজনগর চা বাগান], সূর্যবাণ সিংহ [রাজনগর চা বাগান], কুবেরপ্রসাদ কালোয়ার [রাজনগর চা বাগান], কপিল দেব মু-া [রাজনগর চা বাগান], সীতারাম নাইডু [সাকেরা চা বাগান] প্রমুখ। চা বাগান অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রে শ্রমিকদের শতভাগ ভোট বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার প্রবণতা এখনো চা বাগানে প্রবল। চা শ্রমিকরা বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে ধারণ করেছিলÑ তাঁদের ভোট দেওয়ার প্রবণতা থেকে বুঝা যায়।
১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে চা শ্রমিকরা তীরধনুক নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধে চা বাগানে গণহত্যা হয়েছে বেশি; নারী নির্যাতনের মাত্রাও ছিল কল্পনাতীত। তেলিয়াপাড়া থেকে শুরু করে জাফলং পর্যন্ত সীমান্তবর্তী প্রায় শতাধিক কিলোমিটার জায়গা চা বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই সব এলাকায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে চা শ্রমিকের অবদান স্মরণীয়। তেলিয়াপাড়া চা বাগান, ধলই চা বাগনের কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। চা শ্রমিকরা বঙ্গবন্ধুকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলÑ বুকের রক্ত ঢেলে তাঁরা প্রমাণ করে গেছে। বঙ্গবন্ধুও চা শ্রমিকদের ছাড়েননি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ অক্টোবর ‘শ্রীহট্ট জেলা চা শ্রমিক ইউনিয়নে’র সাধারণ সম্পাদক শ্রমিক নেতা রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনারজী বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন [জনশক্তি, ৯ নভেম্বর, ১৯৭২। সংবাদ শিরোনাম: ‘বঙ্গবন্ধু সকাশে চা-শ্রমিক নেতা’]। বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের কথা শোনেছিলেন। বিধ্বস্ত চা বাগানগুলো রক্ষা করা ও পুনর্গঠনের রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েছিলেন। পুনরায় চা শ্রমিকদের রেশনিং প্রথা দ্রুত চালু করতে তিনি মালিকপক্ষকে চাপ দেন। স্বাধীনতার পর চা শ্রমিকরা মূলধারার জনসাধারণের সঙ্গে চলাফেরা ও রাজনীতি করার সুযোগ পায়। এবং স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা ভোট দেওয়া নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করেন। ইতোমধ্যে ঔপনিবেশিক আমলে সৃষ্ট বাগানী আইনের বিলোপ ঘটে। এই সমস্ত ধারাবাহিক ঘটনার পিছনে বঙ্গবন্ধু কাজ করেছিলেন। চা-শ্রমিকরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি এতই অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল যে, স্বাধীনতার পর তাঁরা বঙ্গবন্ধুর ৫৩ তম জন্মতিথি পালন করতে ভুলেনি। ২২ শে চৈত্র ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের জনশক্তি পত্রিকা ‘শ্রমিকদের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জন্মতিথি’ শিরোনামে লেখে, ‘বঙ্গবন্ধুর ৫৩ তম জন্মদিবস মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। তাহাতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শ্রীরাজেন্দ্র প্রসাদ বুনারজী সভাপতিত্ব করেন এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন আদর্শকে সামনে রাখিয়া দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করিতে সকলকে আহবান জানান।’ বঙ্গবন্ধু চা বাগানে স্কুল গড়ার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে এই কর্মসূচি বেশি অগ্রসর হতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার আদর্শ মতো চা বাগান এলাকায় ২০১৩সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনধাপে ৫০টি চা বাগানে ৫১টি প্রাথমিক স্কুলকে সরকারিকরণ করেছেন [জুড়ি উপজেলাÑ৭, রাজনগর উপজেলা-১, কুলাউড়া-২, বড়লেখা-৪, শ্রীমঙ্গল-৩৪, কমলগঞ্জ-৩]। তাঁর কল্যাণে শ্রীমঙ্গলে চালু হয়েছে দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র। পরিশেষে জাতির পিতাকে তাঁর অবিনাশী কাজের জন্য শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর জন্মশতবর্ষে চা-শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নয়নে বেসরকারি-সরকারি পর্যায়ে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
চা-শিল্প উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু
ভারত ও পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলার প্রধান শিল্প ছিল চা ও পাট। সিলেটী চায়ের জন্য বহিঃবিশ্বে নাম-ডাক ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ পর্বে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যয় এবং পরে ভারত-ভাগের কারণে চা-বাগানগুলোতে মন্দাভাব দেখা দেয়। তার রেশ চলেছিল কয়েক বছর। অন্যদিকে পূর্ববাংলার প্রতি পাকিস্তান সরকারের শোষণমূলক নীতির ফলে চা-শিল্পের গুণগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। এই দৈন্য দশার মুক্তি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি শ্রম, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকা কালে চা-শিল্পের উন্নয়নে বাস্তব সম্মত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি চা থেকে বৈদেশিক আয়ের অংশকে পূর্ববাংলার পুনর্গঠন কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তখনো বাংলায় চা-ছাড়া বৈদেশিক আয়ের জন্য অন্য কোনো ভারী শিল্প গড়ে ওঠেিেন। ফলে চা-শিল্পকে রক্ষ করতে তিনি এগিয়েআসেন। তা ছাড়া এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল কয়েক লক্ষ শ্রমিক। বঙ্গবন্ধুর কাছে এই সুযোগটা এসেছিল তিনি শ্রম-শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকা কালে। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬-৫৭ সালে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ, বাগান ব্যবস্থাপক এবং মৃত্তিকা ও কৃষি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলাপক্রমে চা-শিল্পের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে চা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন কালে তিনি ঢাকা শহরের মতিঝিলে চা-বোর্ডের নিজস্ব ভবন নির্মাণে প্রশংসনীয় সহায়তা দান করেন। তাছাড়া চায়ের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে কয়েকবার শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট অঞ্চলের অনেক চা-বাগান ঘুরে-ঘুরে দেখেন। তিনি চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেযারম্যান হিসেবে চা-শিল্প বিকাশে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েছিলেন। চা-গবেষণায়ও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বিশেষত চা-বোর্ডের অধীন ১৯৫৭ সালে ‘পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন’ শ্রীমঙ্গলে স্থাপিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর মাথায় তখন পূর্ব-বঙ্গের উন্নয়নের চিন্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মান্দাতা কাটিয়ে চীন ও ভারতের চা তখন বিশ্ববাজার দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তানের চা-এর গুণমান বৃদ্ধি করাকে বঙ্গবন্ধু একটা চেলেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগের ফলে ১৯৫৭Ñ৫৯ সালে চা উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। চা-বোর্ডের রিপোর্টে প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধুর বহুমুখী প্রচেষ্টার ফলে ১৯৫৮-৫৯ অর্থ বছরে চা উৎপাদন সর্বোচ্চ একর প্রতি ৭৪৫ পাউন্ড বেড়ে যায় [আগে ছিল একর প্রতি গড় ১২৪ পাউন্ড। ১৯৫৭-৫৮সালে দাঁড়ায় ৬২১ পাউন্ডে]। অর্থ আয়ের দিকে থেকে দেখা যায়, ১৯৫৮-৫৯ সালে ১১৭৩৬৮১২ লাখ পাউন্ড চা বিদেশে রপ্তানি করে ৩০ মিলিয়ন টাকা আয় হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে কর্ণফুলি ও ভাড়াউড়া চা বাগানে পরীক্ষামূলক ‘রেসিস্টেন্ট ক্লোন’ জাতের চায়ের চারা লাগানো হয়েছিল।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক পূর্বাঞ্চলে বিমাতাসুলভ আচরণের ফলে চা-শিল্পে বঙ্গবন্ধু উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু তাঁর সুদূর প্রসারি কর্ম-পরিকল্পনা চা-শিল্পকে বেগবান করেছিল। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান টি এ্যাক্ট ১৯৫০-এর ৭ নম্বর ধারার সংশোধনী [পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটি বিলুপ্ত] করে কমিটির কার্যক্রমকে টি বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বঙ্গবন্ধু অবদান রয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় চা-বাগানগুলো অনেকটা নরকে পরিণত হয়েছিল। বিধ্বস্ত চা-বাগানগুলো পুনরুৎপাদনে বঙ্গবন্ধু যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তানী মালিকানাধীন পরিত্যক্ত চা-বাগানকে তিনি সরকারীভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। তখন নিষ্প্রভ চা-বাগানকে নতুন করে গড়ে তোলতে তিনিবহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিধ্বস্ত চা-বাগানে সহায়তার জন্য বঙ্গবন্ধু কমনওয়েলথ সচিবকে অনুরোধ করলে তারা সাড়া দিয়েছিল। তিনি ১৯৭২Ñ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চা-শিল্প রক্ষার জন্য অনেক ভর্তুকি দিয়েছিলেন। এমনকি সার সরবরাহে ভর্তুকীর ব্যববস্থাও রাখেন। যুদ্ধের সময় প্রায় সকল চা-কারখানা ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছিলÑ সেগুলো চালু করতে জাতির পিতা ভারতের ‘ইন্ডাস্টিয়াল ডেভেল্পমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ থেকে ৩০ লাখ ভারতীয় রূপী নিয়ে কলকজ্বা আনয়নের ব্যবস্থা করেন। বঙ্গবন্ধু টি বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেন প্রণোদনার জন্য প্রভিডিয়েন্ট ফান্ড চালু করেন। চা-শিল্পের উন্নয়ন ও চা-শ্রমিকদের আর্থ-সামাজিক গুণমানে পরিবর্তনের জন্য ‘মুজিব বর্ষে’ আলাদা কর্মসূচি নেওয়া দাবী রাখে। তাহলে ১৯৫৬ ও ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া প্রতিশ্রুতি চা-শিল্প ও শ্রমিকজীবনে নতুন করে ইতিহাস গড়বে বলে সকলের বিশ্বাস।

উৎসমুখÑ
ক. আলাপচারিতা [বর্তমানে ০১ থেকে ০৭ সাত পর্যন্ত নেতারা পরলোকগমন করেছেন]
১. সীতারাম বর্মা, শমসেরনগর. মৌলভীবাজার
২. নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী, চালিবন্দর, সিলেট
৩. সুহাসিনী দাস, রঙ্গিরকূল আশ্রম, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার
৪. সূর্যমণি দেব, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
৫. মোহাম্মদ ইলিয়াস, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
৬. মো. আব্দুল জব্বার, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার
৭. মফিজ আলী, শমসেরনগর মৌলভীবাজার
৮. রাজেন্দ্র বুনার্জি, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
৯. আজিজুর রহমান, চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ মৌলভীবাজার ও প্রাক্তন গণ-পরিষদ সদস্য
১০. অপূর্বকান্তি ধর, মৌলভীবাজার
১১. শিবশঙ্কর তাঁতী [বীর মুক্তিযোদ্ধা], শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
১২. মোহাম্মদ আব্দুল মছব্বির, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, শমসেরনগর
১৩. পরাগ বাড়ৈ, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
১৪. কিশোলয় চক্রবর্তী, শিক্ষা অফিসার, প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগ, সিলেট
খ. গ্রন্থ
১.উরৎবপঃড়ৎু ড়ভ ঃযব চৎড়ারহপরধষ অংংবসনষু, ঊধংঃ চধশরংঃধহ, ১৯৫৭, পূর্ব-পাকিস্তান সরকারী প্রেস, ঢাকা, পৃ. ১০, ২৮
২.নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী, কর্মযোগী পূর্ণেন্দুকিশোর সেন,শিলচর, কাছাড়, আসাম, ১৩৯০ বঙ্গাব্দ, পৃ.৬১
৩. সুহাসিনী দাস সংবর্ধনা গ্রন্থ, নৃপেন্দ্রলাল দাশ, দীপংকর মোহান্ত প্রমুখ সম্পাদিত বই-এর ‘দেশ বিভাগের ডায়েরি (১৯৪৭)’ অংশ, পৃ. ৩১৭, সিলেট, ১৯৯৯,
৪. দীপংকর মোহান্ত, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের চা-শ্রমিক, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০০
৫. রসময় মোহান্ত, চা শিল্প ও শ্রম, মৌলভীবাজার, ২০০৮
৬. আবুল কাসেম, চা শিল্পের ইতিহাস, গতিধারা, ঢাকা, ২০১০
৭. আবুল কাসেম, বঙ্গবন্ধু ও চা শিল্প, বাংলা একাডেমি, ২০২০
৮. বিবেকানন্দ মোহন্ত, চরগোলা এক্সোডাসÑ১৯২১, শিলচর, আসাম, ২০১৪
গ. পত্রিকা
১. সাপ্তাহিক জনশক্তি, ২৬ সেপ্টেম্বর ও ৫ই ডিসেম্বর, ১৯৫৬, সিলেট
২. বিচিত্রা, ২১ জুন ১৯৭৯ [বাংলাদেশের চা-বাগান এক নিষিদ্ধ জগৎ, প্রতিবেদন, লেখক: শাহরিয়ার কবির]

 

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930