বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার অগ্রযাত্রা [১৯৭১-২০২১}

প্রকাশিত: ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২১

বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার অগ্রযাত্রা [১৯৭১-২০২১}

দীপংকর মোহান্ত
ঔপনিবেশিক যুগে লর্ড ম্যাকলে যে ফলবতী আধুনিক শিক্ষা-বৃক্ষ ব্রিটিশ-ভারতের মাটিতে রোপণ করেছিলÑ তার শিকড় কখনো ভূমির গভীরে স্পর্শ করতে পারেনি। পরে পাক-শাসকও সে বৃক্ষে অন্য কায়দায় পানি ঢেলেছে। সে শিক্ষাবৃক্ষে ফুল-ফল ধরেনি বা সাধারণ মানুষ নাগাল পায়নি বরং তারা পূর্ববাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকশিত না করে নির্লজ্জভাবে সংকোচিত করেছিল। ভাষা সংগ্রামী ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস ১৯৫৪ সালে নওবেলাল পত্রিকায় ‘আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে পশ্চিমাদের শিক্ষা-শোষণ, সাধারণ মানুষের শিক্ষা-বঞ্চনা, বিড়ম্বনা ও শিক্ষা সংকোচনের দিকটি পরিসংখ্যান দিয়ে উন্মোচিত করেছিলেন। তিনি দেখান যে ১৯৫২-৫৩ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ছিল ১২৬ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্ধ ছিল ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষায় ব্যয় হয় অনেক কম। কিন্তু সে অর্থবছরে কেবল করাচী পুলিশের জন্য বরাদ্ধ ছিল ২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। জনগণের সার্বিক ব্যয় ছিল ০.৬ পাই [পয়সার হিসাবে]। তাঁর মন্তব্য ছিল ‘ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের যে আশা পাকিস্তানের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নর-নারী করেছিল, গত চার বছরের শাসনে লীগ সরকার সামগ্রিকভাবে তার বাস্তব রূপায়নের পথে এক পা-ও অগ্রসর হয়নি।’
পরাধীন ভারতে ১৯৩৪-১৯৩৫ সালে মোট জনসংখ্যার ৪.৯ শতাংশ শিশু পাঠশালাতে লেখাপড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু ১৯৫৩-৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় প্রায় ৬% শিশু কোনো রকমে সে সুযোগ পায়। অর্থাৎ প্রাইমারির অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ জন-সংখ্যা বাড়তে থাকে। মোহাম্মদ ইলিয়াস লেখেন, ‘কত স্কুলের ঘরের চাল নাই, বেড়া নাই, কত স্কুলের বোর্ড নাই। তার খবর কে রাখে?’ ১৯৫২ সালে সরকারের পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে, পূর্ব বাংলায় ২৬,৯৮৯ টি প্রাইমারি স্কুল ছিল। ছাত্রসংখ্যা ২৩,২২,৬৬৫ জন [ছেলেÑ২১,৭৮,৪২৩ জন, মেয়ে ১,৪৪,২৪২জন]। যা ৬Ñ১১ বছরের শিশুর প্রায় ৪৪%। ১৯৫৩Ñ৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বাজেট ছিল ৫৯,৮৫,৫৮০ টাকা। শিক্ষাখাতে ব্যয়ের হিসেবে শিশুদের মাথাপিছু ১ টাকার উপরে ছিল [প্রায়]। ১৯৫০Ñ৫১ সালে পূর্ব বাংলায় বিভিন্ন ধরণের মাধ্যমিক স্কুল ছিল ৩,০৫৩টি। মোট ছাত্র ২,৯৪,৭৪৮ জন। বুঝা যাচ্ছে ঝরে পড়ার হার ছিল প্রচুর। মাধ্যমিক পাশ করতো ২৭% শিশু। সে সময় পূর্ব বাংলায় বিভিন্ন ধরণের কলেজ ছিল ৬৭ টি [ডিগ্রী কলেজ ছিল ৩৬ টি, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ৩৯ টি, ট্রেনিং কলেজ ২ টি। মোট ছাত্রসংখ্যা ২০,৮৭৮ জন]। তন্মধ্যে ২০টি কোনো সরকারি সাহায্য পায়নি। প্রাদেশিক সরকারের ১৯৫১-৫২ সালে বেসরকারি কলেজে বরাদ্দ রাখে ৭,৪৭ ,২০০ টাকা। ১৯৫২-১৯৫৩ সালে সে বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ৬,৭১,৮০০ টাকা। ১৯৫৩-৫৪ সালে হয় ৬,৭৯,৮০০ টাকা। এমতাবস্থায় কলেজগুলোর ‘অস্তিত্ব বজায় রাখা’ অনেকটা ‘বিপদসঙ্কুল হয়ে দাঁড়িয়েছিল’। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ বন্ধ করা হয়েছিল [আসাম সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত]। তখন চৌহাট্টাস্থ গোবর্ধন সঙ্গীতালয়ের সরকারি আর্থিক অনুদানের অংশ বন্ধ হয়ে যায় [আসাম সরকারের অনুদানকৃত] এবং শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজ [আসাম সরকারের অনুদানকৃত] অকার্যকর করার দৃশ্যত কর্মকা- শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় গোটা পাকিস্তান আমল পূর্ববাংলার শিক্ষার বিকাশ তৃণমূলে পৌঁছতে পারেনি। তারা পুরাতন গোলক ধাঁধায় ঘোরপাক করলেও ধর্মীয় শিক্ষায় জোর দেওয়ার চেষ্টা চালায়। প্রাইমারি শিক্ষা কোনো রকম টিকে থাকলেও উচ্চ শিক্ষায় নিদারুণ বৈষম্য চোখে পড়ে। ১৯৫১ সালে গ্রাজুয়েট ছিল ৪১,০০০; অন্যদিকে পশ্চিমে ছিল ৪৫,০০০। কিন্তু দশ বছরে অর্থাৎ ১৯৬১ সালে গ্রাজুয়েট হয় ২৮,০০০। আর পশ্চিমে ৫৪,০০০। তখন উচ্চ শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় ৩২% কমে যায়। এই বৈষম্যের কারণ ছিল পূর্বদিকে কম অর্থ বরাদ্দ রাখা এবং দূরভিসন্ধিমূলক অবহেলা।
পাকিস্তান আমলের একেবারে শেষ দিকে পূর্ববাংলার জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাতকোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোটামুটি একটা চিত্র তোলে ধরা হলোÑ ১৯৭০Ñ৭১ সালে সবধরণের প্রাইমারি স্কুল ছিল প্রায় ৩৬ হাজার; হাই স্কুল ৫১৭০টি [তার মধ্যে বালিকা ৫৬৭টি], কামিল মাদ্রাসাÑ২৯টি, ফাজিল মাদ্রাসাÑ৪৮৩টি, আলিমÑ৩৫৫টি, দাখিল মাদ্রাসাÑ৬৫১টি, ফুরকানিয়াÑ ৫০৯১টি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ছিল ৪টি। ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ২৭৫টি [তন্মধ্যে মহিলা মহাবিদ্যালয় ১৭টি, ক্যাডেট কলেজÑ৪টি]। ১৯৭০-৭১ সালে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ৪টি, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়Ñ১টি। মেডিক্যাল কলেজ ছিল ৮টি। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র সমকালে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক কম ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষক সমাজের অবস্থান ও ধ্বংশপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সকলেই অবহিত। ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ, রোকেয়াহলসহ সে এলাকার রক্তগঙ্গা মূলে ছিল তার-ই ব্যর্থ প্রতিশোধ। দেশের শিক্ষক সমাজ ছাত্র-জনতাকে যুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। অনেক আবার সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেয়। অনেক শিক্ষক শহিদ হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২১এ মার্চ কলকাতায় গড়ে ওঠে ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’Ñযারা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় এই সমিতির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখন ধ্বংশস্তুপে পরিণত হয়। ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’ অনেক শরণার্থী শিবিরেও ত্রাণের পাশাপাশি শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত করে। শিক্ষক সমিতি তখন ৩৭টি স্কুল গড়েছিল। সরকারি হিসেব মতে, যুদ্ধের সময় ১০০০-এর উপরে শিক্ষক শহিদ হয়েছিলেন। ৩০,০০০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালুর জন্য সরকার প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। ১৬ নভেম্বর ১৯৭২ সালে জনশক্তি পত্রিকার লেখে:
বর্বর পাক-বাহিণী শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশে ১৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করিয়াছে বলিয়া সরকারী সূত্রে বলা হইয়াছে। বিগত স্বাধীনতা সংগ্রামের নয় মাসে তস্কর বাহিণী এক হাজারেরও বেশী শিক্ষককে হত্যা করিয়াছে এবং প্রায় ৩০,০০০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিধ্বস্ত করিয়াছে। শিক্ষকসমাজ ছাত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সাহায্য ও পুণর্বাসন খাতে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার নিজের তহবিল হইতে প্রায় দশ কোটি টাকা ব্যয় করিয়াছেন।
স্বাধীন দেশে স্থানীয় জনতা এবং সরকারের উদ্যোগে সেগুলো মেরামতের কাজ চলে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করা হবে এবং সকল শ্রেণির মানুষের পক্ষে শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ গড়িয়া তোলা হবে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে সরকার প্রথম চিন্তা করেন প্রাইমারি শিক্ষকদের জীবনমান নিয়ে। তারা সংখ্যায় যেমন বেশি ছিলেন তেমনি বেতনও ছিল নামমাত্র। কিন্তু তাঁরা প্রায় সকল গ্রামে ছড়িয়ে ছিলেন। শিক্ষকরা তৃণমূলের চালিকাশক্তি থাকায় সরকার তাদের কথা প্রথমে চিন্তা করে। ২১ অগ্রহায়ণ ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে [১৯৭২] সালে জনশক্তি পত্রিকা [সম্পাদক নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী, সিলেট] ‘প্রাথমিক শিক্ষা প্রসঙ্গে’ সম্পাদকীয়তে লেখেন,
প্রাথমিক শিক্ষাই জাতীয় উন্নয়নের প্রাথমিক ভিত্তি। কিন্তু এই প্রাথমিক শিক্ষায় যাহারা ধারক তাহারা চিরকালই অর্থনৈতিক ও অন্যান্যভাবে উপেক্ষিত হইয়া আসিতেছিলেন। আনন্দের কথা এই যে বাংলাদেশ সরকার দেশের প্রায় ১ লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন ও যোগ্যতার মান বৃদ্ধি করার চেষ্টা করিতেছেন।
অর্থাৎ সরকার প্রথম থেকে প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের বেতন ছাড় দেওয়ার চেষ্টা চালায় [স্কুল বেসরকাররি থাকায় সরকারি অংশ]। সূচনালগ্নে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং চালুর ব্যবস্থা হয়।
স্বাধীনতাত্তোর শিক্ষা ও শিক্ষক: পূব আকাশে সূর্যোদয়Ñ দেশ স্বাধীন হলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রথমেই গণমুখী শিক্ষাকে ক্রমে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করেন। বিশেষত বঙ্গবন্ধু পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশু শিক্ষার সূচনাপর্বের দিকটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই বাস্তবতা আমরা দেখি তিনটি গতিশীল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। প্রথমতÑ ১৯৭২ সাল স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে গৃহীত মৌলিক অধিকার ও শিক্ষা সংক্রান্ত রক্ষা কবচের দ্বারা। সংবিধানে ১৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা’ থাকবে এবং সকল বালক-বালিকাকে ‘অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক’ শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। অর্থাৎ ১৭-এর (ক) ও (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক শিক্ষাদানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়তÑ শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা হলো বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে প্রাথমিক শিক্ষা গণমুখী করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে প্রাইমারি টেকিং ওভার অ্যাক্ট আইনের আওতায় ৩৬,১৬৫টি প্রাইমারি স্কুল সরকারি করা হয় এবং স্কুলের ১,৫৭,৭২৪ জন শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ হয়। এই স্কুলগুলোর বেশিরভাগ অবস্থান ছিল গ্রামাঞ্চলে। অর্থাৎ গ্রামীণ শিশুদের সামনে শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। তৃতীয়তÑ বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই প্রথিতযশা বৈজ্ঞানিক কুদরাত-এ-খুদাকে দিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন আধুনিক, কর্মমুখী ও দূরদৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিয়েছিল ১৯৭৪-এ। তাছাড়া উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ আইনÑ১৯৭৩ স্মর্তব্য। ফলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বদেশে শিক্ষার যাত্রা-পথ ভালো হয়েছিল। যদিও তা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সামরিক শাসনের দীর্ঘসূত্রিতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা ছিল অনেক। তবে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর মূল্যায়নে সহ¯্রাব্দের সূচনা শতকে শিক্ষার গতিশীলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার-ই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় মাইল ফলক হলো জাতীয় শিক্ষানীতিÑ২০১০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা [২৮টি অধ্যায় ও ২টি সংযোজনী]। এই শিক্ষা নীতির আলোকে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা ঘটে ও শিশু বিকাশকেন্দ্রের ধারণাকে উৎসাহিত করে। এই শিক্ষানীতির ফলে আইসিটির উন্নয়নসহ তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মধ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষণীয়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে বিজ্ঞজনের ধারণা যে, মোটামুটিভাবে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার অর্জন বিশাল। পঞ্চাশ বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ও ব্যবস্থায় গতিশীল হয়েছে এবং শিক্ষার বিষয় বৈচিত্র্যও বেড়েছে অনেক। তার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে বেসরকারি ও এনজিওদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা স্বল্প পরিসরে আলোচনার স্বার্থে ধারাবাহিক শিক্ষার অর্জনগুলো দেওয়ার চেষ্টা করবো। তবে শিক্ষার কাক্সিক্ষত মসৃণ লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
প্রাকপ্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরÑ বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় বিশাল অর্জন রয়েছে। সরকারি বেসরকারি নানামুখী উদ্যোগের ফলে তা সম্ভব হয়েছে। শিশু ঝরে পড়ার হার যেমন কমেছে, তেমনি শিক্ষা চক্র সমাপনের হার বেড়েছে। প্রান্তিক শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার বিভিন্ন ধরণের প্রজেক্ট অব্যাহত রয়েছে। শিশুদের সার্বিক বিকাশ ও স্কুলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয়মূলক কার্যক্রম চোখে পড়ে। ২০২০ সালে বহু কার্যক্রম হাতে নেওয়ার কথা থাকলেও কোবিডÑ১৯ এর কারণে কাজগুলো অগ্রসর হচ্ছে না।
ডে-কেয়ার সেন্টার: শিশুর মধ্যে সুপ্ত থাকা সকল ধরণের বিকাশ না ঘটলে তার জীবন পূর্ণতা পায় না। শিশুর জন্য দরকার পড়ে যতœ, সুন্দর পরিবেশ দেওয়া, শিশুতোষ খেলা, ভালো খাওয়া-খাদ্য ও সংস্কৃতি-আনন্দ ইত্যাদি সহজাত প্রবৃত্তি বিকাশের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র। সময়ের আবর্তে আজ আমাদের শিশুরা খাঁচাবন্দি হয়ে পড়ছে। অনেক নি¤œ পেশার কর্মজীবী মা তার সন্তানকে দেখভালের জন্য তার-ই ৫Ñ৬ বছরের অন্য শিশুদের কাছে রেখে অন্যত্র কাজ করতে চলে যায়। তারা ছোট ভাই-বোন রাখে। ফলে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না। দুই দিক থেকে শিশু বিকাশ ব্যহত হয়। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ শিশুএকাডেমি ২-৪ বছরের শিশুদের বিকাশের কথা মাথায় রেখে ২০১৮ সাল থেকে পরীক্ষামূলক ৪০টি ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ চালু করেছে। এইগুলো আবার প্রান্তিক শ্রমিকদের মধ্যে ভালোভাবে চলছে। এই ৪০টি ‘ডে কেয়ার সেন্টারে’র মধ্যে সিলেট জেলার চা-বাগানে ৪টি এবং মৌলভীবাজার চা-বাগানে ১১টি রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে সিলেটে আরো ৫০টি ‘ডে কোয়ার সেন্টার’ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নি¤œ আয়ের শ্রমজীবী পাড়া/বস্তিতে এই কার্যক্রম চললে ভবিষ্যতে শিশু শিক্ষার হার বাড়বে বলে আশা করা যায়।
শিশু বিকাশ কেন্দ্র [৪-৫ বছর বয়সী]: আশির দশক থেকে বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কিন্ডার গার্টেন স্কুলে প্রি-নার্সারি শুরু হলেও এই সুবিধা সাধারণের জন্য ছিল না। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০১৯ সালে থেকে ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ নামে ৪-৫+ বয়সী শিশুদের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির অধীনে ৯৮ টি ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ চালু রয়েছে [৭১টি অফিস সংলগ্ন কক্ষে সম্পাদিত হয়। তা ছাড়া আনন্দের বিষয় যে বিভিন্ন কারাগারে দ-প্রাপ্ত থাকা মা-আসামীদের সঙ্গে থাকা শিশুদের বিকাশের জন্য ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে]। বাংলাদেশ সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, ক্রমে প্রতিটি সরকারি স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির সাথে শিশু বিকাশ কেন্দ্র সংযুক্ত করে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকে এক বছরের জায়গায় দুই বছর মেয়াদী করা হবে। এই উদ্দেশ্যে ২০২১ সাল থেকে ২,৫৮৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হবার কথা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হলে শিক্ষার গুণগত মানও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা [৫Ñ৬ বছর বয়সী]:
আগে প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম ধাপ ছিল ৬+ বছরের শিশু কেন্দ্রীক। এর নিচের বয়সের শিশুদের স্কুলমুখী করার সুয়োগ ছিল না। কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টের সপ্তম অধ্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর সুপারিশ করা হলেও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দুর্গম, চরাঞ্চল, প্রান্তিক, অতিদরিদ্র ও অসচেতন পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় আগ্রহ কম ছিল। আশির দশকে সরকারের সহযোগিতায় ইউনিসেফ, ব্র্যাক প্রভৃতি সংস্থা প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি পরীক্ষামূলক চালু করে। ১৯৮৫ সালে ব্র্যাক মোটামুটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২২টি এক কক্ষ বিশিষ্ট শ্রেণিকক্ষে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে। বিদেশী সাহায্যে ব্রাক ২০০৫Ñ৬ সালে সারাদেশে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৪০,০০০ স্কুল চালায়। বিদেশী সাহায্য কমে আসলে ২০১৫ সালে ১৩,৫২২টি বিদ্যালয় ছিল। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ব্র্যাক বিদ্যালয় ছিল ১০,৩১৮ টি। হাওর অঞ্চলে তারা নৌকার মধ্যে ভাসমান বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছিল। এই সময়ে বাণিজ্যিকভাবে কিন্ডারগার্ডেন স্কুলও চালু হতে থাকে। শিশু শিক্ষার জন্য ব্র্যাক ছাড়াও কারিতাস, আহসানিয়া মিশন, এফআইভিডিবিসহ অন্যান্য সংস্থা ব্যাপক কাজ করছে। দেশের মোট শিশুর [৪Ñ৬ বয়সী] অনুপাতে এই শিক্ষা উদ্যোগ ছিল সামান্য।
২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীত হলে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ৫Ñ৬ বছরের শিশুদের জন্য সারা দেশে [জেলা পর্যায়ের অফিসারের তত্ত্ববধানে] প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিগুলোতে রাজস্ব খাতে ৭১টি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু হয় যা অধ্যাবধি চলছে [৬৪ জেলায়Ñ৬৪টি, কেন্দ্রীয় শিশু একাডেমির অফিসÑ১টি, ৬টি উপজেলায় ৬টি]। তাছাড়া ইউনিসেফের সহায়তায় পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের জন্য ২০০৮Ñ২০১৩ পর্যন্ত ৩৫,০০ টি ‘পাড়া কেন্দ্র’ চালু ছিল [কেবল প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণি]। অপরদিকে ব্র্যাকের সহায়তায় পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া সমুদ্রতীরবর্তী লোকবসতি অঞ্চল, সিডর ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত অঞ্চল, হাওর ও নদীর চরাঞ্চল, চা-বাগান, দুর্গম যাতায়াতের জনবসতি, ভাসমান লোক বসতি প্রভৃতি এলাকায় ৮০০০টি ‘পাড়া কেন্দ্রে’ [পাড়ার কোনো বাড়িতে স্কুল] ২০১৯ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম চালায়। বর্তমানে ইউনিসেফ তিনটি পার্বত্য জেলায় সরাসরি ৪৫০০টি ‘পাড়াকেন্দ্র’ প্রাকপ্রাথমিক [শিশুবিকাশ কেন্দ্রসহ] কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শিশু একাডেমির প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এগিয়ে আসে এবং ২০১১ থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যাপক ভিত্তিক প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলেছিল। পরে প্রাথমিক স্কুলের একজন করে শিক্ষকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরীক্ষামূলক ৫+ শিশুদের [নূন্যতম ৩০ জন] স্কুলে ভর্তি করা হয়। অতপর সরকার ২০১৩ সালে পর্যায়ক্রমে সকল সরকারি স্কুলে একটি করে প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই কাজে ব্যাপক সাড়া যেমন পাওয়া যায়Ñ তেমনি শিশুদের স্কুলমুখী হওয়ার আগ্রহ ছিল লক্ষণীয় মাত্রায়। এই কাজে ইউনিসেফসহ অনেক সংস্থা কারিগরি সহায়তা করে। পরিশেষে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চালুকৃত পিইডিপিরÑ২ প্রজেক্টের আওতায় ২০১৪ থেকে তিন ধাপে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৭,৬৭২ জন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা হয়। যা প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষার একটি মাইলফলক বলতে হয়। এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষা নামে আদালা উইংস রয়েছে। সরকার প্রাকপ্রাথমিকের সকল ব্যয়ভার গ্রহণ করে। প্রজেক্টে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষককে পরে রাজস্বখাতে নেওয়া হয় এবং সর্বশেষ আত্মীকরণকৃত ২৬,১৯৩ টি স্কুলেও প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬৫,৬২০টি সরকরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণি চালু রয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার জন্য যাবতীয় উপকরণ ও বই সরকার দিয়ে থাকে।
প্রাথমিক শিক্ষা [৬+ থেকে] ও শিক্ষার উন্নয়ন: ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সর্বসাধারণের জন্য যে শিক্ষা ছিল অধরা, অবহেলিত এবং ভাগ্যনির্ভরÑ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দিলেন। কারণ গ্রামাঞ্চলে লোকসংখ্যা থাকে বেশি, সেকালে গ্রামে প্রাথমিক স্কুলও কম ছিল না। তৃণমূলে শিক্ষার ডাক গ্রামে সহজে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি স্কুল ও শিক্ষককে প্রায় শূন্য হাতে সরকারি করেন। পাশপাশি প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করে দেন। ১৯৭২Ñ৭৩ সালে প্রাইমারি স্কুল ছিল ৩৬,৫৯৩টি [তার মধ্যে বালিকা ৯৮৩ টি], ১৯৭৩Ñ১৯৭৪ প্রাইমারি স্কুল দাঁড়ায় ৩৬,৬৩৩ টি [বালিকা ২৩০ টি]। বুঝা যাচ্ছে প্রাইমারি স্কুল সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল ৭৭,৯৩, ৯০৫ জন [বালিকা ২৭,২০,০৭২ জন], ১৯৭৩Ñ১৯৭৪ সালে মোট ছাত্র হয় ৭৭,৪৭,৫৫৯ জন, [মেয়ে শিশু ২৫,৬১,৪৫৯ জন]। শিক্ষার্থী সংখ্য কমে যাওয়ার কারণ ছিল সম্ভবত দুর্ভিক্ষ, বন্যা ইত্যাদি। পরে প্রাইমারি বিদ্যালয়ে প্রুটিনযুক্ত একধরণের গুড়ো [ভূষি জাতীয়] আটা দেওয়া শুরু হয়। যা পানি দিয়ে খওয়া যেত। পরের বছরগুলোতে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধু পরবর্তী কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্থর গতিতে চলতে থাকে। পরে অরো কয়েকটি শিক্ষা কমিশন বা জাতীয় কমিটি হলেও প্রাথমিক শিক্ষার আমূল পরিবর্তন বা গণমুখী চরিত্র দৃষ্টিগোচর হয় না। তবে শিশুদের স্কুলমুখীকরণের কিছু কৌশল ছিলÑ যেমন পোশাক ও খাতা পত্র দেওয়া। এই কয়েক বছর শিক্ষা একই সমান্তরালে চলে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় [১৯৮০Ñ৮৫] পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্তর পরিচালনার জন্য পৃথক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সৃষ্টির কার্যক্রম চলে এবং ১৯৮১ সালে স্বতন্ত্র অধিদপ্তর হিসেবে নিজস্ব পরিচয়ে যাত্রা করে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় গতি আনয়নের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ নানা পদে ১৯৮৪ পদ সংরক্ষিত হয়। পূর্বের ‘ডি আই অব স্কুলস’এর পরিবর্তে ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার’ ও ‘সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার’ ইত্যাদি নামাকরণ হয়। পদ বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মান উন্নয়ন ও শিক্ষকদের তত্তা¡বধানের জন্য ১,৮৩৪টি সহকারী শিক্ষা অফিসারের পদ সৃষ্টি করা হয় এবং শিক্ষকদের সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণের জন্য ক্লাস্টারের ব্যবস্থা করা হয়। এই ধারণা ছিল নতুন। ১৯৮৬ সালে যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের মূল কাজ শুরু হয়ে যায় [১৯৯২সালে প্রথম শ্রেণিতে চালু হয়ে পর্যায়ক্রমে ১৯৯৬ সাল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হয়]।
দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় [১৯৮০Ñ১৯৮৫] দেশের সমস্ত শিশুর মধ্যে শতকরা ৯০% শিশুকে স্কুলমুখীকরণের লক্ষ্যমাত্র ধার্য করা হলেও এই কাজ বাস্তবায়িত করা কঠিন ছিল। অর্থাৎ শিশুদের স্কুলমুখীকরণের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেনি এবং ঝরে পড়ার হার কমেনি। অতিদরিদ্র পরিবার, ভাসমান পরিবার, চা-বাগান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার দিকে নিয়ে আসা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পরে তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে [১৯৮৫-৯০] বাস্তবমুখী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তখন স্থির হয় মোট শিশুর ৭০ ভাগকে স্কুলের আওতায় নিয়ে আসা এবং যোগ্যতাভিত্তিক শিখনক্রম সম্প্রসারণ ও পরিমাজিত করা এবং মূল্যায়নে পরিবর্তন করা। পঞ্চম পরিকল্পনার সময়ও ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়। তখন ক্যারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নৈতিক শিক্ষা, ঐতিহ্য রক্ষা, স্বদেশ প্রেম বাড়ানো, দক্ষ তথ্য-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক জনশক্তি তৈরির দিকে মনোনিবেশ করা হয়।
সর্বজনীন শিক্ষার মাইলফলক: মিলিনিয়াম গোলকে [২০০০ সাল] সামনে রেখে পৃথিবীব্যাপী শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ, বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, মেয়ে/নারী শিক্ষার ব্যাপকতা বৃদ্ধির জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তার সাথে প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর আগে সকল উদ্যোগের হিসেব কেবল খাতাপত্রে ঠিক থাকে। বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
২০০০ সালকে সামনে রেখে পৃথিবীব্যাপী উন্নয়নশীল দেশের সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার ঘটানো, শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় ছেলে-মেয়ে সমতা আনয়নে ইউনেস্কো যথাযথ উদ্যোগী হয়। সহ¯্রাব্দের শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে ১৯৯০ সালে ইউনেস্কো সকল দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের নিয়ে থাইল্যান্ডের জমতিয়েন শহরে প্রথম বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলন করেছিল। এটা ছিল একটা মাইলফলক স্বরূপ। মূলত এই সম্মেলনের বিষয়বস্তুতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ স্বাক্ষর করেন। এরপর থেকে বাংলাদেশে ব্যাপক কাজ শুরু হয়। যেমন ভ্রাম্যমান স্কুল স্থাপন, স্যাটেলাইট স্কুল স্থাপান, কমিউনিটি স্কুল স্থাপন, রেজিস্ট্রার স্কুল স্থাপন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এই স্কুলগুলো জনগণ স্থাপন করেন। সরকার বিভিন্ন সাপোর্ট দিয়ে থাকে। এই সম্মেলনের পর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা জোরদার করা হয় এবং ১ জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে শিশুকে স্কুলে পাঠানোর বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন করে গেজেট প্রকাশ পায়। গেজেটে শিশুকে স্কুলে না পাঠালে সামান্য অর্থদ- রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অতিদরিদ্র পরিবারের শিশু Ñ যেমন কাজের বোয়া, রিক্সা ড্রাইভার, মৌসুমী কৃষক ও পাথর শ্রমিক, মৎসজীবী, ভাসমান ইত্যাদি পরিবারের শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসা কষ্টসাধ্য ছিল। এই পরিবেশের অনেক শিশুরা পিতা মাতার সাথে ধান রোপন, ধান কাটা, পরের ঘরের রাখালি, পেঠে ভাতে কাজ করা, মাছ ধরতে সাহায্য করা, ঠেলা গাড়িতে সাহায্য করা, মৌসুমী মজুরী গ্রহণ ইত্যাদি কারণে স্কুলমুখী হতে পারেনিÑ আবার কেউ স্কুলে ভর্তি হলেও পড়তে পারেনি। এমন অবস্থায় স্কুলে গেলে তাদের পিতা-মাতাকে গম দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মিলিনিয়াম গোলকে সামনে রেখে ১৯৯৩ সালে ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি’ চালু হয়। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ২৭ শতাংশ এলাকার অতিদরিদ্র পিতামাতাকে এবং স্কুলে ভর্তিকৃত ৪০ শতাংশ দরিদ্র পরিবারকে চাউল-গম শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তখন নানা প্রশ্ন ওঠে যে গম/চাউলের পরিমাণে কম দেওয়া হয় এবং মানও ভালো নয়। ফলে ১৯৯৪ সাল থেকে ছাত্রী উপবৃত্তি চালু হয়। ২০২০ সালে প্রাথমিক উপবৃত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৮০০ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক স্কুলে ৩১৫ কোটি টাকা। এই সমস্ত পদক্ষেপের কারণে বাধ্যতামূলক আইন পাশ হওয়ার পর শিক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। তাছাড়া বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিতে নারী প্রতিনিধি নিয়োগ প্রথার আইন হয় এবং মায়েদের স্কুলে আনয়নের ফলে সামাজিক অচলায়তন ভেঙে যায়। নারীদের ম্যানেজিং কমিটিতে রাখার সময় বিধান নিয়ে অনেক এলাকায় গোঁড়া ধ্যান ধারণার কারণে আপত্তি ওঠে। কিন্তু সরকার এটি বাস্তবায়নে অনড় থাকে। ফলে বিদ্যালয়ে মায়েদের সংযুক্তির নতুন যুগের জন্ম দেয়। এতে শিশুদের বিকাশের পথ যথেষ্ট মাত্রায় সুগম হয়। ১৯৯১ সালে আমাদের শিক্ষার হার ছিল ৩৫%। ১৯৯২ সালে আরেকটি শিক্ষার মাইলফলক হলো সমস্ত প্রাথমিক শিক্ষা ক্যারিকুলামকে ভেঙে দিয়ে নতুন করে যোগ্যতা ভিত্তিক ক্যারিকুলাম গঠিত হয়। নতুন করে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, প্রান্তিক যোগ্যতা, সকল ক্লাসের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা এবং শিখনফল নির্ধারিত হয়। নতুন বিষয় সম্পর্কে বাংলাদেশের সকল শিক্ষককে প্রশিক্ষণ অওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। কয়েক বছর এই প্রশিক্ষণ চলেছিল। জমতিয়েন সম্মেলনের ১০ বছর পর ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত সেনেগালের রাজধানী ডাকার সম্মেলনে ১২৮টি দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার অনেক পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক কৌশল গৃহীত হয় [২৬Ñ২৮ এপ্রিল]। এগুলোর সাথে বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়ের সমতা বিধান এবং নারীর ক্ষামতায়ন বৃদ্ধি পায়। পরের কয়েক বছরের মধ্যে জেন্ডার সমতার ইস্যুতে বাংলাদেশ সকল দেশকে চমকে দিয়ে এগিয়ে যায়। তখন ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য সর্মসূচি’ ব্যাপক সাড়া জাগায়। নব্বইয়ের দশকে বহুমুখী উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে ২০০০ সালে বাংলাদশের শিক্ষার হার দাঁড়ায় ৬০ শতাংশে। তখন ঝরে পড়া রোধ ও শিক্ষাচক্র সমাপনের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি সরকার সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের আগমনের পথ উন্মুক্ত করতে অনেক কৌশল গ্রহণ করতে হয়; পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওকে সরকার উৎসাহিত করে।
শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের স্কুল গঠন: আশির দশকের মাঝামাঝি শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে শহরাঞ্চলে কিছু অস্থায়ী স্কুল করা হয়। পরে এই স্কুলকে বর্ধিত করে হোটেল শ্রমিক, গাড়ির হেলপার, দোকান কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত শিশু কিশোরদের শিক্ষার জন্য সরকার শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল পরিচালনা করেন। প্রতিটি জেলায় ১/২টি করে এই বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।
আনন্দ স্কুল: দরিদ্র-পীড়িত পরিবারের ঝরে পড়া শিশুদের [৮+ ১৪ বছর পর্যন্ত] পড়াশুনার ধারা অব্যাহত রাখার জন্য রস্ক প্রকল্পের অধীন সারা দেশে অস্থায়ীভাবে আনন্দ স্কুল খোলা হয়। পিইডিপিÑ৩-এর আওতায় শিক্ষার জন্য উপবৃত্তির অধীনে এই কার্যক্রম চলছে।
চা-বাগান এলাকার স্কুল: একসময় চাবাগান ছিল ‘নিষিদ্ধ জগৎ’। চা-বাগানে ঔপনিবেশিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যে, স্থানীয় লোকজনের সাথে চা-শ্রমিকদের যোগসূত্র ছিল না। চা-বাগান ছিল মদের হাড়িতে পূর্ণ এলাকা কিন্তু বিদ্যালয় ছিল খুব সীমিত। মালিকপক্ষ চা-বাগানে স্কুল করতে অনাগ্রহী ছিল। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক সর্বজনীন ভোটাধিকার পাওয়ার পর ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব অনেকটা কমলেও আশির দশক পর্যন্ত চা বাগানে প্রাথমিক স্কুল সংখ্যা কম ছিলÑ অর্থাৎ চা-বাগানে শিক্ষার গুরুত্ব কম ছিল। চা-বাগানে শিশু ও বয়স্কদের নিরক্ষরতার কারণে জাতীয় শিক্ষা অর্জন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। নব্বইয়ের দশকে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ও ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’ আইন পাশ হলে মিলিনিয়াম গোলকে সামনে রেখে সরকার সাংবিধানিক শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে জোরদার করে। তখন চা-বাগান কর্তৃপক্ষ [মালিক পক্ষ], চা-ইউনিয়ন [শ্রমিক পক্ষ], দাতা সংস্থা [ইউনিসেফ, প্ল্যান বাংলাদেশ ইত্যাদি] এবং সরকার [জেলা প্রশাসক] দফায়-দফায় মিটিং করে চুক্তির মাধ্যমে চা বোর্ডের অধীন, চা-বাগানের অধীন স্কুল তৈরি শুরু হয়। অন্যদিকে ব্যক্তি উদ্যোগে কয়েকটি কমিউনিটি ও রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। আবার এনজিওরা চা-বাগানে গিয়ে অস্থায়ী স্কুল খুলে শিশু শিক্ষা দেওয়ার অনুমতি পায়। ফলে ব্র্যাক, আউস [আঞ্চলিক, কমলগঞ্জ] প্রভৃতি এনজিও চা বাগানে শিশুদের অল্প-বিস্তর পড়ার সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে চা বোর্ডের বা বাগানের স্কুলগুলোর শিক্ষকদের জন্য কিছু কিছু প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। ১৯৯৮-৯৯ সাল থেকে চা-বাগান স্কুলের শিক্ষকরা পিটিআই-এ একবছরের সিইনএড কোর্স সম্পাদনের সুযোগ পায়। তৎকালীন চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক রাজেন্দ্র বুনারজির আবেদনের প্রেক্ষিতে নেপ, ময়মনসিংহ মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট পিটি আই-এ চা-বোর্ডের অধীন শিক্ষকদের ভর্তির জন্য কোটা রাখেন। ২০১৩ সালে বেসরকারি স্কুল সরকারিকরণের সময় সরকার মৌলভীবাজার জেলার ৫১টি চাবাগানের স্কুল অধিগ্রহণ করে [জুড়ি উপজেলাÑ০৭, রাজনগর উপজেলাÑ০১, কুলাউড়াÑ০২, বড়লেখাÑ০৪, কমলগঞ্জÑ০৩, শ্রীমঙ্গলÑ৩৪ টি]। পরিসংখ্যানে দেখা যায় শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সর্বাধিক চা বাগানের স্কুল সরকারি হয়েছে। অন্যান্য উপজেলায় কম সংখ্যক স্কুল সরকারি হয়েছে। দুঃখের বিষয় যে, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় কোনো চা-বাগানের স্কুল সরকারি হয়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, যে সকল উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তারা সচেতন ও আন্তরিক ছিলেন সেখানেÑ সেখানে চা বাগানের স্কুল সরকারি হয়েছে বেশি। তখন শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা অফিসার ছিলেন কিশোলয় চক্রবর্তী। তিনি তাঁর মহান দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করেন। তাঁকে সাহায্য করেন উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপিসহ সংশ্লিষ্টজন। ফলে একুশ শতকে চা-বাগানে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান চা-বাগান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু প্রাথমিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে।
মন্দির, মসজিদ ও চ্যারিটি ভিত্তিক শিক্ষা পর্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক: সকল শিশুকে স্কুলমুখী করা অথবা ‘স্বাক্ষর’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে মন্দির, মসজিদ ভিত্তিক কিছু প্রাক/প্রাথমিক শিক্ষা দেশে চালু আছে। তার মূল লক্ষ হলো ড্রপ আউট শিশু, অক্ষর জ্ঞানহীন বয়স্ক শিশু-কিশোর-কিশোরী, দরিদ্র, অতিদরিদ্র, অসহায়, প্রান্তিক সমাজ এবং ভাসমান শিশুরা যেন অন্তত ‘স্বাক্ষরতা’ অর্জন করতে পারে বা পরে মূলধারার স্কুলে যেতে পারেÑ সে জন্য সহায়তা দান। অর্থাৎ তার শিক্ষা যেন থেমে না যায়। মূলত এগুলো গণশিক্ষামূলক কার্যক্রম। ধর্মমন্ত্রণালয় এই প্রকল্প দেখভাল করে। মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বাংলাদেশ ইসলামি ফাউন্ডেশন দেখে থাকে। মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ-ট্রাস্ট দেখভাল করে। ১৯৯৩ সাল থেকে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চলে আসছে। বর্তমানে তার সপ্তম পর্যায় চলছে। প্রথম পর্যায়ে ৯৪,৫৯০, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭,২৩,৮৮০ জন, তৃতীয় পর্যায়ে ১৬,৪৩,০৪০ জন শিশু সামান্য লেখাপড়া করেছে। ২০১৫ সাল থেকে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আলাদা করে ১০১০ টি ‘দারুল আরকার মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণশিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে ‘মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা’ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিশেষত দুর্গম পাড়ার মন্দিরে একজন শিক্ষক দিয়ে এই স্কুল বসে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এই মন্দিরভিত্তিক শিক্ষায় ৬৬,১৭.০০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ করা হয়। ২০১৭ পর্যন্ত মন্দিরভিত্তিক প্রাক প্রাথমিক কেন্দ্র সংখ্যা ছিল ৬,০০০। তাছাড়া খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের শিশু শিক্ষার জন্য কাজ করছে কিছু চ্যারেটি [যেমনÑ ক্যাথলিক মিশন, ব্যাপটিস্ট মিশন, চার্চস অফ গড, ন্যানরিন মিশন, প্রেস বিটারিয়ান মিশন]।
প্রাথমিক স্তরে সমন্বিত উন্নয়নের ধারা: ১৯৫৭ সালে সরকার জেলা স্কুল বোর্ড ভেঙে দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস গঠন করে। তখন মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা একই ডিপিইর অধীনে ছিল। দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় [১৯৮০Ñ৮৫] ১৯৮১ সালে পৃথক ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ চালু হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় ১৯৯২ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও গণশিক্ষা বিভাগকে এক করে ‘প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ সৃষ্টি করা হয়। নব্বই দশকে ইউনিসেফ সাহায্যপুষ্ট আইডয়াল প্রকল্প, ডিএফআইডি এস্টিম প্রকল্প, নোরাড, জাইকা ইত্যাদি আলাদাভাবে কাজ না করে সমন্বিত কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে ব্র্যাক, এফআইভিডিবি প্রভৃতি এনজিও প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নকে কাজ চালায়। কিন্তু ফিল্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও কর্মচারি বেসরকারি সংস্থাদের মানসিক দূরত্ব দেখা দেয়Ñ এমতাবস্থায় দেশের শিক্ষা উন্নয়নের স্বার্থে উভয়ে যৌথ কাজ করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে উৎসাহপূর্ণ মিটিং সমাবেশ এবং সার্কুলার জারি করে এই অচলাবস্থা ও পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে দেয় এবং যৌথ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়। যা ১৯৯৭ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি [পিইডিপি]Ñ১ নামে অভিহিত। এই বছরের জুলাই থেকে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে একই লক্ষ্যাভিমুখী হয়ে বৃহৎ পরিসরে কার্যক্রম চালু হয় এবং ২০০৩ সালের মেয়াদ পর্যন্ত ১০টি লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ চালায়। এই সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপজেলা রিসোর্স সেন্টার [ইউআরসি] সৃষ্টি করা [১৯৯৮ সাল]। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের সকল উপজেলায় একটি করে মডেল স্কুলের মধ্যে [ব্যতিক্রম আছে] ইউআরসি স্থাপন করা হয় এবং ২০০৫ সালে এই অফিসের তিন স্টাফবিশিষ্ট সকল জনবল রাজস্বখাতে স্থানান্তরিত করা হয়। শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণের মান বৃদ্ধির জন্য ও সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণের লক্ষে স্বল্প মেয়াদে শিক্ষকদের জন্য ইউআরসি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। ২০০৪ সালে গৃহীত হয় পিইডিপিÑ২ কার্যক্রম। পিইডিপিÑ২-এর কার্যকালে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম অর্জন হলো ইনক্লোসিভ এডুকেশন বা একীভুত শিক্ষা অথবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরদের মূলধারার শিক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। সরকার সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৯(১), (৩), ২৭, ২৮(১), (২), (৪), ২৯(১) ধারায় দেশের অতিদরিদ্র, এতিম, অনগ্রসর, সাধারণ প্রতিবন্ধী প্রভৃতি শিশুদের শিক্ষাদানে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকায়Ñ তাদেরকে শিক্ষার বেষ্টনীতে এনে তাদের নিরাপত্তার জন্য সাধারণ স্কুলে তাদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন। সরকারি ও এনজিও স্কুলে এই সকল কার্যক্রম চলে। বাংলাদেশের প্রায় সকল স্কুলের শিক্ষককে ‘ইনক্লোসিভ’ বা একীভূত শিক্ষার কার্যক্রম ও পাঠদানের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে স্কুলগুলোতে সাধারণ প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ভর্তির হার বেড়ে যায়। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিলÑ যা অনেকটা অজির্ত হয়েছে। পিইডিপিÑ২-এর আওতায় দক্ষ জনসম্পদ ও গুণগত শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষে অনেক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলেছিল। বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধী শিশুর [প্রায় ৪০ লক্ষ] প্রায় ১৪ ভাগের উপরে সাধারণ স্কুলে পড়াশুনা করতে পারছে। এই শিশুর ২০ ভাগ মূলধারার স্কুলের পরিবেশের সাথে অভিযোজনের ক্ষমতা রাখে [সরকার আলাদা করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার জন্য নীতিমালা ২০১৮ ঘোষণা করছে]। পিইডিপিÑ২-এর আওতায় মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য ৬৪টি জেলায় ৬৪টি সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের পদ সংরক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি জেলায় ২জন করে সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার রয়েছেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত পিইডিপিÑ২-এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। জুলাই ২০১১ থেকে পিইডিপি-৩-এর কার্যক্রম শুরু এবং জুনÑ২০১৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে [মেয়াদ কিছু দিন বাড়ানো হয়]। এই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকার ও দাতা সংস্থা ২২ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা অনুমোদন করে। এই সময় থেকে ব্যাপক কাজ চোখে পড়ে। তখন সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুন্দর অবকাঠামো তৈরি ও গুণগত শিক্ষার জন্য প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। ইত্যবস্যরে ৩,৬৮৫টি নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি, ২,৭০৯টি স্কুল পুনঃনির্মাণ, ১,২৮,৯৯৫৫টি টয়লেট স্থাপন, ৪৯,৩০০টি নলকূপ স্থাপন, ১১,৬০০ শ্রেণিকক্ষ মেরামত দৃশ্যমান হয়। তাছাড়া এই সময়ে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলে এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত ৪৪ ধরণের পদে ৩৭৭টি পদ সংখ্যা সংরক্ষণ/সৃজন করা হয়। নবতর দৃষ্টিভঙ্গির ডিপিএড কার্যক্রম এই সময় চালু হয়ে থাকে। পিইডিপিÑ৩ অর্থাৎ তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে দেশে ১২টি নতুন প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয় [যে যে জেলায় পিটি আই ছিল না। যেমনÑ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি ইত্যাদি]। এই সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরীক্ষামূলক চালু করা হয়Ñ অর্থাৎ বিদ্যালয়ে শিশুদের খাদ্যের যোগান দেওয়া। সারা দেশে এই প্রকল্প সফলভাবে চালু করা না গেলেও শিশুরা বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার স্কুলে নিয়ে আসার জন্য প্রচুর টিফিন বক্স দেওয়া হয়। এবং তারা স্কুলে ক্ষুধার্থ না থেকে কোনানা কোনা ভাবে টিফিন নিয়ে আসার চেষ্টা করে থাকে। আমাদের দেশে দেখা যায় শিশুদের স্কুল ঘণ্টাা অনেক বেশি। অধিকাংশ গরিব শিশু স্কুলে এলেও বিকালে ক্ষুধার জন্য ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। তাদের জন্য এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দরিদ্রপীড়িত ৭২ টি উপজেলায় প্রায় ২৭ লাখ শিশুদের প্রতিদিন উন্নতমানের ৭৫ গ্রাম ওজনের পুষ্টিকর বিস্কুট দেওয়া হয়। দেখা গেছে এই সময় স্কুলে ছাত্রসংখ্যা নিয়মিত হয়েছিল। পরে এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং ৯৩টি উপজেলার প্রায় ৩৪ লাখ শিশু এই সুবিধা পায়।
পিইডিপিÑ৩-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ১:৪০ রাখার জন্য কয়েক হাজার শিক্ষক নিয়োগ। বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের দীর্ঘকালের বড় দুর্গতি ছিল যে, তারা স্কুল ঘরের ঝাড়– দেওয়া থেকে শুরু করে স্কুলবেল বাজানো সবই করতেনÑ এই সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে সরকার ২০১২ সালে ৩৬,৯৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ জন করে দপ্তরী কাম প্রহরী নিয়োগদান করে। পিইডিপিÑ২-এর আওতায় ৪৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যা পরে রাজস্ব খাতে যায়। এই প্রকল্প থেকে ৩৭,৬৭২ জন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দান করা হয়। ২০১৩ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার ৩৬,১৯৩টি বেসরকারি [রেজিস্ট্রার, চাবাগান স্কুল ও কমিউনিটি স্কুল] জনবলসহ সরকারি করেন। যা বঙ্গবন্ধু পরবর্তী অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সদ্য সরকারীকরণকৃত স্কুলে একটি করে পদ বাড়ানো হয় [প্রধান শিক্ষক বাদে ৫টি পদ]। তখন এই স্কুলগুলোর জনবল দাঁড়ায় ১,৩০,৯৬৫ জন। অন্যদিকে আগেকার ১৫০০ বিদ্যালয় প্রকল্পে ৪৮৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। দেখা যায় পিইডিপিÑ৩ তে ১২টি নতুন স্থাপিত প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পদ সংরক্ষিত করা হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় ২ ও ৩ শিক্ষক বিশিষ্ট স্কুলে [বিশেষত সিলেট অঞ্চলে] পর্যায় ক্রমে পদ বাড়ানো হয়ে থাকলেও ২০১৩ সালে এই স্বল্প শিক্ষকের স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা ৫ পদ সৃষ্টি করে ২০১৩ টি নতুন পদ সৃজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এভাবে ও পিইডিপিÑ৩ [পিইডিপিÑ২-এর আংশিক সহ] অধীনে প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়ে ৯৫,৮৫২ জনকে রাজস্বখাতে গ্রহণ করা হয় [উন্নয়নখাতে ৩২৯ জন]। যা স্বাধীন দেশে নজীরবিহীন ঘটনা। এই নিয়োগের বড় অংশ হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষাকে গতিশীল করতে ও মাঠ প্রশাসনে শৃঙ্খলা এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে ২০১২ সালে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট [পিটি আই-এর] সুপারিনটেনডেন্টের পদকে আপগ্রেড করা হয় [বর্তমান ৬ষ্ঠ গ্রেড]। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালে ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নতুন একটি পদ [মোট ২টি] পিডিপিÑ২-এর আমলে সৃজন করা কিন্তু একই পদমর্যাদার পিটি আই-এর সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট-এর পদ দীর্ঘকাল ১টি থাকে। অথচ পিটি আই-এ ২য় শিফট চালু হয়ে যায়। অনেকে ২৭/২৮ বছর চাকরির পর কোনো প্রমোশনের মুখ দেখতে পারেনি। অবশেষে ২০২০ সালে মাননীয় সচিব ও মাননীয় প্রতিমন্ত্রী উদ্যোগে পিইডিপিÑ৪ থেকে পিটি আই-এর নতুন করে একটি সহকারী শিক্ষককের পদ সৃজন করা হয়।
আগে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে [সরকার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া] নিজস্ব মতে পাঠ্য বই ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতো। পরে সরকার সকল ধরণের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বই পড়াতে বাধ্য করেছে। যাতে শিশুরা দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। সকল ধরণের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ও সরকারের তত্ত্বাবধানে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করছে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিশুরা উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তাদের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হয়। পূর্বে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের বিভিন্ন খাতের ও পদের শিক্ষকদের মধ্যে বদলি অনেক জটিল ও কঠিন ছিল। ২০১০ থেকে এই জটিলতা দূর করা হয়েছে। অর্থাৎ যে যে প্রক্রিয়ায়ই নিয়োগ হয়ে থাকেন না কেন রাজস্ব খাতে আসার পর তারা বদলি হতে পারবেন। এই দিকটি শিক্ষকের জন্য সহজ হয়েছে।
পিইডিপিÑ৪ [১জুলাই ২০১৮ থেকে ২০২৩ জুলাই পর্যন্ত] এর আওতায় প্রাথমিক শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, গুণগত মান বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, ইনোভেশন কার্যক্রম, বিদ্যালয়কে শিশুবান্ধব করা, ব্যাপক শিক্ষক নিয়োগ, আইসিটি প্রশিক্ষণ জোরদার করা, ইংরেজি শিক্ষার মান বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কোবিড-১৯-এর কারণে অনেক কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। ইতোমধ্যে ২০২১ সালে শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র পাল্টে গেছে। প্রতিটি বিদ্যালয় পাকা হয়েছে। উন্নত ওয়াশ ব্লক করা হয়েছে, ক্লাসে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের উপকরণ দেওয়া হয়েছে, আধুনিক ব্লকবোর্ড সংযুক্ত হয়েছে। ১ জানুয়ারি ‘বই উৎসবে’র মাধ্যমে শিশুদের হাতে বই পৌঁছে যায়। সরকার রুটিন মতো নিয়মিত মাসিক/বার্ষিক ব্যবস্থাপনা খরচ বাবদ টাকা বৃদ্ধি করেছেন। ছাড়া পিইডিপিÑ২ থেকে প্রধান শিক্ষকের হাতে/মাধ্যমে বিদ্যালয় ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা [ঝখওচ] করে খরচের বাবদ প্রতিবছর ৪০,০০০/ টাকা প্রদান করা হয় [২০০৭ থেকে শুরু এবং পিইডিপিÑ৪ থেকে ছাত্র অনুপাতে এই টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে ৫০,০০০/- থেকে ১,০০০০০/Ñ পর্যন্ত]। পিইডিপি-৩ থেকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির উন্নয়ন ও খেলার সামগ্রী ক্রয় করার জন্য ৫,০০০/- দেওয়া শুরু হয়েছে [পিইডিপিÑ৪ থেকে এই পরিমাণ বৃদ্ধি করে ১০,০০০/- করা হয়েছে]। তাছাড়া চক্রাকারে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র মেরামত, ওয়াস ব্লক রক্ষা, শিশুদের খেলার সামগ্রী ক্রয় বাবদ টাকা দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে পাইলটিং ভাবে ৮০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৬ষ্ঠ শ্রেণির অনুমতি দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরে প্রায় ৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয় [প্রতিটি উপজেলার ১টি করে। কোনো কোনো দুর্গম উপজেলায় ২টি (যেমন সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলা)। যে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাই স্কুল নেই বা দূরে অবস্থিতÑ সেখানে প্রথম পাইলটিং চলে] । ২০১৬ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পর্যায়ে কিছু সিদ্ধান্ত মতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত আপাতত হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তত্ত্ববধান করবে। ফিল্ড পর্যায়ে চালুকৃত স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ উন্নয়ন: ব্রিটিশ আমলে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ‘গুরু ট্রেনিং স্কুল’ ছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যোগ্যতা ‘মাইনর পাস’ হলে চলতো। ১৯৫২ সালের তৎকালীন জেলাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে পিটি আই স্থাপিত হয়Ñ পরে পর্যায়ক্রমে অনেক মহকুমা শহরের পিটি আই স্থাপিত হয়। এই সকল প্রতিষ্ঠানে প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলে। পরে এই একবছর কোর্সের নাম হয় সিএনএড [সার্টিফিকেট-ইন-এডুকেশন]। ১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর পিটি আই-এর ইন্সট্রাক্টরের পদ প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়। ২০১০ শিক্ষানীতির আলোকে প্রাথমিক শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্সটি একেবারে ঢেলে সাজানো হয়। আধুনিকায়কৃত কোর্সটি আন্তর্জাতিক মানের সাথে মিল রেখে করা হয়। এই কোর্সের নাম হয়Ñ ডিপ্লমা-ইন প্রাইমারি এডুকেশন। ২০১২ সালে বিভাগীয় পর্যায়ের পিটি আইয়ে এই কার্যক্রম চলে এবং ২০১৫ সাল থেকে তখনকার ৫৪টি পিটিআই-এর এই কার্যক্রম একযোগে শুরু হয়। এই বিশাল কাজে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা একাডেমি [নেপ], আইইআর [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়], ইউনিসেফ এক যোগে কাজ করে। এবং সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিÑ৪ [পিইডিপিÑ৪]-এর আওতায় পিটিআই প্রতিটি পিটি আই-এ একটি করে মাইক্রোবাস, ড্রাইভার, গ্যারেজ নির্মাণ করে দেওয়া হয়। প্রতিটি পিটি আই-এ নূন্যতম ৪জন করে আউট সোরসিং লোক নিয়োগ করে জনবল বৃদ্ধি করা হয় [২০১২]। এই সময়ে ঐতিহাসিক কাজ হলোÑ ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে ১২ টি জেলায় ১২টি নতুন পিটি আই নির্মাণ। ২০১১ সালে থেকে সকল পিটি আই-এ একটি করে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয় [২৫Ñ৩০টি ডেক্সটপ ও নুন্যতম ৪টি করে ল্যাপটপ দেওয়া হয়]। তাছাড়া প্রতিটি পিটিআই অফিসে পর্যায় ক্রমে ৩টি ট্যাব প্রদান করা হয়। অধিকাংশ ইন্সট্রাকক্টদের ১টি করে ল্যাপট্যাব প্রদান করা ছাড়াও কর্মকর্তাদের জন্য মোটর সাইকেল বরাদ্দ্ দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে সকল পিটি আই-এ আই-সিটি ইন্সট্রাক্টর পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ দান সম্পাদিত হয়। ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার জন্য পিটি আই কম্পিউটার ল্যাবে অব্যাহতভাবে প্রশিক্ষণ কাজ চলছে।
মৌলিক প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি: পাকিস্তানের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, রংপুর, ফেণি, ময়মনসিংহে জুনিয়র ট্রেনিং কলেজ (জেটিসি) স্থাপতি হলে দুই বছরব্যাপী ইন্টারমিডিয়েট ইন এডুকেশন [আই এড] কোর্স চালু হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে এই প্রতিষ্ঠিানগুলো কলেজ অব এডুকেশন নামে [বিএড] পুনরায় যাত্রা করে। কলেজগুলোতে তিন বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব আর্টস ইন এডুকেশন কোর্স শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে আবারো বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটে। এই ছয়টি প্রশিক্ষণ কলেজের মধ্যে চট্টগ্রাম, ফেণি, যশোর, রংপুর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ-এ রূপান্তরিত হয়ে মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়। অন্যদিকে ঢাকার প্রতিষ্ঠানটি সরকারি নজরুল কলেজে রূপান্তরিত হয়। ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠানটি ‘মৌলিক শিক্ষা একাডেমি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান নিরীক্ষণ এবং পিটি আই-এর মান নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়। পরে ১৯৭৮ সালে কুদরাত-ই-খুদা কমশিনের সুপারিশ মতো প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষে কেন্দ্রীয় গবেষণা ও তত্ত্বাবধান করতে সরকার ময়মনসিংহে ৫.২৩ একর জায়গা নিয়ে মৌলিক শিক্ষা একাডেমি হিসেবে নবতর যাত্রা করে। ১৯৮৫ সালে নামকরণ হয়Ñ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, ২০০৪ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি সায়ত্ত্বশাসিত হয়। ২০০৯ থেকে সারা দেশের পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা নেপ-এর তত্ত্বাবধানে চলছে। এখন নেপ ডিপিএড-এর এবং স্কুলগুলোর মাননিয়ন্ত্রণে বদ্ধপরিকার।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্যÑ২০১৯ : ১. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়Ñ৬৫,৬২০; ২. নন- রেজিস্টার বেসরকারিÑ৪,৭৫৭; ৩. এবতেদায়ীÑ৫,৯১০; ৪. কিন্ডার গার্টেন ২৮,৯৫০; ৫. কমিউনিটিÑ১৪২; ৬. মাদ্রাসা সংলগ্ন এবতেদায়ীÑ৭,৩৫৫; ৭. হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলÑ১,৮৯৯; ৮. ব্রাকÑ৩,৭০২; ৯. শিশু কল্যাণÑ ২০৩; ১০. রকস্Ñ৩১৯৯, ১১. এনজিও শিশু কেন্দ্রÑ১,৬৩২; ১২. অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়Ñ ১,৩৩৭টি। সর্বমোটÑ১২,৯২৫৮টি। এই প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা: ২,০১২,২,৩৩৭ জন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যাÑ৭,২১,৮০১ জন [তার মধ্যে শিক্ষিকাÑ৪৩৬২১৬ জন। অর্থৎ ৬০.৪৩%]
বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবুও সামনে অনেক পথ পড়ে আছে। বিশেষত প্রান্তিক, অতি দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ধরে রাখা অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ। শিক্ষায় মেয়েদের অগ্রগতি আশানুরূপ হয়েছে। তবে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও ধর্মান্ধতার রাহুগ্রাস থেকে উদ্ধার পেতে কিছু সময় লাগবেই। তবে শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। অথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষায় দেশ ভালো অবস্থানের দিকে যাচ্ছে।
এবতেদায়ী মাদ্রাসাসহ অন্যান্য ধরণের মাদ্রাসা শিক্ষা: পাকিস্তান আমলে মাদ্রাসা শিক্ষা একান্ত ধর্মীয় ছিল। এই শিক্ষা নিয়ে মূলধারার শিক্ষা ও চাকরি গ্রহণের তেমন সুযোগ ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে ফুরকানিয়া মাদ্রাসা ছিল ৫,০৯১ টি, দাখিলÑ৬৫১, আলিমÑ৩৫৫, ফাজিলÑ৪৮৩, কামিলÑ২৯ টি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই সংখ্যাগুলো বাড়তে থাকে। কুদরাত-এ-খুদা কমিশন মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে ও তার সাথে কিছুটা কর্মমুখী ধারাকে সংযুক্তি করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে এই শিক্ষা কেবল একই বৃত্তে ঘোরপাক করতে থাকে। ১৯৮০ সালে সরকার আলীয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ধারাকে এমপিও ভুক্তি করে। ১৯৮৫ সালে দাখিলকে এসএসসি সমমান, ১৯৮৭ সালে আলীমকে এইচ এসসি সমমান নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষার সম-মান করে মূলত এবতেদায়ীর যাত্রা হয়। এবং ধর্মীয় বিষয়ের পাশপাশি বাংলা শিক্ষাকে রাখা হয়। ২০০৬ সালে ফজিল শ্রেণিকে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দেওয়া হয়। তার মান করা হয় ডিগ্রীর সমতুল্য। এবং কামিলকে করা হয় মাস্টার্স-এর মর্যাদা সম্পন্ন। ১৯৯৫ সালে সরকারি উদ্যোগে ‘মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ স্থাপিত হয়। এইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন ঘটে। কিন্তু তার বাইরে থাকে বিশাল সংখ্যক কওমী মাদ্রসা। তারা পুরাতন ট্রেডিশন বজায় রাখেন। ২০১৭ সালে কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে সরকার ইসলামি স্টাডিজ ও আরবি মাস্টার্সের সমতুল্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে আরবি শিক্ষা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও অন্যদিকে প্রায় শূন্যের দিকে নামছে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা। পাকিস্তান আমল থেকে ‘শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজ’ ডুবতে থাকলেও একুশ শতকে এই কলেজ তলানিতে পৌঁচেছে। টোলের সংখ্যা বাস্তবিক অর্থে কমে গেছে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক পালি ভাষার চর্চা সামান্য রয়েছে।
নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা ও কলেজ শিক্ষা : ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে জুনিয়র স্কুল [নি¤œ মাধ্যমিক] সংখ্যা ছিল ২,৬২১টি [তার মধ্যে বালিকা বিদ্যালয় ৩৬৯ টি]। ছাত্র সংখ্যা ৩,০৩,৩৭৮ [মেয়েÑ৯৮,৪৯৩ জন]। আবার ১৯৭৩-৭৪ সালে নি¤œ মাধ্যমিক স্কুল হয় ২,৭১০ [বালিকা বিদ্যালয়Ñ ৪৫৩ টি]। ১৯৭৩-৭৪ সালে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৩,০২,৯০৫ জন [মেয়েÑ ৯৮,০৫০জন]। ১৯৭২-৭৩ সালে পূর্ণাঙ্গ উচ্চ হাই স্কুল [নবম দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৫,৪৮৩টি [বালিকা বিদ্যালয়Ñ৬০০টি]। সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষমাত্রা সামনে রেখে অনেক প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছিল। বিশেষত প্রাথমিকের পর মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ঝরে পড়ার হার যেমন বেশি ছিল, তেমনি প্রান্তিক সমাজে মেয়ে শিশুদের বেশি লেখা পড়ানোর দিকে অগ্রসর হতে দেয়নি। ফলে ১৯৯৪ সালে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষায় ‘মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প’ চালু হয়। এই প্রজেক্টের অধীন একজন কর্মকর্তা এবং একজন সহকারী কর্মকর্তা প্রজেক্টে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রজেক্টের মেয়াদ শেষে সরকার এই পদকে ‘উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার’ হিসেবে পদায়ন করেন। মূলত উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাকে তারা দেখভাল করেন। ১৯৯৪ সলে কিছু এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুলকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে মফস্বল উচ্চ শিক্ষার পথ কিছুটা প্রশস্ত হয়।
২০১০ সাল থেকে নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল শ্রেণিতে বিনামূল্যে বই বিতরণ শুরু হয়। ২০০৯ সালে সকল পর্যায়ের বেসরকারি নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে ২৭৩১টি এমপিও ভুক্ত হয়। ২০১৯ সালে পুনরায় সরকার ২৭৩০ টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছে [তারমধ্যে নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এই সময় প্রায় ৫০০ মাদ্রাসা এমপিও ভুক্ত হয়েছে]। নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে ৩৫,৫০০ ‘শেখ রাসেল ডিজিট্যাল’ ল্যাবরেটরি চালু করা হয় [৪১৬১টি প্রক্রিয়াধীন]। তবে ২০১০ সালে সরকার সকল উপজেলায় পর্যায়ক্রমে একটি করে সরকারি হাই স্কুল সরকারিকরণের ঘোষণা দিলেÑ সেই মতে প্রায় ৩২৯ হাই স্কুল সরকারি হয়। বলা যায় যে, ২০০৯ সালের আগে দেশে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ছিল ৩১৭টি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল যে মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষাকে পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি করা হবে। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে জোর দেওয়া হয়। তখন সরকার পরীক্ষামূলক পুনরায় ১১ টি সরকারি ও কিছু সংখ্যক বেসরকারি স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণির কার্যক্রম চালু করার অনুমতি দেয়।
কলেজ: ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছিল মাত্র ৩০০টি [তারমধ্যে মহিলা কলেজ ১৯ টি, ক্যাডেট কলেজ ৪টি]। তখন ইন্টিারমিডিয়েট পরীক্ষার ক্যারিকুলাম কঠিন ছিল এবং ইংরেজি ভাষায় জোর দেয়ার কারণে পাশের হার কম ছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১,৬৭,৯৬১ জন কিন্তু উত্তীর্ণ হয়েছিলÑ ৫০,৬৬৮ জন।
১৯৭৮ সালে সরকার প্রতিটি মহকুমায় একটি করে কলেজ সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে [তখন জেলা পর্যায়ে কয়েকটি মহিলা কলেজ সরকারিকরণ হয়েছিল। যা ১৯৮০ সালের মধ্যে সরকারিকরণের কাজ সম্পাদিত হয়।
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সামরিক সরকার বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হাই স্কুল ও কলেজকে সরকারি করেন। তখন উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক ও কলেজ সরকারিকরণ শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে সরকার প্রতিটি জেলায় ১টি মহিলা কলেজ সরকারিকরণের কাজ সম্পাদিত হয় [তখন সারা দেশে ১৯টি জেলা শহরে মহিলা কলেজ সরকারিকরণ হয়]।
আগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কলেজে অনার্স পড়ার সুযোগ ছিল না। নব্বই দশকে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে অনার্স পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে ২০১০ থেকে উপজেলা পর্যায়ের কলেজে অনার্স চালু হয়েছে। কলেজে নতুন-নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। মেয়েদের জন্য বৃত্তি এবং গরীব শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা বৃত্তি চালু হয়েছে। ১৯৮২Ñ১৯৮৮ পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে কিছু কলেজ সরকারি হয়েছে। ২০১০ সালে সরকার প্রতি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়েছে। বিভিন্ন যাচাই-চাছাইয়ের পর ২০২১ সাল থেকে ৩১৫ টি কলেজ পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসেবে যাত্রা করেছে [বাকীগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় পুন যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা যায়]। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সরকারি কলেজ সংখ্যা ছিল ২৮৯ টি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রায় ৬১৪ টি স্কুল-কলেজ সরকারি হয়েছে। স্কুল ও কলেজ সমূহের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সম্পাদনের জন্য ১০ টি শিক্ষাবোর্ড কাজ করছে। পাকিস্তান আমলে ছিল চারটি শিক্ষা বোর্ড। বর্তমানে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য অনেকগুলো সরকারি বিএড কলেজ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়: উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভালো। যদিও এশিয়া অঞ্চলের পড়াশুনার মানের সূচকে সেগুলো পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতার সাথে আন্তরিকতার সংকটও কম নয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি [৪টি সাধারণ ও ২টি বিশেষায়িত]। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [১৯২১], রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় [১৯৫৩], চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় [১৯৬৬], জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় [১৯৭০]। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়Ñ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় [রমনা, ঢাকা, ১৯৬২], কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [ময়মনসিংহ, ১৯৬১]। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ছিল প্রায় চৌদ্দ হাজার। এই প্রতিষ্ঠানে ১৯৭২-৭৩ সালে ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৪,২০৩ জন [ছাত্রীÑ৩,৩৫৫ জন] এবং ১৯৭৩-৭৪ সালে ছাত্র সংখ্যা ১৪,৮২৬ জন [ছাত্রীÑ ৩১৭৭ জন]।
১৯৭৩ সালে প্রশংসনীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ সরকার গ্রহণ করে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাশ হয় ১৯৯২ সালে [২০১০ সালে সংশোধন করা হয়]। সর্বস্তরের শিক্ষাকে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালে সরকারি উদ্যোগে উন্মক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় [২১ অক্টোবর ১৯৯২]। বর্তমানে তার অধীনে সমস্ত দেশে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি কো-অর্ডিনেটিং অঞ্চল এবং তার অধীনে প্রায় ১,০০০টি টিউটোরিয়াল কেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে আগে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজসমূহ ছিলÑ তারাই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতো [ডিগ্রী থেকে অনার্স পর্যন্ত] পরে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত দেশের সে দায়িত্ব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন [বর্তমানে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে অধীন কয়েকটি কলেজ রয়েছে]। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ২৮ লক্ষের উপরে শিক্ষার্থী রয়েছে। আবার সরকারি উদ্যোগে ১৯৮০ সালে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় [কুষ্টিয়া] এবং ২০১৩ সালে আরবি ও ইসলামি শিক্ষার জন্য ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় [ঢাকা] চালু হয়। তাছাড় পাবলিক/সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেÑ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ১৯৯১], জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় [২০০৫, স্থাপিত ১৮৫৮], জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় [ত্রিশাল, নতুন, ২০০৫], কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন,২০০৬], বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় [রংপুর, নতুন, ২০০৮], বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব প্রফেশনালস [ঢাকা, নতুন ২০০৮], বরিশাল বিশ্বদ্যিালয় [নতুন, ২০১১], রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় [সিরাজগঞ্জ, নতুন ২০১৮], শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় [নেত্রকোণা, নতুন, ২০১৮], শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় [কিশোরগঞ্জ, নতুন, ২০২০]। ২০২০ পর্যন্ত দেশে ৪৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সক্রিয় রয়েছে।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়: ১. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [৭টি]Ñ ক). ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন স্থাপিত, ১৯৬২]; খ). বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ১৯৯৮, গাজীপুর, প্রতিষ্ঠাÑ ১৯৮৩]; গ). শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ২০০১, প্রতিষ্ঠাÑ ১৯৩৮]; ঘ). চট্টগ্রাম ভেটেরিনারী ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব, ২০০৬, প্রতিষ্ঠাÑ ১৯৯৫]; ঙ). সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ২০০৬, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৯৫]; চ). খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১৯]; ছ). হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১৯]
২. বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় [৫টি] ]Ñ ক). বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, [১৯৬২]; খ). রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [ বিশ্ব. ২০০৩, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৬৪]; গ). চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ২০০৩, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৬৮]; ঘ). খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব.২০০৩, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৬৯]; ঙ). ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব.২০০৩, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৮০, গাজীপুর]
৩. বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [১৫টি]Ñ ক). শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [১৯৮৬]; খ.) হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ১৯৯৯, প্রতিষ্ঠাÑ ১৯৭৯, দিনাজপুর]; গ). মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ১৯৯৯, টাঙ্গাল]; ঘ). পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [বিশ্ব. ২০০০, প্রতিষ্ঠাÑ১৯৭২]; ঙ). নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০০৬]; চ).যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০০৮]; ছ). পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০০৮]; জ). বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১১, গোপালগঞ্জ]; ঝ). রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন ২০০১১]; ঞ). বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১৮, জামালপুর]; ট). বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১৮, গাজীপুর]; ঠ). চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০১৯]; ড). সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [ নতুন, ২০২০]; ঢ). বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [নতুন, ২০২০]; ণ). লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [২০২০]। উল্লেখ্য যে, ২০২০-এ প্রতিষ্ঠিতগুলোর কার্যক্রম চলছে।
৪. বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় [৪টি]Ñ ক). বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় [ঢাকা, ১৯৯৮ সাল, পূর্বের পিজি]; খ). রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ [২০১৭]; গ). চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ [২০১৭]; গ). সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় [২০১৮]; ঘ). শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় [২০২০ অনুমোদিত]।
নতুন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়: ১. বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় [ঢাকা, নতুন, ২০১০। এর অধীনে ৬টি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে] ২. বঙ্গবন্ধু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় [ঢাকা, নতুন, ২০১৩] ৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন এন্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় [লালমনিরহাট, নতুন, ২০১৯]
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে নতুন-নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। তবে গুণমানের দিকে খেয়াল না করলে মৌলিক উন্নয়নের ধারা ব্যহত হবে।
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ : ১৯৭০-৭১ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল ০৩টি। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ০৫টি [বিএসসি ডিগ্রী দেওয়া হয়], বিশেষায়িত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজÑ০৩টি। সরকারি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং [বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং] কলেজ ০৭টি, [সরকারি-বেসকারি অংশীদারিত্বে রয়েছেÑ ০১ টি জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট]। ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়রিয় ০৮টি, সরকারি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট [এসএসসির সমান] ৪২টি রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে অনেক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান।
কারিগরি শিক্ষা: কারিগরি শিক্ষায় মানুষের গ্রহণে আগ্রহ বাড়ছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এইসকল কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন পূর্বের ৬৪ জেলায় স্থাপিত ভকেশনাল ইনস্টিটিউটকে উন্নীত করে ‘টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ’-এ রূপান্তর করা হয়। ২০২০ পর্যন্ত ১২ লাখ শিক্ষার্থী কারিগরিতে পড়াশোনা করেছে। ২০২১ থেকে ৭ম-৮ম শ্রেণিতে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন ধরণের ৮,৬৭৫টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে [২০২০ সালে] ৪৯টি সরকারি ও ২১৭ বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে উচ্চতর ইঞ্চিনিয়ারিং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। ‘বাংলাদেশ লেদার টেকনোলজি মহাবিদ্যালয়’ ও ‘ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি’ [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীকরণÑ২০১১] চামড়া টেকনোলজি বিষয়ে পাঠদান করছে। তাছাড়া বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ওপর কলেজ স্থাপিত হয়েছে।
শরীর চর্চা, ক্রীড়া, সঙ্গীত, আর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ক্রীড়া অধিদপ্তরের অধীন ০৬ টি সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ রয়েছে [ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ময়মসসিংহ]। বেসরকারি শরীরচর্চার স্কুলও কয়েছে। এগুলো থেকে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে [বিপিএড ও এমপি এড]। ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশেরÑ বিকেএসপি সংস্থা। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তাদের অধীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলে। সঙ্গীত বিভাগ এখন কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হলেও দেশে একটি মাত্র সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় রয়েছে। সরকারিভাবে সঙ্গীত বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় /মহাবিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো ও স্কুল-কলেজে ‘সঙ্গীত শিক্ষকের পদ’ রাখা দরকার বলে বিজ্ঞদের ধারণা। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সঙ্গীত শিক্ষা। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আর্টÑ অর্থাৎ চারু ও কারু শিল্প প্রতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। চাকরিরও কিছু পদ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে।
কৃষি শিক্ষা ও মৎস শিক্ষা: স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মাথায় বলা যায় কৃষি ও মৎসখাতে অনেক অগ্রগতি লক্ষ্যণীয়। বিশেষত ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও মৎস বিভাগের গবেষণামূলক সাফল্য প্রচুর। আধুনিক উদ্ভিদ ও মাছের জীন গবেষণায় বাংলদেশ এগিয়েছে অনেক [পাট ও ইলিশ মাছ প্রভৃতি]। দেশে ১৮টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কৃষি শিক্ষায় কাজ করছে। এগুলো থেকে পাঠদান শেষে নিয়মিতদের বিশেষায়িত কৃষি-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
মেডিকেল শিক্ষা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মেডিক্যাল কলেজ ছিল ৮ টি। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা অনুপাতে এমবিবিএস ডাক্তারের সংখ্যা কম ছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত গ্রাজুয়েট ডাক্তার হয়েছিলেন ২৬,১২০ জন।এফসিপিএস কিংবা এফ আর সিএস অথবা বিশেষায়িত ডাক্তারের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ১৯৭১Ñ৯০ সালের মধ্যে একটি ০১টি মেডিক্যাল কলেজ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ১৯৯২Ñ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪৯ টি এবং ২০০৯Ñ২০১৬ পর্যন্ত ৪৭টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত/অনুমতি পায়। ১৯৯৬ সালে প্রথম দেশে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের/চালুর অনুমতি দেওয়া হয়। মার্চ ২০২১ পর্যন্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ দাঁড়ায় ৩৭টি, সামরিক মেডিক্যাল কলেজÑ ০৬টি, বেসরকারি মেডিক্যালÑ ৩৮টি, সরকারি ডেন্টাল কলেজÑ ০১টি [ডেন্টাল ইউনিটÑ৮টি], সরকারি হোমিও কলেজÑ০১টি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কলেজÑ ০১টি। বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত সর্বাধিক সরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত/অনুমতি পেয়েছে। ২০২০Ñ২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজসমূহে এমবিবিএস ভর্তির আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রায় ৩২১২টি নির্ধারিত হয়েছে [১৯ নভেম্বর ২০১৯ সালে ২৮২টি আসন বৃদ্ধি করা হয়]। অন্যদিকে বেসরকারি মেডিক্যাল ৬,২৮১ জনের আসন রয়েছে। বিজ্ঞজনের মতে দেশের জনসংখ্যা এবং ছাত্র অনুপাতে এই সংখ্যা সীমিত। তবে বিপুল সংখ্যক মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২১ পর্যন্ত মেডিক্যাল বাংলাদেশে ০৪টি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে [সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ আরম্ভ হয়েছে]। এক হিসেবে দেখা যায় যে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ সমূহে তীব্র শিক্ষক সংকট রয়েছে, বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষার অবস্থায় শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। ২০১৭ সালে সরকারি কলেজে ৬৩ ভাগ শিক্ষক সংকট ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে চিকিৎসার উন্নতিও লক্ষণীয় [যদিও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নয়]। এখন জেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত ডাক্তার রয়েছেন।
দেশে সেবামূলক শিক্ষার অন্যতম নার্সিং ইনস্টিটিউটের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ২০১৯ পর্যন্ত ৯৮টি নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। তার মধ্যে সরকারিÑ৪৩টি, স্বায়ত্ব শাসিতÑ০১, বেসরকারিÑ৫৪ টি। নার্সিং শিক্ষার উন্নত হয়েছে। চার বছরমেয়াদি ব্যাচেলর অব নাসিং এবং তিন বছর ব্যাপি ডিপ্লমা ইন নার্সিং কোর্স চলছে।
তথ্য-প্রযুক্তি ও কম্পিউটার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: প্রায় নব্বইয়ের দশকে উচ্চশিক্ষার দ্বারে কম্পিউটার শিক্ষার অভ্যুদ্বয় ঘটে। বিষয়টি ক্রমে অর্থকরি পড়াশোনা হিসেবে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মফস্বলে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়ে যায়। শিক্ষানীতি ২০১০ সাল থেকে দেশে বিজ্ঞান, কারিগরি ও তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষায় জোর দিয়েছেন ফলে ২০১৮ সাল থেকে দেশের সকল ভর্তি পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষার ও ফলাফল প্রকাশের যাবতীয় কাজ কম্পিউটার ও অন-লাইনে চলছে। প্রতিটি শিক্ষা অফিসে অনলাইনভিত্তিক কাজে জন্য কম্পিউটার পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়।
২০১০ থেকে ব্যাপকভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল, মাদ্রাসা এবং কলেজ শিক্ষকদের পর্যায় ক্রমে কম্পিউটার ট্রেনিং দেওয়া আরম্ভ হয়। কম্পিউটার সম্পর্কে প্রাথমিক শ্রেণি থেকে ধারণা দেওয়া হচ্ছে এবং হাই স্কুলের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বেসকারি কম্পিউটার কলেজ কিছু চালু রয়েছে এবং বিশ^বিদ্যালয়ে উচ্চতর কম্পিউটার অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। মূলত কম্পিউটার শিক্ষা যুগের পরিবর্তন সূচনা করে দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক কম্পিউটার শিক্ষার চেয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম শিক্ষা নেওয়া এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের ডিজিটাল ক্লাসের অওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২০১৩ সালের ৯ মে ‘শিক্ষক বাতায়ন’ নামক পোর্টাল চালু করা হয়েছে। এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২১-এর মধ্যে সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের ডিজিটাল ক্লাসের করতে উৎসাহ করতে ‘শিক্ষক বাতায়ন’-এ ৯ লক্ষ শিক্ষককে সদস্য করানোর নির্দেশ/উপদেশ দিয়েছিলেন। বর্তমানে প্রায় ৫লক্ষ শিক্ষক ‘শিক্ষক বাতায়নে’ নিবন্ধিত হয়েছেন। অন্যদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘এটুআই’ প্রজেক্টের অধীন ‘মুক্তপাঠ’ নামে আরেকটি পোর্টাল চালু হয়েছে। এর সদস্য সংখ্যা ১১০৫০১৭, মোট কোর্স ১৯৮ এবং ২০২১ সালে চলমান ৮৯টি। দেশের প্রত্যেক স্তরের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারি ও জনগণকে [বিভিন্ন পেশা শেখার] ডিজিটালাইজ শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা/ বিভিন্ন পেশা শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করেছে। ‘মুক্তপাঠ’ দিনদিন জনপ্রিয় পোর্টাল হচ্ছে। পাঠদান আকর্ষণীয় করার জন্য এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রায় ৫৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়ার জন্য যাবতীয় উপকরণ প্রদান করেছেন।
নারী শিক্ষা: আমাদের পশ্চাৎপদ সমাজে নারীশিক্ষা আশানুরূপ ছিল না। আবার মুসলিম সমাজের রক্ষণশীলতা স্মর্তব্য। স্মরণ করা যায় যে, সিলেট মহিলা কলেজ ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং ১৯৪৫ [১ ডিসেম্বর] সালের দিকে আসাম সরকার অধিগ্রহণও করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান আমলের শুরুতে সিলেটের-ই একজন মন্ত্রী মনে করেছিলেন যে, মুসলিম মেয়েদের প্রয়োজন নাই। পরে সে কলেজটি বেসরকারি হয়ে যায়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করেনি। ১৯৭২-৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মেয়েদের সংখ্যা ছিল ৩,৩৫৫ জন [অধ্যাপিকা ৪১জন]। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল ২৭ জন মেয়ে শিক্ষার্থী। ১৯৭২-৭৩ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে [পরে বুয়েট] ছাত্র ছিল ৩১ জন। তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন ১৬৯ জনÑ তার মধ্যে অধ্যাপিকা ছিলেন মাত্র ৪ জন। ১৯৭১ সালে মেডিক্যাল কলেজগুলোতে [৯টি] অধ্যয়নরত [সকলবর্ষের] শিক্ষার্থীণীর সংখ্যা ছিল ৬৩০ জন। দেশ স্বাধীনতার আগে অর্থাৎ ১৯৭০-৭১ সালে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২৮.৪% ছিল মেয়েরা। স্বাধীনতার পর আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে মন্থর গতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখনো সমাজে ধর্মান্ধতা, মেয়েদের নিরাপত্তা, অসচেতনতা, বাল্য-বিবাহ, দরিদ্র অবস্থা খুব সক্রিয় ছিল। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা কমিশন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং অন্তত প্রাথমিক স্কুলে ৬০ ভাগ শিক্ষিকা নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। ১৯৯০ সালের জমতিয়েন সম্মেলন [সবার জন্য শিক্ষা] ও পরে ১৯৯৫ সালে বেইজিং আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের প্রভাব পড়েছিল বাংলদেশে।
নব্বই দশকের আগে নারী শিক্ষার হার ছিল চোখে পড়ার মতো। আবার মেয়েদের ড্রপ আউট বা ঝরে পড়ার হার ছিল বেশি। চরাঞ্চল, চা-বাগান এবং প্রান্তিক সমাজ, মৎসজীবী, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার দ্বার ছিল প্রায় বন্ধ। সরকারি, বেসরকারি এবং এনজিওদের নানামুখি পদক্ষেপের ফলে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে কয়েকগুণ। এনজিওদের কার্যক্রমে নারীর ক্ষমতায়ণ বাড়ে। তারা মূলধারার উৎপাদনকাজেও যুক্ত হতে থাকেন। বিশেষত নব্বই দশকে প্রাইমারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে নারী প্রতিনিধি রাখা, মা সমাবেশ চালু করা। এবং ছাত্রী বৃত্তি প্রদান প্রভৃতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিইডিপিÑ২ ও পিইডিপিÑ৩ বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণ মেয়েদের নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করে দেয়। ১৯৯৯ সালে বেনবেইসের হিসেব মতে বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রী সংখ্যা আশানুরূপ অবস্থায় দাঁড়ায়। উচ্চপর্যায়ে নারী শিক্ষার অগ্রগতি হয়। তখন সকল প্রকার প্রাইমারি স্কুলে [১৯৯৯] শিশুদের সংখ্যা ছিল ১,৭৬,২১,৭৩১ জন। তার ভেতরে ভর্তিকৃত ছাত্রী সংখ্যা ৮৫, ৬৫,৭১২ জন। মাধ্যমিক স্কুলে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৬৬,৮১,২১২ জন। তার মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ৩৫,৪২,১০৫ জন। অর্থাৎ প্রায় ৫৩%। সেবছর বুয়েটে ৪,০০১ জন ছাত্রের মধ্যে ছাত্রী ছিল ৫৪৩ জন। তেমনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩৭৭ জন ছাত্রের মধ্যে ছাত্রী ৩৫৮ জন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল ৭৫৫ জন ছাত্রী [ছাত্রÑ৪৬৭৬ জন]। বাংলাদেশ ০৩টি সরকারি মহিলা পলিটেকনিক্যাল কলেজ রয়েছে [ঢাকাÑ০১, খুরনাÑ০১, চট্টগ্রামÑ০১ টি]
মাধ্যমিক পর্যায়টা মেয়েদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই স্তরে অনেক ঝরে পড়ে। এই অবস্থা দূর করার জন্য মাধ্যমিকে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু, বেতন রহিতকরণ এবং ফিমেইল এডুকেশন প্রজেক্টের আওতায় শিক্ষিকা নিয়োগের ফলে মেয়েদের স্কুলমুখি প্রবণতা বাড়ে। পরে বেসরকারি ‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগ নীতিমালা’ নিশ্চিত নিশ্চিতকরণে অভিভাবদের মনে আগ্রহ বাড়ে [২০১২ সালে নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসায় শহরাঞ্চলে শতকরা ৪০ জন এবং গ্রামাঞ্চলে শতকরা ২০জন শিক্ষিকা নিয়োগের নতুন নীতিমালা করা হয়]। বেসরকারী স্কুল কলেজে নারী শরীরচর্চার নিয়োগের জন্য সরকার পরিপত্র জারি করেছেন। বর্তমানে অর্থাৎ ২০২১ সালের বেনবেইসের তথ্য মতে নি¤œ প্রান্তের শিক্ষায় মেয়েদের সংখ্যা বেড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায়Ñ সরকারি প্রতিষ্ঠানÑ৬৫,৬২০ টি, ছাত্র সংখ্যা: ১,৪১,০০,৪৪৫ জন। তার মধ্যে বালিকা: ৭২,৬১,৪৩৬ জন। অর্থাৎ মেয়ে ৫১.৫০%। বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের [কিন্ডারগার্ডেন সহ] সংখ্যাÑ ৬৩,৬৩৪টি, ছাত্র সংখ্যা: ৬০২১৮৯২ জন। তার মধ্যে বালিকা: ৩০,১৭,৪০৬ জন, অর্থাৎ ৫০.১১% মেয়ে [মোট শিশু : ২,০১২,২,৩৩৭ জন]। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে [সরকারি- বেসরকারি মিলে] ৫০.৬৬% মেয়ে শিশু রয়েছে। তদ্রুপ মাধ্যমিকে [সরকারি বেসরকারি] রয়েছে ৫৪.৪১% মেয়ে। কলেজ পর্যায় থেকে মেয়েদের সংখ্যা কমে যাচ্ছেÑ [সরকারিÑ৬৫১টি ও বেসরকারি কলেজÑ৩৯০০টি মিলে] ৪৮.৪৩% মেয়ে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে [সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়Ñ ৪৫টি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়Ñ১০৩ টি] অধ্যয়নরত মোটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬.২৩% নারী।
অন্ধ-বধির, প্রতিন্ধী ও অটিজম শিশুর শিক্ষা: আগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং বধির শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। বিষয়টা দেখা হয়েছে অভিশাপ হিসেবে। বড় অবহেলায় চলেছিল এই সমস্ত মানব শিশুদের যাপিত জীবন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রথম দৃষ্টিহীনদের জন্য শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণে উদ্যোগ নেয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন দৃষ্টিহীন শিশুদের জন্য মফস্বল অঞ্চলের ৪৭টি মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে সমন্বিত শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়। ২০০০ সালের দিকে ৬৪টি স্কুলে এই কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র বৃদ্ধি ঘটে। ২০০৩ সালে বিশ্বব্যাংক জরিপে দেশে ৩৫ লক্ষ প্রতিবন্ধী শিশু ছিল [২০০১৩ সালে ৪৫ লাখের মতো ধরা হয়েছে] ২০১৩ সালে দেশে ২২ থেকে ২৫ হাজার শ্রবণ, দৃষ্টি ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু পড়াশোনার সুযোগ পায়Ñ যা এই ধরণের শিশুর শতকরা প্রায় ১৪%। তবে হিসাব মতে ২০% শিশু সাধারণ স্কুল ও বিশেষায়িত স্কুলে অভিযোজন করতে পারে।
সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রতিবন্ধিকতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতমালাÑ২০০৯’ প্রণয়ন করেছে। ফলে বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়। তখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৫৬টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শতভাগ বেতনের দায়ভার গ্রহণ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ৪৮টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল [সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত], ০৭টি প্রতিবন্ধী ‘ইনক্লুসিভ বিদ্যালয়’ [প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন পরিচালিত] ও প্রয়াস পরিচালিত ০১টি শিশু বিদ্যালয়ের পাশাাপাশি বেসরকারি ও এনজিও এবং ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিবন্ধীসহ অটিজম স্কুল চলছে। ‘ডিজেবল’ শিশুদের শিক্ষার জন্য ‘সেন্টার ফর ডিজেবল ইন ডেভেলপমেন্ট’, সহ অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সরকার প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য শিক্ষাভাতা চালু করেছে। বিশেষত দৃষ্টিহীনদের শিক্ষার জন্য ১. ব্যাপটিস্ট সাংহা স্কুল ফর ব্লান্ড গার্লস ২. সলভেশন আর্মি’স ব্লাইন্ড বয়েজ হোম, ৩. বাংলাদেশ দৃষ্টিহীন ফাউন্ডেশন ৪. বাংলাদেশ ন্যাশন্যাল সোসাইট ফর দ্যা ব্লাইন্ড প্রভৃতি সংস্থা কাজ করছে।
‘মূখ ও বধির’দের জন্য শিক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে। সরকারিভাবে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে [২০০২ সাল পর্যন্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ১২টি বধির স্কুল ছিল] বধির স্কুল হোস্টেল রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সরকারি হাই স্কুলের পাশে কিছু প্রতিবন্ধী স্কুল দেখা যায় [যেমন মৌলভীবাজার]। ‘বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংঘ’ বধির শিক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। তেমনি শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য ১৯৮২ সালে একটি শ্রবণ প্রতিবন্ধী স্কুল চালু হয়েছিল। মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য ২০০২ সালে সরকারি ০১টি এবং এনজিওদের ৪৫টি স্কুল চালু ছিল। এই কাজে দিশারী, কল্যাণী, কমলকলি, চম্পকলি, কবরি, মাধবী ও চারুকর প্রভৃতি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে থাকে। এছাড়াও ‘ব্রেইল প্রেস ও কৃত্রিম অঙ্গ উৎপাদন কেন্দ্র’ পরোক্ষভাবে ডিজেবল শিশুদের চাহিদা মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি করছে। এই কাজে সরকার প্রাথমিকভাবে দুইশত কোটি টাকা দিয়েছিল।
‘জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ অনেক কাজ করে যাচ্ছেÑ তাদের সর্বশেষ উদ্যোগ হলো ‘স্পশাল স্কুল ফর অটিস্টক চিলড্রেন’ শিক্ষা কার্যক্রম। ২০১১ সালে ১৬ অক্টোবর ঢাকা মিরপুরে প্রথম স্কুল চালু হয়। বর্তমানে অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই স্কুলের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে সারাদেশে এই শিশুদের সংখ্যা সার্ভে করা হয়েছে। ২০১১ সালে ১১টি স্কুল দ্রুত চালু করা হয়। ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’-এর অধীন ১০৩ টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের একটি অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী কর্ণার স্থাপন করে অটিশজ মিমুদের পরমর্শ ও সেবাদান করা হচ্ছে।
অন্ধ ও বধিরদের জন্য পর্যায়ক্রমে সরকার যাতায়াত সুবিধা, আসন সংরক্ষণ এবং সর্বশেষ চাকরিতে কোটা বরাদ্ধ দিয়েছে। সরকার এই জাতীয় সকল শিশুর কল্যাণের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন যেমন ভাতার ব্যবস্থা করছে, তেমনি শিক্ষারও ব্যবস্থা ক্রমে সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিত কাজ করছে। আবার বেসরকারি এবং এনজিও পর্যায়ে এই শিক্ষা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
শিক্ষায় ইনোভেশন কার্যক্রম: শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় ধরণের গবেষণা কার্যক্রম চোখে না পড়লেও ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য নানাধরণের ইনোভেশন কার্যক্রম করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার রয়েছে এটুআই প্রজেক্টের অধীনে বহুমুখী ইনোভেশন প্রকল্প। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ইনোভেশন কাজে অর্থ বরাদ্দ ও তদারকি চলছে। শ্রেণি কার্যক্রমকে সহজ ও আনন্দ দায়ক করার জন্য, প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য নানা অ্যাপস তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষায় জাতীয় অগ্রগতি: নিরাবেগ দৃষ্টিতে দেখলে স্বাধীনতা যুদ্ধে যে স্পিড বা চেতনা নিয়ে জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলÑ পরের ধাপে সুস্থ দেশ ও সমাজ বিনির্মাণে ক্ষেত্রে সেই স্ফূরণের অমিত শক্তি ধরে রাখা যায়নি। ক্রমশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী চিন্তার গোলক ধাঁধা অবস্থা, প্রগতি বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার নানা মেরুকরণ, সামরিক সরকারের প্রাধান্য লাভ, আমলাতন্ত্রের জটিলতা, সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্মান্ধতা, দুর্নীতি, অবাস্তব ও সমন্বয়হীন প্রজেক্ট গ্রহণের প্রবণতা ইত্যাদি নানা কারণে দেশের অগ্রযাত্রা মন্থর গতিতে চলতে থাকে। অবশ্য সহ¯্রাব্দে উন্নয়নে [মিলিনিয়ার গোল] ধারাবাহিকতায় শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘ভিশন-২১’কে সামনে রেখে যে পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘উন্নয়নশীল’ স্বপ্ন-সড়ক তৈরি হয়েছেÑ তার মূলে একটি ‘শিক্ষা’ অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষার বিনিয়োগ অনেকটা অদৃশ্য থাকে। যে দেশে শিক্ষার বিনিয়োগ যত বেশিÑ সে দেশ দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। ১৯৯০ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৬১%। ২০১৯-এ সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭৩.৯% [তার মধ্যেÑ পুরুষ ৭৫.৭%, নারীÑ ৭২.১৫%]। তার ভেতরে শিক্ষা বাজেট কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করলে তার ফল আরো বেশি আসবে। আমরা দেখি যে, ২০১০-১১ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ১২.১১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল শিক্ষা খাতে। ২০১৯Ñ২০ বাজেটে ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় শিক্ষায় জন্য। কোবিডÑ১৯-এর সময় ২০২০Ñ২১ অর্থবছরে শিক্ষায় বাজেট ধরা হয় ১১.৬৯% অর্থাৎ শিক্ষার জন্য বরাদ্ধ হয় ৬৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। ২০১৯Ñ২০ অর্থ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ছিল ২৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২০Ñ২১ অর্থ বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় ধরা হয়Ñ ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। জাতীয় শিক্ষার অগ্রগতিতে ফলে নারী শিক্ষার হার ও নারীদের চাকরি গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে।
জাতীয়ভাবে প্রাথমিক স্তরে শিশু ঝরে পড়ার হার ক্রমশ কমছে। ২০০৫ সালে শিশু ঝরে পড়ার হার হার ছিল ২৬.২%। ২০১৪ সালে ঝরে পড়ার হার কিছু কমে হয় ২০.৯% [তখন ১ কোটি ৯৫ লক্ষ ৫২ হাজার ৯৭৯ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছিল, তার মধ্যে ঝরে পড়ে ৪০ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫৭০ জন]। প্রাথমিক শিক্ষাচক্রের [সমাপনের] হিসেবে ২০১৯ সালে ঝরে পড়ার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৬ শতাংশ [প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর বিবৃতি, ভোরের কাগজ, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। তবে কারো কারো মতে ঝরে পড়ার হার বর্তমানে ১৮.৮]। ২০২০ সালে দেখা যায় বিদ্যালয়ে ভর্তির [৬+] হার প্রায় ৯৮% হয়েছে এবং বিদ্যালয়ে ভর্তির বাইরে প্রায় ২% শিশুর থেকে যায়। শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করতে ও শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
শেষ কথা: স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছরে আমাদের শিক্ষার অগ্রগতি বা অর্জনের পথ খুব মসৃণ ছিল না। আমাদের প্রতিশ্রুতি ও দায়বোধ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠতে পারে। তবে আমাদের জনসংখ্যা, ভূ-খ-ের পরিসীমা দিকে খেয়াল করলে বুঝতে হবে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং অর্জন খুব কম নয়। তবে এখনো অতিদরিদ্র পরিবার, ভাসমান পরিবার, প্রান্তিক সমাজ, অনুন্নত সম্প্রদায়ের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। এখন দরকার শিক্ষার সাথে জড়িত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন, বাস্তব সম্মত প্রকল্প গ্রহণ এবং লক্ষ্যাভিমুখী মনিটরিং জোরদার করা। বিদ্যালয় সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ছাত্র অনুপাতে যোগ্য শিক্ষকের অভাব প্রকট। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের আবশ্যকতা রয়েছে [তার সাথে বাস্তবসম্মত পরিদর্শ জোরদার করা]। শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা সময়ের দাবী। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও পিটি আই ইন্সট্রাক্টরের প্রমোশন নানা জটিলতায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তেমনি সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর, সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের অবস্থা একই। বিভিন্ন প্রজেক্ট দফায়-দফায় আত্মীকরণের সময় সুস্পষ্ট সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় নানা জটিলতা দৃশম্যমান হচ্ছে। মূল সমস্যাগুলো দ্রুত শেষ করলে কাজের গতি বাড়বে। শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সূচনালগ্নে শিক্ষাকে গণমুখী করতে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সে পথ আরও নিবিড়ভাবে খোঁজা দরকার।
সূত্র:
০ মোহাম্মদ ইলিয়াস, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, নওবেলাল, ২৮ জানুয়ারি, ১৯৫৪; ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪; ১ মার্চ ১৯৫৪
০ নওবেলাল [পাকিস্তান আমল]ও জনশশক্তি [পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল] প্রত্রিকার ফাইল
০ পরিসংখ্যান বুলেটিন, ১৯৫০-৫১
০ অহহঁধষ জবঢ়ড়ৎঃ ঙহ ঞযব চৎড়মৎবংং ঙভ ঊফঁপধঃরড়হ ঙভ ইধহমষধফবংয: ভড়ৎ ঃযব ুবধৎ ১৯৭৩-৭৪, ইধহমষধফবংয এড়াবৎসবহঃ চৎবংং, উধপপধ, ১৯৭৮
০ বেনবেইস রিপোর্ট, ১৯৯৯
০ ঐরংঃড়ৎরধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ঝবপড়হফধৎু ঊফঁধঃরড়হ রহ ইধহমষধফবংয: ঈড়ষড়হরধষ চবৎরড়ফ ঃড় ২১ঃয ঈবহঃঁৎু, ঋধপঁষঃু ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ, টহরাবৎংরঃর কবনধহমংধধহ, গধষধুংরধ, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঊফঁপধঃরড়হ ঝঃঁফরবং, ৮ ঝবঢ়ঃধসনবৎ, ২০১৫
০ মাছুম বিল্লাহ, চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে কিছু কথা, কালে কণ্ঠ, অন লাইন, ১৩ আগস্ট, ২০১৮
০ সা’দত হুসাইন, ডাকার শিক্ষা সম্মেলন: স্বপ্ন ও প্রতাশার সুর [প্রবন্ধ], বাংলদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, হোসেন আরা শাহেদ সম্পাদিত, সূচীপত্র, ঢাকা ,২০০২
০ আবদুস সাত্তার মোল্লা, বিদ্যালয়ে ‘যোগ্যতা ভিত্তিক’ শিক্ষাক্রম? প্রথম আলো, অনলাইন, ২২ জানুয়ারি ২০১৪
০ খন্দকার সাখাওয়াত আলী, উপবৃত্তি: উপকারভোগীদের স্বার্থ ও পছন্নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, বণিক বার্তা, ২৬ মার্চ, ২০২১
০ প্রাথমিক শিক্ষার ৫ বছরের অর্জন [২০০৯Ñ২০১৩], প্রকাশক: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মনন্ত্রণালয়, ২০১৩
০ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ইসলামী ফাউন্ডেশন, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম।
০ মোশতাক আহমদ, বাজেটে একই বৃত্তে ঘুরছে শিক্ষার বরাদ্দের হার, প্রথম আলো, ১২ জুন ২০১৯
০ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ‘অপরিবর্তিত’, ডেইলি স্টার, জুন ২০২০
০ শিশির মোড়ল, মেডিক্যাল শিক্ষায় জোড়াতালি, প্রথম আলো, ০৫ জানুয়ারি ২০১৭
০ অজয় রায়, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬
০ বিভাষ বাড়ৈ, প্রাথমিক শিক্ষা চালু হবে ২০২১ সালে, দৈনিক শিক্ষা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
০ শিক্ষা কণ্ঠ, ৪ এপ্রিল ২০২১
০ রাশিদা বেগম, আমাদের শিক্ষানীতিতে নারী শিক্ষার অবস্থান [প্রবন্ধ], বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা [হোসনে আরা শাহেদ সম্পাদিত], সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০২
০ রেহেনা বেগম, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাব্যবস্থা [প্রবন্ধ], বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা [হোসনে আরা শাহেদ সম্পাদিত], সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০২
০ বেনবেইস রিপোর্টÑ২০১৯
০ মোশাররাফ হোসেন মাহবুবুর রহমান ভূঁয়া, একীভূত শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী শিশু, কালের কণ্ঠ, ৩ ডিসেম্বর, ২০০১৩
০ শাকিল আনোয়ার, স্বাধীনতার ৫০ বছর: যে বৈষম্যের কারণে বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, বিবিসি নিউজ বাংলা, লন্ডন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
০ হোসনে আরা শাহেদ [সম্পাদিত], বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, সূচিপত্র, ঢাকা, ২০০২
০ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইড ও তথ্য বাতায়ন এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বেনবেইজ
কৃতজ্ঞতা:
১. জসিম উদ্দিন মাসুদ, জেলা শিশু বিষক কর্তকর্তা, মৌলভীবাজার
২. কিশোলয় চক্রবর্তী, শিক্ষা অফিসার, প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগ, সিলেট
৩. জয়দীপ দে, অধ্যাপক, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা
৪. মহিদুর রহমান লেখক ও প্রকাশক, মৌলভীবাজার

ছড়িয়ে দিন