বাংলা বর্ষবরণ বিরোধিতা ও জবাব

প্রকাশিত: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

বাংলা বর্ষবরণ বিরোধিতা  ও জবাব

সৌমিত্র দেব

বাংলা বর্ষবরণ বাঙালি জাতিসত্তার এক আনন্দ উল্লাস । এই আনন্দ উৎসবের চরিত্র অসাম্প্রদায়িক । ধর্ম এবং সম্প্রদায় নির্বিশেষে এই উৎসবে সকলের অংশ গ্রহণ থাকে । তবু এই উৎসবের বিরোধিতা অনেকে বুঝে এবং না বুঝে করে থাকেন । বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাদের কথায় কোন যুক্তি থাকে না । সম্প্রতি অগ্রজপ্রতিম মুনিম সিদ্দিকী এ বিষয়ে ফেসবুকে কিছু যুক্তির অবতারণা করেছেন । আসুন ,তার সে সব যুক্তির নিরিখে আমরা বাস্তবতা খতিয়ে দেখি । তিনি লিখেছেন , “যারা ধর্মকে সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা জ্ঞান করেন, ধর্ম চিন্তাকে জ্ঞানের অপরিপক্কতা হিসাবে মূল্যায়ন করেন, যারা বাঙালিয়ানাকে ধর্মের উপর স্থাপন করতে চান, যারা ক্ষুদ্র আঞ্চলিকতাকে মানবিকতা জ্ঞান করেন, তাদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা ল্যাটিন আমেরিকান প্যাগানদের কার্নিভাল অনুকরণে যেভাবে আমাদের বাঙালির একটি বড় আনন্দ উৎসব সাজিয়েছেন, তা যেভাবে উদযাপন করছেন, সেভাবে না করে এই দেশের সংখ্যালঘু মানুষের দৈনন্দিন আচার প্রথা দিয়ে সাজালে কেমন লাগবে?”
তার জবাবে আমরা বলবো, মোটেও ভালো লাগবে না । কারণ আমরা উৎসবকে উৎসব হিসেবেই দেখতে চাই । এই দেশের সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু মানুষের দৈনন্দিন আচার প্রথা দিয়ে সাজালে তা আর যাই হোক উৎসব হবে না ।

মুনিম ভাই লিখেছেন , “যদি পহেলা বৈশাখ শুরু হয়, ফজরের আজান ধ্বনির মধ্যে দিয়ে? সম্মিলিত ভাবে নামাজের পর প্রভাত ফেরি শুরু করি, সেই প্রভাত ফেরিতে
টোটাম হিসাবে ব্যবহার করি মসজিদের ছবি, কোরানের আয়াত, চাঁদ আর তারা ?

রাজি হবেন তো দাদারা,কমরেডগণ, ধর্মকর্ম করেননা সেসব মানবতাবাদীরা এভাবে হৃদয়কে প্রসারিত করতে?

কেমন লাগবে আপনাদের মনে ভায়েরা?

আপনারা মোট জনসংখ্যার দশভাগের একভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ধর্মীয় আচার প্রথাকে ইন্সটল করার প্রস্তাব শুনে যদি আপনাদেরকে ব্যথিত করে, তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপনিষদের আচার প্রথা দিয়ে সাজানো এইযে অধুনা ১লা বৈশাখ উৎসব আয়োজন করে যাচ্ছেন, তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনে যে ব্যথা লাগছে তা কেন অনুভব করতে পারছেননা? ”
আমাদের জবাব হলো , প্রিয় মুনিম ভাই বৈশাখ উৎসবের আয়োজন কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ করছে না । সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে এই আয়োজন হচ্ছে । উপনিষদের আচার প্রথা দিয়ে সাজানোর তো প্রশ্নই ওঠে না । আমরা যে এ কথা বলবো তা তিনি ও জানেন । তাই এর পরেই তিনি লিখেছেন ,

“হয়তো বলবেন কোথায় উপনিষদের আচার ব্যবহার বৈশাখী উৎসবে? এগুলো তো স্রেফ ধর্মনিরপেক্ষ আয়োজন। ধর্মের সাথে কোন তালুক নেই।

আসুন দেখিতো কিভাবে আপনারা আপনাদের উপনিষদ দিয়ে কিভাবে সাজিয়েছেন ১লা বৈশাখকে?

বৈশাখের মৌলিক সাতটি প্রোগ্রামকে সামনে নিয়ে আলোচনা করে দেখি,

১. মঙ্গল শোভাযাত্রা;

২. ছায়ানটের বৈশাখীবরণ,

৩. লাল সাদা পোষাকের মহত্ত্ব;

৪. অবাধ মেলামেশা;

৫.উল্কি আঁকাসহ নানা অনৈসলামিক কাজ!

৬. অপচয়;

৭. গরিব জনগোষ্ঠীর সাথে উপহাস।

মুসলিমদের ধর্ম বিশ্বাস আপনাদের মত “যত মত তত পথে” বিশ্বাসী নয়। ধর্ম মানুষের আবিষ্কার তাও বিশ্বাস করেনা। মুসলিমদের ধর্ম বিশ্বাস কোরান ভিত্তিক। ইসলামের মৌলিকত্ব হচ্ছে, এক আল্লাহর ইবাদত। কেউ সেনাবাহিনীতে চাকুরী নিলে যেমন সেনাবাহিনীর রুলসের বাইরে যেতে পারেনা, তেমন করে কেউ নিজকে ইসলামে অন্তর্ভুক্তি করে নিলে সে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করতে পারেনা।

এটি হচ্ছে মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস। ঈমান আর শিরিক মানে অংশিবাদীতা একত্রে চলতে পারেনা, ঈমানের হানি ঘটবে এমন পারিবারিক সামাজিক, আঞ্চলিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক কোন কিছুকে মুসলিমরা হৃদয় প্রসারিত করে গ্রহণ করতে পারিনা।”
এইবার বোঝা গেল আমার মুনিম ভাইয়ের উপনিষদ সম্পর্কে জ্ঞানের বড় অভাব । বেদ এবং উপনিষদ হলো একেশ্বরবাদী ধর্মগ্রন্থ । সেখানে পুজা অরচনার কোন উল্লেখ নেই । তিনি যে ৭ টি প্রোগ্রামের উল্লেখ করেছেন তার একটি ও উপনিষদের আচার ব্যবহার নয় । হয় তো তিনি নিজেও সেটা বুঝে নিয়ে উপনিষদ বাদ দিয়ে একটু পরেই বলেছেন ,

“এবার আসুন, দেখুন আপনারা কোথায় কোথায় বৈশাখী আয়োজনকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক করে রেখেছেন।

(ক) আচ্ছা বলুন তো এই যে লাল পাড়ের সাদা শাড়ী, লাল টিপ এর সাথে সংখ্যাগুরু বাঙালীর কী সম্পর্ক?

এটা তো হিন্দু বিবাহিত নারীদের সাদা শাখা লাল সিঁদুরের বর্ণ!

তাহলে কি কৌশলে আমাদেরকে শাখাসিঁদুরে অভ্যস্ত করা হচ্ছে?

(খ) রমনা বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীরা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে প্রস্তুত, প্রস্তুত শ্রোতারা, অপেক্ষায় থাকেন কেবল সূর্য উঠার, সূর্য উঠার অপেক্ষায় মুসলিম থাকতে পারে?

এটা তো সূর্য পুজারীদের কাজ! মুসলিমরা তো সূর্য সূর্য পুজারী নয় বরং সূর্য উঠলে ইবাদত বন্ধ করে দেয়।

কারণ নবীজী সা. সূর্য উঠা আর ডুবার সময় নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন, যেনো আমাদের ইবাদত সূর্যপূজারীদের সাথে মিলে না যায়। এখন কি বাঙালিত্ব বজায় রাখার জন্য সেই মুসলিমরা প্রত্যুষে ফজরের নামাজ বাদ দিয়ে সূর্য উঠার অপেক্ষায় থাকবে?

(গ) সূর্য উঠার সাথে সাথেই রবি ঠাকুরের প্রার্থণামূলক সঙ্গীত “এসো হে বৈশাখ এসো……” দিয়ে শুরু করেন বর্ষবরণ।

ঠাকুরের এই প্রার্থনা কি এক আল্লাহর কাছে? না এই প্রার্থনা আল্লাহ কাছে নয়, বৈশাখ মাসের কাছে, বিশাখা নক্ষত্রের কাছে, ঠাকুর তো সে বিশাখা দেবতার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছেন।”
এর অর্থ -রবি ঠাকুরের নাম দেখেই তিনি তাকে হিন্দু ভেবেছেন । অথচ রবীন্দ্র নাথ মনে প্রাণে ছিলেন একেশ্বরবাদী ।ব্রাম্ম ধর্মাবলম্বী । আর একজন ব্রাম্মধর্মাবলম্বী গিরিশ চন্দ্র সেন বাংলা ভাষায় প্রথম কোরান অনুবাদ করেন । এরপর মুনিম সিদ্দিকী লিখেছেন ,

“মুসলিমরা তো একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আর কারো কাছে করতে পারেনা, তাহলে মুসলিমরা বৈশাখীর কাছে কিভাবে প্রার্থনা করবে? বৈশাখীর কাছে তো মুশরিকরা প্রার্থনা করে থাকেন।

এই গানটি ইসলামের স্পিরিটের বিরুদ্ধে । শিরক স্পষ্ট। কারণ গানের একটি কলি হলো “অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা” অর্থাৎ আগুন গোসল দিয়ে গোটা জগত পবিত্র হোক।

আগুন পবিত্র করার ক্ষমতা রাখে এ বিশ্বাস হিন্দুদের, এই বিশ্বাস মুসলিমদের নয়। আর তাই আপনারা আপনাদের মৃত ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর আগুনে পুড়িয়ে পবিত্র করেন। মুসলিম কি সে ভাবে বিশ্বাস করতে পারবে ?

(ঘ) আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার আগে দেখেছি “রামযাত্রা” “কেষ্ট যাত্রা” যা হিন্দুদের আচার প্রথা ছিলো।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আল্লাহর সাথে অংশিবাদ হয় মঙল শোভাযাত্রায়। আচ্ছা নববর্ষ তো আনন্দ উৎসব, তাহলে এই শোভাযাত্রাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম করন না করে আনন্দ শোভাযাত্রা করলেননা কেন?

এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করা হয় সকল অমঙ্গল দূর করার জন্য । মঙ্গল অমঙ্গল করার ক্ষমতা কার ? এখানে প্রার্থনাটা কার কাছে?

এখানে কৌশলে মুসলিমদেরকে আপনাদের দেবতার কাছে প্রার্থনা করিয়ে নিচ্ছেন।

আপনাদের এক দেবতার নাম বিষ্ণু দেবতা, যার পত্নী হচ্ছে লক্ষ্মীদেবী। যার পাঁচ কন্যা; পদ্মা, পদ্মালয়া, ইন্দিরা, শোভা, কমলা। আপনাদের বিশ্বাস সমস্ত মঙ্গলের মালিক হচ্ছে লক্ষ্মী দেবী, যার বাহন হলো পেঁচা।”
দারুন আবিষ্কার করেছেন মুনিম ভাই । মঙ্গলের দেবী লক্ষ্মী । তাই “মঙ্গল” শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না । এই শব্দটি অভিধান থেকে তুলে দিতে হবে । কিন্তু শোভাযাত্রায় এই শব্দ তো কোন হিন্দু আমদানি করে নি । লক্ষ্মীর বাহন পেঁচাকে এখানে কে এনেছে ? তার জবাব অবশ্য তিনি নিজেই দিয়েছেন ,

“চারুকলা পড়ে পেটের ভাত সংগ্রহ করা কঠিন তাই নববর্ষ উপলক্ষে বাড়তি আয় রোজগারের জন্য সোনার ছেলেরা বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তির সাথে পেঁচার মূর্তিটিও ঢুকিয়ে দেয় মঙ্গল শোভাযাত্রায়।

পেঁচা কি বাংলায় কথা বলে?

না পান্তা ইলিশ খায়?

পেঁচার সাথে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালীর কী সম্পর্ক?

আসলে সম্পর্ক বাঙ্গালীর সাথে নয়, হিন্দুধর্মের সাথে, লক্ষ্মীদেবীর বাহন রেডি করে আহবান করা হচ্ছে তাকে। কারণ সে না আসলে মঙ্গল বিতরণ করবে কে?

আসলে আপনারা যদি সরাসরি মুসলিমদেরকে পূজামণ্ডপে গিয়ে পুজা করার জন্য ডাকতেন
তাহলে তো মুসলিমরা সেখানে যাবেনা , তাই কৌশল পরিবর্তন করে মুসলিম যুবকদের দিয়ে শিরক ঠিকই করিয়ে নিচ্ছেন কিন্তু নাম দিচ্ছে বাঙালী অসাম্প্রদায়িক চেতনার!!”
পাঠক বিচার করুন ,মুনিম ভাইয়ের ভাষ্য থেকেই জানা যাচ্ছে পেঁচার মূর্তি ঢুকিয়েছে চারুকলার সোনার ছেলেরা । শুধু পেঁচা নয়, আবহমান বাংলার বিভিন্ন জীব জন্তুর ছবি নিয়ে আসে তারা । এতে শোভাযাত্রা হয় বর্ণাঢ্য । এর সঙ্গে হিন্দুদের কোন সম্পর্ক নেই । বরং কট্টরপন্থী হিন্দুরা পঞ্জিকা অনুসারে এক দিন পরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে । মুনিম সিদ্দিকী নিজেও খুব কট্টরপন্থী মুসলমান নন । কারণ এরপরেই তিনি ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখার কথা বলেছেন । সর্বধর্মালম্বীর ঐক্যবদ্ধ বাঙালি উৎসব চেয়েছেন ।

“কোন ছলনার আশ্রয় নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি চাপিয়ে না দিয়ে সত্যিকারের সর্বধর্মালম্বীরা যাতে অনুষ্ঠানে দ্বিধাহীন চিত্তে অংশ নিতে পারে সেভাবে উৎসব আয়োজন করতে হবে, যদি চান হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ, খৃষ্টান, জড় পুজারি, নাস্তিক সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে বাঙালি উৎসব পালন করুক।

যদি সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতি সত্ত্বা সৃষ্টি করতে চান, তাহলে বাঙালিদের উৎসব আয়োজনকে সত্যিকার ভারে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখুন।”
সবশেষে আমরা মুনিম সিদ্দিকীর সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই –

“বাঙালি মুসলিমদের কোন আনন্দ উৎসব নেই, কাজেই ১ লা বৈশাখকে আমরা সব বাঙালিদের সাথে নিয়ে নববর্ষ উদযাপন করতে চাই। যে উৎসবে কোন প্রকাশ্য বা হিডেন ধর্ম থাকবেনা থাকবে শুধু জাতীয়তা।”