বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা কেলেঙ্কারিতে দুই বিভাগের লোকজনই সব জানে

প্রকাশিত: ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা কেলেঙ্কারিতে দুই বিভাগের লোকজনই সব জানে

এসবিএন ডেস্কঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের খোয়া যাওয়া টাকা কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাংকের দু’টি বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসছে। সন্দেহভাজন জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এসব কর্মকর্তা সবকিছু জানেন বলে প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে রিজার্ভের টাকা চুরির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ বিভাগ সিআইডি। বৃহস্পতিবারও ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে তদন্ত দল সেখানে যায়।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আব্দুল্লাহেল বাকীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়। দুপুর পর্যন্ত তারা ডিলিং রুম শাখা ও আইটি শাখার বিভিন্ন কম্পিউটার থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছিল।

এগুলো থেকে সিডি ও পেন ড্রাইভে তথ্য সংগ্রহ করেন কর্মকর্তারা। দুটি বিভাগের কম্পিউটার যেসব কর্মকর্তারা প্রতিদিন অপারেটর করেন, তাদের কাছ থেকেও তথ্য জানতে চাওয়া হয়।

এগুলো কীভাবে বা সর্বশেষ কত দিন আগে পরিচালিত হয়েছে তাও জানার চেষ্টা করেন তারা। তথ্য সংগ্রহ করার সময় প্রায় এক মাস আগের তথ্যও নেওয়া হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

সূত্র বলছে, ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গত বছরের অক্টোবরেই সুইফট কম্পিউটারের তথ্য পাচার হয়। লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ১টি সফটওয়্যার ইনস্টল (সংযোজন) করা হয়।

যারা সফটওয়্যার সংযোজন করেছেন তাদের নামও বেরিয়ে এসেছে। এই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন কিছু তথ্য পাচার হয়। এই সিস্টেমের মাধ্যমে চেক জমা দিলে ১ মিনিটের মধ্যে অ্যাকাউন্টে টাকা ক্রেডিট হয়।

তবে রিজার্ভ সংরক্ষণের জন্য যে কম্পিউটারের মাধ্যমে সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) লেনদেন হতো, সেই কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগও ছিল না।

সুইফট পরিচালনার জন্য বেলজিয়ামে সুইফটের ওই প্রতিষ্ঠানের মূল সার্ভারের সঙ্গে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক টেকনোলজি ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের সংযোগ ছিল। কিন্তু সফটওয়্যার ইনস্টল করার পর সুইফটের কম্পিউটারেও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়।

এ পদ্ধতি চালুর সময় বিভিন্ন পর্যায়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন। সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে সুইফট শাখার তথ্য খোয়া গেছে। ডিজিটাল আপগ্রেডেশনের কাজ করেছেন অনেকেই। তারা কী কী তথ্য নিয়েছেন। কোন কোম্পানি এই সফটওয়্যার দিয়েছে। সফটওয়্যার ইনস্টল করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের কারা ছিল, তার সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা গেছে, ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন ব্যাংকেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তাদের কম্পিউটারেও তা দেখা গেছে। তবে তাদের কম্পিউটার থেকে যেসব তথ্য নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে ব্যাংকের মূল সার্ভারের হার্ডডিস্কের সংযোগ আছে।

এখন ওই ডিস্কের সিস্টেমের তথ্যের সঙ্গে প্রাপ্ত তথ্য বা ডেটা মেলানো হবে। এর পরই সন্দেহভাজনদের ব্যাপারে আরো নিশ্চিত হওয়া যাবে। ওই ডিস্ক ব্যাংকের লেনদেনের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে সব ধরনেরই তথ্য থাকে।

ইচ্ছা করলেই যে কেউ ডিস্কের তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন না। এ কারণে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে বলে সূত্রটি আশা করছে। এরপরই সন্দেহভাজন দুই বিভাগের ব্যক্তিদের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে বুধবার ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য জব্দ করা কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক পরীক্ষা করার অনুমতি দেন।

এর আগে সিআইডি আদালতে আবেদন করে। আর গত এক সপ্তাহ ব্যাংকের দুটি বিভাগ থেকে নেওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অনেককেই শনাক্ত করা হয়। তারই অংশ হিসেবে ব্যাংকের বেশ কয়েকজনকে মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে বলে জানা গেছে।

এদের ব্যাপারে এরপরই ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে। পরে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ পেলে মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় সে ক্ষেত্রে আরো ১০-১২ জন আসামির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একজন ডেপুটি গভর্নর সন্দেহভাজন এসব কর্মকর্তার তালিকার প্রথমেই রয়েছেন বলে সূত্রটি জানায়।

২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল হ্যাকাররা।

এ চেষ্টায় দুই ধাপে প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার লোপাট করলেও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার পাচারে ব্যর্থ হয় তারা। এতে আরো জানানো হয়, সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি করা অর্থ ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়।

এর মধ্যে ফিলিপাইনে অ্যাকাউন্টে নেওয়া ৮ কোটি ডলার ক্যাসিনোর মাধ্যমে হংকংয়ে পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনা প্রায় এক মাস চাপা দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ঘটনা জানাজানি হলে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

এরপরই নানা তথ্য এবং সন্দেহভাজনদের সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে হারানোর খবরটি গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে টের পেলেও সম্প্রতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আলোচনার মধ্যে চাপে থাকা গভর্নর ১৫ মার্চ পদত্যাগ করেন।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com