বিচারকের পর্যবেক্ষণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা

প্রকাশিত: ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০১৭

বিচারকের পর্যবেক্ষণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা

হাই কোর্টের রায়ে এক বিচারকের পর্যবেক্ষণে আট বছর আগে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে সংঘটিত বিদ্রোহের পেছনে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ ছিল উল্লেখ করা হয়েছে । এক ই সঙ্গে সে সময় শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়েছে ।আলোচিত এই মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেছেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পূর্বাপর আলোচনা ও পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, এ ঘটনা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। শুধু তাই নয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি দক্ষ, প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ধ্বংসেরও চেষ্টা।

কিন্তু ধ্বংসের সে চক্রান্ত রুখে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। সদ্য নির্বাচিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে বিদ্রোহ দমনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।”

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ডের এই মামলার আপিলের রায় রোববার দেওয়া শুরু করেছে হাই কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। এদিন বেঞ্চের বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতি মো. শওকত হোসেন তার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পর বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

সোমবার বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার তার পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পর মূল রায় (আদেশের অংশ) দেওয়া শুরু হবে। পর্যবেক্ষণ আলাদাভাবে দিলেও দণ্ডাদেশের মূল রায়টি সর্বসম্মতভাবে দেওয়া হবে বলে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক শওকত হোসেন জানিয়েছেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসার পরের মাসেই বিডিআরে বিদ্রোহ দেখা দেয়। ঢাকার পিলখানায় বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে মারা যান ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহে বেসামরিক ব্যক্তিসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল জওয়ানদের বিদ্রোহ।

বিদ্রোহের মামলায় বিডিআর বাহিনীর বিশেষ আদালতে ৬ হাজার জওয়ানের কারাদণ্ডের পর পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের মামলাটির বিচার শুরু হয় সাধারণ আদালতে।

ঢাকার জজ আদালত ২০১৩ সালে এ মামলার রায়ে ৮৫০ আসামির মধ্যে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এছাড়া ২৫৬ আসামিকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের অনুমতি (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিল এরপর আসে হাই কোর্টে। শুনানি শেষ হওয়ার সাত মাস পর হাই কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ রোববার রায় দেওয়া শুরু করে।

বিচারিক আদালতে রায়ের পর্যবেক্ষণে ঢাকার জজ মো. আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহের পেছনে অর্থনৈতিক ‘মোটিভ’ ছিল। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ‘মোটিভও’ থাকতে পারে।”

তিনি বলেছিলেন, “সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধ্বংস করার মোটিভ নিয়ে এই বিদ্রোহের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের দেশকে ছোট করা, বিদেশি বিনিয়োগ না আসার জন্য কলকাঠি নাড়া হয়েছে।

“আদালত মনে করে, দেশের ‘অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড’ দুর্বল করার জন্য ওই বিদ্রোহ ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। আর সশস্ত্র বাহিনীকে নিরুৎসাহিত করাও এর একটি কারণ হতে পারে।”

জজ আখতারুজ্জামান পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ‘অপারেশন ডালভাত’ কর্মসূচিতে বিডিআরকে জড়ানো ঠিক হয়নি।

এই বিদ্রোহের তথ্য আগে জানতে না পারার ঘটনায় ‘গোয়েন্দা দুর্বলতা’ ছিল বলেও বিচারিক আদালতের মন্তব্য ছিল।

বিএনপি নেতাসহ সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা তখন দাবি করেছিলেন, বিদ্রোহ সামলাতে সরকারের পদক্ষেপ যথাযথ ছিল না। ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে সেনাবাহিনীকে অভিযান চালাতে দিলে অনেককে বাঁচানো যেত।

আপিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, “বিডিআর বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে যে কোনো মূল্যে তাদের দাবি আদায় করা। বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করে এই সুশৃঙ্খল বাহিনীকে অকার্যকর করা। সেনাবাহিনী-বিডিআরকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মাধ্যমে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীলতায় নিপতিত করা। এমনকি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত করা।”

আপিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক শওকত হোসেন স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বিভিন্ন সময়ে এই আধা সামরিক বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, জওয়ানরা ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে দেশের আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্তান্তে লিপ্ত হয়।

এমনকি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াসহ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের উপর প্রত্যক্ষ হুমকির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের ইতিহাসকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। এই কলঙ্কের চিহ্ন তাদের বহুকাল বহন করতে হবে।