বাংলা কবিতার নতুন কন্ঠস্বর কবি মাশরুরা লাকী

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২২

বাংলা কবিতার নতুন কন্ঠস্বর কবি মাশরুরা লাকী

কামরুজ্জামান
একটি নতুন মিলেনিয়াম অতিক্রম করে আধুনিক বাংলা কবিতা যে তারুণ্যের কলকাকলীতে প্রবহমান কবি মাশরুরা লাকী তাদেরই অন্যতম।

অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম কাব্য প্রয়াস ‘ পচন ধরা বাঙলা পিন্ড ‘। বইটি প্রকাশের পরপরই আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে। নাম নিয়ে প্রারম্ভে আমার সামান্য অপছন্দ থাকলেও পরবর্তী সময়ে পাঠের মাধ্যমে তা দূরিভুত হয়। নতুন একটি কাব্য গ্রন্থকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করবো তা নিয়ে বিবিধ চিন্তা, প্রশ্নের সমাবেশ ঘটতেই পারে। বিখ্যাত জার্মান কবি, নাট্যকার,কাব্য সমালোচক ব্রেশট / ব্রেখট শিল্প বিচারের ক্ষেত্রে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শিল্প বিচারের জন্য অবশ্যই আমাদের নির্মোহ হয়ে উঠতে হবে। নিজেকে বিযুক্ত রেখে তবেই তা নিয়ে ভাবতে হবে, তা না হলে আমরা সৌন্দর্যের বাহ্যিক মোহে মুগ্ধ হয়ে যাবো। আর তার ফলে সৃষ্টির নিগুঢ় প্রাণ রস আহরণ থেকে বঞ্চিত থাকবো।
বিগত শতাব্দীর প্রথমার্ধের দিকে কিছু ইউরোপিয় কাব্য সমালোচক মনে করেন কবিতা বিচারের ক্ষেত্রে কবির জীবনকেও বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে। কেননা একজন কবি যে অভিজ্ঞতা ও জীবন যাপনের ভঙ্গির মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন তা-ই তার কবিতায় প্রকাশিত হয়ে থাকে নানা কৌশলে। ‘ পচন ধরা বাঙলা পিন্ড ‘ এর কবি মাশরুরা লাকী তার বাইরে কেউ নন। আমরা যারা তাকে ব্যক্তিগত ভাবে জানি, অত্যন্ত মার্জিত ব্যক্তিত্ব সম্পন্না, মৃদু মিষ্টভাষী, সদালাপী সর্বদা হাস্যজ্জ্বোল এক গৌড় মুখশ্রী।
আমরা অনেক সময় সব কিছু বাইরে থেকে দেখে সঠিক বিচারটি করতে পারিনা, ঠিক তেমনি ‘ বাঙলা পিন্ড ‘ এর অভ্যন্তরে প্রবেশ না করলে বুঝবার কোন উপায় নেই যে এত দ্রোহ, এত সত্য উচ্চারণ, এত নির্ভীক, এত মায়াময় বিগলিত কবি প্রাণ মাশরুরা লাকী।
‘ বাঙলা পিন্ড ‘ গ্রন্থটি সূচনা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণের মধ্য দিয়ে ‘ আমি স্বয়ং শেখ মুজিব’। শুধু তাই নয় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হয়েছে বইটি।
একজন তরুণ কবি যখন তার দেশমাতৃকার ভালোবাসায়, দেশের শ্রদ্ধার প্রাণ পুরুষকে অকৃত্রিম মমতায় স্মরণ করেন তখন তা সন্দেহাতীত ভাবে অসামান্য গুরুত্ব বহন করে।
কবি তার প্রথম কবিতায় উল্লেখ্য করেন…
‘ আমি স্বপ্নের ক্যানভাসে স্বপ্ন এঁকে বলছি
যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো
আঠারো কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা নাহ। ‘
তোমরা আমাকে বঙ্গবন্ধু বলেই ডাকতে পারো।’
( আমি,স্বয়ং শেখ মুজিব)
আমরা যদি এই পংক্তি গুলোকে একটু অনুধাবন করার চেষ্টা করি তবে দেখবো এক অন্য সৌন্দর্য। যখন বঙ্গবন্ধু তাঁর বিখ্যাত সাত’ই মার্চের ভাষণ প্রদান করেন তখন কিন্তু দেশের জনসংখ্যা সাত কোটি। কিন্তু কবি এখানে বলছেন আঠারো কোটি জনসাধারণের কথা, এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে বঙ্গবন্ধু আজো কবির চেতনায় স্বশ্রদ্ধ বহমান। কবি আরো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিলিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে চেতনায় উপস্থিত করেন –
‘ তোমরা আমাকে বঙ্গবন্ধু বলেই ডাকতে পার। ‘
তখন নতুন এই কবির প্রতি আমাদের স্বাভাবিক মনোযোগ আকর্ষণ করে অবলীলায়। একই কবিতায় কবি আবার বলছেন –
‘ পদ্মার কোলে পাল তোলা নায়ে ধীরে চলি অবিরাম,
কিনতেই হবে মায়ের আঁচল রক্তই বুঝি দাম।
তোমরা আমাকে এবার স্বাধীনতা নামে ডাকতে পারো।
( আমি, স্বয়ং মুজিব)
এখানে যে মায়ের আঁচল, এ আঁচল আমার দেশ চির হরিৎ বাংলাদেশ। কবি বঙ্গবন্ধুর চতনাকে ধারণ করে বলেন আমি তোমাদের বুকে শিখা অনির্বাণ দ্বীপ, আর এর মধ্য দিয়ে কবি হয়ে ওঠেন স্বয়ং শেখ মুজিব।
বয়ঃসন্ধি কালের সাথ সাথে মানুষের দেহ মনে চিন্তার জগতে যে লীলা-লাস্যের পরিবর্তন ঘটে তা বহমান প্রকৃতিরই অনিবার্য আকুতি। যৌবনের এই তাড়না, বিপরীত লিঙ্গের সাথে মিলিত হবার প্রগাঢ় বাসনাকেই প্রকাশ করেছেন কবি নানা অনুষঙ্গে। সৃষ্টি কুলে’র কেউ এই মোহ থেকে আলাদা কেউ নয়। ‘ মধুপোকা ‘ কবিতায় সেই মিলনের কথা কবি সাহসের সাথেই ব্যক্ত করেছেন কাব্য কুশলতায়।
‘ তিল ফুলে জমানো মধুতে লেপ্টে থাকে ওষ্ঠ আমার
তুই মধুপোকা হয়ে চুষে নিস তার সব টুকু রস
সঙ্গমের বসন্তে আমরা স্বয়ং প্রকৃতি। ‘
( মধুপোকা)
এই সমর্পণের ভেতর দিয়ে কবি যৌবনের স্বভাবকে প্রকাশ করেছেন কোনো রুপ আড়াল না রেখেই। আর পরিপূর্ণ সম্ভোগ আরামের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি হয়ে উঠবার অভিলাষ কবি স্থাপন করেছেন তিলফুলে জমানো মধু র আস্বাদ গ্রহণ পক্রিয়াতে। এখানে তিলফুলের প্রাচুর্যের প্রতি দৃষ্টিপাত প্রশংসার মাত্রা সংযোগ করে অনায়সে। বহুদিন পর এমন একটি ফুলের কথা কবি উল্লেখ করলেন যা আমাদের চমকে দেয়, গ্রামীন জীবনকে জীবন্ত করে তোলে মুহূর্তেই। কিংবা যদি বলি এমন একটি ফুলে কথা যে কবি হৃদয়ে স্হাপন করলেন। তাকেকি একবার ঘুরে দেখবেন না? দেহ কারাগার কবিতায় ও কবি একই বাসনা ব্যক্ত করেছেন।
‘ ঝড়ো বাতাসে আমার কেঁপে কেঁপে ওঠে তনুমন
বাহুতে বাহুতে সোহাগের ইচ্ছে, চাই আজ কারো তীব্র আলিঙ্গন। ‘
( দেহ কারাগার)
কবি মাশরুরা লাকী তার কাব্য অভিযাত্রায় নিজেকে বিস্তৃত করেছেন নানাবিধ বিষয় বৈচিত্র্যে। শুধু কল্পনার ফানুস উড়িয়ে কল্পরাজ্যের স্বপ্নে ভেসে বেড়াননি।বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য তুলে ধরতে কবি তার সকল ইন্দ্রিয় সজাগ রেখেছেন অনুপুঙ্খ নিপুনতায়। মোয়না কবিতায় যে চরিত্রটির মধ্য দিয়ে কবি সুখের বনফুল এনে দিতে চান সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তার সূচনায় –
‘ প্রকৃতির নির্বাসিত বলয়ে বেড়ে ওঠা মহপাপী ভেনাস আমি
এন্টার্কটিকার বরফে আটকে পড়া ছোট্ট একটি ঢেউ মাত্র। ‘
( মোয়ানা)
এখানে আটকে পড়া ছোট্ট একটি ঢেউ এর মধ্যে দিয়ে কি বিশাল আর্তিকে প্রকাশ করেছেন কবি তা বিবিধ অর্থেই প্রশংসার দাবী রাখে। একই কবিতায় কবি আরো উল্লেখ করেন –
‘ডিজনি চরিত্রগুলো একাকী বসন্তে রূপ পাল্টায়
জীবন মানে, নেহায়েত পাতলা একটুকরো বরফ’
( মোয়ানা)
একটুকরো বরফের সাথে জীবনের তুলনা যে কত নির্মম সত্য এবং কত মৌলিক তা যখন একজন নতুন কবি উৎকীর্ণ করেন তখন আমাদের তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই হয়।
কবিতার বিষয় বস্তু নির্বাচন, কবিতার ভাব সম্পদের গভীরতা, শব্দ ব্যবহার, উপমা, নির্মাণ শৈলী একজন কবি কে বিশিষ্টতা প্রদান করে। তাই উৎকৃষ্ট কবিতা যাপিত জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কবি মাশরুরা লাকী সেই প্রতিচ্ছবি চিত্রিত করেছেন ‘ মঙ্গা ‘ কবিতায়।
‘ আমার বাবা তোমাদেরই একজন
গণ্যমান্য সম্মানীয় সৎ এবং দরিদ্র ইশকুল মাস্টার
অভাব কামড় বসিয়ে দিয়েছিল আমার মায়ের আটপৌরে
জীবন, নিতম্ব স্তনবৃন্তে জুড়ে -‘
( মঙ্গা )
কবি নিঃশঙ্ক চিত্তে অবলীলায় ব্যক্ত করেছেন ব্যক্তিগত জীবনের চালচিত্র, এখানে কোন ভনিতার আশ্রয় তিনি নেননি। এই কবিতার শেষের স্তবকে আমরা দেখি অন্য চিত্র , যে জোড়া শালিকের খেজুর পাটিতে ছিলো সুখের সংসার কিশোরীর
নরম ঠোঁট লেপ্টে ছিলো পানের রসে। এই চিত্রকল্প গুলোই এখানে কবি মাশরুরা লাকীকে দান করেছে ভিন্ন এক সনাক্ত চিহ্ন যা অন্য কারো সাথে মিলেনা।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি কোনো বিজ্ঞ সমালোচক নই, আমি সৌন্দর্য পিয়াসী একজন কবিতা প্রেমী মানুষ মাত্র। তুল্যমূল্য বিচার বিশ্লেষণ আমার কোনো অভিলাষও নয়। আমি শুধু আমার বিবেচনায় সৌন্দর্যের দিকটিই প্রকাশ করতে আগ্রহী। প্রথম পদক্ষেপে কবি যে স্বকীয়তা, শব্দ ব্যবহার, উপমার নতুনত্ব প্রকাশ করতে পারঙ্গম হয়েছেন তাকে শতফুলের সম্ভাষণে স্বাগত জানাই।
হরিজন বউ কবিতায় কবি যে অসামান্য সত্য তুলে ধরেছেন অসীম সাহসের মধ্য দিয়ে তা শংসা বচন এর দাবী রাখে।
‘ সভ্যতার আড়ালে ফিঙে বউ
রাতভর খালি পেটে লাঙ্গল চাষ
কেউ কেউ তরকারির দামে স্বাধীনতা ফেরি করে
আর গণতন্ত্রের হাট বসে সেই বউ মাগীর নিতম্বে।’
( হরিজন বউ)
আমাদের গ্রামীণ প্রবাদ আছে যে ‘ গরীবের সুন্দরী বউ সকলেরই ভাবী হয় ‘ এর মধ্যে যে এক নির্মম সত্য কথা বলা হয়েছে তা সকলেরই জানা। তারই প্রতিধ্বনি পরিলক্ষিত হয়েছে মাশরুরা লাকীর হরিজন বউ কবিতার শেষ চরণটির মধ্যে।
‘ পচনধরা বাঙলা পিন্ড ‘ গ্রন্থটিতে স্থান লাভ করেছে বিভিন্ন স্বাদের ছেচল্লিশটি কবিতা। বোধ করি একথা বলা অনুচিত হবেনা, গ্রন্থ ভুক্ত প্রতিটি কবিতাই কাব্য সুষমায় অভিসিক্ত। বইটি নিবিড় পাঠের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আমার তাই মনে হয়েছে। কবিতা চর্চা এক অন্তহীন যাত্রা , এবং সর্বঅর্থেই নিষ্ঠুর , কোনো আবেগ অর্থ বিত্ত তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। কবিতা টিকে থাকে তার বাণীর প্রাখরতায়। আমার বিশ্বাস কবি মাশরুরা লাকী তার নিবিষ্ট চর্চার মধ্য দিয়ে আগামী দিন গুলোতে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন।
হাতির ঝিল রামপুরা ঢাকা
© কামরুজ্জামান।
২ রা জুলাই ২০২২।