‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে লন্ডনে সক্রিয় হয়েছিলাম’

প্রকাশিত: ১০:০২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে লন্ডনে সক্রিয় হয়েছিলাম’

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সূদীর্ঘ সম্পর্ক ও যোগাযোগ এর ভিত্তিতেই যখন এবারের সিলেট সফরে যাবার পর তাঁর ফোনে দীর্ঘদিন পরে যোগাযোগ হলো  তিনি আমাকে শহরের টিলাগড়ে তাঁর বাসভবনে স্বাগত জানালেন। ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সংসদ সদস্য ও সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগ নেতা মুহিবুর রহমান মানিক সাহেবের ল্যান্ডক্রুজার গাড়ীতে উঠে যখন সিলেটের পথে যাত্রা করি সেদিন ছিল শুক্রবার। পথে যেতে যেতে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা মহাকালের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে রচিত আমার গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত এক ইতিহাসের প্রচ্ছদ’ এর জন্য সিলেটে যেয়ে বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিলেট অঞ্চলের পরীক্ষিত নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখেছিলাম।

 

এই পথে যাত্রার ইতিহাস আমার জন্মের ইতিহাসের সাথে অনবদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমার জন্মভূমি সিলেট। এই পথ ও প্রান্তর আমার চিরচেনা। সবুজ চা বাগানের সারি আর হাসন রাজার গান আমার প্রাণের চিরসাথী। গাড়ীতে একা বসে বিভিন্ন কথাই ভাবছিলাম আর লক্ষ্য করছিলাম শত মাইলের চেয়েও অধিক গতিতে ড্রাইভার শাহজাহান ভাই ল্যান্ডক্রুজার গাড়ীটি চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার পকেটে কোন টাকই ছিল না। জুম্মার আযানের সময় লক্ষ্মীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল আউয়াল সাহেব দশ হাজার টাকা পাঠালেন বিকাশ করে। ব্রাহ্মবাড়িয়াতে টাকা ক্যাশ আউট করে আমার জন্মস্থান মাধবপুরে যাত্রাবিরতী করে মধ্যহ্নভোজ করে নিয়েছিলাম। নানাবাড়ীতে চা-বিরতীর পর পূনরায় ল্যান্ডক্রজারটি সিলেটের পথে এগুতে থাকে। রাতে বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে সিলেট জেলা পরিষদের অডিটরিয়ামে তিল ধারণের ঠাই নেই। ডিনারের পর ছাতক গেস্ট হাউসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম শফিকুর রহমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করার বিষয়টি।

 

 

দু-তিনদিন মুহিবুর রহমান মানিকের সাথে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সেই সুযোগ আর আসেনি। ৮ ফেব্রুয়ারি সুযোগ হয়ে গেলো শফিকুর রহমান চৌধুরীর সাথে দীর্ঘদিন পর যোগাযোগ করার। আগের রাতেই টেলিফোনে কথা হয়েছিল। সকালে ব্রেকফাস্ট করেই শুনশান নিরব শহরে সিএনজি নিয়ে টিলাগড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। শেষবার শফিকুর রহমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ হয়েছিল ঢাকা ক্লাবে। তখন যুদ্ধাপরাধীদের আন্দোলনে ঢাকা শহরের শাহবাগে উত্তাল জনসমুদ্র। সেই উত্তাল আন্দোলন এর উপর দিয়ে ঢাকা ক্লাবে গিয়ে দেখলাম শফিকুর রহমান চৌধুরী আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। টিলাগড়ে যেয়েও বুঝলাম শফিকুর চৌধুরী অপেক্ষা করছেন আমার জন্য।

 

তাঁর পরিবার বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইংল্যান্ডে শফিকুর রহমান চৌধুরীর পিতার রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। আবার টিলাগড়ের এই বাড়িতেও বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন ১৯৭০ এর নির্বাচনের আগে। মুজিব জন্ম শতবর্ষে শফিকুর রহমান চৌধুরী সিলেটের টিলাগড়ে আমাকে এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন যেখানে তিনি অনেক ঐতিহাসিক পটভূমির অপ্রকাশিত তথ্য প্রকাশ করেছেন। পাঠকের জন্য এখানে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত করা হলো।

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ মুজিব জন্ম শতবর্ষে আপনাকে শুভেচ্ছা ও আমার স্টুডিওতে স্বাগতম। শৈশবকাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আপনার সংশ্লিষ্টতা ও যোগাযোগ সম্পর্কে জানাবেন কি?
শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ ধন্যবাদ আপনাকে। মুজিব বর্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। যাঁর জন্ম না হলে আমরা আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারতাম না। যার জন্ম না হলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের স্থান হতো না। যার জন্ম না হলে সারাবিশ্বে আমাদের লাল-সবুজ পতাকাটি উড়তো না। যার জন্ম না হলে সারা বিশ্বে বাঙালী সমাজ মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারতো না। মহান জাতির মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুজিব বর্ষে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। শ্রদ্ধা সহকারে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লক্ষ জনতা ও চার লক্ষ মা-বোনকে। আর স্মরণ করছি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা ও শেখ জামাল, শেখ কামাল ও শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা তাজুদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ কামরুন্নজামান সাহেবকে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সিলেট অঞ্চলের তুখোড় নেতা বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, কূটনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ সকলকে। যারা স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কর্মকান্ডে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। আরও স্মরণ করছি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এডভোকেট আব্দুর রহিম, ইফতেকার হোসেন শামীম, এনামুল হক চৌধুরী বীরপ্রতীক, আশরাফ আলী, শাহ আজিজসহ আমার নির্বাচনী এলাকার সকলকে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার পিতা আব্দুল মতিন চৌধুরী, মতিউর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান চৌধুরীকে যারা স্বশরীরে বঙ্গবন্ধুর সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ¯েœহধন্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমাদের পরিবারের পারিবারিক সুসম্পর্ক ছিল। ইংল্যান্ডে আমাদের একটি রেষ্টুরেন্ট ছিল। বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে যেতেন তিনি আমাদের রেষ্টুরেন্টে আতিথীয়তা গ্রহণ করেছেন। একসময় আমার পিতা ইংল্যান্ডে ‘দিলস্বাদ’ রেষ্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই রেষ্টুরেন্ট-এ যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের প্রথম কনফারেন্স হয়েছিল। সেই সময় থেকেই আমার পিতার সাথে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ১৯৭০ এর নিবৃাচনের আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন সিলেটে এসেছিলেন তখন আমার পিতা বাংলাদেশে ছিলেন। ইংল্যান্ড থেকে আমিও আমার পিতার সাথে বাংলাদেশে এসেছিলাম। সেদিন যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে সালাম করেছিলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছিলেন। আমি এক সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ১৯৭২ সালের পর মুজিববাদী আদর্শে দিক্ষীত হয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেছিলাম। ঐ বছর ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও মুজিববাদী আদর্শ ভাবধারায় ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে গেল্ োআমরা মুজিববাদী আদর্শকে ধারণ করেছিলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পূনঃগঠিত করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করার কাজে বদ্ধপরিকর ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়ে আমরা নির্যাতন-জেল-জুলুমের শিকার হয়েছিলাম। আমাদের জীবনে ‘জয় বাংলা’ হয়ে উঠলো নিষিদ্ধ শ্লোগান। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৮০ সালের দিকে আবারও লন্ডনে ফিরে গেলাম। ডিসেম্বর মাসে ইংল্যান্ডে ফিরে যখন গেলাম তকন সেখানে প্রচন্ড শীত। এসময় সেখানে যোগাযোগ হয় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই কণ্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সাথে। ইংল্যান্ডের শহরে শহরে মুজিব হত্যার বিচার চেয়ে আমরা দিনরাত রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাই। ১৯৭০ এর নির্বাচনে ভোটার ছিলাম, ভোট দিয়েছিলাম। আশির দশকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম ইংল্যান্ডে। সেই অধ্যায়ে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত ভূমিকা সৃষ্টিতে সেখানে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে পৃথিবীব্যাপি একটি আবেদন সৃষ্টি হয়েছিল। পঁচাত্তরের মধ্য ভাগ থেকে আশির দশক ও নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিয়ে দেশে-বিদেশে সক্রিয় থাকতে হয়েছিল আমাদের। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত নেতৃত্ব সৃষ্টিতে সেটা ছিল আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ও এগিয়ে চলার মূলমন্ত্র। বছরের পর বছর আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় ছিলাম। দেশে দেশে, শহরে শহরে, বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে মুজিববাদ পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়িত হলো আবার ঘরে ঘরে, জনসমাজে। সময় বয়ে যায় বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পূণরায় পূনগঠিত করার মধ্য দিয়ে। ২০০১ সালে সিলেটের বিশ্বনাথে জাতীয় নির্বাচনের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলাম। বিএনপির প্রার্থী ইলিয়াস আলী নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমার বাড়ীতে হামলা চালায়। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় আমাকে জড়িয়ে ফেলে। নির্বাচনের পরপর আমি ইংল্যান্ডে চলে যাই। ফিরে এলাম ২০০৩ সালে আবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে দেশে ফিরে কাজ করতে বলেছিলেন। এদিকে ওয়ান ইলেভেন-এ ৪০ জন নেতা-কর্মী নিয়ে আমাকে সাড়ে পাঁচ মাস কারাভোগ করতে হলো আবার। ইংল্যান্ড -আমেরিকা থেকে প্রত্যাগত নেতাকর্মীদের নিয়ে টিলাগড়ের এই বাড়ীতে আমরা মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করার কারণে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুলিশ বাহিনী আমাদের সকলকে গ্রেফতার করেছিল সেদিন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ফিরে গেলাম আবার। এরপর হজ্ব পালন করেছিলাম। কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে এলাম। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দেন। সিলেট জেলায় বিএনপি হিসেব করেছিল খালেদা জিয়ার পর বাংলাদেশে যদি দ্বিতীয় কোন আসনে বিএনপি জয়লাভ করে তাহলে সেটা হবে ইলিয়াস আলীর আসন। বিএনপি’র পরাজয় তাদের কল্পনাতেও ছিল না। ইলিয়াস আলী নির্বাচনের পূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কণ্যাকে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন দম্ভ করে। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচনে বিপুল ভোটো নৌকা প্রতীক জয়লাভ করে। জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতির জনকের কণ্যা শেখ হাসিনাকে এই আসনটি উপহার দিয়েছিলাম আমি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে পাঁচ বছর বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে ব্যাপক উন্নয়ন সংগঠিত করেছিলাম। সারাদেশের উন্নয়ন জোয়ারে বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ২০০৮-২০১৪ পর্যন্ত। নির্বাচনী ইস্তেহারে শর্ত ছিল বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার করা হবে। ১৯৭১ সালের রাষ্ট্রদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন হবে। শিক্ষার উন্নয়ন হবে। চিকিৎসার উন্নয়ন হবে। সেইসব প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশে আজও চলমান রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন আজ পূরণ করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষুদামুক্ত-দারিদ্রমুক্ত-সাম্প্রদায়িক শক্তি মুক্ত সোনার বাংলা গড়তে বাংলাদেশে আজ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণজোড়ায় চলমান। আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার হলো রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ গঠনের।

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল একটি সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে লড়াই করে। পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষের দাবি ছিল সাম্য-অর্থনৈতিক মুক্তি-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছিল বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগ বিষয়টির বিরুদ্ধে বারবার শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। আপনারা কতটা সফলতা পেয়েছেন?

 

শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির পূনঃরুত্থান ঘটেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভ হলো গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্ম নিরপেক্ষতা-বাঙালী জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্রকারীরা হত্যা করেছিল মূলত সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভে আঘাত করার উদ্দেশ্যে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ্ েপাকিস্তানের প্রতি পূনসমর্থনের দলিল হিসেবে হত্রাকারী ও তাদের দোসর সামরিক জান্তা সরকার ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানের প্রবর্তন করেছিল জনসমাজে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিবর্তে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের দাবি তুলেছিল সেসময়। পাকিস্তানের পূর্ব তাবেদার ও এজেন্ট জিয়াউর রহমান, খন্দকার মোশতাক, খালেদা জিয়া ও হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ যে যার যার মতো ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানী ভাবধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সেকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার, ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সফলভাবে সংগঠিত করেছেন। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করতে গণসচেতনতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ একদিকে যেমন উন্নত বিশ্বের মর্যাদা লাভের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তেমনি মৌলবাদী অপশক্তিকেও নিশ্চিহ্ন করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর।

 

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্নই শুধু দেখেননি তিনি দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রত্যাশা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারাবাহিকতা কি আওয়ামী লীগ রক্ষা করতে পেরেছে?

 

শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের মাঝেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও দর্শন লুকায়িত রয়েছে। এজন্যই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনীতি উচ্চমুখি সূচকের মুখ দেখে। বঙ্গবন্ধু আত্মত্যাগের রাজনীতি করেছেন তাঁর ৫৪ বছরের জীবনে। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু একজন অনন্য উদাহরণ। মাও ঝে দুং, চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো যা পারেননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেটা পেরেছেন। তরুণ বঙ্গবন্ধু থেকে শাসক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনসমাজকে প্রগতির পথে ঐক্যবদ্ধ করে রাখতে পেরেছিলেন। সেটা অন্যরা পারেনি। বঙ্গবন্ধু যেখানে শেষ করেছেন শেখ হাসিনা পূনরায় সেখান থেকে শুরু করেছিলেন বিগত শতকের আশির দশকেই। গোটা পরিবারকে হত্যার পরও শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন পিতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ হতে দেননি শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্দুকে ব্যর্থ হতে দেননি আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ হতে দেননি এদেশের মুক্তিকামী জনতা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ৬৯ এর অভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একই সূত্রে গাঁথা একটি রাজনৈতিক পুষ্পমাল্য। পাকিস্তানের শোষক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বারবার জনসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যে সময়ে বাঙালী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সেই সময়ে প্রযুক্তির বিকাশ লাভ ঘটেনি। তবুও বঙ্গবন্ধু সফলতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে মানবতার কল্যাণে রূপদান করতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে যখন তখন যেকোন কারণেই গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল বারবার। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে তখনই ফাঁসি দিতে চেয়েছিল মিলিটারি জান্তা সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনদিনও তাদের কাছে মাথা নত করার চেষ্টা করেননি। তিনি সবসময় বাঙালী জাতির মুক্তি চেয়েছিলেন। শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ক্ষুদামুক্ত দেশ ও সমাজ চেয়েছিলেন। দারিদ্রমুক্ত সমাজ চেয়েছিলেন। সুশাসন ও সম্পদের সুষম বন্টন চেয়েছিলেন। বাংলাদেশে সেটাই বাস্তবায়িত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দীর্ঘ ২১ বছর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পূনরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে বাঙালী সমাজে।

 

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ খুনিরা হত্যার পর সংসদে ইনডেমনিটি বিল পাস করিয়ে হত্যাকান্ডের বিচার রহিত করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে আওয়ামী লীগ ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে। বিচার করা হয় খুনিদের। তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এই দৃষ্টান্ত সিলেটের রাজনীতিতে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে?

 

শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ আমরা আজও মনে করি খুনিদের যারা এখনো বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে তাদের ইন্টারপোলের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে একটি আদর্শিক পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে খুনিদের ফাঁসি নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। আমরা মুজিবাদে ও মুজিব আদর্শে বিশ্বাসী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে গিয়েছে, সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা বাংলার মানুষের মূল শক্তি, রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা ও প্রান্তিক জনশক্তির মূল আত্মপরিচয়। আজ বিশ্ব মহামারীতেও বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক ভারসাম্য ধরে রেখে জনস্বাস্থ্যের সূচকে বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে এগিয়ে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইউরোপ এমনকি পার্শবর্তী দেশ ভারত যখন কোভিড-১৯ মহামারীতে হিমশিম অবস্থায় পর্যূদস্ত সে সময় বাংলাদেশ কিন্তু মহামারী মোকাবেলায় উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হলেও ঘনবসতিপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখানে মহামারীর আঘাত অত্যন্ত কঠোর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ মহামারির প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। অর্থনীতিকে রক্ষার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন স্তরে প্রণোদনা দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ অত্যন্ত সচেতনতা ও দক্ষতার সাথে করোনার মহামারীতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিল শুরু থেকেই। মানুষজন ভেবেছিল বাংলাদেশ মহামারীতে কোনভাবেই গণমৃত্যু ঠেকাতে পারবে না। তারা ভেবেছিলো লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানী ঘটবে মহামারীর কারণে। অথচ সেটা ঘটেনি কিন্তু। এই সফলতা সরকারের যোগ্য নেতৃত্বের প্রতিই ইঙ্গিত করে। মহামারীর শুরুতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে একজন মানুষও মহামারীতে না খেয়ে মৃত্যুবরণ করবে না।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষের ঘরে ঘরে অর্থ ও খাদ্য পৌঁছে দিয়েছেন।

 

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ মুজিব জন্ম শতবর্ষে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আপনি কতটা শক্তিশালী মনে করছেন?

 

শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ আমি আওয়ামী লীগ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শকে মুল্যায়ন করলে এবং জনসমাজে তার প্রতিফলন ঘটলে সেখানে গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকার কথা নয়। গণতন্ত্র কোন ছকে বাঁধা শর্ত নয়, গণতন্ত্র এক ধরনের সামাজিক চর্চার বিষয়বস্তু। বাংলাদেশ বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলোর সাথে আজ প্রতিযোগিতা করছে। সেটাই জনগণের গণতান্ত্রিক মর্যাদার অংশ। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করি বিধায় আমি সংসদ সদস্য হয়েছি, নির্বাচন করেছি, মনোনয়ন পেয়েছি, পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়েছি, প্রান্তিক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।

 

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনাকে ধন্যবাদ।

 

শফিকুর রহমান চৌধুরীঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। মুজিব বর্ষ সফল হোক।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930