বাল্যবিবাহ : একটি অভিশাপ ও স্বপ্নভঙ্গের উত্থান

প্রকাশিত: ৬:০১ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২১

বাল্যবিবাহ : একটি অভিশাপ ও স্বপ্নভঙ্গের উত্থান

সেলিনা আক্তার

মানুষের জীবন-মৃত্যুও মাঝে বিবাহ প্রকৃতির একটি অলঙ্ঘনীয় বিধান। সামাজিক ও ধর্মীয় বৈধ চুক্তির মাধ্যমে দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে এই বিবাহ বন্ধন তৈরি হয়। জৈবিক চাহিদা পূরণ ও ভবিষ্যতের বংশ বিস্তার বিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য। এজন্য মানব জীবনে বিবাহ অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু অতি অল্প বয়সে বিবাহ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া অল্প বয়সে বিবাহ দেওয়া শিশু নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের মধ্যেও পড়ে যা আমাদের দেশের অনেকে তা বিশ^াস করেন না।
বাল্যবিবাহ নামটার সঙ্গে কৈশোর কৈশোর একটা ভাব রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যাগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহ একটি। একসময় বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের মহামারি আকার ধারণ করেছিল। এখনো যে বাল্যবিবাহ হয় না তা নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য এই শব্দটা বিভীষিকাময় এক অধ্যায়। আমার গ্রামের এক কিশোরী, নাম আছমা। তার বয়স ১৪ বছর সে পড়াশুনা করত। তার বাবা ভ্যানচালক আর মা মানুষের বাসায় কাজ করে। ছয় ভাই-বোন তার। মেয়েটি পড়াশুনাই ভালো ছিল। কিন্তু সে বেশি দিন পড়তে পারল না। মা-বাবা তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়। কিছুদিন যেতেই আছমার ঘরে জন্ম নেয় এক অপরিপক্ক সন্তান। আছমা ও সন্তান দুজনই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। যে বয়সে আছমার স্কুলের বারান্দা আর ক্লাস রুমে থাকার কথা ছিল সে বয়সে সে তার সন্তানের দায়িত্ব পালন করছে।
বাংলাদেশে ১ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত হলো শিশুকাল। তাই ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হলে তাকে শিশু বিবাহ বা বাল্যবিবাহ বলে। বাংলাদেশের বিয়ের আইন অনুযায়ী পুরুষদের জন্য ২১ বছর এবং নারীদের জন্য ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে যেকোনো একজনের ১৮ বছরের নিচে বিবাহ হলে তা বাল্যবিবাহ হবে। আমাদের দেশে মেয়ে শিশুদের একটি বড়ো অংশের বিয়ে হয় ১৮ বছরের নিচে। বাল্যবিয়ে বন্ধে ইতোমধ্যে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। গবেষণায় দেখা যায় অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে এখন ও বাল্যবিয়ে হচ্ছে।
নানা সূচকে বিশে^র রোল মডেল বাংলাদেশ। মাতৃমৃত্যুও হার কমে আসাও এই অর্জনের অন্যতম। দিনে দিনে বাল্যবিবাহ কমে আসায় কমছিলো মাতৃমৃত্যুর হার। কিন্তু করোনা মহামারির মধ্যে বেড়েছে বাল্যবিবাহ। দেশে আগের তুলনায় এই সময়ে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩ শতাংশ।
করোনাকালে অভিভাবকের কাজ না থাকা, সন্তানের স্কুল খোলার নিশ্চয়তা না থাকা এবং অনিরাপত্তা বোধ থেকে দেশে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবসহ নানা কারণে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতে মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধিরও আশঙ্কা করছেন তারা। তাছাড়া সচেতনতা ও আইন দিয়েই মূলত বাল্যবিবাহ রোধ প্রচেষ্টা চলছিল। কিন্তু করোনাকালে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহ। মূলত: গ্রামঞ্চলে চুপিসারে দেওয়া হচ্ছে এসব বিবাহ। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও দারিদ্র্যই এ সময়টিতে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাল্যবিবাহ নারীর অগ্রগতির ব্যাহত করে। এর ফলে নারীর অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হয়। অল্প বয়সে বিবাহ মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি নবজাতকের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি করে। অনেক সময় নবজাতক মারাও যায়। নবজাতক বেঁচে থাকলেও পরবর্তীতে শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভোগে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মায়ের প্রতিবন্ধী শিশু জন্মদানের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অল্প বয়সে বিবাহের ফলে একটি মেয়ের পক্ষে অন্য একটি পরিবারের অনেক বিষয় সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়। অনেক সময় বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনাও ঘটে। পরবর্তীতে ঐ মেয়ের বাবা-মায়ের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, যা কোন বাবা-মা কখনো কামনা করেন না। মেয়ের ভবিষ্যতটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাল্যবিবাহ কখনো ভালো ফল আনতে পারে না। তাই সর্বদা নেতিবাচক ফলবাহী বাল্যবিবাহ বন্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবুও আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ থেমে নেই। এটা বন্ধ করতে না পারলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী নষ্ট হবে ও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে।

১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ বন্ধে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ প্রণীত হয়। এই আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর এবং ছেলেদের ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে এই আইন পরিবর্তন এনে মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয় ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। সর্বশেষ বাংলাদেশ ২০১৭ সালে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭’ পাস হয়। এই আইনেও মেয়েদের বিবাহের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর ও ছেলেদের কমপক্ষে ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিয়ে করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এজন্য দুই বছরের কারাদ- বা একলাখ টাকা অর্থদ- আরোপের বিধানও রাখা হয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাল্যবিয়ে করলে একমাসের আটকাদেশ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তির যোগ্য হবে। বাল্যবিয়ের সাথে পিতা-মাতা বা অন্যরা জড়িত থাকলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদ-, ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারে। জরিমানার টাকা না দিলে আরও তিন মাসের জেল খাটতে হবে। বাল্যবিয়ে নিবন্ধ করলে নিবন্ধকের লাইসেন্স বাতিল হবে। যিনি বিয়ে পড়াবেন কিংবা নিবন্ধন করবেন তারাও ছয় মাস থেকে দই বছরের কারাদ-, ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। এছাড়াও বর্তমান সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১০৯ নম্বরে কল বা এসএমএস করে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে। এরফলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন গণযোগাযোগ অধিদপ্তর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উঠান বৈঠক, মা সমাবেশ, সিনেমা শো’র মত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সরকার মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণকে অনুপ্রাণিত করতে শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। এরফলে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাচ্ছে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে লন্ডনে গার্লস সামিটে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বাল্য বিবাহের হার শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ১৫- ২১ মধ্যে সংগঠিত বাল্যবিবাহের হার এক তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা। ২০০৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) ছিল ৭৪ %। ২০১৫ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) ছিল ৫২ %। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) ৪৭ % এ নেমে এসেছে। ২০০৭ সালে বাল্য বিবাহের হার (১৫ বছরের নিচে) ছিল ৩২ %। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৫ বছরের নিচে) ১০.৭% এ নেমে এসেছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাল্যবিয়ে হ্রাসের যে হার আশা করা যায়, ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ বাল্যবিয়ে মুক্ত দেশে পরিণত হবে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী/ প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২৯ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কমিটি ও জেলা পর্যায়ে ২৫ সদস্য, উপজেলা পর্যায়ে ১৬ সদস্য ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫ সদস্য বিশিষ্ট বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ও সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে । যৌতুক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ১১ হাজার ৬৩৬টি উঠোন-বৈঠকের মাধ্যমে ১ লাখ ৫৫ হাজার, ১৭৭ জনকে সচেতন করা হয়েছে। ৬৪টি উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ২০১৫ হতে ২০১৯ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার শিশু বাল্যবিবাহ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রান্তিক ও অসহায় কিশোর-কিশোরীদের জেন্ডার বেইজডভায়োলেন্স প্রতিরোধ করার জন্য ৬৪টি জেলার প্রায় ৮ হাজারটি কিশোর-কিশোরি ক্লাব স্থাপন করা হচ্ছে। তথ্যআপা প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ১ কোটি মহিলাকে তথ্য সেবা প্রদানে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি নির্মূলে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সহযোগিতা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো গ্রামের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া সভা সেমিনারের মাধ্যমে অনেক সচেতনতা বাড়ানোসহ সমস্যাটি রোধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষক মসজিদের ইমাম এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এ বিষয়ে এগিয়ে আসলে বাল্যবিয়ে অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

ছড়িয়ে দিন