বাঙালির বৈশাখ: উৎস ও গতি-প্রকৃতি

প্রকাশিত: ১০:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৪

বাঙালির বৈশাখ: উৎস ও গতি-প্রকৃতি

জী ব ন   তা প স   ত ন্ম য়
বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য হাজার বছরের।নিজস্ব কৃষ্টি কালচারের বর্ণচ্ছোটায় আলোকিত বাঙালির ঐতিহ্য দেখে বিমোহিত পুরো বিশ্ব।একটি জাতির ঐতিহ্য এতটা সমৃদ্ধশালী হতে পারে তা অনেকেরই মনে বিস্ময় সৃষ্টি করে।বাঙালির রীতিনীতির ধরণটাই যেন আলাদা। একেকটি উৎসব পার্বণ পালিত হয় একেক আঙ্গিকে। প্রতিটি উৎসবই প্রাণের আবেগে মিলিত হই সবাই। বাঙালির তেমনি একটি চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখ।
সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রচলিত হিজরী সন থেকে সামঞ্জস্য রেখে ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী বহু ভাবনা-চিন্তার পর উদ্ভাবন করেন ‘ফসলি সন’ বা বাংলা সন। ফসলের মওসুমের কথা বিবেচনা করে এ নতুন সনের প্রবর্তন হয় বলে নামকরণ করা হয় ‘ফসলি সন’।পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলের নাম অনুযায়ী ‘ফসলি সন’ পরবর্তিতে রূপ ধারণ করে বাংলাদেশে তা ‘বাংলা সন’ নামে অভিহিত করা হয়।
পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার বাংলা সনের প্রথম মাসের প্রথম দিন।এদিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব।এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ।অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনায় আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয় নববর্ষেএ প্রথম এদিন।বাঙালির চির ঐতিহ্য আর উৎসবময় সংস্কৃতির সর্বজনীন রূপের ধারক হলো পহেলা বৈশাখ।
বাংলাদেশে বর্ষবরণ বেশ মহাসমারোহের সাথে পালন করা হয়।ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব বর্তমানে স্থান করে উৎসবের।আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের প্রথম খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে।প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে পূজার ব্যবস্থা করা হয়।এরপর ১৯৭৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।ঐবছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীপিড়ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ বাংলা বর্ষবরণ আয়োজন করে।কালক্রমে এ আয়োজনই পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নানা ধরণের বর্ণিল আয়োজন হতে দেখা যায়।এর সর্বাগ্রে রয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত এ শোভাযাত্রায় তুলে ধরা হয় বিভিন্ন ধরণের প্রতীকি শিল্পকর্ম।অংশগ্রহণকারীরা রঙ-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে।প্রতিবছরই এ মঙ্গল শোভাযাত্রার একটি মূলভাব থাকে।এই মূলভাগ প্রতিবাদের, ভালোবাসার ও দ্রোহের। সেখানে অশুভের বিনাশ কামনা হয়।প্রার্থনা করা হয়। প্রার্থনা করা হয় সত্য ও সুন্দরের।শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন বয়সের মানুষ।খুবই আশাবাদের কথা যে, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে বিশ্বায়ন সংস্কৃতি-কৃতি লাভের গৌরব অর্জন করেছে।
গ্রামাঞ্চলে নববর্ষ মানে শুধু বৈশাখ উদযাপন নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নববর্ষ মানে বছরের শেষ মাস চৈত্র ও বছরের প্রথম মাস বৈশাখের যুগল মিলন ঘটানো। আবহমান কাল ধরে গ্রামের সাধারণ চৈত্রসংক্রান্তির বিচিত্র ধরণের কৃত্যমূকক সংস্কৃতি পালন ও উদযাপনের ভেতর দিয়ে নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখে প্রবেশ করে আসছিলেন।দুই-তিন যুগ আগেও আমাদের এই ঋতুভিত্তিক চাষের দেশে চৈত্র মানে ছিল অবসরের কাল। তখন সেই অবসরে গ্রামের মানুষ অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে কৃত্য ও সংস্কৃতির অদ্বৈতরূপে নানা ধরণের উৎসব, নৃত্য, গীত ও বাদ্যে মেতে উঠত।এখনো সেই সংস্কৃতির ফল্গুধারার চলমান, তবে সবটুকু আগের মত নেই।কেননা এই দেশে সনাতন তালিকায় চাষাবাদ বদলে নতুন চাষপদ্ধতির প্রবর্তন হয়েছে।ফলে এদেশের কৃষকের অবসর ঘুচে গেছে, চৈত্রেও কৃষককে ব্যস্ত রাখে তার হাইব্রিড শস্যক্ষেত্র।তাই অনেক অঞ্চল থেকেই চৈত্রসংক্রান্তির জীবনাচার, নৃত্য-গীত, কৃত্য-নাট্য ও বাদ্যের অমর সাংস্কৃতিক চর্চা বিলুপ্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে জনমানুষের স্মৃতিসত্তায়।বিগত ১৫ বছরের জনসংস্কৃতি সমীক্ষণ, তথা নিবিড়ভাবে গ্রাম- অভিজ্ঞতায় এ কথা না বলে উপায় নেই।তথাপি আশার কথা, এখনো বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে শত-সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যেও লোকায়ত সংস্কৃতি।এইসব লোকায়ত সংস্কৃতির বিভিন্ন উৎসবগুলো হচ্ছে _ হালখাতা, গ্রামীণ মেলা, অষ্টক গান, গমীরা, চরকের মাঠ, বাইদ্যার নাচ, দণ্ড, নাচ, পটগান, লাঠিখেলা ইত্যাদি উৎসব প্রবর্তন হয়ে আসছে।
বৈশাখ বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির ধ্রুপদী ভাষারূপ। ঐতিহ্যের স্মারক।শেকড়ায়নের মূলানুগ ধারাপাত। বাঙালি আত্মপরিচয়ের এই স্বপ্নমুখতায় দীপিত হয়। হৃৎকমলের টানে।সহজ ও সহজাত মৃত্তিকাপুরাণ পাঠ অন্বেষায় আসুন সূর্যমুখী দীগন্তচারি হই সবাই।সভ্যতাকে এগিয়ে সভ্য আচারে।শুভ্রতায়।কুপমুণ্ডুকতা ও অপসংস্কৃতি দানবদাহ পায়ে দলে।দলে দলে এই বাঙালি সংস্কৃতি দলিল নিয়ে বুকটান সাহসে এগিয়ে যাই সত্য ও সুন্দরে।আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে।জয় বাঙলা!

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031