বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন

প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২১

বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন

অজয় দাশগুপ্ত

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের ৩-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ ৪-ক অনুচ্ছেদে ‘জাতির পিতার প্রতিকৃতি’ যে সব স্থানে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে, তার উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের সর্বশেষ ১৫৩ অনুচ্ছেদের ২-ধারায় বলা হয়েছে- ‘বাংলায় এই সংবিধানের একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ ও ইংরাজিতে অনুদিত একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ থাকিবে… বাংলা ও ইংরাজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’ [ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষের আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানের ‘The Second Proclamation (Fifteenth Amendmaent) Order 1978’ জারি করেন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ১৯৭১ সালে মহান মুক্তি সংগ্রামে আত্মদানকারীদের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন ঘটানো হয় এ সংশোধনীর একটি ধারায় এভাবে- ‘সংবিধানের বাংলা ও ইংরাজি পাঠের মধ্যে কোন বিরোধ, বৈপরিত্য, অসংগতি অথবা অসামঞ্জস্যতার ক্ষেত্রে, যতদূর তাহা উক্ত ফরমানসমূহ দ্বারা সংবিধানের কোন পাঠ কিংবা উহার উভয় পাঠের কোন সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন অথবা বিলোপসাধন সম্পর্কিত হয়, ইংরাজি পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’]

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এটা সংবিধানের ৪-ক অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। কেন তিনি জাতির পিতা, সেটা ষষ্ঠ তফসিলের ১৫০(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে এভাবে- ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’

বঙ্গবন্ধু এ ভূখণ্ডের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর আহ্বানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য লাখ লাখ তরুণ-যুবক অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। মুক্ত স্বদেশে আর্থসামাজিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি প্রণীত হয় সংবিধান, যেখানে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ৪ মার্চ পাকিস্তানের এক গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটির কয়েকজন সদস্য বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে একটি লিফলেট বিতরণ করেছে। লিফলেটে অন্যান্যের সঙ্গে ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ার শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রয়েছে।’ [সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭]

বঙ্গবন্ধু ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত কলিকাতায়মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় আসার পর সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। ৪ জানুয়ারি (১৯৪৮) গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। তাঁর নিজের ভাষায় বলতে হয়- ‘ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠান গঠন করার সাথে সাথে বিরাট সাড়া পাওয়া গেল ছাত্রদের মধ্যে। এক মাসের ভেতর আমি প্রায় সকল জেলায়ই কমিটি করতে সক্ষম হলাম। যদিও নইমউদ্দিন কনভেনর ছিল, কিন্তু সকল কিছুই প্রায় আমাকেই করতে হত।’ [শেখ মুজিবুর রহমান-অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৪৯]

নবগঠিত এ সংগঠনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ আসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা রোধ এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা। তবে মাত্র ২৭ বছর বয়সেই শেখ মুজিবুর রহমানের

-২-

মনোজগতে চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে- পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোতে বাঙালির মুক্তি নেই। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি খ্যাতিমান লেখক অন্নদা শঙ্কর রায়কে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলাভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে।’ [সূত্র : অন্নদা শঙ্কর রায়ের লেখা ‘ইন্দ্রপাত’- মূল গ্রন্থ শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, পৃষ্ঠা ৩৬]

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে তিনি বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। ১৯৪৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার তাজমহল সিনেমা হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন এবং এ উপলক্ষ্যে আরমানিটোলা ময়দানের জনসভায় তিনি ছাত্র সংগঠনের করণীয় হিসেবে যে সব বিষয় তুলে ধরেন তার মধ্যে ছিল- বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, নিরক্ষরতা দূর করার জন্য নৈশবিদ্যালয় স্থাপন, বিতর্কসভা গঠন, পাকিস্তান সরকারের জুলুম-নির্যাতন-শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা প্রভৃতি। তিনি ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের দাবি তুলে বলেন- পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যাদের এ ভূখণ্ড রক্ষার জন্য আনা হয়েছে তারা এখানের ভৌগোলিক পরিবেশ বোঝে না। [গোয়েন্দা রিপোর্ট, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৯ ও ২৭৫]

বাঙালি ছাত্র-তরুণদের হাতে অস্ত্র কী অমিত শক্তি অর্জন করে, সেটা পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু এটা বুঝতে পেরেছিলেন ১৯৪৯ সালেই, বয়স যখন মাত্র ২৯ বছর।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হয়। ডাকা হয় হরতাল। বঙ্গবন্ধু হরতাল সফল করার জন্য বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলা সফর করেন। ঢাকায় হরতালের পিকেটিং করতে গিয়ে গ্রেফতার হন তিনি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ছাত্রছাত্রীরাই হরতাল সফল করায় মুখ্য ভূমিকা পালন। আমাদের জেলের ‘দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হত না। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই, পুলিশি জুলুম চলবে না- নানা ধরনের স্লোগান।’ এই সময় শামসুল হক সাহেবকে বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৯৩-৯৫]

বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালেই তার কাছে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কামরুদ্দিন আহমদ হাজির হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের আপস প্রস্তাব নিয়ে- বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারিভাষা করা হবে, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার অনুরোধ জানান হবে গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে এবং হরতালের সময় আটক সকল বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। বন্দি ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এ আপস ফরমুলা অনুমোদন করলে সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদের চুক্তি সই হয়।

এ ঘটনায় সংগ্রাম পরিষদে বঙ্গবন্ধুর কতটা প্রভাব ছিল, তা অনুমান করা যায়। গোয়েন্দা রিপোর্ট সূত্রে আমরা আরও একাধিক ঘটনা জানতে পারি, যা থেকে সেই তরুণ বয়সেই বঙ্গবন্ধুর প্রভাব সম্পর্কে ধারণা মেলে। ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের সমর্থনে ছাত্র ধর্মঘট ও উপাচার্যকে অবরোধ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। এর আগে তাঁর ছাত্রত্বও কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৪৯ সালের ৯ মে তাঁর কাছে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে আপস প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। তাকে বলা হয়- ক্ষমা চাইলে মুক্তি মিলবে, ছাত্রত্বও ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ‘He was not ready to offer any apology’ [গোয়েন্দা রিপোর্ট, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬]

-৩-

এ দফায় জেলে থাকার সময়েই তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্মসম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৬ জুন (১৯৪৯) তিনি মুক্ত হন, জেলগেটে তাকে ব্যান্ড পার্টি নিয়ে সংবর্ধনা দিতে হাজির হন দলের প্রধান ভাসানী সাহেবসহ অনেক নেতা ও কর্মী।

অসামাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কৃষক সমাবেশে যোগ দিয়ে ঢাকা ফেরার সময় সঙ্গী ছিলেন খ্যাতিমান পল্লিগীতি শিল্পী আব্বাসউদ্দিন সাহেব। তিনি বলেন, ‘মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে।…বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।’ [পৃষ্ঠা ১১১]

গোয়েন্দা রিপোর্ট জানায়, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ১৪ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কাছে এক কৃষক সমাবেশ এবং একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন। [প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৬]

এক তরুণ ছাত্রনেতার ওপর খ্যাতিমান জনপ্রিয় শিল্পীর (তাঁর বয়স প্রায় ৫০ বছর এবং শেখ মুজিবের ২৯ বছর) কী আস্থা!

অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী তাকে পশ্চিম পাকিস্তান পাঠিয়েছিলেন উভয় পাকিস্তান মিলে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠার বিষয় নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য। অবিভক্ত বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং খ্যাতিমান আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বয়স তখন ৫৭ বছর। তাকেসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিশিষ্ট মুসলিমলীগ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক আওয়ামী লীগ গঠনের দায়িত্ব মওলানা ভাসানী অর্পন করেন ২৯ বছর বয়সী ‘মজিবরের’ ওপর। এ সফরের জন্য অর্থের কী ব্যবস্থা হবে সে প্রশ্নে উত্তর এসেছিল- ‘তা আমি কি জানি! যেভাবে পার লাহোর যাও।’ [পৃষ্ঠা ১৩৫]

তিনি লাহোর এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে গিয়ে দলনেতার অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষভাবে তুলে ধরেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা।

নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ফিরে আসেন এবং ১৯৫০ সালের প্রথম দিনে তাঁর স্থান হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এ জেলজীবন স্থায়ী হয় ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে রচিত হয় অমর ২১ ফেব্রুয়ারির অমর গাঁথা।

কারাগারে থাকার সময় তিনি কী করেছেন? গোয়েন্দা রিপোর্ট সূত্রে (৮ ডিসেম্বর, ১৯৫১) আমরা জানতে পারি, তিনি অসুস্থতার কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ‘শেখ মুজিব হাসপাতালে ছাত্রলীগ সভাপতি খালেক নেওয়াজের সঙ্গে বিনা অনুমতিতে প্রায় আধা ঘন্টা কথা বলেছেন। এ জন্য জেল কোড অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। [গোয়েন্দা রিপোর্ট দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩০]

১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি অপর এক গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়, নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনা হয়। কিন্তু তিনি ‘taking undue advantage of his coming to Dacca in furtherance of his political activity’ [গোয়েন্দা রিপোর্ট, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৭]

-৪-

হাসপাতালে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করেছেন? তিনি লিখেছেন, ‘আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। … বললাম খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে।… বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। … খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে। কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি।… পরের দিন রাতে এক এক করেঅনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১ শে ফেব্র“য়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে।…আমিও আমার মুক্তির দাবি করে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করব।’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠ ১৯৬-১৯৭]

২১ ফেব্রুয়ারি এবং পরের কয়েকটি দিনের ঘটনা আমাদের এ ভূখণ্ডে নতুন ইতিহাস রচনা করে। বাঙালি ঢাকা শহর রক্তে রাঙায়। ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’ বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভের সংগ্রামে হয়ে ওঠে প্রেরণা। আন্দোলনের চাপে বঙ্গবন্ধুকে ২৭ ফেব্র“য়ারি মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা থেকে সর্বত্র নির্দেশ যায়, ‘Keep continuous watch on Sk Mujibur Rahman and if he indulges again in prejudicial activities he should be arrested.’ [গোয়েন্দা রিপোর্ট, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬]

কিন্তু তিনি যে অদম্য। সামরিক আইন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার পর পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদণ্ড প্রদান ও কার্যকর করার উদ্যোগের পরও তিনি প্রিয় বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করে থেকেছেন চিত্ত যেথা ভয় শূন্য। রুখবে তাকে কে? তাঁর স্বপন পূরণ হয়। বাঙালি শুরু করে নবযাত্রা।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা স্বীকৃত হয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। এই বিশ্ব সংস্থাই বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে সাড়া দিয়ে অমর ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এখন বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে পালিত হয় এ মহান দিবস। শত শত কোটি মানুষের কণ্ঠে আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… তারা স্মরণ করে ভাষা শহীদদের, শ্রদ্ধা জানায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ এই আন্দোলনের বীর নায়কসহ সকল অংশগ্রহণকারীকে।

 

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930