বাংলাদেশ কারারুদ্ধ হলে কেউ রেহাই পাবেন না

প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২১

বাংলাদেশ কারারুদ্ধ হলে কেউ রেহাই পাবেন না

গত ১৬ জুলাই ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারাবরণের বার্ষিকী। ২০০৭ সালের এই দিনে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বানোয়াট কিছু অভিযোগে গ্রেপ্তার করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে। এটি আজ স্পষ্ট যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নয় বরং আইন আর গণতন্ত্রকে স্থায়ী নির্বাসনে পাঠানোর মূল চক্রান্তটি অর্থাৎ মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই সাজানো হয়েছিল এই গ্রেফতার নাটক আর তারপর প্রায় বছরব্যাপী প্রহসনের বিচার। ২০০৮ সালে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের চাপে শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপরের ইতিহাস চলমান এবং আমাদের সবার জানা। এই ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেনিফিশিয়ারি আমরা প্রত্যেকে। কারণ এই ইতিহাস বাংলাদেশের এমনকি করোনা দিনেও ছন্দপতনহীন সামনে এগিয়ে চলার আর পাশাপাশি চক্রান্তকারীদের আঁস্তাকুড়ের দিকে অগস্ত্য যাত্রার।
এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ যার অনেকগুলোই ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ সংশ্লিষ্টদের লেখা। জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি নিশ্চিত করায় স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির দেশে-বিদেশে যে উদ্যোগ আর তার পেছনে বাংলাদেশের দুর্দিনে নেপথ্য কান্ডারি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার যে বলিষ্ঠ ভূমিকা তার কিছুটা উঠে এসেছে সম্প্রীতি বাংলাদেশের সুহৃদ ও সর্ব-ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলামের কলামে। শেখ রেহানার নির্দেশে সেদিন গঠন করা হয়েছিল ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’। অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের দেশে-দেশে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই সংগঠনের ব্যানারে সেদিন নেত্রীর মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক জনসমর্থন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
সিনিয়র সাংবাদিক এবং সম্প্রীতি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আলী হাবিব তার কলামে বর্ণনা করেছেন নেত্রীর গ্রেফতারের দেশজ প্রেক্ষাপটটি। তার লেখায় তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আইয়ুব জমানার পোডো আর এফডো অর্থাৎ পাবলিক অফিস ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার আর ইলেক্টেড বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার নামে কুখ্যাত দুটি সামরিক আইনের কথা। আইয়ুব খানের সময় এই দু’টি কালো আইন প্রয়োগ করে ৪২ জন বাঙালি রাজনীতিবিদকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ শেখ হাসিনার জন্য যে ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মুলাটি প্রণয়ন করা হয়েছিল তা আসলে আইয়ুবের এই জমানার শিষ্যরা তাদের আদর্শিক পিতার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল।
অন্যদিকে বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সম্প্রীতি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার তার কলামটিতে চমৎকার বিশ্লেষণে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনরা প্রকৃতপক্ষে পঁচাত্তরের অসমাপ্ত কাজটি শেষ করার শেষ চক্রান্তটি করেছিল মাত্র। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির শেষ বাতি ঘরটিও নিভিয়ে দেওয়া। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ঘটনাক্রমে দেশের বাইরে থাকায় যা সেদিন করতে পারেনি জিয়া-মোশতাক আর ফারুক-রশীদরা তাই করার লক্ষ্য ছিল ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন গংয়ের।
শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের খবরটি এসে পৌছালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় কিছু তরুণ চিকিৎসকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করেছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন আজকের অধ্যাপক, সেদিনকার তরুণ চিকিৎসক নেতা ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। সাথে ছিলাম আমি এবং আমার মতো হাতেগোনা আরও কিছু তরুণ চিকিৎসক। পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের আনাগোনায় মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পরামর্শে মিছিলকারীরা সেখান থেকে সরাসরি তার বাসায় চলে যায়।
এমনি পাহাড় প্রমাণ চক্রান্তের বিরুদ্ধে বিন্দু-বিন্দু করে গড়ে তোলা যে সিন্ধুসম প্রতিবাদ তারই ফলাফল আজ শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বে বিশ্বের রোল মডেল বাংলাদেশ। অথচ এই বিষয়টি আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই। আমরা কেন যেন মাঝে-সাঝে ধরেই নিই যে বাংলাদেশটা বরাবরই এমন ছিল। এমন উন্নয়নের জোয়ারেই ভাসছিলাম আমরা সেই কবে কোন জমানা থেকে! সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সে সময়ে ছিলেন সদ্য বিলাত ফেরত আইনজীবী। বিদ্যুৎ সংকট, ধসে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদের উত্থান, অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে বিরোধী দমন, নির্বিচারে গুম-হত্যা-ধর্ষণ আর সংখ্যালঘু নির্যাতন, মঙ্গাক্লিষ্ট উত্তরবঙ্গ আর কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া হাওয়া ভবনের দুর্নীতির সেই বাংলাদেশের লম্বা ফিরিস্তি আছে তার কলামটিতে। বাংলাদেশ আসলে খুব বেশিদিন আগেও এমনটা ছিল না।
বাংলাদেশ এমনটা হয়েছে অল্প ক’দিন হয় এবং তা শুধু ওই এক মহিয়সী নারীর হাতের ছোঁয়াতেই। একইভাবে টুঁটি চাপা ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রও। আজকে যারা গণতান্ত্রিক সুবাতাসের সুযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছেন কিংবা বিগড়ে দিতে চাইছেন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে, বিচারপতি মানিকের বয়ানে যে বাংলাদেশ আবারো সামনে উঠে এসেছে, তারা নিশ্চিত থাকতে পারেন এর কিয়দংশও যদি সেদিন তাদের মতো কেউ করতো, তাহলে তাদের দেহ থেকে ক’টি আঙ্গুল আর মুখ থেকে একমাত্র জিহ্বাটি খসিয়েই ছাড়তো সেদিনের সেই সরকারের সাঙ্গপাঙ্গরা।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বে কারামুক্ত বাংলাদেশে তাই আজ যারা সরকারের বিরোধিতাতে মেতেছেন কিংবা ব্যস্ত আছেন নিজের আখের গোছানোয় অথবা কোভিডের স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই ছুটছেন গরুর হাটে আর দিগ্¦িদিক তাদের একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ যদি আবারও কারারুদ্ধ হয়, রক্ষা যেহেতু পাবেন না কেউই, অতএব, ‘সাধু সাবধান’।

লেখকঃ অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
-ডিভিশনাল হেড, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

ছড়িয়ে দিন