বাবা এই দিনে দারুণ খুশি হতেন: জামিলুরকন্যা

প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২২

বাবা এই দিনে দারুণ খুশি হতেন: জামিলুরকন্যা

প্রমত্তা পদ্মার বুকে প্রাকৃতিক অযুত বাধা পেরিয়ে নির্মিত সেতু শনিবার সকালে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই সেতুতে রোববার ভোর ৬টায় শুরু হবে যান চলাচল।২০২০ সালের ২০ এপ্রিল ৭৭ বছর বয়সে মারা যান বাংলাদেশের অগ্রগণ্য প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী। কারিশমা দেখেছেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রকল্পটি নিয়ে তার বাবার গভীর ভালোবাসা।পেশায় প্রকৌশলী কারিশমা ফারহীন চৌধুরীর গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে পদ্মা সেতুর সঙ্গে। সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে বছরের পর বছর আগ্রহভরে চোখ রেখেছেন সেতুর অগ্রগতির ওপর।

 

প্রকল্প শুরুর দিকে জামিলুর রেজা চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে কন্যা কারিশমা বলেন, ‘বাবাও প্রথম থেকে দেশের সবার মতোই এই প্রজেক্টটি নিয়ে খুবই এক্সসাইটেড ছিলেন। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিল। প্রথমত তিনি জানতেন- এটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প।

 

পদ্মা সেতুর সঙ্গে কারিশমার গভীর আত্মিক যোগাযোগের মূল কারণ তার বাবা। দেশের ‘সক্ষমতার প্রতীক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই সেতুর পরামর্শক কমিটির প্রধান ছিলেন প্রখ্যাত প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি কারিশমার বাবা।

ঐতিহাসিক এই ক্ষণে আবেগতাড়িত কারিশমা ফারহীন চৌধুরী বলেন, ‘বাবা বেঁচে থাকলে দারুণ খুশি হতেন। তার অবর্তমানে দলের অন্য সদস্যরা সেতুটি তৈরি করতে পেরেছেন, এতে নিশ্চয় গৌরবান্বিত হতেন তিনি।’

 

তিনি বলেন, ‘বাবা বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাই এই মেগাপ্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, সেই যোগ্যতা তাদের আছে। আর পদ্মা সেতু এখন বাস্তবতা-এটা দেখে নিশ্চয়ই তিনি অনেক খুশি হতেন।’

 

পদ্মা সেতু নিয়ে বাবার আবেগ, উদ্দীপনা, চ্যালেঞ্জ, উদ্বেগ, গর্ব আর স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন কারিশমা। জানালেন, তাদের পুরো পরিবারকেই সব সময় এক ধরনের উত্তেজনার মধ্যে রেখেছে এই সেতু। জামিলুর রেজা চৌধুরীর মৃত্যুর পরেও তাদের মনোযোগ রয়ে গেছে সেতুটির দিকে।

‘দ্বিতীয়ত, প্রকৌশলী হিসেবে এটা উনার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং একটি প্রজেক্ট ছিল। অনেকেই জানেন, এই প্রকল্পে অনেকগুলো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বাধা ছিল। নদী শাসন, মাটির শক্তিমাত্রাসহ আরও অনেকগুলো বিষয়।’

বাংলাদেশের বড় বড় সব প্রকল্প বিদেশি অর্থায়নে হতো বলে সহযোগী দেশগুলোর অনেক শর্ত মেনে কাজ করতে হতো। পরামর্শদাতা হিসেবে বিদেশিদেরই নিয়োগ দেয়ার শর্ত থাকত। এ নিয়ে জামিলুর রেজা চৌধুরীর সবসময় ক্ষুব্ধ ছিলেন।

জামিলুরকন্যা বলেন, ‘বিদেশি যাদেরকে পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতো, দেখা যেত কিছু ক্ষেত্রে তাদের কারিগরি দক্ষতাও আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে কম। কিন্তু অর্থের জন্য আমরা অন্যদের ওপর নির্ভর থাকতাম বলে কিছু করা যেত না।

 

‘পদ্মা সেতু যেহেতু নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছিল, ফলে আমাদের সেরা প্রকৌশলীদের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। জামিলুর রেজা চৌধুরীর পাশাপাশি অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলীও বিভিন্ন ধাপে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’

এই প্রকল্পটিতে শেষ পর্যন্ত জামিলুর রেজা চৌধুরীকে আর ক্ষুব্ধ থাকতে হয়নি। কারণ, বিশ্বব্যাংকের টালবাহানা শেষে সরকার পরে নিজ অর্থে সেতুর কাজ শুরু করে। তখন আর আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাটির কোনো খবরদারি ছিল না।

বাবার সঙ্গে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখার স্মৃতিও স্মরণ করে কারিশমা ফারহীন চৌধুরী।

 

 

তিনি বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বাবাসহ পদ্মা সেতু স্বচক্ষে দেখতে যাওয়ার। আমরা পুরো পরিবারের সবাই পদ্মা সেতুর অগ্রগতি দেখতে গিয়েছিলাম। তখন মনে হয় ২৯ বা ৩০টির মতো স্প্যান বসেছিল। তখন আমরা বুঝতে পারছিলাম তিনি কতটা গর্ববোধ করছেন।’

 

 

পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছিল সে সময় জামিলুর রেজা চৌধুরীর মনের অবস্থা কেমন ছিল, তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন কি না- তা নিয়েও কথা বলেছেন তার মেয়ে।

 

 

কারিশমা বলেন, ‘বাবা আসলে কাজের জায়গাগুলো নিয়ে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগের সময় প্রকল্প নিয়ে আমাদের সঙ্গে খুব বেশি খোলামেলা আলোচনায় যেতেন না। তবে সে সময় বাবাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখা যেত।’

 

 

জামিলুর রেজা চৌধুরী সবসময়ই আশাবাদী ছিলেন বলেও জানান তার মেয়ে। কারিশমা বলেন, ‘বাবা সরকারকেও এটা বুঝাতে পেরেছিলেন আমাদের পক্ষেই এই সেতু তৈরি করে ফেলা সম্ভব।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

November 2022
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930