বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবন সংগ্রাম

প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২১

বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবন সংগ্রাম

বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠী
ও তাদের জীবন সংগ্রাম

সৌমিত্র দেব

 

চায়ের প্রচলন পৃথিবীতে প্রথম শুরু হয় চীন দেশে। আরব থেকে চীন সুদূর হলেও আমাদের দেশ থেকে খুব দূরে নয়। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে চীনে চায়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল। তার অনেক পরে আমাদের দেশে চা শিল্প বিকশিত হয়। চা-শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক শ্রেণী ও তাদের পরিবারের মানুষজন চা-জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
এদেশে চায়ের প্রচলন শুরু হয় উপনিবেশিক আমল থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৮০ সালের দিকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতে চা চাষের উদ্যোগ নেয়। এর আগে তারা চীন দেশ থেকে চা এনে ব্যবসা করতো। কিন্তু এক পর্যায়ে চীন ও বৃটেনের মধ্যে বানিজ্যিক সম্পর্কের অবণতি ঘটলে তারা ভারতেই চা চাষের উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। দেবব্রত দত্ত তার কাছাড়ে চা-শিল্পের আদিপর্ব গ্রন্থে দেখিয়েছেন ১৭৮৮ সালে কোম্পানীর পরিচালকেরা পূর্ব-ভারতে চা চাষের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীকালে তারা চা চাষ শুরু করে।
১৮৩৩ সালের দিকে চার্টার আইন পাশ করে আসামে চা চাষের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এই আইনে বলা হয়েছিল যে, ইউরোপীয়রা এদেশে জমি সংগ্রহ করতে পারবে। ১৮৩৯ সালে ইংল্যান্ডে আসাম কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তাদের কাছেই বিক্রি করে দেওয়া হয় সরকারী তত্ত্বাবধানে নির্মিত চা বাগানগুলো।
এরপর চা-শিল্পের গোড়া পত্তনের জন্য এদেশের সিলেট অঞ্চলে চা শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। প্রথমে চেষ্টা করা হয়েছিল স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে চা চাষ করা। কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। সিলেট তখন ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম রাজ্যভূক্ত একটি জেলা। আসামের জনসংখ্যা তখন খুবই কম।
১৮৫৩ সালে জয়ন্তিয়া পাহাড়সহ সিলেটের লোক সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লক্ষ এবং প্রতি বর্গ মাইলে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২শ’ জন। সে কারণে বিশাল চা জনগোষ্ঠী সেখান থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। এছাড়া সিলেটসহ আসাম অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক বিন্যাসে নিয়মিত মজুরী ভিত্তিক শ্রমিক ছিল অনুপস্থিত। তাদের প্রায় সবারই নিজস্ব জমি জমা ছিল। নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে চা বাগানের শ্রমিক হওয়া তাদের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। তার উপরে নিজেদের সম্পর্কে সিলেটিদের কিছু উচ্চ ধারণা আগে থেকেই ছিল। অন্যদিকে ইংরেজ ব্যবসায়ীদের কাছে চা-শিল্প বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল শ্রমিক নয়, ক্রীতদাস। তার জন্য বাইরে থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা তাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এনেছিলও তাই। ভারতের উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার, অন্ধপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা প্রভৃতি বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়েছিল চা বাগানে। অবশ্য এদেশের কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষও এর অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। এদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের চা জনগোষ্ঠী। এখন চা বাগান শুধু সিলেট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পঞ্চগড় প্রভৃতি অঞ্চলেও চা বাগান গড়ে উঠেছে। সেসব এলাকায়ও বিস্তৃত হয়েছে চা জনগোষ্ঠী। তবে এখনও বড় অংশটি রয়ে গেছে সিলেট বিভাগে। সিলেটের ৪টি জেলার জাতীয় নির্বাচনে চা জনগোষ্ঠীর ভোট বিরাট ফ্যাক্টর। বিশেষ করে মৌলভীবাজার জেলার ৪টি আসন, হবিগঞ্জ জেলার কমপক্ষে ৩টি আসন ও সিলেট জেলার ২টি আসনে চা শ্রমিকদের ভোটের কথা মাথায় রেখেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়। অথচ গণমাধ্যমে চা জনগোষ্ঠীর কথা সেইভাবে আলোচিত হয় না। আমাদের সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে, অনলাইনে, নাটকে, চলচ্চিত্রে চা বাগানের কথা আসে। চা-শিল্পের কথাও আসে। কিন্তু চা শ্রমিকদের বা তাদের পরিবারসহ বিশাল জনগোষ্ঠির খবর সেখানে আসে খন্ডিত হয়ে। ক্রীতদাসের মতো চা জনগোষ্ঠির যে জীবন শুরু হয়েছিল এখনও তাঁরা তার থেকে মুক্তি পায়নি। মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তাদের। সভ্যতা থেকে অনেক দূরে লোকচক্ষুর অন্তরালে মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত হয়ে বাঁচতে হচ্ছে। চা বাগানের বিশেষ ব্যবস্থার কারণে গণমাধ্যমে তাদেরকে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু যেটুকু মানবিক অর্জন তাদের হয়েছে তার পেছনেও গণমাধ্যমের ভূমিকাই প্রধান।
গণমাধ্যম দু’ধরণের আছে। একে আমরা বলি মিডিয়া ও প্রতিমিডিয়া। এক ধরণের গণমাধ্যম থাকে সরকার ও অধিপতি শ্রেণীর হাতে। সেটা নামে গণমাধ্যম হলেও আসলে গণমানুষের মুক্তির পক্ষে কোন কাজ করে না। আরেকটি গণমাধ্যম জনগণের ভেতর থেকে উত্থিত হয়। এমনিতে তাকে কেউ মানতে চায় না। কিন্তু এই ধরনের গণমাধ্যমেরও একটি শক্তি থাকে। সেই অন্তনির্হিত শক্তি ঠিক ঐ সময়ে বোঝা যায় না। কিন্তু সেই গণমাধ্যমই কালজয়ী। হাজার বছরের পুরোনো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ হচ্ছে সে ধরনেরই একটি গণমাধ্যম বা প্রতিমিডিয়া। চর্যাপদ সেই সময়ের সরকার, অধিপতি শ্রেণী বা সমাজের নেতৃত্বের আনুকূল্য পায়নি। কিন্তু যুগ পরিক্রমায় এই মাধ্যমটিই টিকে আছে। এর মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে শোষিত শ্রেণীর কথা, তাদের উপর অধিপতি শ্রেণীর অত্যাচার নির্যাতনের চিত্র। চা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এরকম কিছু গণমাধ্যম আছে। যেমন তাদের ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর গানগুলো এ ধরণেরই একটি শক্তিশালী প্রতিমিডিয়া। এই গানগুলো শুধু যে চা শ্রমিকরাই লিখেছেন তা নয়। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কিছু মানবতাবাদী বাঙালী লেখক ও শিল্পীরা। তারা অনেক কষ্টে বাগানে গিয়ে এই হতভাগ্য জনগোষ্ঠিকে জাগানোর চেষ্টা করেছেন।

ঝুমুর গান ঃ
ঝুমুর গানে শুধু চা জনগোষ্ঠীর আনন্দ বেদনার কথাই রচিত হয়নি। সেখানে আছে তাদের প্রতিপক্ষের চক্রান্তের কথা। ওরা শ্রমিক সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে আসামের চা-বাগান ও এই এলাকার সমৃদ্ধির কথা বলত। সেইসব হতভাগ্য চা শ্রমিকদের উত্তরপুরুষেরা বংশানুক্রমে শুনেছে তাদের প্রলুব্ধ করার জন্য। দালাল ও আড়কাঠিরা বলেছে চা বাগানে এমন গাছ আছে যেখানে টাকা ঝরঝর করে পড়ে। সেখানে কোম্পানীর ঘর, রেশন পাবি, পেট ভরে ভাত খেতে পারবি এমনকি বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারবি। এসব শুনে দুর্ভিক্ষপীড়িত সরল মানুষেরা কুলীর খাতায় নাম লেখাতে শুরু করে। ঝুমুর গানে আছে “সখি চল আসামে যাবো, গামছা বিছায়ে ভাত খাবো” এভাবে তাদেরকে প্রলুব্ধ করার এই চিত্র ঝুমুর আখড়ায় এখনও ঝুমুর সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়। তারপর তারা যখন চা বাগানে যায় সেখানে তাদের উপর নির্যাতনের কাহিনী পাওয়া যায়। আরেকটি ঝুমুর গানে। সেখানে আছে,
“সর্দার বলে কাম কাম,
বাবু বলে ধরে আন,
সাহেব বলে লিবো পিঠের চাম রে,
হায়রে ঘনশ্যাম
ফাঁকি দিয়া আনাইলি আসাম।”
তাদের জীবনের এই করুণ চিত্র এখনও ধারণ করে আছে ঝুমুর গান। চা জনগোষ্ঠীর সাদরি ভাষায় আছে তাদের ফেলে আসা বাড়ি-ঘরের কথা।
“রাঁচিকের মাঁঙ্গাল কুলি
দেয় দেলাই টুকরি
ঝুমরী ঝুমরী পাতা তুরেলা
চারা বাড়ি
হায়রে দেইয়া
কাঁহা গেলাক হামনীকের
ঘরবাড়ি
বঙ্গানুবাদ :
রাঁচি থেকে এনে কুলি
দেয়া হলো পাতি টুকরি
সারাদিন চা বাগানে ঘুরে ঘুরে
পাতি তুলি
হে ভগবান
কোথায় গেল আমাদের ঘরবাড়ি।”

নাটক ঃ
চা জনগোষ্ঠীর মহাকাব্যিক জীবন ফুঁটিয়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ নাট্যকারদের ছিল। কিন্তু সেরকম ভালো কোন নাটক রচিত হয়নি। প্রায় শতবর্ষ ধরে তারা নির্যাতিত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে বিদ্রোহ করছে। কিন্তু দৃশ্যকাব্যে তার চিত্র অনুপস্থিত। নিকট অতীতে দুটি নাটক সিলেটে মঞ্চস্থ হয়ে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এর মধ্যে আছে সিলেটের সুরমা থিয়েটার প্রযোজিত বিদ্যুৎ কর রচিত নাটক ‘সুখের খোঁজে সুখলাল।’ মৌলভীবাজারের মনু থিয়েটার প্রযোজিত নীহারেন্দু কর রচিত নাটক ‘দুখিয়া সুখিয়া।’ এই দুটি নাটকই চা জনগোষ্ঠীর জীবন উপজীব্য করে রচিত। একাধিকবার মঞ্চস্থ। জাতীয়ভাবেও আলোচিত এবং প্রশংসিত। কিন্তু সম্পূর্ণ চা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে তেমন কোন নাটক আর রচিত হয়নি। টেলিভিশনে যেসব নাটকে চা-বাগান দেখা যায় সেখানে মালিক ও ব্যবস্থাপকদের চাকচিক্যময় জীবনই তুলে ধরা হয়। চা জনগোষ্ঠী সেখানে আসে অনুষঙ্গ হিসেবে। তেমনভাবে তাদের ভূমিকা সেখানে আলোচিত হয় না। চলচ্চিত্রেও একই অবস্থা। সম্প্রতি হবিগঞ্জে দেয়ন্দি চা বাগানে চা জনগোষ্ঠীর একটি নাট্যসংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘পথিক’ নামের এ নাট্য সংগঠনে অভিনেতা, পরিচালক, নাট্যকার থেকে শুরু করে সকল কুশীলবই চা জনগোষ্ঠীর সদস্য।

কথাসাহিত্য ঃ
চা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে আমাদের কথাসাহিত্যে প্রচুর কাজ হয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি উপন্যাস ও একাধিক গল্প চা বাগানের কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে। এর মধ্যে তার বিখ্যাত গল্প ‘টুনি মেম’এর কথা বলা চলে। চা জনগোষ্ঠীর একটি মেয়ে ও বাগানের আইরিশ ব্যবস্থাপকের সম্পর্ক প্রেম কাহিনীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। অজয় ভট্টাচার্য লিখেছেন একটি উপন্যাস ‘কুলি মেম’ নামে। চা শ্রমিক নারী এভাবেই বারবার উঠে এসেছে আমাদের সাহিত্যে। রিজিয়া রহমান লিখেছেন চা জনগোষ্ঠীর উপরে ‘সূর্য সবুজ রক্ত’ উপন্যাস। সম্প্রতি সেলিনা হোসেন লিখেছেন ‘কাঠ কয়লার ছবি।’ কিন্তু এর কোনটির মধ্যে চা জনগোষ্ঠীর জীবনের বিশালতা তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
চা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে প্রথম যে উপন্যাসটি সারা পৃথিবীতে আলোচিত হয়েছিল সেটি লিখেছেন একজন অবাঙালি লেখক। ইংরেজী ভাষায় এই উপন্যাসটি ইংল্যান্ডে প্রথম প্রকাশিত হয়। লেখকের নাম মুলকরাজ আনন্দ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটির প্রচার নিষিদ্ধ হয়।
মুলকরাজ আনন্দের ‘টু লিভস্ এন্ড বাড’ নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বারা অনূদিত হয়ে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে প্রথম বাংলা সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। ‘সাহেবী অত্যাচারের পটভূমিকায় লেখা এই উপন্যাসের স্থান হল চা বাগান। চা-কেই অলঙ্কার দিয়ে বলা হয় ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’। এই নামটি এখনও চালু আছে। মালিকরা এই নামেই কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। ১৯৩৭ সালে মুলকরাজের এই উপন্যাস ভাষান্তরিত হয়ে বহু দেশে প্রকাশিত হয়েছে। নয় বছর পরে ভারতে যখন প্রথম প্রকাশিত হল, দেশের সব কাগজ এবং সুধীসমাজ অভিনন্দন জানালেন সাহিত্যিক মুলকরাজকে তাঁর সৃষ্টির জন্য। সমালোচনা করতে গিয়ে কিন্তু বিলাতী মালিকদের মুখপাত্র সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে জানালেন এসব আর আজকাল চা বাগান অঞ্চলে ঘটে না।’ প্রথম বাংলা সংস্করণের ভূমিকাংশে প্রকাশিত এই উদ্ধৃতাংশের সাথে প্রকাশক আরও যোগ করেছেন ‘এসব এখনও ঘটে কি না তার জবাব দেবে এই ১৯৪৮-এও জলপাইগুড়ির এক চা বাগানের গুলিবিদ্ধা কুলি রমণী, আসাম ডুয়ার্স-দার্জিলিং এর চা বাগানের মজুররা, যাদের মেয়েদের মানসম্ভ্রম-ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আজও চলে।’

এর আগেই অবশ্য একটি বাংলা উপন্যাস এদেশে আলোচিত হয়েছিল। ১৮৮৮ সালে রাম কুমার বিদ্যারতেœর কুলি কাহিনী নামে এই বই প্রকাশিত হয়েছিল। এটিকে বলা যায় গণমাধ্যমে প্রথম এদেশের চা জনগোষ্ঠিকে তুলে ধরা। রামকুমার বিদ্যারতœ এই বইটি লিখতে গিয়ে নিজের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারেÑ একটি হলো লেখক হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করলে সেখানে প্রাণ নাশের সংশয় ছিল। দ্বিতীয়তঃ তিনি চেয়েছিলেন নিজেকে প্রকাশ না করে চা জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরতে। তাঁর এই বইটিকে তখন বাঙালীর ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এর পেছনে যে কাহিনী ছিল সেটিও একটু বলা দরকার। চা-শিল্প বিকশিত হয়ে যাওয়ার পরেও চা বাগানের ভেতরে বাইরের লোকের কোন প্রবেশাধিকার ছিল না। যার কারণে এর ভেতরে যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন চলতো গণমাধ্যমে এর প্রকাশ ছিল কঠিন। চা বাগানে শ্রমিকদের প্রথম সংগঠিত করতে শুরু করেন স্থানীয় ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের নেতারা। তাঁরা শিক্ষিত ও মানবতাবাদী ছিলেন। সে কারণে তাদের মধ্যে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা প্রচেষ্টা ছিল। এদের মধ্যে একজন ছিলেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় চা শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন। রামকুমার বিদ্যারতœ চা শ্রমিকদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন বোঝার জন্য নিজেই চা শ্রমিক হয়ে বাগানে ঢুকেছিলেন। তাঁর কুলি কাহিনী বইয়ে আছে কিভাবে শ্রমিকদেরকে ধরে আনা হলো। জনৈক সাহেব তার সহকারীকে পরামর্শ দিচ্ছেন ‘তোমরা কয়েকজন মেয়ে আড়কাঠির যোগাড় কর। হাতি শিকারী যেমন কুন্কী হাতি দিয়ে বুনো হাতি শিকার করে, তোমরাও মেয়ে আড়কাঠি দিয়ে, কুলি শিকার করিতে চেষ্টা কর। দেখ কেবল মেয়ে আড়কাঠি আনিলেও হইবে না। মেয়ে আড়কাঠিদগকে বলিয়া দিতে হইবে তাহারা যেন গ্রামে যাইবার সময় ভাল কাপড় ও গহনা পরিয়া যায়। আরও তাহাদিগকে এরূপ শিখাইয়া দিও যে, তাহারা বলে আমরা অনেক দিন আসামে ছিলাম, সেখানে বড় সুখ। কাজকর্ম একরকম না করিলেই চলে, তবে মধ্যে মধ্যে বাগানে ঝাঁট দিতে হয় ও সকালে বিকালে কিছু কিছু পাতা তুলিতে হয়। এরূপ করিয়াই আমরা এত গহনা ও ভাল কাপড় করিয়াছি। তোমরাও আমাদের সঙ্গে চল, আমাদের মতন ভাল অবস্থা হইবে। এইতো সংসারে খেটে খেটে রোগা হয়ে গেছিস্, পেটে ভাত নাই, পরনে কাপড় নাই, হাতে এক গাছা বালা পর্যন্তও নাই। এর উপর আবার মিন্সের বকুনি, ঠেঙ্গানিতো আছেই। তোরা বোকা মেয়েমানুষ বলে এত কষ্ট করছ্সি। চল্ না কেন। তাহারা যদি এইরূপ করিয়া ভজাইতে পারে তাহা হইলে ডজনে ডজনে মেয়ে কুলি সংগ্রহ করিতে পারিবে।’ সাহেবের বাঙালী সহকারী আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘মেয়ে আড়কাঠিরা গ্রামে গিয়ে প্রথমত গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে একটা কুটুম্বিতা পাতাইয়া লইবে, তারপর আজ একটা খেলনা, কাল কিছু খাবার, পরশু একটা আধটা পয়সা ছেলেদের হাতে দিয়ে খুব আত্মীয়তা দেখাইবে। এইরূপ আত্মীয়তা দেখাইলেই গ্রামের লোকেরা গীতমুগ্ধ হরিণীর ন্যায় বশ হইয়া যাবে। তারপর আমাদের আড়কাঠিরা যা বলবে তাই তারা করবে।’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে এর কিছু আভাস পাওয়া যায়। সাওতাল তরুণী মঞ্চি তাঁর স্বামী সংসার ফেলে আড়কাঠির পাল্লায় পড়ে আসামের চা বাগানে চলে গেছে বলে সেখানে উল্লেখ আছে। শ্রমিক সংগ্রহের জন্য আড়কাঠি ছাড়াও নানা কৌশল অবলম্বন করতো চা বাগানের মালিকেরা।

বিহারের রাঁচি, হাজারিবাগ, সাওতাল পরগণা, ডুমকা ও গয়া, উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ গঞ্জাম, সম্বলপুর ও চাইবাসা এবং মধ্যপ্রদেশের রায়পুর, রামপুরহাট ও জব্বলপুর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এই চা শ্রমিকদের সংগ্রহ করা হতো। এছাড়া উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা হতো। নেপাল থেকেও চা শ্রমিক নিয়ে আসা হতো বলে জানা যায়।

একটা সময় ভারতবর্ষে এই চা-শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠেছিল। চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও কেরানিরা চা শ্রমিকদের অদক্ষ শ্রমিক অর্থে ‘কুলি’ নামে অভিহিত করতো।
তখন চা বাগানের শ্রমিক সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন স্থানে ডিপো খোলা হত। এক ডিপোর বাবুর নিকট থেকে আরেক ডিপোর বাবুর নিকট শ্রমিক সংগ্রহের কলাকৌশল সম্পর্কে লিখিত পত্রের নমুনা ‘কুলি কাহিনী’ গ্রন্থ থেকে দেওয়া হল ঃ

‘প্রিয় জলধর বাবু,
তুমি আমাদের ডিপোর কুলি ধরিবার ফিকির জানিতে চাহিয়াছ। যদিও এসব গোপনীয় কথা, অপরকে লেখা আপিসের নিয়ম বিরুদ্ধ; তথাপি তোমার খাতির এড়াইতে না পারিয়া, তোমাকে লিখিতেছি। দেখিও এই পত্র যেন আর কেহ দেখিতে না পায়। আমাদের দেশীয় লোক বড় ধর্মভীরু, ধর্মের ভান (?) করিয়া অসাধ্যকার্য তাহাদের দ্বারা সাধন করা যায়। তীর্থের নামে হিন্দুরা পাগল। তুমি আড়কাঠিদিগকে জগন্নাথ, কামাখ্যা বা অপরাপর তীর্থের পান্ডা সাজাইবে, তাহারা পান্ডা হইয়া গ্রামে গ্রামে ভ্রমণ করিয়া তীর্থের মহাত্ম্য বর্ণনা করিলেই, ছোটলোকদের মন গলিয়া যাইবে। অবশেষে তীর্থ যাত্রার ভান করিয়া তাহাদিগকে কলিকাতায় লইয়া আসিবে। তাহারা একবার কলিকাতা ডিপোতে আসিলেই যেন কোন প্রকারে রেজিষ্টারী করিয়া চালান দেবে। এ তো গেল বাঙালি কুলিদিগের পক্ষে, কিন্তু বুনো (অর্থাৎ হাজারিবাগ ও অন্যান্য সাঁওতাল) কুলিদিগকে মহাপ্রসাদ (অর্থাৎ পক্ষ মকার) ঠুকলেই ধরা যাইতে পারে। এইরূপ করিলে, কুলি সংগ্রহ করা অতি সহজ হইয়া উঠিবে। আমরা এই উপায়ে এবার প্রায় সাত শত কুলি ধরিয়াছি। অত্র মঙ্গল তোমার লিখিয়া তুষ্ট করিবা। ইতিÑ
আশির্বাদক
শ্রী রামদেব শর্মণ।’

এভাবে বোঝা যায় তারা হাতি ধরার মত খেদা নির্মাণ করে ঘুঘু ধরার মত ফাঁদ নির্মাণ করে এই অসহায় মানুষগুলোকে কুলি হিসেবে ধরে এনেছিল। সেই ডিপোর আরেকজন কর্মচারী তার শ্রমিক ধরার কৌশল সম্পর্কে বলছে, ‘আমি খুব সেয়ানা লোক। একদিন কল্লেম কি দোকান থেকে ঘুনসী, মালা, চূড়ি ও নানা প্রকার খেলনা কিনে নিয়ে একখানা দোকান সাজাইলাম ও আমি নিজে দোকানদার সেজে গ্রামে গেলাম। গ্রামের লোকেরা আমাকে দেখে ভেড়ার পালের মত আমার পাশে এসে জুটল। আমি খুব ঝোপ বুঝে কোপ মারতে পারি; আমি কল্লেম কি কাহাকে অর্ধেক দামে, কাহাকে সিকি দামে জিনিসপত্র বিক্রি করতে লাগলেম। আর যাহাদের পয়সা ছিল না তাহাদের অমনি অনেকগুলি জিনিস বিলাইয়া দিলাম। পাড়ার মেয়ে, ছেলে, বুড়ো সকলে আমাকে ধন্য ধন্য দিতে লাগল। আমি কাহাকে খুড়া কাহাকে ভাইপো, কাহাকে বা মামা ডাকিয়া কুটুম্বিতা পাতাইলাম। এইরূপ দশ বারো দিন চেষ্টা করিয়া সেই পাড়া গাঁয়ে আমি একটা কেষ্ট বিষ্টু হইয়া বসিলাম। কিন্তু গেঁয়ো লোকেরা এত বোকা কেহই আমার ফন্দি বুঝিতে পারিল না। ওবার আমি এই চার ফেলে অনেকগুলি মেয়ে মর্দা ধরেছিলাম।’
কাহিনীর ভেতরে আরও আছে ‘কুলির ডিপো আর আড়ত একই কথা-আড়তে মাল আমদানি রপ্তানি হয়, দালালেরা বাজার বুঝিয়া ঐ মাল ক্রয় বিক্রয় করিয়া থাকেন, তবে আড়তদারের লাভটা চাই, যতক্ষণ লাভের অংশ ১ গন্ডা কম হইবে ততক্ষণ আড়তদার মাল ছাড়িবে না। আজ এই ডিপোতে অনেক মাল আমদানি হইয়াছে কিন্তু এখন পর্যন্তও রপ্তানি হয় নাই, কাল বিকালে দালাল অর্থাৎ চা বাগানের কলিকাতাস্থ কুলি এজেন্ট আসিয়াছিল। কিন্তু দামে তাঁহার সঙ্গে বনিল না, তিনি কুলি জোড়ার দাম ১৭৫ টাকা বলিয়াছেন কিন্তু বাজারদর ২০০ টাকা। ডিপোওয়ালার ২০০ টাকা কমে মাল ছাড়িবে না বলিয়া পণ করিয়াছে। এদিকে লোকসানেরও খুব আশঙ্কা। কারণ ইহারা মিঠা জায়গার লোক, কলিকাতা লোনা জায়গা, কি জানি যদি ওলাউঠা বা জ্বর বিকারে ২/১ কুলি মরিয়া যায় তবে ব্যবসায় বড় ক্ষতি।’
এভাবে তারা মানুষকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করত। কুলি ছিল তাদের কাছে ক্রীতদাস। বইটিতে এই ক্রীতদাস কেনা বেচার আরও কাহিনী রয়েছেÑ
‘এই ব্যবসাতে সকলেরই লাভ আছে, যাহারা কুলি সংগ্রহ করিয়া প্রধান রিক্রুটারের হাতে দেয় তাহারা জনপ্রতি ২ হইতে ৪ টাকা পাইয়া থাকে। রিক্রুটারেরা প্রতি কুলিতে ১২ টাকা হইতে ২৫ টাকা পর্যন্ত পায়, গভর্ণমেন্টের লাভ জনপ্রতি পাঁচসিকা, যে ডাক্তার পরীক্ষা করেন তাঁহার ফি দুই আনা আর রেজিষ্ট্রারের কেরানিবাবুর দক্ষিণা দুই আনা, এত টাকা ব্যয় করিয়া এক একটি কুলি সংগ্রহ হইয়া থাকে, তবে সমস্তই যে লাভ তাহা নহে। প্রথমতঃ সংগ্রাহক ও আড়কাঠিদিগকে অনেক বাজে খরচ করিতে হয়। ডিপোর মহাজনকে বাগানে পৌঁছিয়া দিবার ও দেশ হইতে কলিকাতায় আনিবার খরচটা বহন করিতে হয়। কেবল গভর্ণমেন্ট বিনা লোকসানে ১ টাকা পাঁচ সিকা পাইয়া থাকেন।’

‘কুলি কাহিনীর’ লেখক বিস্তারিতভাবে বলেছেন ‘ধুবড়ি ব্রহ্মপুত্রের পূর্বতটস্থিত রাজকীয় কার্যালয় ও বিচারলয়গুলি ব্রহ্মপুত্রের তীরদেশকে আলিঙ্গন করিয়া শোভা পাইতেছে। যখন স্টিমার নোঙ্গর করিল তখনও কাছারি ভাঙ্গে নাই, বিচারকেরা বিচারাসনে বসিয়া বিচার করিতেছেন, এমন সময় স্টিমারের কাপ্তেন ও ডাক্তার বাবু যাইয়া ডেপুটি কমিশনার সাহেবকে বলিলেন ‘দুইটি কুলি স্ত্রীলোক আমাদের বিনা অনুমতিতে স্টিমার পরিত্যাগ করিয়া ঐ দেখুন আপনার কাছারির সম্মুখে রাস্তার উপর বসিয়া আছে, আমরা কত সাধ্য সাধনা করিলাম, কিছুতেই তাহারা স্টিমারে ফিরিয়া গেল না, আপনি যদি পুলিশ দ্বারা তাহাদিগকে স্টিমারে পাঠাইয়া দেন’ ডেপুটি কমিশনার ইহাদের কথা শ্রবণ করিয়া দুইজন কনস্টেবলকে হুমুক দিলেন ঐ দুইজন কুলিকে জাহাজে পৌঁছিয়া দিয়া আইস। কনস্টেবলেরা, কুলিদ্বয়ের সম্মুখে যাইবা মাত্র, তাহারা বিকট স্বরে চিৎকার করিয়া কনস্টেবলদ্বয়কে আক্রমণ করিতে গিয়া সম্মুখে ইট পাটকেল যাহা পাইল কনস্টেবলদ্বয়ের উপর নিক্ষেপ করিল। বার বার ‘মহারানীর দোহাই’, ‘মহারানীর দোহাই’, ‘সাহেব বিচার কর’ আমাদিগকে ফাঁকি দিয়া আসামে লইয়া যাইতেছে বলিতে লাগিল। এই সময় রমণীদ্বয়ের দৃশ্য অতি ভয়ানক। চক্ষু দুইটি রক্তবর্ণ, আলুলায়িত কেশ সর্বাঙ্গ ধূলি ধুসরিত জীবনের আশা পরিত্যাগ করিয়া কনস্টবলদিগের সহিত সংগ্রাম করিতেছে। রাস্তার উপর এ প্রকার গোলযোগ দেখিয়া অনেক লোক তথায় জমিয়াছিল, ডেপুটি কমিশনার সাহেব স্ময়ং আসিয়া তাহাদিগকে বুঝাইতে লাগিলেন, নানাপ্রকার ভয় দেখাইতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাহারা ভীত হইল না, তাহাদের বিশ্বাস ছিল মহারানীর রাস্তার উপর বসিয়া থাকিলে গভর্ণমেন্টের কোন কর্মচারী তাহাদিগকে গ্রেফতার করিতে পারিবে না। সুতরাং সমস্ত রাত্রি এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া কাছারির সম্মুখে রাস্তার উপর বসিয়া রহিল। তাহারা তখন এই কথা বলিয়াছিল যে আমরা কি সহজে কুলি হইয়াছি, আমাদের বাড়ি বর্ধমানের উদিকে, গঙ্গাস্নান করিবার জন্য কলিকাতায় আসিয়াছিলাম, আমরা নূতন লোক, কলিকাতার কিছুই জানি না। বড় বাজারের ঘাট স্নান করিয়া খাবার দোকানের অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম, সেই ঘাটে একটি হিন্দুস্তানী লোক বসিয়াছিল, সে আমাদিগকে বলিল, ‘তোমরা নূতন লোক, খাবার দোকান অনেক দূরে চিনিয়া যাইতে পারিবে না, আমাকে পয়সা দাও, আমি খাবার আনিয়া দিতেছি।’ আমরা তাহার হাতে পয়সা দিলাম, সে আমাদিগকে এক ঠোঙ্গা খাবার আনিয়া দিল। তারপর আর আমরা কিছুই জানি না। কখন রেজিষ্টারী হইয়াছে, কখন কুলি ডিপোতে আসিয়াছি, কিছুই স্মরণ নাই, স্টিমারে আসিয়া আমাদের জ্ঞান হইয়াছে; তখন জানিতে পারিলাম, আমরা কুলি হইয়া যাইতেছি। আমরা কিছুতেই চা বাগানে যাইব না, তোমরা মেয়াদ দাও আর ফাঁসি দাও, যাহা ইচ্ছা তাহাই কর।’ ইহারা সমস্ত রাত্রি সেই রাস্তায় পড়িয়াছিল, পরদিন তাহাদের নামে রীতিমত নালিশ রুজু হইয়াছিল, বিচারক এগ্রিমেন্টের চুক্তিভঙ্গের অপরাধে তিন মাস ফাটক দিয়াছিলেন। এই তিন মাসের পর তাহাদিগকে বাগানে যাইবার জন্য আবার বলা হয়, তাহাতেও তাহারা রাজি হয় নাই, আবার মেয়াদ; এইরূপ তিনবার মেয়াদ খাটিয়া তাহারা কোথায় চলিয়া গিয়াছিল তাহা আমরা জানি না।’

আড়কাঠিদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে চা বাগানের কুলি হয়ে যাওয়া কৈলাশ চক্রবর্ত্তীর ভাষায় জাহাজের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘জাহাজের যিনি ডাক্তার, তিনি কুলিদিগের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। সেই ডাক্তারই কুলিদিগের আহার কম দিয়া প্রায় সমস্ত জিনিসই আত্মসাৎ করেন। এমনকি আমরা যে জাহজে যাই, তাহাতে আমাদের খাওয়ার জন্য ৭টি ভেড়া ছিল, তাহার মধ্যে ২টি দুই দিন কাটা হয়েছিল। আর পাঁচটি মরে গেল, না কর্পূর হয়ে উড়ে গেল, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। মহাশয়! বলব কি চা-করদের সংস্রবে যাহারা থাকে, তাহাদের মধ্যে একটিও ভাল লোক আছে কিনা সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ আছে।’ শ্রমিকদের তখন কাজের নিরিখ ছিল শক্ত। কৈলাশের ভাষায়, ‘আঠার হাতে এক নল, বিশ নল জমি না কোপাইলে এই বাগিচার নিয়মানুসারে এক রোজের কাজ হইবে না। এত জমি কোপাইয়া তারপর কি আর কাজ করা যায়, এমনকি আমি যতদিন কোদালের কাজ করিয়াছি, তারমধ্যে একদিনও পুরা হাজিরা খাটিতে পারি নাই।’ সারাদিন পরিশ্রম করেও সেকালে শ্রমিকেরা উদরান্নের সংস্থান করতে পারত না। তখন বাগান কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ঋণ গ্রহন করতে হত। ‘এইরূপে দিন দিন ঋণ বৃদ্ধি হইয়া এগ্রিমেন্টের সময় পূর্ণ হইলে, সাহেবের পত্রে দেখা যায় যে তাহার এগ্রিমেন্ট পূর্ণ হইলেই যে কুলিরা দেশে ফিরিয়া আসিতে পারিবে, তাহার কোন পথ নাই। এদিকে দেনা, তারপর রাহা খরচ। বুঝন কুলির জীবন কি কষ্টের! এগ্রিমেন্ট পূর্ণ হইলে, মনে মনে আশা হয় যে এবার দেশে ফিরিয়া যাইব। কিন্তু এগ্রিমেন্ট পূর্ণ হইবার দুই এক দিন পূর্বেই সাহেবের লোকেরা বলে, তোমার নিকট এত টাকা সাহেবের পাওনা আছে, হয় আবার এগ্রিমেন্ট লিখিয়া দেও, না হয় দেনা শোধ করিয়া দেশে চলিয়া যাও। গরিব কুলি টাকা কোথায় পাইবে, সুতরাং আবার দাসখত লিখিয়া দিতে বাধ্য হয়; মোদ্দা কথাটা এই যে, একবার কুলি হইয়া আসামে আসিলে, অনেকের ভাগ্যে দেশে ফিরিয়া যাওয়া বড় মুশকিল।’ সেকালে শ্রমিকদের পারিবারিক জীবনেও চলত হস্তক্ষেপ। ‘চা বাগানে যদি অবিবাহিত বা বিধবা থাকে, আর নূতন কুলিদিগের মধ্যে যে কোন জাতিই হোক না কেন, যদি অবিবাহিত থাকে তবে সাহেব যেনতেন প্রকারে ইহাদের মধ্যে ঘটকালী করিয়া একটা বিবাহ দেন। আর নূতন কুলিদের মধ্যে যদি সুশ্রী স্ত্রী কুলি থাকে, তবে তাহারা আর কুলিদের স্ত্রী হইতে পারে না। সাহেব বা বাবুরা তাহাদিগকে আত্মসাৎ’ করেন, ওর বিবাহের স্থায়িত্ব আবার সাহেবের অনুগ্রহের উপর। সাহেব যদি কোন কুলির উপর বিরক্ত হন, তাহা হইলে রামের স্ত্রী শ্যামকে দিয়া সেই বিরক্তির ঝাল উঠাইয়া লন।’ কৈলাশ চক্রবর্ত্তীর জবানিতে দেওয়া উপরের এ সকল উদ্বৃতি থেকে চা চাষের প্রথম যুগের চিত্রকল্প কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়।

প্রবন্ধ ওগবেষণা ঃ
চা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। দেশী-বিদেশী লেখকেরা এ নিয়ে অনেক বই লিখেছেন। এখানে কয়েকটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করা হল। ১৩৬৬ সালে বীরেশ্বর বসুর লেখা চা-মাটি-মানুষ প্রকাশিত হয়। লেখকের ভাষায়Ñ ‘প্রথম পর্বে পটভূমি, ধারাবাহিক ঘটনার মিছিলে চা বাগানের শ্রমিকদের সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কার, উৎসব, আনন্দ, জীবনের তিক্ততাবোধ, পাপবোধ, সাহেব ও বাবুদের কথা স্থান পেয়েছে।’ গ্রন্থের অধ্যায়ে চা বাগান তৈরির জীবন্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবেÑ ‘তারপর বন-জঙ্গল কেটে তৈরি হলো ঘরবাড়ি। এলো কত লোক, হলো চায়ের চাষ। পাহাড় ভেদ করে বনের বুক চিরে তৈরি হলো ছোট বড় কত সড়ক রাস্তা-রেললাইন। কত মজুর দিল কত রক্ত, কত জীবন। বাঘ ভালুক হাতি শূয়ারের শিকার হলো অনেকে, জ্বলেপুড়ে মরল বিষাক্ত সাপের বিষে। তৈরি করলো একতলা, দোতালা, তেতালা কত গুদোম। তাতে বসালো কত ইঞ্জিন, বয়লার পাতিকাটা পাতি মলাই, চা শুকানো আরও কত শর্টিং প্যাকিং মেশিন। বয়লারের জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে মরলো কতজন, গুদোমের চাল থেকে, মাচান থেকে পড়ে মরলো কত লোক, হাত ভাঙলো, পা ভাঙলো, বুকের পাঁজর ভাঙলো, অন্ধ হলো আরও কত জন।’
সত্যেন সেন চা জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তার সেই রচনা প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গ্রাম বাংলা পথে পথে’ বইতে। চা জনগোষ্ঠীর পক্ষে সংগ্রাম করেছেন নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী। তিনি বিভিন্ন রচনায় চা জনগোষ্ঠির কথা লিখেছেন। প্রকাশ করেছেন চা জনগোষ্ঠীর নেতা পুর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্তের জীবনী গ্রন্থ ‘কর্মযোগী পুর্ণেন্দু কিশোর। ’ হেনা দাস তার আত্মজীবনীতে চা জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের কথা লিখেছেন। নিকট অতীতে অজয় ভট্টচার্য লিখেছেন, ‘অর্ধশতাব্দী আগে গণআন্দোলন এদেশে কেমন ছিল’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯০ সালে। প্রকাশক চলন্তিকা বইঘর। সেখানে তিনি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘বাংলায় চায়ের আবাদ ও চা বাগান শ্রমিক আন্দোলন শিরোনামে।’ সেখানে আছে চা শ্রমিক সংগঠনে কার কি ভূমিকা। কিভাবে সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠলো। কংগ্রেস কিভাবে কমিউনিস্টদের কাছ থেকে নেতৃত্ব হাইজ্যাক করল। বাগান মালিকরা কেন কংগ্রেস নেতৃত্বকে অপেক্ষাকৃত সহনীয় মনে করল। বিশেষ করে বিভাগ উত্তরকালে পাকিস্তান আমলে চা জনগোষ্ঠীর অবস্থান তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন সেই বিবরণ এখানে দেওয়া হল ঃ

১৯৪৭ সালে ভারবর্ষ বিভক্ত হয়ে গেলে সিলেট জেলার সাড়ে তিনটা থানা (পাথারকান্দি, রাতাবাড়ি, বদরপুর ও করিমগঞ্জ থানার অর্ধেক)-সহ কাছাড় জেলা চলে যায় আসামের সঙ্গে ভারতে (হিন্দুস্তানে), আর সিলেট জেলার অবশিষ্ট অংশ পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত হয়ে চলে আসে পাকিস্তানে। দেশ-বিভাগের অব্যবহিত আগে বৃটিশ সরকার এই বিভাগের প্রশ্নে জনমত জরিপের কথিত উদ্দেশ্যে সিলেট জেলার এক তথাকথিত গণভোটের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু চা-বাগান শ্রমিকদের তাতে ভোট দেবার অধিকার দেওয়া হয়নি। সিলেট ও কাছাড় জেলার যে সংলগ্ন শ্রমিক অঞ্চলে এতকাল একসাথে সংগ্রাম করে এসেছে এই দেশ বিভাগের ফলে তা ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে গেল।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে মানুষের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ই তখন প্রধান হয়ে উঠেছে। এ পরিচয়ে চা-বাগান শ্রমিকদের অধিকাংশই (শতকরা ৯০/৯৫ ভাগের কম নয়) ছিল প্রধানতঃ হিন্দু সম্প্রদায়ভূক্ত। অর্থাৎ দেশ বিভাগের পরবর্তীকালের রাজনৈতিক পরিভাষায় সংখ্যালঘু। পাকিস্তানের রাজনীতিতে কংগ্রেস তখন সংখ্যালঘুদের স্বার্থের কথা বলেই নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। তাই স্বভাবতঃই তারা এদিক থেকে চা-বাগান শ্রমিকদের মুখপাত্র হওয়ার দাবী করে। বিভাগপূর্ব কালে চা-বাগান শ্রমিকদের সংরক্ষিত আসনে তাদের জয়লাভ তাদের এ দাবীকে শক্তিশালী করে। ফলে দেশ বিভাগের পর হিন্দুস্থানে পাকিস্তানে যে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘুর নতুন রাজনীতি জন্মলাভ করে তাতে কংগ্রেসকেই সরকার এখানে সংখ্যালঘু চা বাগান শ্রমিকদের মুখপাত্র হিসাবে মেনে নেয়। তাতে কংগ্রেসী শ্রমিক পঞ্চায়েতের সুবিধা হয় এই যে, তারা চা-এর ব্যবসায়ে মজুরী ও পুঁজির বিরোধটাকে পাশে ঠেলে রেখে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংস্কার ও অনুভূতির প্রতিই শ্রমিকদের মনোযোগ আকৃষ্ট করার সুযোগ পায়। তারা এখানে ওখানে পূজা পার্বণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে শ্রমিকদের তাতে আকৃষ্ট করতে থাকে। তাতে শ্রমিকদের বাঁচার জন্যে মজুরী বৃদ্ধি, কাজের নিরিখ হ্রাস ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার সংগ্রাম বাদ পড়ে যায়। এ কারণেই বিভাগ পরবর্তীকালে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ও মজুরীর অবস্থার বিশেষ অবনতি ঘটতে থাকলেও তা নিয়ে শ্রমিকদের ভেতর কোন সংগ্রাম বা ধর্মঘট গড়ে ওঠেনি। শ্রমিকদের উপর বাগান কতৃপক্ষের দৈহিক নির্যাতন বা নারী ঘটিত অনাচার সীমা ছাড়িয়ে না গেলে এ সময় কোথাও কোন ধর্মঘট হতে দেখা যায়নি। গান্ধীবাদী রাজনীতির প্রভাবে কংগ্রেসী শ্রমিক পঞ্চায়েৎ কেবল শ্রমিক-মালিক বিরোধে শ্রমিক স্বার্থের বিনিময়ে আপোষ নিষ্পত্তি করে গিয়েছে। এ কর্মপদ্ধতির ফলে শ্রমিক পঞ্চায়েৎ মালিক ম্যানেজারদের খুব প্রিয়পাত্র হয়ে যায়। বাগানগুলোর সব শ্রমিককে ম্যানেজার ও কর্মচারীরা পঞ্চায়েতের সভ্য খাতায় নাম লিখিয়ে তাদের মজুরীর অর্থ থেকে মাসে মাসে চাঁদা কেটে নিয়ে পঞ্চায়েতের নেতাদের হাতে তা তুলে দেওয়ার রেওয়াজ চালু করে। তাতে যেকোন বাগানের মোট শ্রমিক সংখ্যাই হয়ে দাঁড়ায় সে বাগানে পঞ্চায়েতের সভ্যসংখ্যা আর বাগানের ম্যানেজার কর্মচারীরা শ্রমিকদের ডেকে না-ডেকে তাদের পছন্দ মত বাগানের পঞ্চায়েত কমিটি তৈরি করে দিতে থাকে। চা-বাগান শ্রমিকদের সংগঠনকে এ পর্যায়ে ঠেলে নেবার ফলে বিভাগ পূর্বকালে শ্রমিকদের যে সংগ্রামী চেতনা ও ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিল তা একেবারেই লোপ পেয়ে যায়। যার ফলে শ্রমিক পঞ্চায়েৎগুলো সদুপদেশ বিতরণ ও ধর্মীয় নিয়ম পদ্ধতি প্রচারের আখড়ায় পরিণত হয়। পুরনো মজদুর ইউনিয়নের কর্মীরা তখনও তাদের সংগঠনের পুনর্গঠনের আশায় শ্রমিকদের ভেতর তাদের সংগ্রামমূখী কার্যক্রমের প্রচার চালিয়ে যাওয়ায় বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে শ্রমিক পঞ্চায়েতও তাদের বিরুদ্ধে মারমুখো হয়ে ওঠে। সিলেট জেলায় নানকার বিদ্রোহের ফলে পাকিস্তান সরকার তখন ঘোরতর কমিউনিস্ট বিরোধী হয়ে উঠলে তারা শ্রমিকদের ভেতর কর্মরত কমিউনিষ্ট কর্মীদের পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে থাকে। এভাবে পুলিশের হাতে তখন ধরা পড়েন শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিক ইউনিয়ন কর্মী প্রশান্ত দত্ত, সিলেট শহরের নিকটবর্তী খাদিম নগর, কালাগুল, চিকনাগুল চা-বাগান অঞ্চলে কর্মরত ইউনিয়ন কর্মী অশ্বিনী দেব এবং বাগান শ্রমিক সামরথ ও চুনীলাল। মহিলা শ্রমিকদের ভেতর কর্মরত কর্মী হেনাদত্ত (দাশ) কোন রকম পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পেরে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যেতে সমর্থ হন। এভাবে যারা গ্রেপ্তার হন দীর্ঘদিন তাদের হাজতে ফেলে রেখে অবশেষে মিথ্যা সাক্ষী সাজিয়ে তাদের সাহায্যে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাদের সবাইকে দেশ রক্ষা আইনে ৩ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড দেওয়া হয়।
এ সময় সিলেটের চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ও মজুরীরর ব্যাপারে ক্রমাবনতি ঘটতে থাকলেও সরকার ও মালিকপক্ষ শ্রমিক পঞ্চায়েতের সহায়তায় প্রায় সংঘর্ষহীন অবস্থার সৃষ্টি করে ফেলে। সাম্প্রদায়িক অশান্তির ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসী পঞ্চায়েত তখন শ্রমিকদের প্রতিবাদের ক্ষমতা লোপ করে যুদ্ধ ও দেশ বিভাগের পরিণতিতে চা শিল্প তখন দারুণ সঙ্কটের ভেতর দিয়ে চলেছে। এ সঙ্কটের প্রধান চাপ এসে পড়েছে শ্রমিকদের উপর। ফলে চা-বাগান শ্রমিকদের অবস্থা তখন কাহিল। এ সঙ্কটের কারণে সিলেট জেলায় চা-বাগানগুলোর মালিকানার ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটতে লাগল। বিলাতী কোম্পানীগুলো তাদের বাগানগুলো দেশীয় লোকের কাছে বিক্রি করতে আরম্ভ করল। যেগুলো তাদের হাতে রইলো তাতেও দেশীয় লোকের হাতে পরিচালনভার তুলে দিয়ে বিলাতে বসে থেকেই তারা কোম্পানী পরিচালনা করতে থাকল। এই পরিবর্তনের ফলে বাগানগুলোর উপাদনে এবং শ্রমিকদের মজুরীর ক্ষেত্রে দারুণ অবনতি ঘটল। শ্রমিক পঞ্চায়েত তবু তার কাজের ধারায় কোন পরিবর্তন সাধন করল না।
সিলেট জেলায় চা বাগানগুলোর মালিকেরা বিশেষভাবে নবআগন্তুক পাঞ্জাবী পুঁজিপতিরা চা শিল্পের এই শান্ত অবস্থায়ও শ্রমিকদের উপর সন্তুষ্ট ছিল না। চরম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় আচ্ছন্ন এই মালিকগোষ্ঠী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তখন ষড়যন্ত্র আঁটছিল। আইয়ুব খাঁর সামরিক অভ্যুত্থানের সময় এ ষড়যন্ত্র কার্যকরী করতে তাদের সুযোগ হল। পাকিস্তানে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রথম সুযোগেই তারা সরকারকে প্রভাবিত করে শ্রমিকদের ভেতর এই ‘হিন্দুয়ানির’ প্রভাব ঠেকাতে চা বাগান শ্রমিক পাঞ্চায়েতের নেতাদের ধরে বিনা বিচারে জেলখানায় বন্দি করাতে সমর্থ হল। সরকার তাদের হাত থেকে শ্রমিক পাঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে বাগান মালিকদের পেটোয়া মুসলিম লীগ পন্থীদের একটা গোষ্ঠীর হাতে তা তুলে দিল। ইউনিয়নের তহবীল এবং অন্যান্য সম্পদও তারাই পেল। তখন থেকে শ্রমিক ইউনিয়ন সরকার ও মালিকদের ধামাধারা গুটিকয়েক মুসলিম লীগ পন্থীদের লুটপাটের ক্ষেত্র হয়ে উঠল। শ্রমিকদের কোন মতামত না দিয়ে গুটি কয়েক দালাল শ্রমিককে এই মুসলিম লীগ পন্থীদের সাথে জুড়ে দিয়ে সামরিক সরকারের কর্মচারীরা শ্রমিকদের জন্যে এক নতুন ইউনিয়ন গড়ে ফেলল।
সরকার ও মালিকদের এই স্বৈরাচারী কার্যক্রমের কোন প্রতিক্রিয়া শ্রমিকদের ভেতর ঘটতে দেখা গেল না। কংগ্রেসীরা চা-বাগান শ্রমিকদের অতীতের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করে ‘শিল্পে শান্তি রক্ষার’ নামে যে সংগ্রাম বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছিল তার ফলেই সিলেট জেলার লক্ষাধিক চা-বাগান শ্রমিকের, বিশেষ করে শ্রমিক পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে এত বড় একটা আঘাতকেও শ্রমিকরা মুখ বুজে মেনে নিলেন। তারপরেও চা-বাগান শ্রমিক পঞ্চায়েতের কংগ্রেসী নেতাদের উপর সরকারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে বা তাদের মুক্তির দাবীতে শ্রমিকদের সারিতে কোন আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখা গেল না।
পরবর্তীকালে সিলেট জেলার চা-বাগান শ্রমিকদের ভেতর শ্রমিক স্বার্থে আর কোন কার্যকর সংগঠন গড়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশ সৃষ্টির অব্যবহিত আগে ও পরে বামপন্থী রাজনীতির নামে আত্মপরিচয় দিয়ে কিছু রাজনৈতিক কর্মী বার কয়েকই এ ধারায় শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আজও তাদের এমন কোন প্রচেষ্টাই সাফল্যের ধারে কাছেও পৌছতে পারেনি। তার প্রধান কারণ মনে হচ্ছে যে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এ দেশের সমাজ জীবনকে আজ গ্রাস করতে বসেছে, দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী, কাউকে তা রেহাই দিচ্ছে না। কোথাও কোন সংগঠন গড়ে উঠতে না উঠতে তার অগ্রণী কর্মীদের একটা অংশ নিজেদের আর্থিক সুবিধা আদায়, সরকার দমননীতি থেকে গা বাঁচান ও নির্বাচনের টিকিট সংগ্রহ করার আশায় সরকার ও কায়েমী স্বার্থের খপ্পরে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে। এ দেশের সমাজে যে সুবিধাবাদ জীবনের মূল্যবোধকে আজ মুছে ফেলতে উদ্যত হয়েছে চা-বাগান শ্রমিকদের আন্দোলন ও সংগঠনের উপর তা আজও ছায়া ফেলে চলেছে। অথচ চা বাগান শ্রমিকদের জীবন প্রবাহ আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এ দেশের অপর যেকোন মানব গোষ্ঠীর জীবন ধারার কতটা পেছনে পড়ে আছে অনেকের পক্ষে বোধহয় তা কল্পনা করাও কঠিন হবে। সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন ছাড়া অন্যদের সঙ্গে তাদের এ ফারাকটা দূর করা কোন দিনই সম্ভব বলে মনে হয় না।
মুক্তিযুদ্ধে চা জনগোষ্ঠীর রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। অথচ এই বিষয়টি আমাদের ইতিহাসে উপেক্ষিত হয়ে আছে। কঠিন পরিশ্রমে সেই উপেক্ষিত ইতিহাসটি তুলে ধরেছেন দীপঙ্কর মোহান্ত। ২০০০ সালের মে মাসে বইটি প্রকাশ করে সাহিত্য প্রকাশ। ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের চা শ্রমিক’ নামের এই বইটিতে আছে পাঁচটি পর্ব। এর মধ্যে আছে পটভূমি, নির্যাতন পর্ব, বীরাঙ্গনা পর্ব, বাগানে বাগানে যুদ্ধ ও স্মৃতিপর্ব। পরিশিষ্ট অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চা শ্রমিক, চা শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও বাংলাদেশের চা বাগানসমূহ। বইটি পড়লেই বোঝা যায় এর পেছনে লেখকের রয়েছে বিস্তৃত অধ্যয়ন ও গবেষণার যোগফল।
সাংবাদিক ইসহাক কাজল লিখেছেন ‘সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক আন্দোলন অতীত ও বর্তমান।’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে। প্রকাশ করেছে প্রবাস প্রকাশনী। বইটি কিছুটা অগোছালো হলেও লেখকের আন্তরিকতা ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি সেখানে বর্ণনা করেছেন কিভাবে পাকিস্তান আমলে চা জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব কংগ্রেসের হাত থেকে চলে গেল পাকিস্তান সরকারের তাবেদার সোলেমানের হাতে। স্বাধীনতা উত্তরকালে চা শ্রমিকের নেতৃত্ব চলে যায় চা শ্রমিক নেতা রাজেন্দ্র বুনার্জির হাতে। তিনি লিখেছেন ১৯৭২ সাল থেকে শ্রমিক আন্দোলনে শুরু হলো নতুন ধারা। ১৯৭২ সালে এম সোলেমান স্বেচ্ছায় ইউনিটি হাউস ত্যাগ করে চলে গেলে ইউনিয়ন এবং ইউনিটি হাউসের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জি ও তার সহযোগীরা। রাজেন্দ্র, সুরেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তাই আওয়ামীলীগ সমর্থিত চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ তাদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে ইউনিয়ন থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। শুরু হয় একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বোনা। শ্যাম নারায়ণ গৌড় ও ন্যাপ নেতা রাজেন্দ্র দত্তের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে জবর দখলের জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা আলতাফুর রহমানের নেতৃত্বে চা শ্রমিকদেরকে নিয়ে লাল বাহিনী গঠন করা হয়। এই লাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বিমল বুনার্জি ও সুখ সরকার।
লাল বাহিনীর মাধ্যমে চা বাগানে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। উদ্দেশ্য একটিÑ রাজেন্দ্র বুনার্জিকে ইউনিয়ন নেতৃত্ব থেকে হটানো। শুরু করা হয় নানাবিধ চক্রান্ত ষড়যন্ত্র। খেজুরিছড়া চা বাগানের মসজিদে শুকর বলি ও মসজিদ ভাঙ্গার মিথ্যা প্রচারণা ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এই হানাহানির সুযোগে লক্ষ্মী নামের একটি চা শ্রমিক মেয়েকে অপরহণ পর্যন্ত করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীতারাম নাইডু ও মোহন লাল সোমকে রক্ষী বাহিনী গ্রেপ্তার করে সীমাহীন নির্যাতন করে। রাজেন্দ্র বুনার্জি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। পলাতক অবস্থায় রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাগানে বাগানে গোপন বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। রাজেন্দ্র বুনার্জি বর্মাছড়া ও টিপড়াছড়া বাগানে অবস্থান করে শ্রমিক সভা করার জন্য তাঁর আপন ভাতিজা বসন্ত বুনার্জিকে মাইকে প্রচার করার দায়িত্ব দেন। বসন্ত বুনার্জি ছিলেন শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র এবং ছাত্র ইউনিয়নের স্কুল কমিটির সভাপতি। ঘোষনা করা হয় খেজুরিছড়া চা বাগানের নাচঘরে চা শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষনা মাইকে প্রচার হবার পর লাল বাহিনীর নেতৃত্বাধীন চা শ্রমিকদের আঁতে ঘা লাগে। তারা উক্ত শ্রমিক সভা বানচাল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামেন। লাল বাহিনীর প্রধান নিয়ন্ত্রক আলতাফুর রহমানকে নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে এই সমাবেশ বানচাল ও রাজেন্দ্র গ্রুপকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সাল। বসন্ত বুনার্জি মাইক প্রচার শেষ করে একটি জিপে সিন্ধুরখান চা বাগানে যাবার পথে তাকে জোর পূর্বক অপরহরণ করা হয়। রাজেন্দ্র দত্তের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বসন্ত বুনার্জিকে অপহরণ করে নিয়ে লাল বাহিনীর গণসংযোগ কমিটির চেয়ারম্যান সুখ সরকারের বাসায় আটক রাখা হয়। এই বাসাটি ছিল হরিপদ দত্তের। রাত ১০টার পর কালিটিলা নিয়ে গিয়ে বসন্ত বুনার্জিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার হাত-পায়ের রগ কাটা হয়, পুরুষাঙ্গ কর্তন করা হয় এবং সর্বশেষ গলা কাটা হয়। এই হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে চিত্র ভৌমিক, সত্য ভৌমিক, সুখ সরকার সহ ১০ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। এই হত্যা ঘটনার পর ন্যাপ ও সিপিবির নেতৃত্বে শ্রীমঙ্গলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘদিন বিক্ষোভ মিছিল, জনসভা, পথসভার মাধ্যমে বসন্ত হত্যার বিচার দাবি করা হয়। কিন্তু লাল বাহিনীর অত্যাচার আর নির্যাতনের ভয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হত্যাকান্ডটি আদালতে প্রমাণ করা যায়নি। অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন এবং যারা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা প্রাণের ভয়ে আসামী পক্ষের আইনজীবীর শিখানো বুলি বলে গেছেন। ফলে হত্যার সাথে জড়িতরা সবাই মুক্তি পেয়ে যান। আসামীগণ মুক্তিলাভের পর আরও সাহসী হয়ে উঠেন। লাল বাহিনীর প্রতাপ আরও বহু গুণ বেড়ে যায়। রাজেন্দ্র বুনার্জির পক্ষে ইউনিয়ন পরিচালনা তো দূরের কথা প্রকাশ্যে চলাফেরা পর্যন্ত অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
এরপর রাজেন্দ্র তার নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য আওয়ামীলীগের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ২০০১ সালের পরে রাজেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোটের আশির্বাদপুষ্ট হয়ে একদল শ্রমিক আন্দোলন করে লেবার হাউস দখল করে নেয়। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ও ভ্যালী নির্বাচনে রাজেন্দ্র বুনার্জির পক্ষ হেরে যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজেন্দ্র আবার অলিখিতভাবে চা জনগোষ্ঠীর প্রধান নেতা হিসেবে বিবেচিত হন এবং চা জনগোষ্ঠীর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন।
ড. নিবেদিতা দাশপুরকায়স্থ রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ্স বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে চা জনগোষ্ঠীর উপর একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এর নাম ‘আত্ম উন্নয়নে চা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ।’ বইটিতে মোট ৭টি অধ্যায়। প্রাক কথন, গবেষণা পদ্ধতি ও প্রয়োগ, চা শ্রমিকদের দারিদ্র-শিকড় ও কারণ অনুসন্ধান, চা শ্রমিকদের সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র, শ্রম-শিল্প আইনে শ্রমিকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তবতা, চা শ্রমিকদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভূমিকা ও আন্দোলন, চা শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে যৌথ উপায় উদ্ভাবন ও ফলোআপ পরিকল্পনা। সবশেষে আছে পরিশিষ্ট।
রসময় মোহান্ত লিখেছেন ‘বাংলাদেশের চা-শিল্প ও শ্রম।’ বইটি ২০০৮ সালে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী শুয়েব আহমদ শওকতি। বইটিতে আছে মোট ১১টি অধ্যায়। এর মধ্যে আছে চা চাষের সূত্রপাত, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা, চা শিল্পের সমস্যাবলী ও সরকার, চায়ের বাজার ঃ আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক, চা বাগানের শ্রমিক সংগ্রহ, চা শ্রমিকদের পরিণতি, সেকালে চা শ্রমিক নির্যাতন ঃ লেখক ও সম্পাদকের দৃষ্টিতে, চা শ্রমিকদের প্রতিরোধ আন্দোলন ঃ অসংগঠিত পর্যায়, চা শ্রমিক প্রতিরোধ আন্দোলন ঃ সংগঠিত পর্যায় ঃ চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ।
মাহফুজুর রহমান চা জনগোষ্ঠীসহ সিলেট জেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠিকে নিয়ে লিখেছেন একটি গ্রন্থ ‘সিলেট অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী।’ ২০০৯ সালের বইমেলায় বইটি প্রকাশ করে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
২০১০ সালে চা জনগোষ্ঠীর লেখক পরিমল সিং বাড়াইক লিখেছেন ‘চা জনগোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতি।’ এই বইটিতে সাবলীল ভাষায় চা-জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে।

সংবাদপত্র ঃ
গণমাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী অবস্থান সংবাদপত্রের। প্রাচীন অনেক সংবাদপত্রে চা শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার অনেক করুণ কাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে তার অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। লুপ্ত হয়ে গেছে তাদের প্রতিরোধের কাহিনী। শুরুর দিকে যেসব পত্রিকা চা জনগোষ্ঠির কথা তুলে ধরেছিল এদের মধ্যে ছিল কলকাতার ‘সঞ্জীবনী’ ও ‘বেঙ্গলী’ এবং ঢাকার ‘ঢাকা প্রকাশ’। এসব পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক রামকুমার বিদ্যারতœ ও দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। এদের দু’জনেই আসাম ও উত্তরবঙ্গের অনেক চা বাগানে গোপণে ভ্রমণ করে, কখনও কুলি সেজে সরেজমিন অনুসন্ধান করে শ্রমিক নির্যাতনের সংবাদ নিয়মিতভাবে পত্রিকায় প্রকাশ করতেন। এতে চা-কর সাহেবদের অপকর্মের সংবাদ সভ্যজগতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এতে বাগানের কায়েমী স্বার্থবাদিরা ক্ষেপে যায়। তাদেরকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ভীক এই দুই যোদ্ধা প্রাণ সংশয় জেনেও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হন নি।
অমর দত্ত তার আসামে চা কুলি আন্দোলন ও দ্বারকানাথ গ্রন্থে লিখেছেনÑ
‘ঢাকা হতে প্রকাশিত ঢাকা প্রকাশে চা-করদের অনাচার প্রকাশিত হতে থাকে। ঢাকা প্রকাশ পত্রিকার প্রতিনিধি সম্ভবত সভ্যজগতের কাছে চা-করদের নির্মম অত্যাচারের কথা প্রথম প্রকাশ করে দেন। ফলে উক্ত পত্রিকার প্রতিনিধির জীবন বিপন্ন হয় এবং অন্য কোন প্রতিনিধির পক্ষে জঙ্গালাকীর্ণ আসামের খবর সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
এ প্রসঙ্গে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ থেকে (১৮৬১) একটি চিঠি উদ্ধৃত করেছেন যার বাংলা করলে দাঁড়ায়Ñ
‘আপনি সম্ভবত অবগত আছেন যে, কাছাড়ে ঢাকা প্রকাশের নিয়মিত সংবাদদাতা সেই অঞ্চলের চা-করদের কার্যক্রম সম্পর্কে এ যাবৎ বহির্বিশ্বকে অবহিত করে আসছিলেন। তাদের স্বার্থের প্রতিকূল বিরুক্তির সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখলে তাঁর জীবন বিপন্ন হবে বলে স্বার্থন্বেষী মহল তাঁকে ভয় দেখালে তিনি তাঁর সংবাদ প্রেরণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।’

ঢাকা প্রকাশ পত্রিকায় চা-করদের অত্যাচার সম্পর্কে অনেক খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। যেমনÑ
২৯ জৈষ্ঠ্য, ১২৭০, ৪ জুন ১৮৬৩’ তারিখ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ ঃ
‘মহাত্মা জেপি গ্রান্ট বাহাদুরের সময় প্রজাগণ কিছুকাল সুখে নিদ্রা গিয়াছিল। কিন্তু যেমন তিনি ভারতবর্ষ পরিত্যাগ করিয়াছেন, অমনি তাহাদিগের সর্বনাশ করিতে পবৃত্ত হইয়াছেন। আজি বিডেন সাহেব বাংলার শাসনকর্তা। তিনি গ্রান্ট সাহেবের ন্যায় প্রজাপুঞ্জের হিতৈষী নহেন। দুই একটি বিষয়ে তাহার বিলক্ষণ প্রজা হিতৈষিতার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। আশ্চর্য এই তিনি প্রজাদিগকে পুনর্ব্বার নীল (কর) কর্তৃক প্রপীড়িত হইতে দেখিয়াও এইরূপ নিশ্চিত রহিয়াছেন। আমরা অনুরোধ করি, তিনি আলস্য পরিত্যাগ করিয়া চা-করগণের কার্যের প্রতি একবার কিছু দৃষ্টিপাত করুন। চা-কর অত্যাচারানল দিন দিনই প্রবল হইয়া উঠিতেছে। যদি সত্ত্বর তাহার নিবারণে যথোচিত যতœ বিনিয়োগ না হয়, তবে তাহা পরিণামে আরও ভয়ানক হইয়া উঠিবে। বিডেন সাহেব বিবেচনা করিতে পারেন, চা করগণের প্রতি দেশোন্নতি অনেক র্নিভর করিতেছে। যদি তাঁহাদিগের প্রতি উপযুক্ত শাসন প্রযুক্ত হয়, সেই দেশোন্নতির পথে অবশ্য কন্ঠপাত পড়িবে। কিন্তু বাস্তবিক এ বিবেচনা নিতান্তই ভ্রমমূলক। চা করদিগের অত্যাচার যথোচিত শাসন প্রযুক্ত হইলে দেশোন্নতির পথে কন্ঠকপাত হওয়া দূরে থাকুক, তাহা আরও পরি®কৃত হইবে। চা-করেরা প্রথম কিছু বিরক্ত হইবেন বটে, কিন্তু শেষে সেই শাসন প্রয়োগের মহোপকারিতা অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন। তবে যদি তাঁহারা নিতান্তই বিরক্ত হইয়া এদেশ হইতে চলিয়া যান, তাহাও দেশের পক্ষে অনিষ্টকর নয়। তাঁহারা এক্ষণে যে রূপ দেশোন্নতি সাধন করিতেছেন, তাহা অপেক্ষা অনুন্নতি, সহস্রবার প্রার্থনীয়। অতএব বিডেন সাহেব আর চা-কর অত্যাচার নিবারণে উদাসীন থাকিবেন না। চা-করেরা কুলীদিগের প্রতি যে সকল ভয়ানক অত্যাচার করেন, তাহা শুনিয়া পাষাণও দ্রব হইয়া যায়, তাঁহার অন্তঃকরণ কি নিমিত্তে দ্রব হইতেছে না? আর কতকাল কুলীদিগের পৃষ্ঠদেশ হইতে শোণিত প্রবাহ প্রবাহিত হইবে? আর কতকাল আমরা তাহাদিগের সকরুণ আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া ব্যথিত থাকিব? আর কতকাল তাহারা আহার ও বাসস্থানের অপকৃষ্ঠতা নিবন্ধন উৎকট রোগাক্রান্ত হইয়া অকালে লোকান্তর গমন করিবে?যদি সভ্যতম ব্রিটিশ অধিকারেও, আমাদিগকে এই সকল অত্যাচার দেখিতে হইল, তাহা হইলে আর মুসলমানদিগের অধিকার নিন্দনীয় কিসে? মুসলমান অধিকার সময়ে প্রজাগণ কি ইহা অপেক্ষা অধিক অত্যাচারিত হইত?’

উপরের সংবাদটিতে কোন সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ না থাকলেও উচ্চারণের কঠোরতা এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এর প্রায় দুই দশক পরের নিম্ন সংবাদটি সুনির্দিষ্ট একটি ঘটনার উপর বিন্যস্ত। এখানেও সংবাদদাতার সাহসিকতাপূর্ণ মন্তব্যগুলি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হল ঃ

২৭ জৈষ্ঠ্য, ১২৯১ জুন, ১৮৮৪’ তারিখ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ ঃ
‘ওয়েবের অর্থদন্ড এবং এতদুপলক্ষে আমাদের একটি মনোগত ভাবনা‘….পাঠকবর্গের অবশ্যই স্মরণ আছে, আমরা ইতঃপূর্ব্বে একজন শ্বেতাঙ্গ পিশাচ কর্তৃক একটি কুলী রমণীর প্রতি পৈশাচিক অত্যচারের কথা প্রকাশ করিয়াছি। এতদিন তাহা জোড়হাটের ডেপুটি কমিশনারের বিচারাধীন ছিল, সম্প্রতি সে বিচার শেষ হইয়া গিয়াছে। যে রূপ বিচার হইয়াছে, তাহাকে বিচার না বলিয়া বিচারের বিপরীত নামে অভিহিত করিলে সত্যের সম্মান রক্ষা পায়। এ রূপ যে হইবে, তাহা আমরা পূর্ব্বেই এক প্রকার স্থির করিয়া রাখিয়াছি। যখনই মনে ভাবিয়াছি, এই মোকদ্দমায় একদিকে একজন শ্বেতাঙ্গ সাহেব, অন্যদিকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ কুলী, তখনই সন্দেহ করিয়াছি- এ স্থলে ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষা হইবে না। যখনই ভাবিয়াছি, এই মোকদ্দমায় একজন অর্থশালী সহায় সম্পন্ন লালমুখো, অন্যদিকে একজন সহায় সম্পত্তিহীন মূর্ত্তিমান দুঃখ, তখনই স্থির করিয়াছি, ওয়েব তাহার পৈশাচিক অত্যাচারের প্রতিফল পাইবে না। ভারত জননীর দেবদুর্লভ সতীত্বরতœ হরণ করিয়া পশুপকৃতির ওয়েব আমাদের হৃদয়ে যে গুরুতর আঘাত দিয়াছে, ওয়েবের হৃদপিন্ড শৃগাল শকুনী দ্বারা খাওয়াইলেও আমাদের সে ব্যাথা অপগত হইবার নহে। যে ওয়েব একজন নিঃসহায়া সতী রমণীর প্রতি অকথ্য অত্যাচার করিয়া, তাহাকে ইহ সংসার হইতে অপসৃত করিয়াছে, সেই পাপের প্রতিমূর্তিরূপী ওয়েবের উচিত শাস্তি কি দুইশত টাকা জরিমানা? পাঠক শুনিতে চাও কি? ডেপুটি কমিশনারের বিচারে ওয়েবের দুইশত টাকা জরিমানা হইয়াছে। যদি একজন কৃষ্ণাঙ্গ অত্যাচারীর দ্বারা কোন শ্বেতাঙ্গ রমণীর এইরূপ দশা হইত, তবে অপরাধীর অবস্থা যে কিরূপ হইত, তাহা চিন্তার অনধিগম্য।’
‘অতঃপর আমাদিগকে আর ঔদাস্যের ক্রেড়ে নিদ্রিত থাকা উচিত নহে। যেখানে যে যে সভা সমিতি আছে, এই উপলক্ষে সকলেরই একটি অবশ্য কর্ত্তব্যকার্য সম্পাদন পক্ষে মনোযোগী হওয়া উচিত। সে কর্ত্তব্য কার্যটি কি? প্রবলের হস্ত হইতে দুর্ব্বলের রক্ষার উপায় বিধান করা, অত্যাচারীর অত্যাচারের প্রশমনের চেষ্টা পাওয়া। উল্লিখিত ঘটনায় যদি পূর্ব্ব হইতেই আমাদের রাজনৈতিক সভাগুলি মনোযোগী হইতেন, তবে হয়ত ওয়েবের এরূপ গুরুপাপে লঘুদন্ড হইত না।’
‘শুনা যায়, বিচারের দিন চা-কর সাহেবের পালে বিচারালয় পূর্ণ হইয়াছিল। সাহেব আসামীর সাহায্যার্থ এরূপ শত শত লোক দন্ডায়মান, কিন্তু নগন্য কুলীর সহায়তার জন্য কে অগ্রসর হইবেন? আমরা সুশিক্ষিত, আমরা সুসভ্য আমরা কি একজন হেয় কুলীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিয়া, একজন নীচ জাতীয় লোকের সাহাযার্থে দন্ডায়মান হইয়া আমাদের সুশিক্ষার, সুসভ্যতার অবমাননা করিব। কিন্তু এখন আর আমাদের এই সকল অভিমান করা সাজে না। দেখিতেছি না, অত্যাচারীর হস্ত ভারত সতীর সতীত্বাপহরণে প্রসারিত হইয়াছে; অতঃপর সকলে সাবধান হও যাহাতে উৎপীড়িত নিঃসহায় দরিদ্রগণ এইরূপ পৈশাচিক উৎপীড়নে উৎপীড়িত হইয়া সাহায্যাভাবে সহায়াভাবে সুবিচার লাভে অসমর্থ না হয়। তদর্থ আমাদের সর্ব্বদাই সচেষ্ট হওয়া উচিত। ভারত সভা একবার এ বিষয়ে মনোযোগী হইবেন কি? ভারত সভা অন্যান্য যে যে বিষয়ে আন্দোলনের আগুন জ্বালিবার চেষ্টা করিতেছেন, সে সকল অপেক্ষা আমরা এ বিষয়টিকে অধিক গুরুতর মনে করি। শ্বেতাঙ্গের পদাঘাতে, ঘুষার চোটে অহরহ কত কত কুলীর স্বর্গপ্রাপ্তির সংবাদ শুনিয়া থাকি; কিন্তু তাহাতে আমাদের হৃদয় এইরূপ জ্বালাদগ্ধ হয় না। ভারত সন্তানের হৃদয়ে ভারতে রমণীর অবমাননা, ভারত রমণীর সতীত্ব নাশ অসহনীয়। আমরা এ সময়ে ভারতীয় ভ্রাতৃগণকে স্বর্গগত সতীর প্রেতাত্মার প্রণোদনায় জাগরিত হইতে অনুরোধ করিতেছি।
ঢাকা প্রকাশের পর আসে সঞ্জীবনী ও ঃযব ইবহমধষবব প্রভৃতি পত্রিকার কথা। ভারত সভার ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে নেতৃত্বে তখন চা কুলি আন্দোলনের স্বপক্ষে সংবাদ সংগ্রহ করে প্রকাশ করতে থাকেন। সেই কারণেই প্রয়োজন হয় নিজেদের পত্রিকা, সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের ঃযব ইবহমধষবব এবং বিলেতে কৃষ্ণকুমার মিত্রের পরিচালনায় ‘সঞ্জীবনী‘ খ্যাতি লাভ করে। সঞ্জীবনীর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ‘চা-কর আন্দোলনের কুলি অত্যাচারের কাহিনী।’ সঞ্জীবনীর পাতায় ছড়িয়ে থাকা ১৮৮৩, ১৮৮৫ এবং ১৯০৪-১৯০৫ সালের ১২টি সংবাদ নিম্নে উদ্ধৃত করা হল।
১১ জৈষ্ঠ্য ১২৯২ তারিখ সংখ্যায় আছে ‘আমাদের পাঠকগণ জানেন, আসামে গোলাঘাটের নিকট হামদাই প্রান্তরে হেক্সট ও ব্রাগ নামক দুইজন চা-কর বিগত জানুয়ারি মাসে গাড়ী হাঁকাইয়া যাইতেছিলেন। কোন সম্ভ্রান্ত মুসলমান বালক ইংরেজের দিকে দৃকপাত না করিয়া অশ্বারোহণে গাড়ীর অগ্রে অগ্রে যাইতেছিল। অবশেষে বালকের দেহ শকট চক্রে নিষ্পেষিত হয়, বালক জীবন লীলী সম্বরণ করে। বালকের অভিভবাকগণ বলেন, একটি দেশী লোক ইংরেজের গাড়ীর অগ্রে অগ্রে অশ্বারোহণে যাইতেছে দেখিয়া ইংরেজ ক্রোধে বালককে কষাঘাত করেÑ বালক আঘাত সম্বরণ করিতে না পারিয়া ভূতলে পতিত হয়, চা-কর যুগল তাহার উপর শকট চালাইয়া দেন, তাহাতেই বালকের মৃত্যু হইয়াছে। চা-করদ্বয় বলেন, বালক তাঁহাদের দ্রুতধাবিত শকটের সম্মুখে আপনাআপনি অশ্ব হইতে পড়িয়া যায়, তাঁহারা গাড়ী থামাইতে পারিলেন না, চক্রাঘাতে বালকের প্রাণ বাহির হইল। ইহা লইয়া মোকদ্দমা হয়। বিচারে চা-করগণ নির্দোষ সাব্যস্ত হইলেন। কিন্তু উপরিবর্তন কর্ম্মচারী বিচারে অসন্তুষ্ট হইয়া আসামীদিগকে সেশনে অর্পণ করিতে বলেন। বিগত ১৯ জানুয়ারি শিবসাগরে তাঁহাদে বিচার হইয়াছে। আমরা আমাদের সংবাদদাতার নিকট হইতে নিম্নলিখিত তারের সংবাদ পাইয়াছিÑ

‘হেক্সট ও ব্রাগ খালাস পাইয়াছে। দন্ডবিধির ৩০৪ এ ধারানুসারে চার্জ হইয়াছিল। ইউরোপীয় জুরীর মতানুসারে আসামীদ্বয় মুক্তি পাইয়াছে। দেশী জুরীগণ খালাস দিতে মত দেন নাই। আমরা মোকদ্দমার কাগজপত্র দেখিবার জন্য অপেক্ষায় রহিলাম।’

২৫ জৈষ্ঠ ১২৯২ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘আমাদিগের আসামের সংবাদদাতা লিখিয়াছেনÑ আসামের কুলী অত্যাচার লিখিতে গিয়া আপনার উপায়হীন সংবাদদাতা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণ জালে জড়িত। চতুর্দ্দিকে শত্রু বেষ্টিত। কেবল যে সাহেবরই শত্রু এমন নয়, কোম্পানীর হাকিম, উকিল, মোক্তার, সরকার, কেরানী, গোমস্তা সকলেই আমার উচ্ছে সাধনে তৎপর। সাহেবরা তো অনেকদিন হইতেই বলিয়া রাখিয়াছে, সঞ্জীবনীর সংবাদদাতা চা-করের বন্দুকের প্রথম শিকার হইবে।’
‘হে চা-কর, তুমি গুলি করিবেই বল, আর যাহাই বল, আমি কখনই আমার কর্তব্য কার্য হইতে বিরত হইব না। যে পর্যন্ত আমার দক্ষিণ হস্ত থাকিবে, সে পর্যন্ত জগৎকে তোমার নৃশংস পাপাচার জানাইতে কখনই পরাক্সমুখ হইব না।’
৭ অগ্রায়ণ ১২৯২ তারিখ সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদে আছেÑ ‘শ্রীহট্টের কুলী হত্যা সম্বন্ধে বাদীর প্রতিবাদীর পক্ষের বিবরণ এইÑ তত্রত্য কালাগুল চা বাগানের ১৪/১৫ বৎসর বয়স্ক উমেশ নামক জনৈক কুলী যুবক গত শুক্রবার বাগিচার কাজে যায় নাই, তাই ম্যানেজার সাহেব রাগান্ধ হইয়া সূর্যাস্ত কালে বীরবল নামক সরদার দ্বারা উমেশকে তাঁহার বাংলোয় ডাকাইয়া নেয়। তৎকালে সাহেব কি করেন তাহা দেখিবার জন্য আরও কয়েকটি কুলী স্ত্রী ও পুরুষ ও তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা গোপনে পাছে পাছে গিয়াছিল। উমেশ বারান্দার উপর গেলে পর কেন সে কাজে যায় নাই, তাহা বলিয়াই সবুট এক লাথি মারিয়া তাহাকে বারান্দা থেকে নিচে ফেলিয়া দেন। তৎপর আরও দুই তিন লাথি মারেন, তাহাতেই হতভাগার প্রাণবায়ু বহির্গত হয়। ঐ কুলীর কনিষ্ঠ ভ্রাতাসহ অপর কুলীগণ সম্মুখে থাকায় তাহাদিগকে ঐ লাশ লইয়া যাইতে বলিলেন। কিন্তু কুলীরা মরা নিতে অস্বীকার করায় সাহেব স্বমূর্তি ধারণ করিয়া ‘শূওর লে যাও, না হনে সে বেত দেগা’ বলিয়া চৌকিদারকে বেত আনিতে আদেশ করিলেন। পরে কুলীগণ ভীত হইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে লাশ লইয়া লাইনে চলিয়া গেল। রাত্রে তাহারা কোথাও না যাইতে পারে তজ্জন্য পাহারা বসিয়াছিল। পরদিন ৮টার সময় কুলী গন্তি হয়, তখন শিবচরণ প্রভৃতি দুই তিন জন লোক পলাইয়া থানায় আসিয়া এজাহার দেয়।
‘এদিকে সাহেব অন্য কেহ মারিয়াছে বলিয়া একখানা চিঠি দিয়া ঐ লাশ পুলিশে পাঠাইয়া দেন। পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবু ব্রজগোপাল ধর বিশেষ তদন্তে সাহেবকে দোষী স্থিরীকৃত করিয়া ফৌজদারী কার্যবিধির ৩০৪ ধারা মতে সাহেবকে চালান করেন। এস্টেন্ট কমিশনর শ্রীযুক্ত আর. আর. পোপ সাহেবের নিকট মোকদ্দমা হয়। বিচারে আসামী খালাস পাইয়াছে। বাদীর পক্ষে বেশ সুন্দররূপে প্রমাণ হইয়াছিল, তবে নিরক্ষর কুলীগণ কোন কোন বিষয়ে গোল করিয়াছে। কেহ বা বলিয়াছে ঘটনার তারিখ, শুক্রবার, কেহ বলিয়াছে শনিবার, কেহ বলিয়াছে উমেশকে বাম পার্শ্বে লাথি মারিয়াছে, কেহ বলিয়াছে ডাইন পার্শ্বে লাথি মারিয়াছে, উহা ভিন্ন আর সব ঠিক আছে। ডাক্তার সাহেব বলিয়াছেন,তাহার ম্যালেরিয়া ছিল এবং প্লীহা এত বড় ছিল যে প্রায় ১ পাউন্ড ৮ ঔন্স ছিল, সাধারণত ৭ ঔন্স হইয়া থাকে। কুলী প্লীহা ফাটিয়া মারিয়াছে। প্লীহা ফাটা আঘাতের দ্বারায়ও হইতে পারে, স্বাভাবিক অবস্থায় পড়িলে ফাটিতে পারে। কোন আঘাতের চিহ্ন তিনি পান নাই। বিবাদী জবাবে বলেন, বাদী কেন তাহার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা আনিয়াছে তিনি বলিতে পারেন না। তিনি উহাকে মারেন নাই। তবে ঘটনার তারিখে (মৃত ব্যক্তির ছোট ভাই) একটি বালক কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার বাংলোয় অপরাহ্ন ৬ টার সময় যাইয়া বলিয়াছিল, সুধারাম (যে ব্যক্তি এই মোকদ্দমার প্রধান একজন উদ্যোগকারক) উমেশকে মারিয়াছে তৎপর তিনি ঐ রাত্রে সুধারাম ও লালাকে পাহারায় রাখিয়াছিলেন। ঐ দিবস মি. অবইম নামক দুইজন সাহেব তাহার বাংলোয় ছিলেন।
ঐ বৎসর ১২ পৌষ (১২৯২) তারিখে প্রকাশিত ‘অদ্ভুত বিচারÑ (কুলী আন্দোলন) শীর্ষক দীর্ঘ প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ ছিল নিম্নরূপ ঃ
‘শ্রীহট্টের কালাগুল চা বাগানের উমেশ নামক কুলি বালকের অপঘাত মৃত্যু বিবরণ আমরা পূর্বে পাঠকবর্গকে প্রদর্শন করিয়াছি। সম্প্রতি উক্ত মোকদ্দমার রায়ের একখন্ড প্রতিলিপি আমাদিগের হস্তগত হইয়াছে। আসিস্টান্ট কমিশনার পোপ সাহেব নিরপেক্ষভাবে বিচার করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন, তাহা প্রদর্শন করিতে যে যথেষ্ট সমর্থ হইয়াছেন তাহা বিশেষ সন্দেহের বিষয়। উল্লেখ্য এই রায়ে চা-কর আসামীকে খালাস দেওয়া হয়েছিল।
২১ অগ্রহায়ন ১৯৯২ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘আপনাদের পত্রিকায় অনেক সময় হতভাগিনী বঙ্গ বিধবাদিগের দুঃখসময় জীবনের দুঃখময় কাহিনী প্রকাশিত হয়। আজ একটি বিবরণ তাহার সহিত যোগ করিবার জন্য প্রেরণ করিলাম, সমাজ দেখুন, তাঁহাদের কূলকন্যাগণের পরিণাম কোথায় যাইয়া দাঁড়াইতেছে!’
দুর্গোৎসবের ছুটির সময়ে আসামের পূর্বাঞ্চলে ভ্রমণ করিতে যাইয়া ‘সোনাই’ স্টিমারে ডাক্তার বাবু ও অন্যান্য কয়েকটি ভদ্রলোকের মুখে শুনিলাম ১২ অক্টোবর তেজপুরের ঘাটে ক্ষীরোদা নাম্মী একটি কুলী রমণী নামিয়া গিয়াছে। ক্ষীরোদার চেহারা দেখিলে ভদ্রঘরের স্ত্রীলোক বলিয়া স্পষ্ট উপলব্ধি হয়। সে বিধবা, কিন্তু গর্ভের সম্পূর্ণ লক্ষণ প্রকাশিত হয়। স্ত্রীলোকটি যতক্ষণ ছিল, সর্বদাই অতি ম্লান ও বিষন্নভাবে এককোণে বসিয়া থাকিত এবং নিজের দুর্ভাগ্য ও দুর্দ্দশার কথা ভাবিত। অতি অনিচ্ছায় কয়েক গ্রাস আহার করিয়া নীরবে বসিয়া থাকিত, কাহারও সঙ্গে প্রায় কথা কহিত না, তখন ভয়ে তাহার মুখ শুকাইয়া গেল চক্ষু ছল ছল করিতে লাগিল। প্রহরীদিগের ভয়ে কেহই তাহাকে একটি কথাও জিজ্ঞাস করিতে সাহস করিল না। অবশেষে কুলি ডিপোর ডাক্তারবাবু ও অন্য একটি কুলী রমণীর সহিত হতভাগিনী জাহাজ হইতে নামিয়া ধীরে ধীরে ডিপোর দিকে যাইতে লাগিল। সঙ্গিনী কুলী রমণী ও ক্ষীরোদা যে কথোপকথন করিল, তাহা হইতে উহার সম্বন্ধে এইরূপ বিরবণ সংগ্রহ করা যাইতে পারে ঃ
‘ক্ষীরোদা বর্দ্ধমান জেলার কোন ভদ্রপরিবারের বিধবা, কোন ব্যক্তির সহিত তাহার গুপ্ত প্রণয় ছিল। কিন্তু গর্ভের লক্ষণ প্রকাশ পাইলে সেই পামর তাহাকে বাহির করিয়া লইয়া আইসে এবং দায় হইতে উদ্ধার পাইবার নিমিত্ত হতভাগিনীকে কুলী ডিপোতে রাখিয়া চম্পট দিয়াছে। কুলী ডিপোর প্রভুদের অপার মহিমা, তাঁহাদের দয়ার শরীর হতভাগিনীর দুঃখে দুঃখিত হইয়া তাহার নাম লিখিয়া লইলেন এবং পরম যতেœ আসামের চা বাগানে পাঠাইয়া দিয়াছেন। সঙ্গিনী কুলী স্ত্রী ক্ষীরোদাকে জিজ্ঞাসা করিলÑ ‘বল তুমি সেই মিন্সেকে যেতে দিলে কেন? ক্ষীরোদাÑ ‘আমি কি আর জানতুম সে এমন করিবে?’ সে বল্লে, ‘যা যা আবশ্যক, সব কিনে নিয়ে আসছি। কিন্তু আর এল না। আগে জানতে পেলে কি ঘর থেকে আসতুম, না তাকে যেতে দিতুম।’ ইহা বলিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। কিছুকাল পরে বলিল, ‘আমরা বাড়ী থেকে টাকা আনাইয়া কি ফিরিয়া যাইতে পাইব না?’ হায়! হতভাগিনী! তুমি যে স্থানে আসিয়া পড়িয়াছ ইহা হইতে আর তোমার উদ্ধার নাই। এখানেই কষ্টে কষ্টে তোমার জীবনলীলা ফুরাইবে। সমাজপতিগণ, দেখ তোমাদের কন্যাগণের কি দুর্দ্দশাÑ এই সমস্ত দেখিয়াও কি বলিবে বিধবা বিবাহ হওয়া উচিত নহে? বল দেখি এই হতভাগিনীর দুর্দ্দশার মূল কারণ কে?
কাহারও ইহার অনুসন্ধান করা আবশ্যক হইলে তেজপুরের কুলী ডিপোতে অনুসন্ধান করিলে জানিতে পারা সম্ভব।’
২ ফান্ডুন ১৯৯২ তারিখ সংখ্যায় আছে ‘কয়েক দিবস হইল আমি চা বাগানের কুলী লাইন দিয়া যাইতেছিলাম। তথায় জীর্ণ মলিন বসনে দুইটি বালিকাকে দেখিতে পাইলাম। একটির বয়স আন্দাজ ৭ বৎসর ও আর একটির ৩ বৎসর হইবে। কুলিগণ বলিল তাহাদের কেহ নাই। তাহাদের অবস্থা দেখিয়া বড় দুঃখ হইল এবং সঙ্গে করিয়া আমার ঘরে লইয়া আসিলাম। ছোট বালিকাটি শীতে কাঁপিতেছিল, ঘরে আনিয়া একখানি পুরাতন কাপড় দিলাম।
বড় মেয়েটি বলিতে লাগিলÑ ‘তাহাদের কেহ নাই, তাহার মা ডিব্রুগড় হাসপাতালে মরিয়াছে এবং বাপ অল্পদিন হইল চৌকিদার ঘরে মরিয়াছে। তাহারা চৌকিদারের ঘরে থাকে, দুই দিন পর্যন্ত খায় নাই। কুলীগণ বলিতে লাগিল, ইহারা ভিক্ষা করিয়া চৌকিদার ঘরে লইয়া যায়, কখনও খেতে পায়, কখনও পায় না, আবার কাজ না করিলে চৌকিদারের মাইকী (স্ত্রী) মারে। বড় মেয়েটি জল আনে, কাঠ কুড়ায় এবং ভিক্ষা করিয়া লইয়া যায়। এ স্থলে চৌকিদারের পরিচয় দিতেছি।
‘ডিব্রুদের আট মাইল দূরে জয়পুরে রাস্তার ধারে একখানি বাঙ্গালা আছে। সরকারী কর্মচারীগণ মফঃস্বলে আসিলে এই ঘরে অবস্থিতি করেন। তাহার তত্ত্বাবধানের জন্য একজন লোক আছে। সেই লোকটাই এই চৌকিদার। তাহার এক রক্ষিতা স্ত্রী আছে। ইহারও পূর্ব্বে কোন চা বাগানের দ্দলী ছিল এবং চৌকিদার সর্দ্দারের কাজও করিয়াছে। বাগানের চৌকিদার সর্দ্দার যে কী প্রকৃতির লোক তাহা বলা অনাবশ্যক। আমি যখন বালিকার সহিত কথাবার্তা বলিতেছিলাম, তখন ঐ চৌকিদার আসিয়া উপস্থিত হইল। মেয়ে দুইটিকে আমার নিকট দেখিয়া আরক্ত নয়নে তাহাদিগের প্রতি তাকাইতে লাগিল। কিন্তু আমার সমক্ষে কিছু বলিত সাহস করিল না। চৌকিদার বলিতে লাগিল, তাহাদের বাপ-মা অল্পদিন হইল বাগানে এগ্রিমেন্ট দিয়া কুলী খাটিতে আসিয়াছিল। মা ডিব্রুগড় হাসপাতালে মরিয়াছে, তাহাদের বাপ পীড়িত হইয়া কাজ করিতে অপারগ হইলে বাগানের সাহেব তাহাকে বাগান হইতে বাহির করিয়া দেয় এবং তাহার ঘরে কিছুদিন থাকিয়া মরিয়া যায়। সে আরও বলিল, বালিকা দুইটিকে তিন টাকা দিয়া তাহার বাপের নিকট হইতে কিনিয়া রাখিয়াছি। আমি তাহাকে বলিলাম, ইহারা তোমার কাছে কষ্ট পায়, হয়তো মরিয়া যাইবে, আমার কাছে রাখিয়া যাও, আমি খাওয়াপরা দিব। বলাতে সে রাখিয়া গেল। বালিকা দুইটি ভাত খাইয়া আমার বারান্দায় খেলিতেছিল। আমি বাইরে চলিয়া গেলাম, চৌকিদার মাইকী আসিয়া তাহাদিগকে ধরিয়া লইয়া গেল। তাহারা যাইতে চাহে না, কাঁদিতে লাগিল, কিন্তু সে ছাড়িল না।
‘সহৃদয় পাঠকগণ! একবার বাগানের সাহেবের আচরণ ও হতভাগা কুলীদিগের অবস্থা ভাবিয়া দেখুন। এই কুলীর এগ্রিমেন্ট ছিল কিনা তাহা আমি নিশ্চয়ই বলিতে পারি না, কিন্তু পীড়িতাবস্থায় বাগান হইতে তাড়াইয়া দেওয়া সত্য বলিয়া বোধ হয়। গভর্ণমেন্টের বিনানুমতিতে এগ্রিমেন্টের কুলীকে তাড়াইয়া দেওয়া আইন বিরুদ্ধ। ব্যারাম অবস্থায় নিরাশ্রয়ে তাড়াইয়া দেওয়াই বা কোন আইনে আছে জানি না? বালিকার মাতাকে হাসপাতালে পাঠাইলে, পিতাকে কেন পাঠানো হইল না? অযতনে বিনা চিকিৎসায় এবং অনাহারে যে তাহার প্রাণ গেল তজ্জন্য কে দায়ী?বাগানের সাহেবকে মাসিক জন্মমৃত্যুর রিপোর্ট দিতে হয়, গ্রাম্য মন্ডলকেও ঐরূপ রিপোর্ট দিতে হয়। আর রাস্তার ধারে যে নিরাশ্রয় একটি লোক মরিল রিপোর্ট কে কাহাকে দিল? বালিকা দুইটির পরিণামই বা কি হইবে? বড় মেয়েটির মুখ ফুলিয়াছে এবং শীতে ভাতে যেরূপ কষ্ট পায়, তাহাতে মৃত্যু শীঘ্রই তাহার ক্লেশ দূর করিবে। গভর্ণমেন্ট ইহার কি কোন তত্ত্ব লইবে?
২ বৈশাখ ১৩১১ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘চা-কর বৎসল লর্ড কার্জন আসামের চা বাগানের কুলীদের সম্বন্ধে যে আইন প্রণয়ন করিয়াছেন, তাহার নাম ১৯০১ সালের ৬ আইন। সেই আইনের ১৯৫ ধারাতে এই বিধি আছে যে, কোন কুলীর নামে ওয়ারেন্ট বাহির হইলে যে কোন পাটনি খেয়াঘাটে পলাতক কুলীকে গ্রেফতার করিতে পারে। সেই ক্ষমতা প্রদান করাতে যাহাদের নামে ওয়ারেন্ট হয় নাই কিংবা যাহারা চুক্তিমুক্ত বা চুক্তিতে অনাবদ্ধ তাহাদিগকে পর্যন্ত পাটনিরা আটক করিয়া থাকে, এরূপ করিলে আসামের চা বাগানসমূহে দ্দলী পাওয়া দুর্ঘট হইবে। এই আশঙ্কা করিয়া আসামের চীফ কমিশনার মি. ফুলার পাটনিদের এই ক্ষমতা রহিত করিবার জন্য সার্কুলার জারি করিতে ইচ্ছা করিয়া এ বিষযে চা-করদের অভিমত জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছিলেন। আসামের চা-কর সভা তদুত্তরে চীফ কমিশনারকে জ্ঞাপন করিয়াছেন, যদি পাটনিদের কুলী গ্রেফতার করিবার ক্ষমতা রহিত করা হয়, তাহা হইলে পলাতক কুলীদিগকে গ্রেপ্তার করার পক্ষে বিষম অন্তরায় উপস্থিত হইবে। একে রেলওয়ে ও বাষ্পপোতে কুলীদের পলায়নের অধিকতর সুবিধা হইয়াছে, পাটনিদের কুলী গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রহিত হইলে চা-করদের কুলী রাখা দুরূহ হইবে। সুতরাং এই বেআইনী নিয়ম প্রচলন রাখার জন্য তাঁহারা অনুরোধ করিয়াছেন। বাগানের ম্যানেজার যে সকল কুলীদের নাম ও চেহরার বর্ণনা পাটনিদের নিকট প্রেরণ করিবেন, শুধু তাহাদিগকে গ্রেফতার করিবে, অন্যদের গ্রেফতার করিবে না, এরূপ বিধানের জন্য অনুরোধ করিয়াছেন। কোনও পলাতক কুলীর নামে ওয়ারেন্ট বাহির করিতে যে সময় লাগে, তন্মধ্যে কুলীদিগকে সহজে ধরিবার সুযোগ থাকে না। চা-কর সভার সম্পাদকের উত্তর পাইয়া মি. ফুলার এ বিষয়ে কি নির্ধারণ করিয়াছেন, তাহা প্রকাশ হয় নাই। চা-করদের স্বার্থ দেখিতে গিয়া গভর্ণমেন্ট কিরূপে যে বিনা ওয়ারেন্টে পাটনিদের দ্বারা কুলীদিগকে গ্রেফতার করার বে-আইনী প্রথার অনুমোদন করিতে পারেন, আমরা তাহা বুঝিতে অক্ষম। গ্রেপ্তারী ওয়ারেন্ট বাহির না হওয়া পর্যন্ত বাগানের ম্যানেজারের আদেশে পাটনিগণ কোন পলাতক কুলীকে আটক করিতে পারে না, আইনে তদ্রুপ ক্ষমতা পাটনিদগকে দেওয়া হয় নাই।
‘আমরা জানি না, ফুলার সাহেব চা-কর প্রীতির বশবর্তী হইয়া চা-কর সভার প্রস্তাব অনুমোদন করিবেন কিনা। আসামের কোন কোন চা বাগানের অত্যাচার কাহিনী দেশময় প্রচার হইয়াছে। মধ্যভারত, মধ্যপ্রদেশ, ছোট নাগপুর প্রভৃতি স্থানের আদিম আধিবাসীগণ পর্যন্ত চা-করদের এবং চা-কর দূত আড়কাঠিদের গুনগ্রাম ও চাতুরিজাল জানিতে পারিয়াছে। এখন আর সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে আসামের চা-করগণ কুলী পাইতেছেন না। চা-করের এই কুলী কষ্ট দেখিয়া চা-কর বৎসল চীফ কমিশনার মি. ফুলারের করুণাসিন্ধু উছলিয়া উঠিয়াছে। তিনি কুলী আকৃষ্ট করার জন্য চা-করদের নিকট দুইটি প্রস্তাব করিয়াছিলেন, এখন যে সকল সর্দ্দারদিগের কুলী সংগ্রহ করিতে পাঠানো হয়, তাহাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ লোকদিগকে পাঠানো উচিত। তাহাদিগের এক এক জনকে মাসে ৩০/৪০ টাকা পর্যন্ত বেতন দিয়া যদি ১০ জন কুলীও সংগৃহীত হয়, তাতেও বরং লাভ হইবে। যখন কুলী সংগ্রহের ঋতু অতিবাহিত হইবে, তখন সেই সর্দ্দারদিগকে বাগানের কুলীদের কার্য পরিদর্শনে নিযুক্ত করা যাইতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের পর কুলীদিগকে দেশে ফিরিয়া যাইতে দিলে, তাহাদের দৃষ্টান্তে অন্যেরা বাগানে কুলীর কার্য করিতে আসিতে প্রলুব্ধ হইবে। এই উপায়ে ইংরাজ উপনিবেশসমূহে দলে দলে ভারতবর্ষের কুলী নীত হইয়া থাকে। চুক্তিপত্রে এরূপ এক শর্ত থাকিবে যে, চুক্তির সময় অতীত হইলে কুলীরা দেশে ফিরিয়া যাইতে পারিবে না। এরূপ নিয়ম থাকিলে অতি অল্প সংখ্যক কুলীই বরং দেশে ফিরিয়া যাইতে চাহিবে। চীফ কমিশনার সাহেব ইহাও জানিতে চাহিয়াছিলেন যে, কুলীদিগকে একত্রে বস্তিতে বাস করিতে বাধ্য না করিয়া যথেচ্ছভাবে বাগানের স্থানে স্থানে বাস করিতে এবং বাসগৃহের নিকটে চাষ করিতে দিলে, তাহারা সন্তুষ্ট থাকিবে কিনা? চা-কর সভার সম্পাদক প্রত্যুত্তরে জ্ঞাপন করিয়াছেন, অধিক বেতনের সর্দ্দার নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলে আবার আড়কাঠি প্রথা প্রবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা। দুয়ারের চা বাগানের জন্য যেরূপ সর্দ্দারগণ সহজে কুলী সংগ্রহ করে, আসামের চা বাগানের সর্দ্দারদিগকে তদ্রুপ সুবিধা প্রদান করা আবশ্যক। স্থানীয় রাজকর্মচারীগণ কুলীদের রেজিষ্টারীর সময় বড় কড়াকড়ি করিয়া থাকেন, তাহার শিথিলতা আবশ্যক। ৬/৭ বৎসরের পর অধিকাংশ কুলীই দেশে ফিরিয়া যাইতে প্রায় চায় না, এ অবস্থায় চা-করগণ চুক্তিপত্রে নির্দিষ্ট সময়ের পর কুলীদিগকে দেশে প্রত্যাবর্তনের খরচ দেওয়ার অঙ্গীকারাবদ্ধ হইতে সম্মত আছেন। কুলীরা যেরূপ অমিতব্যয়ী এবং এ প্রদেশের আবহাওয়াতে অনভ্যস্ত, তাহাতে হোটেল প্রথা অনিবার্য। কিন্তু কুলীরা নিজেদের কুঁড়েঘরে থাকিতে অধিক ভালবাসে, কিন্তু বাগানে এত স্থান দেওয়া সম্ভব নয়। কুলী বস্তির নিকটেও তাহাদিগকে চাষ করিতে দেওয়া হয়। আমরা ফুলার সাহেবকে একটি বিষয় স্মরণ করাইয়া দিতে ইচ্ছা করি। দুয়ারে চুক্তি প্রথা নাই, আসামে তাহা আছে; সুতরাং দুয়ারে চা বাগানের জন্য যত সহজে কুলী সংগৃহীত হয়, আসামের জন্য তত সহজে সংগৃহীত হইতে পারে না; স্থানীয় রেজিষ্টারীর আঁটাআঁটি থাকাই একান্ত প্রয়োজন। এই বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া যেন চা-কর বাৎসল্য প্রদর্শিত হয়।’

১৫ ভাদ্র ১৩১১ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘কোন বিশ্বস্ত ভদ্রলোক গোয়ালন্দ হইতে আমাদের নিকট নিম্নলিখিত পত্র প্রেরণ করেন ঃ

গোয়ালন্দ ২৪ শে আগস্ট, বুধবার ১৯০৪
সবিনয় নিবেদন,
মহারাজকুমারকে কলিকাতা লইয়া যাইবার জন্য আমি আজ গোয়ালন্দে অপেক্ষা করিতেছিলাম। ভোরে পেঙ্গুইন স্টীমারের নিকট গিয়াছিলাম। তখন কুকি নামক স্টীমার ঘাট ছাড়িয়া আসামের দিকে যাইতেছিল। স্টীমারের নোঙ্গর উল্টাইয়া মধ্য নদীতে গেলে, একটি কুলি স্টীমারের উপর তালা হইতে লাফাইয়া নদীতে পড়ে। ভাসিতে ভাসিতে পেঙ্গুইন স্টীমারের নিকট আসিলে জলে ঝাঁপ দিয়া আমরা একখানা জেলে ডিঙ্গি দ্বারা লোকটাকে পেঙ্গুইন ষ্টীমারে উঠাই। উহার নাম বাঞ্ছানিধি, পিতার নাম সত্যবাদী রাউতারা। নিবাস পুরীধাম, জন্মস্থানের মন্দিরের পশ্চিমের ফাটকের নিকট, পাটনা ঘাটে কাজ করিত। পুরীতে পৌঁছাইয়া দিবে ভান করিয়া তাহাকে কুলীরূপে পাঠাইতেছে। বাঞ্ছানিধি আমার পা ধরিয়া বলিল, ‘বাবা রক্ষা কর, আমি কুলী হইব না।’ দেখিতে দেখিতে কুলী ষ্টীমারের জালিবোটসহ ৪ জন খালাসি আসিয়া উহাকে নির্দ্দয়রূপে টানিয়া লইয়া গেল। আমরা কিছুই করিতে পারিলাম না। পেঙ্গুইনের সরকারী সারেঙ্গ আমিনানি, সুকানি ও অপরাপর লোক এই ঘটনা দেখিয়াছে। আমি অদ্য ধুবড়ীর ডেপুটি কমিশনারের নিকট টেলিগ্রাম করিলাম। আপনি যদি কিছু করিতে পারেন, চেষ্টা করিয়া দেখিবেন। আমি ২/১ দিনের মধ্যে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিব।
ইতি
৮ই ভাদ্র বুধবার।
‘২৫ এর তারিখ ঐ পত্রখানি পাইয়া তৎক্ষনাৎ ধুবড়ীর ডেপুটি কমিশনারকে এই মর্ম্মে এক টেলিগ্রাম করি যে, ‘বাঞ্ছানিধি’ নামক এক ব্যক্তিকে বলপূর্ব্বক কুলীর কার্য্য করাইবার জন্য কুকি ষ্টীমারে লইয়া যাইতেছে। আমরা কোন পত্রপ্রেরকের নিকট হইতে এই পত্র পাইয়াছি। আপনি অনুগ্রহপূর্বক ইহার অনুসন্ধান করিবেন।’

আমাদের টেলিগ্রামের উত্তরে ধুবড়ীর আসিষ্টান্ট সার্জ্জন এইচ.লিংডো নিন্মলিখিত পত্র লিখিয়াছেন। যার বাংলায় অর্থ ঃ

‘মি: লিংডো লিখিয়াছেন, জাহাজে কুলী চালানোর এজেন্টের (সিভিল সার্জনের) অনুরোধে আমি কুকি স্টীমারে ২৫ আগস্ট তদন্ত করিতে গিয়াছিলাম। আমি সেই কুলিকে জিজ্ঞাস করিয়াছিলাম, ‘তুমি কি বাগানে যাইতে চাও?’ কুলী প্রফুল্লচিত্তে বলিল ‘হ্যা’। তখন আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম যে, গোয়ালন্দ হইতে আসিবার সময় অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলে কেন? তদুত্তরে সে বলিল, ‘অপরু নামক একজন কুলির পিয়াদা আমার সহিত গোয়ালন্দ পর্যন্ত আসিয়াছিল। সে আমার নিকট ৭ টাকা লইয়াছিল, কিন্তু টাকা না দিয়াই কলিকাতা ফিরিয়া যায়। আমি তাহাকে স্টীমারে না দেখিয়া বাগানে যাইতে অস্বীকার করি এবং সেই প্যাদাকে ধরিবার জন্য স্টীমার হইতে লাফাইয়া জলে পড়ি।’ তখন দ্দলীকে ধরিয়া কুকি স্টীমারে আনা হয় এবং পরে টাকা তাহাকে প্রত্যর্পণ করিবার অঙ্গীকার করা হয়। ষ্টীমারের ডাক্তার বলিয়াছেন যে, তিনি ডুরিয়া চা বাগানের মালিককে সেই টাকা গৌহাটিতে পাঠাইয়া দিবার জন্য টেলিগ্রাম করিয়াছেন। টাকার জন্যই বাঞ্ছানিধি জলে ঝাঁপ দিয়াছিল। সেই জন্যই গোয়ালন্দ হইতে আসিতে সে বোধ হয় অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল। আমি যখন তাহার সহিত সাক্ষাৎ করি, তখন তাহাকে বেশ হৃষ্টচিত্ত ও বাগানে যাইতে ইচ্ছুক দেখিলাম।’
‘আমরা ডেপুটি কমিশনারকে তদন্ত করিবার জন্য টেলিগ্রাম করিলাম, কিন্তু তিনি স্ময়ং কিম্বা কোন একষ্ট্রা আসিষ্ট্যান্ট কমিশনারের দ্বারা তদন্ত কার্য না করিয়া কুলি বাগানের এজেন্টকে তদন্ত করিতে অনুরোধ করিলেন। এজেন্ট স্ময়ং তদন্ত না করিয়া তাঁহার অধীন আসিষ্ট্যান্ট সার্জ্জনকে তদন্ত করিতে পাঠাইলেন। এইরূপ তদন্ত করা উচিত কার্য্য হইয়াছে কিনা, আসামের প্রধান কমিশনার তাহার বিচার করুন।
‘আমাদের পত্রপ্রেরক অতি সম্ভ্রান্ত লোক। তিনি লিখিয়াছেন, বাঞ্ছানিধি, ‘বাবা রক্ষা রক্ষা কর, আমি কুলী হইব না’ বলিয়া তাঁহার পা ধরিয়াছিল। পত্রপ্রেরক লিখিয়াছেন, তাহাকে পাটনা হইতে পুরী পঁহুছাইয়া দিবার ভান করিয়া কুলি করিয়া পাঠাইতেছে।
‘৭ টাকার জন্য ভাদ্র মাসের ভরা পদ্মা নদীতে বাঞ্ছানিধি ঝাঁপ দিয়াছিল, ইহাও কি সম্ভব? আমরা আসামের কমিশনারকে এই ঘটনার জন্য তদন্ত করিতে অনুরোধ করি।’

২১ ভাদ্র ১২৯২ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘গত সংখ্যক কলিকাতা গেজেটে চা বাগানে কুলী চালান সম্বন্ধে এক মন্তব্য বাহির হইয়াছে। সর্দারগণ কুলীদিগকে প্রলোভন দেখাইয়া আসামের অরণ্য মধ্যে লইয়া যায়। গভর্ণমেন্ট তাহার একটিমাত্র সংবাদ পাইয়াছেন। এই সর্দার দুইটি স্ত্রীলোককে পরিচারিকার কার্যে নিযুক্ত করিবার প্রলোভন দেখাইয়া শ্রীহট্টে লইয়া যায়। গভর্ণমেন্ট সর্দারের ব্যয়ে স্ত্রীলোকদিগকে দেশে পাঠাইয়া দেন। ছোট লাট বলেন, সর্দারদিগের এ প্রকার দুষ্কার্য্য বিরল ঘটনা নহে যতকাল লোকের এই সকল দুষ্কার্য্য নিরসিত হইবার নহে। গবর্ণমেন্ট বলেন, আসামের কুলী জীবনের বৃত্তান্ত দেশমধ্যে যত প্রচারিত হইবে, কুলীদিগের যত বুদ্ধি জন্মিবে, তত অত্যাচার কমিয়া যাইবে। ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগণা, দক্ষিণ বিহার, বাঁকুড়া, বর্ধমান ও মেদিনীপুর হইতে কুলি চালান হইয়া থাকে। সেই সকল দেশে কুলী জীবনের দুর্গতির জ্বলন্ত চিত্র কে চিত্রিত করিবে?’
২ বৈশাখ ১৩১১ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘চা বাগানের কুলি সন্তানদের শিক্ষার বন্দোবস্ত সার মানচার্জি ভবনগরী আসামের চা বাগানের কুলি সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপনার্থ আসাম গভর্ণমেন্টকে বাধ্য করিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন। ভারত সচীব স্রড্রিক মহাশয় বলিয়াছিলেন, তাঁহার প্রস্তাব ভারত গভর্ণমেন্টের বিবেচনার্থ প্রেরণ করা হইবে। কিন্তু যে শ্রেণীর লোক চা বাগানে কুলির কার্য করে, তাহাদের সন্তানেরা যে লেখাপড়ার ধার ধারে না, সঙ্গে সঙ্গে একথাও বালিয়াছিলেন।’

১৬ বৈশাখ ১৩১১ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘চা বাগানের দাঙ্গা আসামে বিশ্বনাথ টি কোম্পানীর পাভারী চা বাগানের ম্যানেজার মি. ফিলকীন ৭ জন কুলির নামে বিগত ২১ মার্চ দাঙ্গার অভিপ্রায়ে জনতার অভিযোগে নালিশ করিয়াছিলেন। পুলিশের এক ইন্সপেক্টর বাগানে আসিয়া তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করিয়া হাতকড়া দেয়। তাহাদের অবস্থা দেখিয়া বাগানের ২/৩ শত কুলি বাগানের নিকট এক রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইল। পুলিশ যখন হাতকড়া দেওয়া কুলিদিগকে লইয়া বাগান হইতে চলিয়া যাইতেছিল, তখন দলবব্ধ কুলিরা পুলিশের হাত হইতে তাহাদিগকে ছিনিয়া লয়।’
‘এই সংবাদ শুনিয়া ম্যানেজার ফিলকীন যখন বাংলো হইতে বাহিরে আসেন তখন কুলিরা লাঠি হস্তে তাঁহাকে আক্রমণ করে। বাগানের চৌকিদারেরা তাঁহাকে ঘেরিয়া বাঙ্গলাতে লইয়া যাওয়াতে তিনি গুরুতর আঘাত হইতে রক্ষা পান। ম্যানেজারকে ছাড়িয়া উত্তেজিত কুলিরা বাগানের কেরানীবাবু এবং মহুরীকে আক্রমণ করে। ফিলকীন সাহেবের শরীরের ক্ষত গুরুতর এবং দাঙ্গাকারী কুলিদের তিন জনের প্রত্যেকের ২ বৎসর, ৪ জনের প্রত্যেকের ১৮ মাস, ২ জনের ৯ মাস এবং ৬ জনের ২ মাস করিয়া কারাদন্ড হইয়াছে।’

৩০ বৈশাখ ১৩১১ তারিখ সংখ্যায় আছেÑ ‘মি. কুলারের চা-কর প্রেমÑ চা বাগানের সর্দারেরা যে সকল কুলি সংগ্রহ করে, বঙ্গীয় গভর্ণমেন্টের আদেশানুসারে তাহাদিগকে আহার ও বাসস্থান সম্বন্ধীয় কতগুলি নিয়মের অধীন হইয়া চলিতে হয়। আসামের প্রধান কমিশনার চা-করদিগকে জানাইয়াছেন, তিনি সেই সকল নিয়ম রহিত করিতে বঙ্গীয় গভর্ণমেন্টকে অনুরোধ করিবেন। অর্থাৎ সর্দারেরা কুলিদিগকে যথাইচ্ছা তথা রাখিতে পারিবে, যাহা ইচ্ছা তাহা খাইতে দিবে, যেরূপ ইচ্ছা তাহাদিগকে আসামে লইয়া যাইবে। বঙ্গীয় গভর্ণমেন্ট তাহাদিগকে কোন নিয়মাবদ্ধ করিতে পারিবেন না। স্যার এ গুরু ফ্রেজার কি এই অন্যায় অনুরোধ পালন করিবেন?‘
সিলেটের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক পত্রিকা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন সম্পাদিত ‘যুগবাণী’। এটি বর্তমানে দৈনিক যুগভেরী নামে সিলেট শহর থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগানের দশরথ গোয়ালার হত্যা সম্পর্কিত সংবাদ ও একটি সম্পাদকীয় যুগবাণীতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে প্রকাশিত একটি সংবাদ ও একটি সম্পাদকীয় নিচে তুলে ধরা হল ঃ
১৯২৫ সালের ১০ জুলাই তারিখে (১ বর্ষ ২৩ সংখ্যা) ‘শ্বেতাঙ্গের পদাঘাতে কৃষ্ণাঙ্গের কৃষ্ণপ্রাপ্তি’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হয় নিম্নোক্ত সংবাদÑ
‘শুনা যায় গতকল্য ৩০.৬.২৫ ইং তারিখে মাধবপুর চা বাগানে চা-কর ম্যানেজার মি. উইলসনের সবুট পদাঘাতে জনৈক কুলী চা বাগিচার হাড়ভাঙ্গা খাটুনীতে চিরতরে নিঃশেষক্রমে নশ্বর দেহ ত্যাগ করিয়াছে। শবদেহ ব্যবচ্ছেদের জন্য মৌলভীবাজার নীত হইলে পর কতিপয় চা-করের আপত্তিতে নাকি স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ এ্যাসিস্টেন্ট সার্জনকে শব ব্যবচ্ছেদ না করিতে দিয়া শ্রীহট্ট হইতে গভর্ণমেন্ট, শ্বেতাঙ্গ সিভিল সার্জনকে উক্ত কাজের জন্য আনা হইতেছে।
‘পরবর্তী সংবাদে প্রকাশ যে, শ্রীহট্ট হইতে সিভিল সার্জন না আসায় ২.৫.২৫ইং তারিখে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ এসিস্টেন্ট সার্জনই শব ব্যবচ্ছেদ করিয়াছেন।’

পরবর্তী সংবাদ ঃ
‘গত ৩০ জুন মঙ্গলবার মাধবপুর চা বাগানের ম্যানেজার মি. উইলসন প্রায় ১১টার সময় ১নং সড়কের উত্তর মাথা দিয়া ঢুকিয়া পূর্বমুখী চারাবাড়িতে ঢুকিয়া পড়ে। সাহেব পুঙ্গব কাজ দেখিতে দেখিতে দশরথের কাছে গিয়া উপস্থিত হয়। তাহার সঙ্গে টিলাবাবু ও তুরঙ্গ সর্দ্দার আসিয়াছিল। এক চা গাছের নীচে ঘাস জড়ো দেখিয়া সাহেব সর্দ্দারকে জিজ্ঞাসা করে ইহা কার কারসাজি। সর্দ্দার তখন উত্তরে বলে যে, তাহা দশরথের কাজ। তারপর সর্দ্দারের আদেশে দশরথ সাহেবের কাছে উপস্থিত হয়। সাহেব রাগে অগ্নিমূর্তি হইয়া দশরথের গর্দনায় বামহাতে ধরিয়া ডান হাতে মারিতে আরম্ভ করে। অবশেষে দশরথ ভূমিতে পড়িয়া যায়, তখন সাহেব পুঙ্গব জুতা দিয়া মারিতে থাকে। বুক ও পেটে মারিতেও ছাড়ে নাই। দশরথ মার খাইয়া মলত্যাগ করিবার পর এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া শান্তির ক্রোড়ে আশ্রয় লইয়াছে। প্রায় ৫৫ জন কুলী দশরথকে নিয়া মৌলভীবাজারে এসডিওর কাছে রওয়ানা হয়। রাত্রেই মৌলভীবাজার থানায় গিয়া তাহারা এজাহার দিয়াছে। পরদিন সকালে দারোগা বাবু পাঁচজন ব্যতিত সকলকে ফিরিয়া আসিতে বলেন। ২রা জুলাই লাশ কাটা হইয়াছে। সাহেব কুলীদের উপর সর্বদাই মারপিট করিয়া থাকে। এ পর্যন্ত সাহেব পুঙ্গব গ্রেফতার হয় নাই। শ্রমিক মহলে খুব চাঞ্চল্য দেখা যাইতেছে। তাহারা কয়দিন ধর্মঘট ভাঙ্গিয়াছে। জিলা কংগ্রেস সম্পাদক বিয়ষটা অনুসন্ধান করিয়া আসিয়াছেন। মহামতি এ গুরুজের কাছে পত্র লিখা হইয়াছে।’

এই মামলার রায় প্রকাশের পর ১১ইং ডিসেম্বর ১৯২৫ তারিখের যুগবাণীতে ‘দশরথ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় অংশবিশেষ লেখা হয় ঃ
‘সিলেটবাসী নিতান্ত উৎসুক হইয়া মাধবপুর চা বাগানের কুলী দশরথ হত্যার মামলার ফলাফল জানিবার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। এতদিন পরে সেই বিচার নাটকের যবনিকাপাত হইল। আসামী মি. উইলসন তাহার অসংযত আচরণের জন্য দুইশত টাকা ‘গুনাহগারী’ দিয়া নি®কৃতি লাভ করিয়াছে।’
‘প্রকাশ যে দশরথ গোয়ালা মাধবপুর চা বাগানে কুদালী কাজ করিত। বিগত ৩০ শে জুন মঙ্গলবার ৯ কি ১০ টার সময় বাগানের ম্যানেজার মি. উইলসন কুলীদের কার্য পরিদর্শন করিতে যাইয়া দেখিতে পায় যে, দশরথের নির্দিষ্ট কাজ মোটেই আশানুরূপ সম্পাদিত হয় নাই। কুলী সর্দ্দার কর্তৃক দশরথকে ডাকাইলে বে-আদব কুলি হাসিতে হাসিতে তাহার কালামুখ লইয়া উইলসনের সম্মুখে আসিয়া হাজির হয়। উইলসন তাহাকে কাজ করিতে বলিলে সে হাসিতে হাসিতে উইলসনের রাগ উদ্দীপিত করিয়া তুলে। উইলসন তাহাকে শায়েস্তা করিবার জন্য তাহার গালে এক মধুর ‘চপেটাঘাত’ করে। কিন্তু বে-তমিজ কুলি পুনঃচপেটাঘাতের জন্য তাহার অন্য গাল ফিরাইয়া না দিয়া সটান মাটিতে পড়ে যায়। নিতান্ত নিমকহারামের মত তাহার বর্ধিত প্লীহাটি ফাটাইয়া দিয়া সে দশরথে চড়িয়াই একেবারে আজরাইলের দফতরে গিয়া হাজির হয়। কিন্তু তাহার দুষ্টামী এখানেই শেষ হয় নাই, দুরাচার কুলি উইলসনের বিনা অনুমতিতে মরিয়া গিয়া নিতান্ত নিষ্ঠুরের মত তাহাকে ফৌজদারী আইনের ধারা বেধারার ঘুর্ণিপাকে ফেলিয়া যায় যাহার ফলে দুইশত টাকা আক্কেলসেলামী দিয়া বেচারা উইলসনকে আজ আইনের ফাঁদ হইতে উদ্ধার পাইতে হইল।’
‘আজ যদি কোন কালা আদমীর চপেটাঘাতে কোন শ্বেতাঙ্গ দশরথের দশাপ্রাপ্ত হইত তাহা হইলে অবস্থা কিরূপ দাঁড়াইত সুবিজ্ঞ পাঠক তাহা ভাবিয়া দেখিবেন। হয়তো সেই অঞ্চল পিটুনী পোলিশের হুঙ্কারে টলমল করিত এবং পিটুনী সহিতে সহিতে ও ট্যাক্স দিতে দিতে দেশবাসীর জীবন দুর্বহ হইয়া উঠিত। বিলাতের খবরের কাগজে বড় বড় হরফে ছাপা হইত যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন টলটলায়মানÑ যেমন নাকি বল প্রয়োগ বিহীন অসহযোগ আন্দোলনের সময় লর্ড নর্থক্লিফ লিখিয়াছিলেন যে, ভারতের অবস্থা সিপাহী বিদ্রোহের সময়ের অবস্থা অপেক্ষাও সঙ্গীন এবং ভারতের কোথাও কোন শ্বেতাঙ্গের জীবন নিরাপদ নহে।’
‘এইরূপভাবে কুলী মারিয়া কেহ কেহ বেকসুর খালাস পাইয়া আবার কেহ বা সামান্য অর্থদন্ড দিয়াই যে অব্যাহতি লাভ করিতেছে, ইহার কি কোন প্রতিকার নাই? আসাম সরকার এই মোকদ্দমাদ্বয়ের বিরুদ্ধে কোন আপীল করিবেন কিনা দেশবাসী তাহা জানিতে পারিবেন কি?’
উল্লেখ্য, যুগবাণী কোন শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষের পত্রিকা ছিল না। কিন্তু গণমাধ্যম হিসেবে তার ভূমিকা পালন করতে গিয়ে এ ধরনের রচনা প্রকাশে তারা দ্বিধাবোধ করেননি।

এর কিছু পরে কংগ্রেস কর্মী ও চা শ্রমিক নেতা নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ‘জনশক্তি’ পত্রিকা বের করেন। ১৯৭৪ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় পত্রিকাটির বিলুপ্তি ঘটে। নিকুঞ্জ গোস্বামী সম্পাদিত ‘জনশক্তি’ পত্রিকায় চা শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার কাহিনী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
ঐ সাপ্তাহিকের ১২.৬.১৯৫৭ তারিখে প্রকাশিত সংখ্যায় ‘জনৈক চা শ্রমিকের মন্তব্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় ঃ
‘আমরা টিলায়ও ভিজি, ঘরেও ভিজি। টিলায়ও পানি খাই, ঘরেও পানি খাই এইভাবেই আমাদের দিন কাটিতেছে।’
‘জনৈক চা শ্রমিক নিজেদের বর্তমান দুঃখের কথা বর্ণনা করিতে গিয়া উপরোক্ত মন্তব্য করেন।
‘চাউলের দর বেশি হেতু ও পয়সার অভাবে শ্রমিকেরা চাউলের কোন ব্যবস্থা করিতে পারিতেছে না। অধিকাংশ শ্রমিকই লবণ চা খাইয়া কাজে চলিয়া যায়। সামান্য কাজের পরই পরিশ্রান্ত হইয়া পড়ে এবং ঘন ঘন ঠান্ডা জল খাইতে থাকে ইহাতে তাহাদের কর্ম ক্ষমতাই কমিয়া যাইতেছে। পক্ষান্তরে ইহাদের ঘরবাড়ি এখনও সর্বত্র যথারীতি মেরামত না হওয়ায় সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজিয়া কাজের পরে ঘরে আসিয়া বৃষ্টির জলে ভিজে। বস্তির জমি হইতে বাগানের জমি নিরস, ধান একেবারেই ফলে না এরূপ জমিও অনেক আছে। কিন্তু তথাপি বরাদ্দ রেশন দেওয়া হয় না। বাজারেও কিনিতে পারে না। শ্রমিকদের এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া অবিলম্বে দরকার।’

ঐ পত্রিকার ১০.৭.১৯৫৭ তারিখে সংখ্যায় ‘বৈকুন্ঠপুর বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা’ শিরোনামযুক্ত সংবাদে বলা হয়েছে ঃ

‘মাধবপুর থানার অন্তর্গত বৈকুন্ঠপুর বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হইতেছে। শ্রমিক পুরুষকে ১ টাকা এবং স্ত্রীলোককে মাত্র চৌদ্দ আনা দৈনিক হাজিরা দেওয়া হয়, কাজের সময় হাতিয়ার যথারীতি দেওয়া হয় না। গত সপ্তাহে কোদালী কাজ করার জন্য কতেক মেয়েকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সকলকে কোদাল না দেওয়ায় প্রায় ৩০/৪০ জন মেয়ে এ দিন কোন কাজ করিতে পারে নাই। অন্য কোন কাজও মিলে নাই।’

‘অসুস্থদের বাসগৃহ যথারীতি মেরামত হয় নাই। অনেকের ঘরেই বৃষ্টি হইলে জল পড়ে। প্রতি কামলা মেয়েপুরুষ ১২.৫০ টাকা মণ দরে ৫ সের ধান পায়, ছেলেমেয়েকে মাত্র আড়াই সের ধান দেওয়া হয়। সমস্ত জীবন কাজ করিয়া বৃদ্ধ অবস্থায় অবসর গ্রহণ করিলে মাত্র ১ টাকা সপ্তাহে দেওয়া হয়। বাগানে কোন শিশুসদনও নাই।’
পরবর্তীকালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় চা জনগোষ্ঠির উপর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। চা বাগান প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিকে শ্রমিক সংগ্রহের জন্য তাঁরা যে সব কৌশল ও অপকৌশল ব্যবহার করেছে তার একটি বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
এটি প্রকাশিত হয়েছে শামসুর রহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রার ২৯-০৬-১৯৭৯ সংখ্যায়।

শ্রমিক সংগ্রহের জন্য চুক্তি অনুযায়ী (পরে আইন অনুযায়ী) শ্রমিক সংগ্রহকারক বা এজেন্ট এই কাজে নিয়োজিত হইলেন। এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঝুঁকিলেন। তাঁহারা লইলেন প্রকৃত লোভীর ভূমিকাÑ কে কত বেশি শ্রমিক সংগ্রহ করিয়া চালান দিবেন, কত মুনাফা পাইবেন। জাহাজ কোম্পানীগুলিও ছিল ব্রিটিশের। তাঁহারা মওকা লুটিলেন। ফলে এক জঘন্য পশুসুলভ ব্যবসা গড়িয়া উঠিল এই শ্রমিক সংগ্রহের ব্যাপারে।

‘ভেড়া ছাগলকে যেভাবে পিঠাপিঠি করিয়া চালান দেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে শ্রমিককে চালান দেওয়া আরম্ভ হইল। (যাহা ১৮৯৬ সালের চা বাগান তদন্ত কমিশনের নিকট অনেক ম্যানেজার, অনেক শ্রমিক সংগ্রহকারী এজেন্ট ও জাহাজের অধিকর্তা স্বীকার করিয়াছেন।) যে জাহাজে ২০০ জনের স্থান, সেই জাহাজে ১০০০/১২০০ করিয়া শ্রমিককে চালান দেওয়া হইতে লাগিল। লোকে উহা দেখিয়া সর্বদাই মন্তব্য করিয়াছেন, উহারা যেন ভেড়া ছাগল, মানুষ নয়। এই অমানবিক ব্যবহারের ফলে দেখা দিল নানা রোগ। কলেরা, বসন্ত মহামারীরূপে দেখা দিল। কিন্তু জাহাজে কোন সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় কাতারে কাতারে লোক জাহাজে মরিত লাগিলেন। জাহাজ যখন আসিয়া বদরপুর বা কাঠিগড়ায় (পূর্বে ঐ দুই স্থানে ছিল স্টিমার স্টেশন) পৌঁছিল তখন দেখা গেল প্রায় অর্ধেক লোক কমিয়া গিয়াছে। সবচেয়ে লোমহর্ষক যে রোগ যাতে বিস্তার লাভ করিতে না পারে এই অজুহাতে ঐ মৃত ব্যক্তিদের জলে ফেলিয়া দেওয়া হইত। সৎকারের কোন ব্যবস্থা হইত না। বিদেশী সরকারের কাছে প্রতিকার করিবার কোন সুযোগ তাহারা পাইলেন না। যাহারা জীবিত ছিলেন তাহারা আসিয়া প্রবেশ করিলেন শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে আবাদ করিবার জন্য। এজেন্টরা সেইখানে সোনালী চিত্র আঁকিয়া তাহাদেও দুরবস্থার সুযোগ নিয়া ভাওতা দিয়া এইখানে আনিয়া বাগান কর্তৃপক্ষের হাতে সমজিয়া দিয়া খালাস। ম্যানেজারও এদের কর্মচারীদের জঙ্গলে থাকার নির্দেশ দিয়া নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাংলায় চলিয়া গেলেন। জঙ্গলে শ্রমিক ও কর্মচারীর বন্য জন্তু, বাঘ, হাতি প্রভৃতির হাতে হইলেন শিকার; আর অনেক শ্রমিক হইলেন নানা ব্যাধিতে কাতর, যেমনÑ ম্যালেরিয়া, আমাশায়, কলেরা, কালাজ্বর ইত্যাদি। কর্মচারিদেরও ঐ একই অবস্থা। নামমাত্র চিকিৎসার ব্যবস্থা আছেÑ না আছে ভাল ঔষধ, না আছে ভাল ডাক্তার। ফলে যখন চা বাগানের জমি মনুষ্য আবাদের ও চারা রোপণের যোগ্য হইল তখন দেখা গেল বাকি শ্রমিকেরা হয় জন্তুর হাতে প্রাণ দিয়াছেন, নয়তো রোগে প্রাণ দিয়াছেন। অর্থাৎ যাহারা বাড়ি ত্যাগ করিয়া চা বাগান তৈরির কাজে যাত্রা করিয়াছিলেন তাহাদের চার ভাগের তিনভাগ অকালে প্রাণ হারাইয়াছেন।’

 

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930