বিকল্প গণমাধ্যম

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২১

বিকল্প গণমাধ্যম

 

সৌমিত্র দেব

গণমাধ্যম বলতে শুধু সংবাদপত্র, রেডিও বা টিভির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয; বর্তমানে বিকল্প গণমাধ্যম নামে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি গণমাধ্যমের আবির্ভাব হয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইউটিউবসহ মতপ্রকাশের নতুন মাধ্যম তৈরি হচ্ছে হরদম। এসব টুলসকে তরুণ প্রজন্ম নিজস্ব মতপ্রকাশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে এবং এটি বিস্তার লাভ করছে লক্ষণীয়ভাবে। এর বড় শক্তি— মতপ্রকাশের ক্ষমতা। রেডিও-টেলিভিশন বা খবরের কাগজে তথ্য দিলে সেটি প্রকাশ না হওয়ার শঙ্কা থাকে বেশি। সেখানে এক ধরনের গেট কিপিং থাকে। অনেক ধরনের প্রটোকল থাকে, মুখ চেনা অনেক মানুষের কথা ছাপা হয়। তাদের কথাই বলা হয় বেশি। কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে অবস্থানকারীদের মন্তব্য ও বক্তব্য দেয়ার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু অনলাইন বা বিকল্প গণমাধ্যমের সুবিধা বেশি। যে ব্যক্তি এটি ব্যবহার করছেন, তিনি নিজেই তথ্য নির্মাণ করেন, নিজেই তা প্রকাশ করেন এবং নিজেই তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। তথ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে এ মাধ্যমে, যেটি মূলধারার গণমাধ্যমে অনুপস্থিত। আগে ছিল তথ্য উত্পাদন হবে এবং সেটি মেইন স্ট্রিম মিডিয়া প্রচার করতে পারে, না-ও পারে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণটা ছিল অন্যের হাতে। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারের সুযোগ পেত না। অথচ বিকল্প গণমাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তিরই তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। এ তথ্য তিনি নিজে উত্পাদন করেন, সেটি তিনি সম্পাদনাও করেন। তথ্য অন্যের সঙ্গে শেয়ারও করেন আবার মুছেও ফেলতে পারেন। অনলাইন মিডিয়ার তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাও বেশি। বলা চলে অমিত সম্ভাবনাময় এক মাধ্যম এটি। যে কেউ নিজের এবং অন্যের তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন এর সহায়তায়। এসব কারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে এটি সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়করভাবে মানুষের এমপাওয়ারমেন্ট ঘটে গেছে। বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তি প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আপতত মনে হতে পারে, এটি স্বার্থপরতা। তবে এর প্রমাণটা মিলছে না। ব্যক্তি নিজেই ক্ষমতাবান আবার ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে লিংকড হচ্ছেন বিকল্প গণমাধ্যমের সহায়তায়। নতুন মাধ্যমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই। ব্লগ বা ফেসবুকে তথ্য উত্পাদন করে সেটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যদের মধ্যে। এখানে সামষ্টিকভাবে একজন ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবাই একটি সুতায় গাঁথা। এটি শুধু ভার্চুয়াল নয়। তিনি শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না এখন। অনলাইনের মধ্য দিয়ে তারা একটি চেতনা তৈরি করছেন। এটি আমরা দেখছি শাহবাগে সংঘটিত আন্দোলনে। বহু বছর ধরে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে।

এক দিনে ডাক দিলে মানুষ শাহবাগে জড়ো হতো না। অনলাইন কিন্তু জামায়াত-শিবিররাও ব্যবহার করে। তারা কেন এমন আন্দোলন সংঘটন করতে পারল না? প্রশ্ন সেটিও। প্রযুক্তির শক্তি আছে। কিন্তু এটি ব্যবহার করে যদি মানুষের চেতনায় পরিবর্তন না আনা যায়, তাহলে সে পরিবর্তন সত্যিকারের পরিবর্তন হয়ে ওঠে না। প্রযুক্তি হচ্ছে বস্তুগত বিষয়। মূলে বিষয় হলো চেতনাগত পরিবর্তন। পাঁচ-সাত বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনলাইনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চেতনাগত পরিবর্তন হয়েছে এতে। এ কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভটা প্রসারিত হয়েছে বলে দ্রুতই শাহবাগে এসে অবস্থান নিতে পেরেছেন তরুণরা। তারা কেবল অনলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। সত্যিকার স্থান রাজপথেও চলে এসেছেন। কম্পিউটার থেকে তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে স্থানান্তর করেছে। নানা বিষয়ের সম্মিলন ঘটেছে এখানে।

কখনো বিকল্প মাধ্যমকে বিপ্লবী কখনো র‌্যাডিক্যাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার এ প্রত্যয়যুগল ভিন্নধর্মী দু’টো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখার প্রয়াস দেখা যায়।

ব্লগ বা ব্লগিং আমাদের দেশে নতুন। শুধু আমাদের দেশেই না, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেও ব্লগ সংস্কৃতি এসেছে খুব বেশিদিন আগে নয়; কিন্তু এরই মাঝে এটি মিডিয়াজগতে কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একটা সময় পর্যন্ত ব্লগের ধারণা শুধু ব্যক্তিমানুষের লিখিত অনলাইন ডায়েরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আস্তে আস্তে এতে বহুমাত্রা যুক্ত হয়েছে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও অনেকে ব্লগের কথা জানতেন না। যারা ব্লগ লিখতেন, তাদের অধিকাংশ মূলত নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ ওয়েবে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সে অবস্থা থেকে ব্লগ এখন এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যেখানে ব্লগকে একটি আলাদা মিডিয়ার মর্যাদা দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্লগ মানুষের মত প্রকাশের অন্যতম একটি হাতিয়ার হিসেবেও দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ‘গণমাধ্যম’গুলোর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে– এগুলো মোটামুটি একরতফা বা একপাক্ষিক। সেখানে পাঠকের দিক থেকে লেখক বা বক্তার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ খুবই কম। কিন্তু ব্লগে লেখকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়, বক্তব্য পছন্দ বা অপছন্দ হলে তা সরাসরি বলা যায়। এমনকি লেখক ভুল তথ্য দিলে বা লেখায় অসততা থাকলে পাঠক সেখানে প্রতিবাদও জানাতে পারে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়ার এ চরিত্রটি মোটামুটি অনুপস্থিত। যে দুয়েকটি সীমিত ক্ষেত্রে পাঠক বা দর্শককে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, সেখানেও মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ ও সময় থাকে তুলনামূলকভাবে কম। আজকাল অবশ্য সংবাদমাধ্যমগুলোর কিছু কিছু তাদের ওয়েব সংস্করণে পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানার ব্যবস্থা যুক্ত করেছে, কিন্তু সেটিও আসলে একতরফা যোগাযোগ। পাঠকের মতামতের ওপর ভিত্তি করে লেখকের প্রতিক্রিয়া জানা যায় না, এমনকি ভুল তথ্য থাকলে লেখকের সেটি সংশোধনের সুযোগ নেই। ব্লগ এ সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।

ইন্ডিমিডিয়ার রিপোর্টাররা মনে করেন, কোনো সাংবাদিকতাই পক্ষপাতমুক্ত নয়। এই পক্ষপাতকে ধামাচাপা দেয়ার জন্যই মূলধারার সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার কথা এত বেশি উচ্চারিত হয়। এ ধরণের বিকল্প মাধ্যম তাদের পক্ষপাতকে লুকানোর চেষ্টা করে না। তাদের লক্ষ্য হলো সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে ফেলা। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাওয়া।

অন্যদিকে ২০১০ সালের শেষ দিকে মহাশক্তিধর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস। উইকিলিকস স্বেচ্ছাসেবী তথ্যদাতাদের সহায়তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গোপন সব নথি প্রকাশ করতে থাকে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরাট হৈ চৈ ফেলে দেয়। উইকিলিকস একাই মেইনস্ট্রিম ও প্রথাগত সাংবাদিকতাকে নিরর্থক বলে প্রমাণিত করেছে।

এবার একটু মুদ্রিত সংবাদপত্রের দিকটিতে চোখ বুলানো যাক। ব্রিটিশদের যতই আমরা গালি দেই, আমাদের অনেক কিছুই তাদের কাছে ধার করতে হয়েছে। ঠিক বিকল্প মিডিয়ার ধারণাটিও। বলা হয়ে থাকে, সাংবাদিকতার ইতিহাস যেখান থেকে বিকল্প মিডিয়ার ইতিহাসও সেখান থেকে শুরু। ইউরোপে যখন প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতে শিপিং, ব্যাংকিং, যুদ্ধ-সংঘাত এবং উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণীর চলমান ভাবনা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশিত হতো। বড়ো লোক শ্রেণীর এই পত্রপত্রিকার বিকল্প হিসেবে বরাবরই নানা ধরণের সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবে মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত শ্রমজীবী শ্রেণীর পত্রিকাকে বিকল্প মাধ্যমের সবচেয়ে বড় উদাহারণ হিসেবে দেখা হয়। এই সংবাদপত্রগুলো রেডিকাল প্রেস হিসেবে পরিচিত ছিল; এই প্রেস শ্রম, ধর্ম ও মানবাধিকার সম্পর্কে র‌্যাডিকাল ধারণা পোষণ করতো। এই প্রেস শ্রমজীবীদের স্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করতো এবং শ্রমজীবী শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধও করে তুলেছিলো। প্রকাশনা প্রযুক্তি তখন সস্তা ছিল, ফলে শ্রমজীবীদের মালিকানাতেই পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া সম্ভব ছিল। আর এই পত্রিকাগুলো তখন জনপ্রিয়ও ছিল। পুওর ম্যানস গার্ডিয়ান, ফ্রি ইনকোয়ারার, পিপলস পেপার ইত্যাদি র‌্যাডিকাল পত্রিকার সার্কুলেশন ছিল অনেক।

 

এসব পত্রিকা নিয়ন্ত্রণ করতো ব্রিটিশ সরকার কাগজের ওপর করারোপ করে, লাইসেন্স প্রথা চালু করে, প্রকাশকদের হেনস্থা করে। এসব করেও যখন বিকল্প মিডিয়াগুলোকে দমাতে পারা যায়নি । কিন্তু পুঁজিপতিদের অর্থের কাছে তার মানতে হয়েছে। হার মানতে হয়েছে বিজ্ঞাপননির্ভর পত্রিকাগুলোর কাছে। ১৯৬০এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিও জার্নলিজমের আবির্ভাব ঘটে। ‘ভিলেস ভয়েস’ নামক পত্রিকাতে এর ছাপ ছিল । কিন্তু এটি মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মারডকের করায়ত্ব হয়।

মূলধারা মিডিয়াগুলো যেখানে ব্যবসা কেন্দ্রীক। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে বিকল্প মাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে। অ-বাণিজ্যিক এ মিডিয়া দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার, প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা প্রভূতি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

গত শতাব্দির শুরু থেকে বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিকগণ (ফ্রাংকফুর্ট স্কুল থেকে ক্রিটিক্যাল রাজনৈতিক অর্থনীতিক পরম্বরা পর্যন্ত) পুজিবাদী ঘরানার গণমাধ্যম কাঠামোকে সমালোচনা করে এসেছেন। তারা দুটি দিক থেকে বিষয়গুলো বিশেষভাবে ফোকাস করেছেন- ১. গণমাধ্যম থেকে উৎসারিত পণ্য ও ২. গণমাধ্যমের আদর্শগত চরিত্র।

সাবজেকটিভ এপ্রোস এ বলা হয় যে, মিডিয়া এক্টররা কাজ করে এবং কিভাবে বিকল্প মিডিয়ার জন্ম দেয়। তারা যুক্তি দেন যে, , যদি মিডিয়ার আধেয় উৎপাদনে গণতান্ত্রিক প্রবেশাধিতার পাওয়া যায় যেখানে সাধারণ জনগণও তাদের কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারে তবেই মিডিয়া মুক্তভাবে সমাজের উপর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অবজেকটিভ এপ্রোস বেশি গুরুত্ব দেয় বিকল্প মিডিয়ার কাঠামোতে । তারা যুক্তি দেন যে, বিকল্প মাধ্যম পুজিবাদী কাঠামোর আদর্শগত চরিত্র বুঝতে সক্ষম এবং এটি পুজিবাদী কাঠামোর মিডিয়া চরিত্রকে বাতিল করে দিতে পারে ক্রিটিক্যাল মাধ্যম আধেয় সরবরাহ করার মাধ্যমে।

বর্তমান সময়ের তাত্ত্বিকরা বলেন যে, পুঁজিবাদী ঘরানার মিডিয়া কাঠামো যেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দু’টি শ্রেণীর তৈরি করে, সেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে আনুভূমিক সম্পর্ক তৈরি করে ভেদাভেদ রেখা উঠিয়ে দিতে চায়। অধিকাংশ মানুষ মিডিয়া দ্রব্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাহিরে থাকে। বিকল্প মিডিয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কেন্দ্রীভূত মিডিয়া সিস্টেম এবং পুঁজিবাদী গণমাধ্যমের ক্ষমতা।

 

কমিউনিটি মিডিয়া দৃষ্টিভঙ্গি সাবজেকটিভ ধরণের, কেননা তাদের অধিশ্রয়ণ বা ফোকাস হলো মিডিয়া উৎপাদনে অংশগ্রহণমূলক প্রবেশাধীকার এবং ব্যক্তিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। কমিউনিটি মিডিয়া কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং অপেশাদারীত্বের মাধ্যমে মিডিয়া উৎপাদন, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা করে। কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা-২০০৮ এ বলা হয়েছে, সংস্থাটি অবশ্যই অলাভজনক হতে হবে; কমিউনিটি রেডিও’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কমপক্ষে পাঁচ বছরের কমিউনিট পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বাংলাদেশে ১৪ টি কমিউনিটি রেডি চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি সরকারি মালিকানায় অপর ১৩টি পেয়েছে এনজিও। এনজিওদের কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এনজিওগুলো বেশ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা যে, কমিউনিটি রেডিওকে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা কী আদৌ আছে। বাকী ১টি তো সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। শাসকদের স্বার্থ বিরোধী কোনো কথা কী প্রচার হবে সেখানে? আমরা তো বর্তমান বিটিভির অবস্থা জানি। সরকারের উকালতি করাই তার কাজ। বিকল্প মিডিয়ার যে বৈশিষ্ট জনগণের হয়ে উকালতি করা তা কতটা সম্ভব তা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকে যায়।

 

বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই বিকল্প ধারার মিডিয়ার কথা জানা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় শাসক গোষ্ঠীর রোষনালে পোড়ার মাধ্যমে। ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকদের কুকর্ম জনসম্মুখে প্রকাশের জন্য ১৭৬৮ সালে উইলিয়ামস বোল্টস এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট মুদ্রাযন্ত্র ও সংবাদপত্র প্রকাশের বাসনা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তা বাস্তব হতে দেয়নি শাসকরা। বিরূপ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাকে জাহাজে চড়িয়ে ভারত থেকে তাড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। (পাল, তারাপদ ১৯৭২, ভারতের সংবাদপত্র’, অরোরো প্রিন্টার্স, ৫৭ শ্রীগোপাল মল্লিক লেন, কোলকাতা-১২)। এক যুগ পর প্রকাশিত হয় জেমস অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত ‘বেঙ্গল গেজেট’। এটিও ছিল তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধী । এরপর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ও বিভিন্ন বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশিত হয় বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। রঙ্গপুর বার্তাবহ, বরিশাল হিতৈষী, বরিশাল বার্তাবহ, স্বদেশ উল্লেখ যোগ্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়ও বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো পাকিস্তানী শাসকদের চ্যালেঞ্জ করে। সমাজ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয় সংবাদপত্রগুলো। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকের মত মূলধারার পত্রিকাগুলোও বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পরিস্থিতির চাপে। বর্তমানে এ ধারাবাহিকতায় কিছুটা স্বাক্ষর রাখছে বামপন্থি দলগুলোর কিছু পত্রিকা। ভ্যানগার্ড, সংহতির মত সাময়িকীগুলো বিকল্প মিডিয়ার আংশিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।

ইন্টারনেটের বিকাশের ফলে এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। দ্রত বিকশিত হতে তথ্য প্রযুক্তি। কিন্তু বিকল্প মিডিয়া তৈরিতে খানিকটা পিছিয়ে বাংলাদেশে। তবে আশার আলোও জ্বলছে। ইন্ডিমিডিয়ার মতো সংবাদনির্ভর বা জিনেটের মত বিশ্লেষণ নির্ভর সাইট এদেশে নেই। রাজনৈতিক ডক কম নামের একটি সাইট আছে যেটি একটু চেষ্টা করে বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ দিতে। কিন্তু থলের বেড়াল বের করতে কোন কাজ করে না। তাই শেষ ভরসা পড়ে সাইবার পরিসরে-ব্লগ, ফেসবুকের ওপর।

আপাতত সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রেও জন্য ব্লগাররা বা অনলাইন কমিউটিটির সদস্যরা তৎপর বলে পর্যবেক্ষণে প্রতিভাত হয়েছে। রেলওয়েমন্ত্রীর এপিএসের গাড়ি থেকে ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার, ভিকারুননেসা স্কুলের স্ক্যান্ডাল বা চাপাই নবাবগঞ্জের গরুব্যবসায়ীকে বিএসএফের নির্মম নির্যাতনের ঘটনা সাইবার জগতে ঝড় তুলেছে। সম্প্রতি সীমাস্তে ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর বাংলাদেশীদের উপর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকা- তরুণ সমাজ জেগে উঠে ব্লগ -ফেসবুকের এক আহবানে।

বিগত সেনাসমির্থত তত্ত্বাধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে, ২০০৮ সালের পিলখানা ট্রাজেডি নিয়ে ব্লগার ও ফেসবুকে তৎপর হয়ে ওঠে মুক্তকামী ব্যবহারকারীরা।

মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করে। বিকল্পমাধ্যম নীতির শৃঙ্খল ছিড়ে বের হয়ে আসতে চায়। স্বভাবই বিকল্প মাধ্যমগুলোর কোন নীতি মালা নেই। আমরা লক্ষ্য করছি যে, ভার্চুয়াল জগতের বিকল্প মিডিয়াগুলোতে ব্যক্তিগত আক্রোশ বেশ ভালোভাবে ওঠে আসছে। দেখা যাবে সমাজের জানার কোন প্রয়োজন নেই, তবুও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে। সেক্স স্ক্যান্ডাল এর অন্যতম উদাহরণ হতে পারে। ফলে বিশেষণাত্বক জায়গা থেকে বিকল্প মিডিয়াকে যেভাবে দেখা হয় বা তাত্ত্বিক ভাবে বিবেচনা করা হয় সে জায়গায় শক্ত শেকড় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

মূলধারার মাধ্যমসমূহ নিয়ে যে প্রশ্নটি প্রায়শ তোলা হয় সেটি হলো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। বিকল্প মিডিয়া নিয়েও একই ধরণের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এদেশে ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিকল্প মাধ্যমগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। যেহেতু বলাই হয়, এ মাধ্যমের অবস্থান হচ্ছে বিশাল অংশ জুড়ে ভার্চুয়াল বিশ্বে। একতো ইন্টারনেটে সাধাররণ মানুষের প্রবেশ ক্ষেত্র সীমিত অপরদিকে এ মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক কিছুই অদ্ভুতুড়ে।বলা হয়ে থাকে, বিকল্প মাধ্যমগুলো হবে বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু এই আর্দশ থেকে দূরে থেকে অনেক সময় এগুলো হয়ে ওঠে মূল স্রোতের মাধ্যমগুলোর মত আর্দশধর্মী। সামহোয়ার ইন ব্লগের প্রেক্ষাপটে, জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধকে অস্বীকার করা, মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা ইত্যাদি ধাঁচের জাতীয়তাবাদী পোস্ট দিয়ে শিবিরকর্মী পরিচয়দানকারী কিছু ব্লগার এই রাজনীতির জন্ম দেন। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব-এর ব্যবহারকারীদের অনেকে ভুয়া আইডি, পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে। রেইন গোল্ড বলেছেন- ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই। এটিএম শাসসুজ্জামানের মৃত্যুর সংবাদের কথা বলা যায়।

সরকার বিরোধী অবস্থান নিলে বন্ধ করে দেয়া হয়ে থাকে এ দেশে। এমন নজির আমরা দেখেছি। বিকল্প মাধ্যমগুলোর বিকাশ ও দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব বাঁধার মুখোমুখি হয় তাদের মধ্যে প্রধানতম হিসেবে সরকারি কড়াকড়িকে বিবেচনায় আনা যায়। ২০০৮ সালের ১৫ তারিখে সচলায়তন ব্লগে ঢোকা যায়নি। ব্লগটি সরকার ব্লক করে দিয়েছিলো। ২০০৯ সালের মার্চে ইউটিউব সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৯ মে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়। মহানবী (স) এর ব্যাঙ্গাত্মক বিষয় প্রকাশের জন্য বিআরটিসি ৭ দিন ধরে বন্ধ রাখে সাইটটি। গত ২২ মার্চ হাইকোর্ট আবারো ফেসুবুকের পাঁচটি পেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

বিকল্প মিডিয়া বিরুদ্ধে বিশেষ দলের হয়ে উকালতি করার অভিযোগ ওঠছে। বিকল্প মিডিয়াতে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার অবাধ চর্চার অবাধ সুযোগ রয়েছে। তবে কারা কিভাবে মাধ্যমটি ব্যবহার করছে বা হচ্ছে তার উপরই নির্ভর করে। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো- কোন রূপ বিবেচনা না করেই কোন কিছু প্রকাশ বা প্রচারিত করা হয়।

উন্নয়নের ‘চুইয়ে পড়া’ তত্ত্বে বলা হয় যে, কেন্দ্রকে আবর্তন করে করে উন্নয়ন প্রান্তের দিকে যাবে। যদি এমনটিই মনে করা হয়, তাহলেও এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে বিকল্প মাধ্যমগুলোতে এতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তয় ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমায় সেন্টমার্টিনের অপার প্রকৃতি দর্শন আর ভ্রমণে। নেই বিদ্যুৎ, নেই কম্পিউটার, নেই ইন্টারনেট সংযোগ। শুধু তাই নয়, বিকল্প মিডিয়া যেটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই শিক্ষারও দুর্দশা সেখানে। তাহলে কেমনভাবে উন্নয়ন হবে? বিকল্প মাধ্যমগুলো কী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে। এটা বলা যায় যে, এ দেশে এখনো বিকল্প মিডিয়া মাথা তুলে ধারাতে পারে নি। দাঁড়াতে পারেনি বলেই জনগণের হয়ে উকালতি করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।

 

বিকল্প মিডিয়ার ব্যবহারকারী বা যারা লেখেন তারা কোন শ্রেণীর? এটার উপরও নির্ভর করছে এর কাঠামো গড়ন। যারা এক্টর হিসেবে কাজ করছেন তারা কোন শ্রেণীতে অবস্থান করছে। তারা কি নি¤œ বর্গের? না তাদের অধিকাংশই সমাজের মর্যাদাসীন আসনের লোক। আমাদের দেশে আশ্চর্য একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। রাতে যারা বিকল্প ধারার মাধ্যমগুলোতে সময় দেন তারাই আবার দিনের বেলায় কাজ করেন মূলধারার মাধ্যমগুলোতে, যেগুলো হয়তো মূল কর্পোরেট হাউজ। ‘রাজধানী ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে ব্লগের তৃতীয় দিবস মিলন মেলায় অংশগ্রহণকারী দুজন ব্লগারের পরিচয় দিলেই বিষয়টি সহজে অনুমেয় হবে। ৩০০ বেশি ব্লগারের একজন মূল নাম জিয়াউদ্দিন সাইমুম। সাইমুম পরিচয়ের এ ব্লগার একটি অনলাইন বার্তায় কর্মরত। আরেকজন ব্লগ লিখেন শিপু ভাই নামে, তিনি ঢাকার একটি হাউজিং কোম্পানির ডিরেক্টর।’

বিকল্প মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমের মতো নয়। তবে রাজনীতিক ক্ষেত্র কিংবা যোগাযোগ তৈরিতে বিকল্প মাধ্যম কাজ করতে পারে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ব্লগারদের পোষ্টগুলোকে ব্যক্তিগত আধেয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাপ দেয় এবং রাজনীতি ও অন্যান্য ইস্যু যা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তাকে আঘাত করে, অরাজকতা তৈরি করে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে- তা নিষিদ্ধ করে। ভিয়েতনামের সকল আইপি এড্রেস সরকারি মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট সার্ভিসেস দ্বারা যোগান দেয়া হয়ে থাকে।

উন্নয়নে বিকল্প মিডিয়া বাংলাদেশে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা নির্ভর করছে কারা এর এক্টর ও ব্যবহারকারী, সরকারের খড়গ আছে কী না, জনগণের প্রবেশাধিকার এখানে কতটুকু, তা কতটা কিভাবে বিশ্লেষণ করছে বিষয়বস্তুকে কিংবা সামজিক আন্দোলনে নিজেদেরকে নিয়োজিত করছে কীনা প্রভৃতি বিষয়ের উপর। আমরা আশা করতে পারি বাংলাদেশে বিকল্প মিডিয়া সামাজিক আন্দোলনে আরো বেশি নিজেদের ব্যাপৃত করবে, জনগণের হয়ে উকালতি করবে, বিশ্লেষণাত্বক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা নেয়া সহ রাজনৈতিক ভাবধারা থেকে উদারনৈতিক আচরণ দেখাবে। অতিমাত্রায় রাজনীতি অতিশ্রায়ণ ব্যক্তি থেকে সমষ্টিকে নিজেদেরকে আরো শক্তভাবে তুলে ধরতে বাধার সৃষ্টি করে। অ-বাণিজ্যিক ঘরানার এদেশের উন্নয়নে অসমান্য অবদান রাখুক এ প্রত্যাশা করছি। জয়তু, বিকল্প মিডিয়া।

 

 

 

গণমাধ্যম বলতে শুধু সংবাদপত্র, রেডিও বা টিভির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয়; বর্তমানে বিকল্প গণমাধ্যম নামে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি গণমাধ্যমের আবির্ভাব হয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইউটিউবসহ মতপ্রকাশের নতুন মাধ্যম তৈরি হচ্ছে হরদম। এসব টুলসকে তরুণ প্রজন্ম নিজস্ব মতপ্রকাশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে এবং এটি বিস্তার লাভ করছে লক্ষণীয়ভাবে। এর বড় শক্তি— মতপ্রকাশের ক্ষমতা। রেডিও-টেলিভিশন বা খবরের কাগজে তথ্য দিলে সেটি প্রকাশ না হওয়ার শঙ্কা থাকে বেশি। সেখানে এক ধরনের গেট কিপিং থাকে। অনেক ধরনের প্রটোকল থাকে, মুখ চেনা অনেক মানুষের কথা ছাপা হয়। তাদের কথাই বলা হয় বেশি। কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে অবস্থানকারীদের মন্তব্য ও বক্তব্য দেয়ার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু অনলাইন বা বিকল্প গণমাধ্যমের সুবিধা বেশি। যে ব্যক্তি এটি ব্যবহার করছেন, তিনি নিজেই তথ্য নির্মাণ করেন, নিজেই তা প্রকাশ করেন এবং নিজেই তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। তথ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে এ মাধ্যমে, যেটি মূলধারার গণমাধ্যমে অনুপস্থিত। আগে ছিল তথ্য উত্পাদন হবে এবং সেটি মেইন স্ট্রিম মিডিয়া প্রচার করতে পারে, না-ও পারে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণটা ছিল অন্যের হাতে। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারের সুযোগ পেত না। অথচ বিকল্প গণমাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তিরই তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। এ তথ্য তিনি নিজে উত্পাদন করেন, সেটি তিনি সম্পাদনাও করেন। তথ্য অন্যের সঙ্গে শেয়ারও করেন আবার মুছেও ফেলতে পারেন। অনলাইন মিডিয়ার তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাও বেশি। বলা চলে অমিত সম্ভাবনাময় এক মাধ্যম এটি। যে কেউ নিজের এবং অন্যের তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন এর সহায়তায়। এসব কারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে এটি সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়করভাবে মানুষের এমপাওয়ারমেন্ট ঘটে গেছে। বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তি প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আপতত মনে হতে পারে, এটি স্বার্থপরতা। তবে এর প্রমাণটা মিলছে না। ব্যক্তি নিজেই ক্ষমতাবান আবার ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে লিংকড হচ্ছেন বিকল্প গণমাধ্যমের সহায়তায়। নতুন মাধ্যমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই। ব্লগ বা ফেসবুকে তথ্য উত্পাদন করে সেটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যদের মধ্যে। এখানে সামষ্টিকভাবে একজন ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবাই একটি সুতায় গাঁথা। এটি শুধু ভার্চুয়াল নয়। তিনি শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না এখন। অনলাইনের মধ্য দিয়ে তারা একটি চেতনা তৈরি করছেন। এটি আমরা দেখছি শাহবাগে সংঘটিত আন্দোলনে। বহু বছর ধরে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে।

 

এক দিনে ডাক দিলে মানুষ শাহবাগে জড়ো হতো না। অনলাইন কিন্তু জামায়াত-শিবিররাও ব্যবহার করে। তারা কেন এমন আন্দোলন সংঘটন করতে পারল না? প্রশ্ন সেটিও। প্রযুক্তির শক্তি আছে। কিন্তু এটি ব্যবহার করে যদি মানুষের চেতনায় পরিবর্তন না আনা যায়, তাহলে সে পরিবর্তন সত্যিকারের পরিবর্তন হয়ে ওঠে না। প্রযুক্তি হচ্ছে বস্তুগত বিষয়। মূলে বিষয় হলো চেতনাগত পরিবর্তন। পাঁচ-সাত বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনলাইনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চেতনাগত পরিবর্তন হয়েছে এতে। এ কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভটা প্রসারিত হয়েছে বলে দ্রুতই শাহবাগে এসে অবস্থান নিতে পেরেছেন তরুণরা। তারা কেবল অনলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। সত্যিকার স্থান রাজপথেও চলে এসেছেন। কম্পিউটার থেকে তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে স্থানান্তর করেছে। নানা বিষয়ের সম্মিলন ঘটেছে এখানে।

 

কখনো বিকল্প মাধ্যমকে বিপ্লবী কখনো র‌্যাডিক্যাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার এ প্রত্যয়যুগল ভিন্নধর্মী দু’টো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখার প্রয়াস দেখা যায়।

 

ব্লগ বা ব্লগিং আমাদের দেশে নতুন। শুধু আমাদের দেশেই না, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেও ব্লগ সংস্কৃতি এসেছে খুব বেশিদিন আগে নয়; কিন্তু এরই মাঝে এটি মিডিয়াজগতে কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একটা সময় পর্যন্ত ব্লগের ধারণা শুধু ব্যক্তিমানুষের লিখিত অনলাইন ডায়েরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আস্তে আস্তে এতে বহুমাত্রা যুক্ত হয়েছে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও অনেকে ব্লগের কথা জানতেন না। যারা ব্লগ লিখতেন, তাদের অধিকাংশ মূলত নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ ওয়েবে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সে অবস্থা থেকে ব্লগ এখন এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যেখানে ব্লগকে একটি আলাদা মিডিয়ার মর্যাদা দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্লগ মানুষের মত প্রকাশের অন্যতম একটি হাতিয়ার হিসেবেও দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ‘গণমাধ্যম’গুলোর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে– এগুলো মোটামুটি একরতফা বা একপাক্ষিক। সেখানে পাঠকের দিক থেকে লেখক বা বক্তার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ খুবই কম। কিন্তু ব্লগে লেখকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়, বক্তব্য পছন্দ বা অপছন্দ হলে তা সরাসরি বলা যায়। এমনকি লেখক ভুল তথ্য দিলে বা লেখায় অসততা থাকলে পাঠক সেখানে প্রতিবাদও জানাতে পারে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়ার এ চরিত্রটি মোটামুটি অনুপস্থিত। যে দুয়েকটি সীমিত ক্ষেত্রে পাঠক বা দর্শককে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, সেখানেও মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ ও সময় থাকে তুলনামূলকভাবে কম। আজকাল অবশ্য সংবাদমাধ্যমগুলোর কিছু কিছু তাদের ওয়েব সংস্করণে পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানার ব্যবস্থা যুক্ত করেছে, কিন্তু সেটিও আসলে একতরফা যোগাযোগ। পাঠকের মতামতের ওপর ভিত্তি করে লেখকের প্রতিক্রিয়া জানা যায় না, এমনকি ভুল তথ্য থাকলে লেখকের সেটি সংশোধনের সুযোগ নেই। ব্লগ এ সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।

 

ইন্ডিমিডিয়ার রিপোর্টাররা মনে করেন, কোনো সাংবাদিকতাই পক্ষপাতমুক্ত নয়। এই পক্ষপাতকে ধামাচাপা দেয়ার জন্যই মূলধারার সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার কথা এত বেশি উচ্চারিত হয়। এ ধরণের বিকল্প মাধ্যম তাদের পক্ষপাতকে লুকানোর চেষ্টা করে না। তাদের লক্ষ্য হলো সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে ফেলা। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাওয়া।

অন্যদিকে ২০১০ সালের শেষ দিকে মহাশক্তিধর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস। উইকিলিকস স্বেচ্ছাসেবী তথ্যদাতাদের সহায়তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গোপন সব নথি প্রকাশ করতে থাকে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরাট হৈ চৈ ফেলে দেয়। উইকিলিকস একাই মেইনস্ট্রিম ও প্রথাগত সাংবাদিকতাকে নিরর্থক বলে প্রমাণিত করেছে।

এবার একটু মুদ্রিত সংবাদপত্রের দিকটিতে চোখ বুলানো যাক। ব্রিটিশদের যতই আমরা গালি দেই, আমাদের অনেক কিছুই তাদের কাছে ধার করতে হয়েছে। ঠিক বিকল্প মিডিয়ার ধারণাটিও। বলা হয়ে থাকে, সাংবাদিকতার ইতিহাস যেখান থেকে বিকল্প মিডিয়ার ইতিহাসও সেখান থেকে শুরু। ইউরোপে যখন প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতে শিপিং, ব্যাংকিং, যুদ্ধ-সংঘাত এবং উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণীর চলমান ভাবনা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশিত হতো। বড়ো লোক শ্রেণীর এই পত্রপত্রিকার বিকল্প হিসেবে বরাবরই নানা ধরণের সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবে মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত শ্রমজীবী শ্রেণীর পত্রিকাকে বিকল্প মাধ্যমের সবচেয়ে বড় উদাহারণ হিসেবে দেখা হয়। এই সংবাদপত্রগুলো রেডিকাল প্রেস হিসেবে পরিচিত ছিল; এই প্রেস শ্রম, ধর্ম ও মানবাধিকার সম্পর্কে র‌্যাডিকাল ধারণা পোষণ করতো। এই প্রেস শ্রমজীবীদের স্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করতো এবং শ্রমজীবী শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধও করে তুলেছিলো। প্রকাশনা প্রযুক্তি তখন সস্তা ছিল, ফলে শ্রমজীবীদের মালিকানাতেই পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া সম্ভব ছিল। আর এই পত্রিকাগুলো তখন জনপ্রিয়ও ছিল। পুওর ম্যানস গার্ডিয়ান, ফ্রি ইনকোয়ারার, পিপলস পেপার ইত্যাদি র‌্যাডিকাল পত্রিকার সার্কুলেশন ছিল অনেক।

এসব পত্রিকা নিয়ন্ত্রণ করতো ব্রিটিশ সরকার কাগজের ওপর করারোপ করে, লাইসেন্স প্রথা চালু করে, প্রকাশকদের হেনস্থা করে। এসব করেও যখন বিকল্প মিডিয়াগুলোকে দমাতে পারা যায়নি । কিন্তু পুঁজিপতিদের অর্থের কাছে তার মানতে হয়েছে। হার মানতে হয়েছে বিজ্ঞাপননির্ভর পত্রিকাগুলোর কাছে। ১৯৬০এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিও জার্নলিজমের আবির্ভাব ঘটে। ‘ভিলেস ভয়েস’ নামক পত্রিকাতে এর ছাপ ছিল । কিন্তু এটি মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মারডকের করায়ত্ব হয়।

মূলধারা মিডিয়াগুলো যেখানে ব্যবসা কেন্দ্রীক। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে বিকল্প মাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে। অ-বাণিজ্যিক এ মিডিয়া দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার, প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা প্রভূতি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

গত শতাব্দির শুরু থেকে বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিকগণ (ফ্রাংকফুর্ট স্কুল থেকে ক্রিটিক্যাল রাজনৈতিক অর্থনীতিক পরম্বরা পর্যন্ত) পুজিবাদী ঘরানার গণমাধ্যম কাঠামোকে সমালোচনা করে এসেছেন। তারা দুটি দিক থেকে বিষয়গুলো বিশেষভাবে ফোকাস করেছেন- ১. গণমাধ্যম থেকে উৎসারিত পণ্য ও ২. গণমাধ্যমের আদর্শগত চরিত্র।

সাবজেকটিভ এপ্রোস এ বলা হয় যে, মিডিয়া এক্টররা কাজ করে এবং কিভাবে বিকল্প মিডিয়ার জন্ম দেয়। তারা যুক্তি দেন যে, , যদি মিডিয়ার আধেয় উৎপাদনে গণতান্ত্রিক প্রবেশাধিতার পাওয়া যায় যেখানে সাধারণ জনগণও তাদের কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারে তবেই মিডিয়া মুক্তভাবে সমাজের উপর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অবজেকটিভ এপ্রোস বেশি গুরুত্ব দেয় বিকল্প মিডিয়ার কাঠামোতে । তারা যুক্তি দেন যে, বিকল্প মাধ্যম পুজিবাদী কাঠামোর আদর্শগত চরিত্র বুঝতে সক্ষম এবং এটি পুজিবাদী কাঠামোর মিডিয়া চরিত্রকে বাতিল করে দিতে পারে ক্রিটিক্যাল মাধ্যম আধেয় সরবরাহ করার মাধ্যমে।

বর্তমান সময়ের তাত্ত্বিকরা বলেন যে, পুঁজিবাদী ঘরানার মিডিয়া কাঠামো যেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দু’টি শ্রেণীর তৈরি করে, সেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে আনুভূমিক সম্পর্ক তৈরি করে ভেদাভেদ রেখা উঠিয়ে দিতে চায়। অধিকাংশ মানুষ মিডিয়া দ্রব্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাহিরে থাকে। বিকল্প মিডিয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কেন্দ্রীভূত মিডিয়া সিস্টেম এবং পুঁজিবাদী গণমাধ্যমের ক্ষমতা।

 

কমিউনিটি মিডিয়া দৃষ্টিভঙ্গি সাবজেকটিভ ধরণের, কেননা তাদের অধিশ্রয়ণ বা ফোকাস হলো মিডিয়া উৎপাদনে অংশগ্রহণমূলক প্রবেশাধীকার এবং ব্যক্তিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। কমিউনিটি মিডিয়া কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং অপেশাদারীত্বের মাধ্যমে মিডিয়া উৎপাদন, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা করে। কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা-২০০৮ এ বলা হয়েছে, সংস্থাটি অবশ্যই অলাভজনক হতে হবে; কমিউনিটি রেডিও’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কমপক্ষে পাঁচ বছরের কমিউনিট পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বাংলাদেশে ১৪ টি কমিউনিটি রেডি চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি সরকারি মালিকানায় অপর ১৩টি পেয়েছে এনজিও। এনজিওদের কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এনজিওগুলো বেশ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা যে, কমিউনিটি রেডিওকে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা কী আদৌ আছে। বাকী ১টি তো সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। শাসকদের স্বার্থ বিরোধী কোনো কথা কী প্রচার হবে সেখানে? আমরা তো বর্তমান বিটিভির অবস্থা জানি। সরকারের উকালতি করাই তার কাজ। বিকল্প মিডিয়ার যে বৈশিষ্ট জনগণের হয়ে উকালতি করা তা কতটা সম্ভব তা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকে যায়।

বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই বিকল্প ধারার মিডিয়ার কথা জানা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় শাসক গোষ্ঠীর রোষনালে পোড়ার মাধ্যমে। ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকদের কুকর্ম জনসম্মুখে প্রকাশের জন্য ১৭৬৮ সালে উইলিয়ামস বোল্টস এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট মুদ্রাযন্ত্র ও সংবাদপত্র প্রকাশের বাসনা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তা বাস্তব হতে দেয়নি শাসকরা। বিরূপ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাকে জাহাজে চড়িয়ে ভারত থেকে তাড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। (পাল, তারাপদ ১৯৭২, ভারতের সংবাদপত্র’, অরোরো প্রিন্টার্স, ৫৭ শ্রীগোপাল মল্লিক লেন, কোলকাতা-১২)। এক যুগ পর প্রকাশিত হয় জেমস অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত ‘বেঙ্গল গেজেট’। এটিও ছিল তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধী । এরপর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ও বিভিন্ন বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশিত হয় বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। রঙ্গপুর বার্তাবহ, বরিশাল হিতৈষী, বরিশাল বার্তাবহ, স্বদেশ উল্লেখ যোগ্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়ও বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো পাকিস্তানী শাসকদের চ্যালেঞ্জ করে। সমাজ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয় সংবাদপত্রগুলো। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকের মত মূলধারার পত্রিকাগুলোও বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পরিস্থিতির চাপে। বর্তমানে এ ধারাবাহিকতায় কিছুটা স্বাক্ষর রাখছে বামপন্থি দলগুলোর কিছু পত্রিকা। ভ্যানগার্ড, সংহতির মত সাময়িকীগুলো বিকল্প মিডিয়ার আংশিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।

ইন্টারনেটের বিকাশের ফলে এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। দ্রত বিকশিত হতে তথ্য প্রযুক্তি। কিন্তু বিকল্প মিডিয়া তৈরিতে খানিকটা পিছিয়ে বাংলাদেশে। তবে আশার আলোও জ্বলছে। ইন্ডিমিডিয়ার মতো সংবাদনির্ভর বা জিনেটের মত বিশ্লেষণ নিভর সাইট এদেশে নেই। রাজনৈতিক ডক কম নামের একটি সাইট আছে যেটি একটু চেষ্টা করে বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ দিতে। কিন্তু থলের বেড়াল বের করতে কোন কাজ করে না। তাই শেষ ভরসা পড়ে সাইবার পরিসরে-ব্লগ, ফেসবুকের ওপর।

বিগত সেনাসমির্থত তত্ত্বাধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে, ২০০৮ সালের পিলখানা ট্রাজেডি নিয়ে ব্লগার ও ফেসবুকে তৎপর হয়ে ওঠে মুক্তকামী ব্যবহারকারীরা।

মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করে। বিকল্পমাধ্যম নীতির শৃঙ্খল ছিড়ে বের হয়ে আসতে চায়। স্বভাবই বিকল্প মাধ্যমগুলোর কোন নীতি মালা নেই। আমরা লক্ষ্য করছি যে, ভার্চুয়াল জগতের বিকল্প মিডিয়াগুলোতে ব্যক্তিগত আক্রোশ বেশ ভালোভাবে ওঠে আসছে। দেখা যাবে সমাজের জানার কোন প্রয়োজন নেই, তবুও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে। সেক্স স্ক্যান্ডাল এর অন্যতম উদাহরণ হতে পারে। ফলে বিশেষণাত্বক জায়গা থেকে বিকল্প মিডিয়াকে যেভাবে দেখা হয় বা তাত্ত্বিক ভাবে বিবেচনা করা হয় সে জায়গায় শক্ত শেকড় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

মূলধারার মাধ্যমসমূহ নিয়ে যে প্রশ্নটি প্রায়শ তোলা হয় সেটি হলো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। বিকল্প মিডিয়া নিয়েও একই ধরণের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এদেশে ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিকল্প মাধ্যমগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। যেহেতু বলাই হয়, এ মাধ্যমের অবস্থান হচ্ছে বিশাল অংশ জুড়ে ভার্চুয়াল বিশ্বে। একতো ইন্টারনেটে সাধাররণ মানুষের প্রবেশ ক্ষেত্র সীমিত অপরদিকে এ মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক কিছুই অদ্ভুতুড়ে।বলা হয়ে থাকে, বিকল্প মাধ্যমগুলো হবে বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু এই আর্দশ থেকে দূরে থেকে অনেক সময় এগুলো হয়ে ওঠে মূল স্রোতের মাধ্যমগুলোর মত আর্দশধর্মী। সামহোয়ার ইন ব্লগের প্রেক্ষাপটে, জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধকে অস্বীকার করা, মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা ইত্যাদি ধাঁচের জাতীয়তাবাদী পোস্ট দিয়ে শিবিরকর্মী পরিচয়দানকারী কিছু ব্লগার এই রাজনীতির জন্ম দেন। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব-এর ব্যবহারকারীদের অনেকে ভুয়া আইডি, পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে। রেইন গোল্ড বলেছেন- ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই। এটিএম শাসসুজ্জামানের মৃত্যুর সংবাদের কথা বলা যায়।

সরকার বিরোধী অবস্থান নিলে বন্ধ করে দেয়া হয়ে থাকে এ দেশে। এমন নজির আমরা দেখেছি। বিকল্প মাধ্যমগুলোর বিকাশ ও দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব বাঁধার মুখোমুখি হয় তাদের মধ্যে প্রধানতম হিসেবে সরকারি কড়াকড়িকে বিবেচনায় আনা যায়। ২০০৮ সালের ১৫ তারিখে সচলায়তন ব্লগে ঢোকা যায়নি। ব্লগটি সরকার ব্লক করে দিয়েছিলো। ২০০৯ সালের মার্চে ইউটিউব সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৯ মে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়। মহানবী (স) এর ব্যাঙ্গাত্মক বিষয় প্রকাশের জন্য বিআরটিসি ৭ দিন ধরে বন্ধ রাখে সাইটটি। গত ২২ মার্চ হাইকোর্ট আবারো ফেসুবুকের পাঁচটি পেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

 

বিকল্প মিডিয়া বিরুদ্ধে বিশেষ দলের হয়ে উকালতি করার অভিযোগ ওঠছে। বিকল্প মিডিয়াতে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার অবাধ চর্চার অবাধ সুযোগ রয়েছে। তবে কারা কিভাবে মাধ্যমটি ব্যবহার করছে বা হচ্ছে তার উপরই নির্ভর করে। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো- কোন রূপ বিবেচনা না করেই কোন কিছু প্রকাশ বা প্রচারিত করা হয়।

 

উন্নয়নের ‘চুইয়ে পড়া’ তত্ত্বে বলা হয় যে, কেন্দ্রকে আবর্তন করে করে উন্নয়ন প্রান্তের দিকে যাবে। যদি এমনটিই মনে করা হয়, তাহলেও এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে বিকল্প মাধ্যমগুলোতে এতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তয় ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমায় সেন্টমার্টিনের অপার প্রকৃতি দর্শন আর ভ্রমণে। নেই বিদ্যুৎ, নেই কম্পিউটার, নেই ইন্টারনেট সংযোগ। শুধু তাই নয়, বিকল্প মিডিয়া যেটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই শিক্ষারও দুর্দশা সেখানে। তাহলে কেমনভাবে উন্নয়ন হবে? বিকল্প মাধ্যমগুলো কী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে। এটা বলা যায় যে, এ দেশে এখনো বিকল্প মিডিয়া মাথা তুলে ধারাতে পারে নি। দাঁড়াতে পারেনি বলেই জনগণের হয়ে উকালতি করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।

 

বিকল্প মিডিয়ার ব্যবহারকারী বা যারা লেখেন তারা কোন শ্রেণীর? এটার উপরও নির্ভর করছে এর কাঠামো গড়ন। যারা এক্টর হিসেবে কাজ করছেন তারা কোন শ্রেণীতে অবস্থান করছে। তারা কি নি¤œ বর্গের? না তাদের অধিকাংশই সমাজের মর্যাদাসীন আসনের লোক। আমাদের দেশে আশ্চর্য একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। রাতে যারা বিকল্প ধারার মাধ্যমগুলোতে সময় দেন তারাই আবার দিনের বেলায় কাজ করেন মূলধারার মাধ্যমগুলোতে, যেগুলো হয়তো মূল কর্পোরেট হাউজ। ‘রাজধানী ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে ব্লগের তৃতীয় দিবস মিলন মেলায় অংশগ্রহণকারী দুজন ব্লগারের পরিচয় দিলেই বিষয়টি সহজে অনুমেয় হবে। ৩০০ বেশি ব্লগারের একজন মূল নাম জিয়াউদ্দিন সাইমুম। সাইমুম পরিচয়ের এ ব্লগার একটি অনলাইন বার্তায় কর্মরত। আরেকজন ব্লগ লিখেন শিপু ভাই নামে, তিনি ঢাকার একটি হাউজিং কোম্পানির ডিরেক্টর।’

বিকল্প মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমের মতো নয়। তবে রাজনীতিক ক্ষেত্র কিংবা যোগাযোগ তৈরিতে বিকল্প মাধ্যম কাজ করতে পারে।

উন্নয়নে বিকল্প মিডিয়া বাংলাদেশে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা নির্ভর করছে কারা এর এক্টর ও ব্যবহারকারী, সরকারের খড়গ আছে কী না, জনগণের প্রবেশাধিকার এখানে কতটুকু, তা কতটা কিভাবে বিশ্লেষণ করছে বিষয়বস্তুকে কিংবা সামজিক আন্দোলনে নিজেদেরকে নিয়োজিত করছে কীনা প্রভৃতি বিষয়ের উপর। আমরা আশা করতে পারি বাংলাদেশে বিকল্প মিডিয়া সামাজিক আন্দোলনে আরো বেশি নিজেদের ব্যাপৃত করবে, জনগণের হয়ে উকালতি করবে, বিশ্লেষণাত্বক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা নেয়া সহ রাজনৈতিক ভাবধারা থেকে উদারনৈতিক আচরণ দেখাবে। অতিমাত্রায় রাজনীতি অতিশ্রায়ণ ব্যক্তি থেকে সমষ্টিকে নিজেদেরকে আরো শক্তভাবে তুলে ধরতে বাধার সৃষ্টি করে। অ-বাণিজ্যিক ঘরানার এদেশের উন্নয়নে অসমান্য অবদান রাখুক এ প্রত্যাশা করছি। জয়তু, বিকল্প মিডিয়া।

 

গণমাধ্যম বলতে শুধু সংবাদপত্র, রেডিও বা টিভির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয; বর্তমানে বিকল্প গণমাধ্যম নামে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি গণমাধ্যমের আবির্ভাব হয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইউটিউবসহ মতপ্রকাশের নতুন মাধ্যম তৈরি হচ্ছে হরদম। এসব টুলসকে তরুণ প্রজন্ম নিজস্ব মতপ্রকাশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে এবং এটি বিস্তার লাভ করছে লক্ষণীয়ভাবে। এর বড় শক্তি— মতপ্রকাশের ক্ষমতা। রেডিও-টেলিভিশন বা খবরের কাগজে তথ্য দিলে সেটি প্রকাশ না হওয়ার শঙ্কা থাকে বেশি। সেখানে এক ধরনের গেট কিপিং থাকে। অনেক ধরনের প্রটোকল থাকে, মুখ চেনা অনেক মানুষের কথা ছাপা হয়। তাদের কথাই বলা হয় বেশি। কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে অবস্থানকারীদের মন্তব্য ও বক্তব্য দেয়ার সুযোগ থাকে না।

 

কিন্তু অনলাইন বা বিকল্প গণমাধ্যমের সুবিধা বেশি। যে ব্যক্তি এটি ব্যবহার করছেন, তিনি নিজেই তথ্য নির্মাণ করেন, নিজেই তা প্রকাশ করেন এবং নিজেই তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। তথ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে এ মাধ্যমে, যেটি মূলধারার গণমাধ্যমে অনুপস্থিত। আগে ছিল তথ্য উত্পাদন হবে এবং সেটি মেইন স্ট্রিম মিডিয়া প্রচার করতে পারে, না-ও পারে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণটা ছিল অন্যের হাতে। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারের সুযোগ পেত না। অথচ বিকল্প গণমাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তিরই তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। এ তথ্য তিনি নিজে উত্পাদন করেন, সেটি তিনি সম্পাদনাও করেন। তথ্য অন্যের সঙ্গে শেয়ারও করেন আবার মুছেও ফেলতে পারেন। অনলাইন মিডিয়ার তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাও বেশি। বলা চলে অমিত সম্ভাবনাময় এক মাধ্যম এটি। যে কেউ নিজের এবং অন্যের তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন এর সহায়তায়। এসব কারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে এটি সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়করভাবে মানুষের এমপাওয়ারমেন্ট ঘটে গেছে। বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তি প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আপতত মনে হতে পারে, এটি স্বার্থপরতা। তবে এর প্রমাণটা মিলছে না। ব্যক্তি নিজেই ক্ষমতাবান আবার ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে লিংকড হচ্ছেন বিকল্প গণমাধ্যমের সহায়তায়। নতুন মাধ্যমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই। ব্লগ বা ফেসবুকে তথ্য উত্পাদন করে সেটি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যদের মধ্যে। এখানে সামষ্টিকভাবে একজন ব্যক্তি অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবাই একটি সুতায় গাঁথা। এটি শুধু ভার্চুয়াল নয়। তিনি শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না এখন। অনলাইনের মধ্য দিয়ে তারা একটি চেতনা তৈরি করছেন। এটি আমরা দেখছি শাহবাগে সংঘটিত আন্দোলনে। বহু বছর ধরে এ অবস্থান তৈরি হয়েছে।

 

এক দিনে ডাক দিলে মানুষ শাহবাগে জড়ো হতো না। অনলাইন কিন্তু জামায়াত-শিবিররাও ব্যবহার করে। তারা কেন এমন আন্দোলন সংঘটন করতে পারল না? প্রশ্ন সেটিও। প্রযুক্তির শক্তি আছে। কিন্তু এটি ব্যবহার করে যদি মানুষের চেতনায় পরিবর্তন না আনা যায়, তাহলে সে পরিবর্তন সত্যিকারের পরিবর্তন হয়ে ওঠে না। প্রযুক্তি হচ্ছে বস্তুগত বিষয়। মূলে বিষয় হলো চেতনাগত পরিবর্তন। পাঁচ-সাত বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনলাইনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চেতনাগত পরিবর্তন হয়েছে এতে। এ কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভটা প্রসারিত হয়েছে বলে দ্রুতই শাহবাগে এসে অবস্থান নিতে পেরেছেন তরুণরা। তারা কেবল অনলাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। সত্যিকার স্থান রাজপথেও চলে এসেছেন। কম্পিউটার থেকে তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে স্থানাস্তর করেছে। নানা বিষয়ের সম্মিলন ঘটেছে এখানে।

কখনো বিকল্প মাধ্যমকে বিপ্লবী কখনো র‌্যাডিক্যাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার এ প্রত্যয়যুগল ভিন্নধর্মী দু’টো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখার প্রয়াস দেখা যায়।

ব্লগ বা ব্লগিং আমাদের দেশে নতুন। শুধু আমাদের দেশেই না, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেও ব্লগ সংস্কৃতি এসেছে খুব বেশিদিন আগে নয়; কিন্তু এরই মাঝে এটি মিডিয়াজগতে কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একটা সময় পর্যন্ত ব্লগের ধারণা শুধু ব্যক্তিমানুষের লিখিত অনলাইন ডায়েরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আস্তে আস্তে এতে বহুমাত্রা যুক্ত হয়েছে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও অনেকে ব্লগের কথা জানতেন না। যারা ব্লগ লিখতেন, তাদের অধিকাংশ মূলত নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণ ওয়েবে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সে অবস্থা থেকে ব্লগ এখন এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যেখানে ব্লগকে একটি আলাদা মিডিয়ার মর্যাদা দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্লগ মানুষের মত প্রকাশের অন্যতম একটি হাতিয়ার হিসেবেও দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ‘গণমাধ্যম’গুলোর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে– এগুলো মোটামুটি একরতফা বা একপাক্ষিক। সেখানে পাঠকের দিক থেকে লেখক বা বক্তার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ খুবই কম। কিন্তু ব্লগে লেখকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়, বক্তব্য পছন্দ বা অপছন্দ হলে তা সরাসরি বলা যায়। এমনকি লেখক ভুল তথ্য দিলে বা লেখায় অসততা থাকলে পাঠক সেখানে প্রতিবাদও জানাতে পারে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়ার এ চরিত্রটি মোটামুটি অনুপস্থিত। যে দুয়েকটি সীমিত ক্ষেত্রে পাঠক বা দর্শককে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, সেখানেও মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ ও সময় থাকে তুলনামূলকভাবে কম। আজকাল অবশ্য সংবাদমাধ্যমগুলোর কিছু কিছু তাদের ওয়েব সংস্করণে পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানার ব্যবস্থা যুক্ত করেছে, কিন্তু সেটিও আসলে একতরফা যোগাযোগ। পাঠকের মতামতের ওপর ভিত্তি করে লেখকের প্রতিক্রিয়া জানা যায় না, এমনকি ভুল তথ্য থাকলে লেখকের সেটি সংশোধনের সুযোগ নেই। ব্লগ এ সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।

 

ইন্ডিমিডিয়ার রিপোর্টাররা মনে করেন, কোনো সাংবাদিকতাই পক্ষপাতমুক্ত নয়। এই পক্ষপাতকে ধামাচাপা দেয়ার জন্যই মূলধারার সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার কথা এত বেশি উচ্চারিত হয়। এ ধরণের বিকল্প মাধ্যম তাদের পক্ষপাতকে লুকানোর চেষ্টা করে না। তাদের লক্ষ্য হলো সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে ফেলা। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাওয়া।

 

অন্যদিকে ২০১০ সালের শেষ দিকে মহাশক্তিধর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয় জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস। উইকিলিকস স্বেচ্ছাসেবী তথ্যদাতাদের সহায়তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গোপন সব নথি প্রকাশ করতে থাকে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরাট হৈ চৈ ফেলে দেয়। উইকিলিকস একাই মেইনস্ট্রিম ও প্রথাগত সাংবাদিকতাকে নিরর্থক বলে প্রমাণিত করেছে।

 

এবার একটু মুদ্রিত সংবাদপত্রের দিকটিতে চোখ বুলানো যাক। ব্রিটিশদের যতই আমরা গালি দেই, আমাদের অনেক কিছুই তাদের কাছে ধার করতে হয়েছে। ঠিক বিকল্প মিডিয়ার ধারণাটিও। বলা হয়ে থাকে, সাংবাদিকতার ইতিহাস যেখান থেকে বিকল্প মিডিয়ার ইতিহাসও সেখান থেকে শুরু। ইউরোপে যখন প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতে শিপিং, ব্যাংকিং, যুদ্ধ-সংঘাত এবং উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণীর চলমান ভাবনা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশিত হতো। বড়ো লোক শ্রেণীর এই পত্রপত্রিকার বিকল্প হিসেবে বরাবরই নানা ধরণের সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবে মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত শ্রমজীবী শ্রেণীর পত্রিকাকে বিকল্প মাধ্যমের সবচেয়ে বড় উদাহারণ হিসেবে দেখা হয়। এই সংবাদপত্রগুলো রেডিকাল প্রেস হিসেবে পরিচিত ছিল; এই প্রেস শ্রম, ধর্ম ও মানবাধিকার সম্পর্কে র‌্যাডিকাল ধারণা পোষণ করতো। এই প্রেস শ্রমজীবীদের স্বার্থে সংবাদ পরিবেশন করতো এবং শ্রমজীবী শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধও করে তুলেছিলো। প্রকাশনা প্রযুক্তি তখন সস্তা ছিল, ফলে শ্রমজীবীদের মালিকানাতেই পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া সম্ভব ছিল। আর এই পত্রিকাগুলো তখন জনপ্রিয়ও ছিল। পুওর ম্যানস গার্ডিয়ান, ফ্রি ইনকোয়ারার, পিপলস পেপার ইত্যাদি র‌্যাডিকাল পত্রিকার সার্কুলেশন ছিল অনেক।

 

এসব পত্রিকা নিয়ন্ত্রণ করতো ব্রিটিশ সরকার কাগজের ওপর করারোপ করে, লাইসেন্স প্রথা চালু করে, প্রকাশকদের হেনস্থা করে। এসব করেও যখন বিকল্প মিডিয়াগুলোকে দমাতে পারা যায়নি । কিন্তু পুঁজিপতিদের অর্থের কাছে তার মানতে হয়েছে। হার মানতে হয়েছে বিজ্ঞাপননির্ভর পত্রিকাগুলোর কাছে। ১৯৬০এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিও জার্নলিজমের আবির্ভাব ঘটে। ‘ভিলেস ভয়েস’ নামক পত্রিকাতে এর ছাপ ছিল । কিন্তু এটি মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মারডকের করায়ত্ব হয়।

 

মূলধারা মিডিয়াগুলো যেখানে ব্যবসা কেন্দ্রীক। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে বিকল্প মাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে। অ-বাণিজ্যিক এ মিডিয়া দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার, প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা প্রভূতি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

 

গত শতাব্দির শুরু থেকে বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিকগণ (ফ্রাংকফুর্ট স্কুল থেকে ক্রিটিক্যাল রাজনৈতিক অর্থনীতিক পরম্বরা পর্যন্ত) পুজিবাদী ঘরানার গণমাধ্যম কাঠামোকে সমালোচনা করে এসেছেন। তারা দুটি দিক থেকে বিষয়গুলো বিশেষভাবে ফোকাস করেছেন- ১. গণমাধ্যম থেকে উৎসারিত পণ্য ও ২. গণমাধ্যমের আদর্শগত চরিত্র।

 

সাবজেকটিভ এপ্রোস এ বলা হয় যে, মিডিয়া এক্টররা কাজ করে এবং কিভাবে বিকল্প মিডিয়ার জন্ম দেয়। তারা যুক্তি দেন যে, , যদি মিডিয়ার আধেয় উৎপাদনে গণতান্ত্রিক প্রবেশাধিতার পাওয়া যায় যেখানে সাধারণ জনগণও তাদের কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারে তবেই মিডিয়া মুক্তভাবে সমাজের উপর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অবজেকটিভ এপ্রোস বেশি গুরুত্ব দেয় বিকল্প মিডিয়ার কাঠামোতে । তারা যুক্তি দেন যে, বিকল্প মাধ্যম পুজিবাদী কাঠামোর আদর্শগত চরিত্র বুঝতে সক্ষম এবং এটি পুজিবাদী কাঠামোর মিডিয়া চরিত্রকে বাতিল করে দিতে পারে ক্রিটিক্যাল মাধ্যম আধেয় সরবরাহ করার মাধ্যমে।

 

বর্তমান সময়ের তাত্ত্বিকরা বলেন যে, পুঁজিবাদী ঘরানার মিডিয়া কাঠামো যেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দু’টি শ্রেণীর তৈরি করে, সেখানে উৎপাদনকারী ও ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে আনুভূমিক সম্পর্ক তৈরি করে ভেদাভেদ রেখা উঠিয়ে দিতে চায়। অধিকাংশ মানুষ মিডিয়া দ্রব্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাহিরে থাকে। বিকল্প মিডিয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কেন্দ্রীভূত মিডিয়া সিস্টেম এবং পুঁজিবাদী গণমাধ্যমের ক্ষমতা।

 

কমিউনিটি মিডিয়া দৃষ্টিভঙ্গি সাবজেকটিভ ধরণের, কেননা তাদের অধিশ্রয়ণ বা ফোকাস হলো মিডিয়া উৎপাদনে অংশগ্রহণমূলক প্রবেশাধীকার এবং ব্যক্তিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। কমিউনিটি মিডিয়া কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং অপেশাদারীত্বের মাধ্যমে মিডিয়া উৎপাদন, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা করে। কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা-২০০৮ এ বলা হয়েছে, সংস্থাটি অবশ্যই অলাভজনক হতে হবে; কমিউনিটি রেডিও’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কমপক্ষে পাঁচ বছরের কমিউনিট পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বাংলাদেশে ১৪ টি কমিউনিটি রেডি চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি সরকারি মালিকানায় অপর ১৩টি পেয়েছে এনজিও। এনজিওদের কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এনজিওগুলো বেশ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা যে, কমিউনিটি রেডিওকে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা কী আদৌ আছে। বাকী ১টি তো সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। শাসকদের স্বার্থ বিরোধী কোনো কথা কী প্রচার হবে সেখানে? আমরা তো বর্তমান বিটিভির অবস্থা জানি। সরকারের উকালতি করাই তার কাজ। বিকল্প মিডিয়ার যে বৈশিষ্ট জনগণের হয়ে উকালতি করা তা কতটা সম্ভব তা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকে যায়।

 

বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই বিকল্প ধারার মিডিয়ার কথা জানা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় শাসক গোষ্ঠীর রোষনালে পোড়ার মাধ্যমে। ব্রিটিশ বেনিয়া শাসকদের কুকর্ম জনসম্মুখে প্রকাশের জন্য ১৭৬৮ সালে উইলিয়ামস বোল্টস এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট মুদ্রাযন্ত্র ও সংবাদপত্র প্রকাশের বাসনা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তা বাস্তব হতে দেয়নি শাসকরা। বিরূপ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাকে জাহাজে চড়িয়ে ভারত থেকে তাড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। (পাল, তারাপদ ১৯৭২, ভারতের সংবাদপত্র’, অরোরো প্রিন্টার্স, ৫৭ শ্রীগোপাল মল্লিক লেন, কোলকাতা-১২)। এক যুগ পর প্রকাশিত হয় জেমস অগাস্টাস হিকি সম্পাদিত ‘বেঙ্গল গেজেট’। এটিও ছিল তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধী । এরপর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ও বিভিন্ন বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশিত হয় বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। রঙ্গপুর বার্তাবহ, বরিশাল হিতৈষী, বরিশাল বার্তাবহ, স্বদেশ উল্লেখ যোগ্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়ও বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো পাকিস্তানী শাসকদের চ্যালেঞ্জ করে। সমাজ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয় সংবাদপত্রগুলো। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকের মত মূলধারার পত্রিকাগুলোও বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করে পরিস্থিতির চাপে। বর্তমানে এ ধারাবাহিকতায় কিছুটা স্বাক্ষর রাখছে বামপন্থি দলগুলোর কিছু পত্রিকা। ভ্যানগার্ড, সংহতির মত সাময়িকীগুলো বিকল্প মিডিয়ার আংশিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।

 

ইন্টারনেটের বিকাশের ফলে এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। দ্রত বিকশিত হতে তথ্য প্রযুক্তি। কিন্তু বিকল্প মিডিয়া তৈরিতে খানিকটা পিছিয়ে বাংলাদেশে। তবে আশার আলোও জ্বলছে। ইন্ডিমিডিয়ার মতো সংবাদনির্ভর বা জিনেটের মত বিশ্লেষণ নির্ভর সাইট এদেশে নেই। রাজনৈতিক ডক কম নামের একটি সাইট আছে যেটি একটু চেষ্টা করে বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ দিতে। কিন্তু থলের বেড়াল বের করতে কোন কাজ করে না। তাই শেষ ভরসা পড়ে সাইবার পরিসরে-ব্লগ, ফেসবুকের ওপর।

 

আপাতত সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রেও জন্য ব্লগাররা বা অনলাইন কমিউটিটির সদস্যরা তৎপর বলে পর্যবেক্ষণে প্রতিভাত হয়েছে। রেলওয়েমন্ত্রীর এপিএসের গাড়ি থেকে ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার, ভিকারুননেসা স্কুলের স্ক্যান্ডাল বা চাপাই নবাবগঞ্জের গরুব্যবসায়ীকে বিএসএফের নির্মম নির্যাতনের ঘটনা সাইবার জগতে ঝড় তুলেছে। সম্প্রতি সীমান্তে ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর বাংলাদেশীদের উপর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকা- তরুণ সমাজ জেগে উঠে ব্লগ-ফেসবুকের এক আহবানে।

 

বিগত সেনাসমির্থত তত্ত্বাধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে, ২০০৮ সালের পিলখানা ট্রাজেডি নিয়ে ব্লগার ও ফেসবুকে তৎপর হয়ে ওঠে মুক্তকামী ব্যবহারকারীরা।

 

মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করে। বিকল্পমাধ্যম নীতির শৃঙ্খল ছিড়ে বের হয়ে আসতে চায়। স্বভাবই বিকল্প মাধ্যমগুলোর কোন নীতি মালা নেই। আমরা লক্ষ্য করছি যে, ভার্চুয়াল জগতের বিকল্প মিডিয়াগুলোতে ব্যক্তিগত আক্রোশ বেশ ভালোভাবে ওঠে আসছে। দেখা যাবে সমাজের জানার কোন প্রয়োজন নেই, তবুও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে। সেক্স স্ক্যান্ডাল এর অন্যতম উদাহরণ হতে পারে। ফলে বিশেষণাত্বক জায়গা থেকে বিকল্প মিডিয়াকে যেভাবে দেখা হয় বা তাত্ত্বিক ভাবে বিবেচনা করা হয় সে জায়গায় শক্ত শেকড় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

মূলধারার মাধ্যমসমূহ নিয়ে যে প্রশ্নটি প্রায়শ তোলা হয় সেটি হলো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতা। বিকল্প মিডিয়া নিয়েও একই ধরণের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এদেশে ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিকল্প মাধ্যমগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। যেহেতু বলাই হয়, এ মাধ্যমের অবস্থান হচ্ছে বিশাল অংশ জুড়ে ভার্চুয়াল বিশ্বে। একতো ইন্টারনেটে সাধাররণ মানুষের প্রবেশ ক্ষেত্র সীমিত অপরদিকে এ মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক কিছুই অদ্ভুতুড়ে।বলা হয়ে থাকে, বিকল্প মাধ্যমগুলো হবে বিশ্লেষণধর্মী। কিন্তু এই আর্দশ থেকে দূরে থেকে অনেক সময় এগুলো হয়ে ওঠে মূল স্রোতের মাধ্যমগুলোর মত আর্দশধর্মী। সামহোয়ার ইন ব্লগের প্রেক্ষাপটে, জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধকে অস্বীকার করা, মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা ইত্যাদি ধাঁচের জাতীয়তাবাদী পোস্ট দিয়ে শিবিরকর্মী পরিচয়দানকারী কিছু ব্লগার এই রাজনীতির জন্ম দেন। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব-এর ব্যবহারকারীদের অনেকে ভুয়া আইডি, পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে। রেইন গোল্ড বলেছেন- ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই। এটিএম শাসসুজ্জামানের মৃত্যুর সংবাদের কথা বলা যায়।

 

সরকার বিরোধী অবস্থান নিলে বন্ধ করে দেয়া হয়ে থাকে এ দেশে। এমন নজির আমরা দেখেছি। বিকল্প মাধ্যমগুলোর বিকাশ ও দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব বাঁধার মুখোমুখি হয় তাদের মধ্যে প্রধানতম হিসেবে সরকারি কড়াকড়িকে বিবেচনায় আনা যায়। ২০০৮ সালের ১৫ তারিখে সচলায়তন ব্লগে ঢোকা যায়নি। ব্লগটি সরকার ব্লক করে দিয়েছিলো। ২০০৯ সালের মার্চে ইউটিউব সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৯ মে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হয়। মহানবী (স) এর ব্যাঙ্গাত্মক বিষয় প্রকাশের জন্য বিআরটিসি ৭ দিন ধরে বন্ধ রাখে সাইটটি। গত ২২ মার্চ হাইকোর্ট আবারো ফেসুবুকের পাঁচটি পেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

 

বিকল্প মিডিয়া বিরুদ্ধে বিশেষ দলের হয়ে উকালতি করার অভিযোগ ওঠছে। বিকল্প মিডিয়াতে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার অবাধ চর্চার অবাধ সুযোগ রয়েছে। তবে কারা কিভাবে মাধ্যমটি ব্যবহার করছে বা হচ্ছে তার উপরই নির্ভর করে। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো- কোন রূপ বিবেচনা না করেই কোন কিছু প্রকাশ বা প্রচারিত করা হয়।

 

উন্নয়নের ‘চুইয়ে পড়া’ তত্ত্বে বলা হয় যে, কেন্দ্রকে আবর্তন করে করে উন্নয়ন প্রান্তের দিকে যাবে। যদি এমনটিই মনে করা হয়, তাহলেও এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে বিকল্প মাধ্যমগুলোতে এতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তয় ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমায় সেন্টমার্টিনের অপার প্রকৃতি দর্শন আর ভ্রমণে। নেই বিদ্যুৎ, নেই কম্পিউটার, নেই ইন্টারনেট সংযোগ। শুধু তাই নয়, বিকল্প মিডিয়া যেটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই শিক্ষারও দুর্দশা সেখানে। তাহলে কেমনভাবে উন্নয়ন হবে? বিকল্প মাধ্যমগুলো কী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে। এটা বলা যায় যে, এ দেশে এখনো বিকল্প মিডিয়া মাথা তুলে ধারাতে পারে নি। দাঁড়াতে পারেনি বলেই জনগণের হয়ে উকালতি করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।

 

বিকল্প মিডিয়ার ব্যবহারকারী বা যারা লেখেন তারা কোন শ্রেণীর? এটার উপরও নির্ভর করছে এর কাঠামো গড়ন। যারা এক্টর হিসেবে কাজ করছেন তারা কোন শ্রেণীতে অবস্থান করছে। তারা কি নি¤œ বর্গের? না তাদের অধিকাংশই সমাজের মর্যাদাসীন আসনের লোক। আমাদের দেশে আশ্চর্য একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। রাতে যারা বিকল্প ধারার মাধ্যমগুলোতে সময় দেন তারাই আবার দিনের বেলায় কাজ করেন মূলধারার মাধ্যমগুলোতে, যেগুলো হয়তো মূল কর্পোরেট হাউজ। ‘রাজধানী ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে ব্লগের তৃতীয় দিবস মিলন মেলায় অংশগ্রহণকারী দুজন ব্লগারের পরিচয় দিলেই বিষয়টি সহজে অনুমেয় হবে। ৩০০ বেশি ব্লগারের একজন মূল নাম জিয়াউদ্দিন সাইমুম। সাইমুম পরিচয়ের এ ব্লগার একটি অনলাইন বার্তায় কর্মরত। আরেকজন ব্লগ লিখেন শিপু ভাই নামে, তিনি ঢাকার একটি হাউজিং কোম্পানির ডিরেক্টর।’

 

বিকল্প মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমের মতো নয়। তবে রাজনীতিক ক্ষেত্র কিংবা যোগাযোগ তৈরিতে বিকল্প মাধ্যম কাজ করতে পারে।

 

ভিয়েতনামে সামাজিক যোগাযোগ ও সামাজিক মাধ্যম বিশেষত ব্লগ গত কয়েক বছরে বেশ বিকাশ লাভ করেছে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ ব্লগারই ছিলো অজ্ঞাত, যারা নিজেদের পরিচয় দিতে চায়নি। তারা মূলত সরকারি কতৃপক্ষের দ্বারা প্রত্যাঘাত হবার বা জেলার যাবার ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ব্লগারদের পোষ্টগুলোকে ব্যক্তিগত আধেয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাপ দেয় এবং রাজনীতি ও অন্যান্য ইস্যু যা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তাকে আঘাত করে, অরাজকতা তৈরি করে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে- তা নিষিদ্ধ করে। ভিয়েতনামের সকল আইপি এড্রেস সরকারি মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট সার্ভিসেস দ্বারা যোগান দেয়া হয়ে থাকে।

 

উন্নয়নে বিকল্প মিডিয়া বাংলাদেশে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা নির্ভর করছে কারা এর এক্টর ও ব্যবহারকারী, সরকারের খড়গ আছে কী না, জনগণের প্রবেশাধিকার এখানে কতটুকু, তা কতটা কিভাবে বিশ্লেষণ করছে বিষয়বস্তুকে কিংবা সামজিক আন্দোলনে নিজেদেরকে নিয়োজিত করছে কীনা প্রভৃতি বিষয়ের উপর। আমরা আশা করতে পারি বাংলাদেশে বিকল্প মিডিয়া সামাজিক আন্দোলনে আরো বেশি নিজেদের ব্যাপৃত করবে, জনগণের হয়ে উকালতি করবে, বিশ্লেষণাত্বক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা নেয়া সহ রাজনৈতিক ভাবধারা থেকে উদারনৈতিক আচরণ দেখাবে। অতিমাত্রায় রাজনীতি অতিশ্রায়ণ ব্যক্তি থেকে সমষ্টিকে নিজেদেরকে আরো শক্তভাবে তুলে ধরতে বাধার সৃষ্টি করে। অ-বাণিজ্যিক ঘরানার এদেশের উন্নয়নে অসমান্য অবদান রাখুক এ প্রত্যাশা করছি। জয়তু, বিকল্প মিডিয়া।

ছড়িয়ে দিন