ঢাকা ১৪ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


বিজিএমইএর নির্বাচন নতুন ইতিহাস রচনা করলেন রুবানা হক

redtimes.com,bd
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০১৯, ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ
বিজিএমইএর নির্বাচন নতুন ইতিহাস রচনা করলেন রুবানা হক

নতুন ইতিহাস রচনা করলেন মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক ।
বিজিএমইএর নির্বাচনে রুবানা হকের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত পরিষদ-ফোরাম প্যানেলের সবাই জয়ী হয়েছেন। এই সংগঠনের প্রথম নারী সভাপতি হচ্ছেন তিনি ।

কারওয়ানবাজারে বিজিএমইএ ভবনে শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়।

ভোট গণনা শেষে রাত সাড়ে ৯টায় নির্বাচন কমিশনার জাহাঙ্গীর আলামিন ফল ঘোষণা করেন। বিজিএমইএর পরিচালনা পর্ষদের ২৬টি (ঢাকার) পদের সব কয়টিতে রুবানা নেতৃত্বাধীন প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন বলে জানান তিনি।

এর বাইরে সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদে চট্টগ্রামের জন্য সংরক্ষিত নয়টি পদে একক প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তারা সবাই সম্মিলিত পরিষদ-ফোরাম-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বিজিএমইএর পরিচালনা পর্ষদের সব কয়টি পদই এই প্যানেলের হওয়ায় রুবানা হকের সংগঠনটির সভাপতি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। আগামী দুই বছরের সংগঠনটির নেতৃত্বে আসছেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুলের স্ত্রী রুবানাই হচ্ছেন বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতি। গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আনিসুলও এক সময় এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।

বিজিএমইএর নেতা নির্বাচন পদ্ধতি অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের ৩৫ পরিচালক নির্বাচন করেন সাধারণ সদস্যরা। পরে নির্বাচিত পরিচালকরা একজন সভাপতি এবং ৭ জন সহসভাপতি নির্বাচিত করে থাকেন।

বিজিএমইএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসা সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম সমঝোতার মাধ্যমে সম্মিলিত পরিষদ-ফোরাম প্যানেল দেয়, যার নেতা নির্বাচন করা হয় রুবানা হককে।

নির্বাচনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল ডিএসএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা পরিষদ, যারা ফোরাম ও সম্মিলিত পরিষদের আধিপত্য ভাঙতে ভোটের দাবিতে অনড় ছিলেন।
ফলাফল ঘোষণা মঞ্চে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের নেতারা ফলাফল ঘোষণা মঞ্চে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের নেতারা এই প্রথম ভোটে অংশ নেওয়া স্বাধীনতা পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে প্রার্থী করতে পারেনি। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে তাদের কোনো এজেন্টও ছিল না। সকালে দুজন এজেন্ট বুথে এলেও কিছুক্ষণের মধ্যে তারা চলে যান।
এই প্যানেলের ১৮জন প্রার্থীর কেউই জয়ী হতে পারেননি।

বিজিএমইএ নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর জানিয়েছেন, বিজিএমইএর ১ হাজার ৯৫৬ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন। ভোটের হার ৭৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৯৯টি ভোট বাদ পড়েছে।

চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, রুবানা হক ১২৮০ ভোট, আব্দুর রহিম ১২৯৫ ভোট, মো. নাছির উদ্দিন ১২২৮ ভোট, আসিফ ইব্রাহিম ১১২৭ ভোট, আরশাদ জামাল দিপু ১২৬৮ ভোট, কে এম রফিকুল ইসলাম ১২৬৭ ভোট, মশিউল আজম ১২৫৬ ভোট, ইনামুল হক খান ১২৬৩ ভোট, রেদওয়ান সেলিম ১২২৭ ভোট, কামাল উদ্দিন ১২২৪ ভোট, মোহাম্মদ নাছির ১২২৩ ভোট, সাজ্জাদুর রহমান মৃধা ১২২১ ভোট, শহীদুল হক মুকুল ১২০৭ ভোট, মাসুদ কাদের মনা ১১৮৭ ভোট, ইকবাল হামিদ কোরাইশী ১২০১ ভোট, ফয়সাল সামাদ ১১২৪ ভোট, মুনির হোসাইন ১২১৮ ভোট, এ কে এম বদিউল আলম ১২১৬ ভোট, মিরান আলী ১২৫৭ ভোট, মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ১২০৮ ভোট, মোশাররফ হোসেন ঢালী ১১৭৪ ভোট, শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী ১১৯৬ ভোট, মহিউদ্দিন রুবেল ১২৩৭ ভোট, এসএম মান্নান কচি ১১৭৩ ভোট, শরীফ জহির ১১৭৩ ভোট এবং নজরুল ইসলাম ১১৪৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই প্যানেলের বিজয়ীরা হলেন- মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, এ এম চৌধুরী, এ এম মাহবুব চৌধুরী, এনামুল আজিজ চৌধুরী, মোহাম্মদ আতিক, খন্দকার বেলায়েত হোসেন, অঞ্জন শেখর দাশ, মোহাম্মদ মুছা ও মোহাম্মদ মেরাজ-ই-মোস্তফা।

অপরদিকে স্বাধীনতা পরিষদ প্যানেলের জাহাঙ্গীর আলম ৪২২ ভোট, সাইফুল ইসলাম ৩০৭ ভোট, দেলোয়ার হোসেন ২৭৫ ভোট, খন্দকার ফরিদুল আকবর ২৬৩ ভোট, হুমায়ুন রশিদ ২৫০ ভোট, কাজী আব্দুস সোবহান ২৪৭ ভোট, শওকত হোসেন ২৪৩ ভোট, শরীফুল আলম ২৩৭ ভোট, মেহয্যাবীন মমতাজ ২৩৩ ভোট, হোসেন সাব্বির মাহমুদ ২২৭ ভোট, আয়েশা আক্তার ২২০ ভোট, মাহমুদ হোসেন ২১৩ ভোট, ওমার নাজিম হেকমত ২১২ ভোট, জাহাঙ্গীর কবির ২১০ ভোট, জাহিদ হাসান ২০৮ ভোট, ওয়ালীউল্যাহ ১৯৯ ভোট ও জহিরুল ইসলাম ১৯৭ ভোট পেয়েছেন।

আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার সময় বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলামিন, পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর, সম্মিলিত ফোরামের প্যানেল নেতা রুবানা হক ও স্বাধীনতা পরিষদের প্যানেল নেতা জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন ।

নির্বাচনে এজেন্ট নিয়ে অভিযোগ থাকলেও নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম।

ভোট চলাকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ভেতরে আমাদের একজন এজেন্টও নেই। এই হল নির্বাচনের অবস্থা। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে খুশি বলতেই হবে। ভোটাররা এসে সুন্দর ও নির্বিঘ্নভাবে ভোট দিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনটা হচ্ছে, অন্তত এই কথা ভেবেই আমি খুশি।”

এজেন্ট কেন দেওয়া সম্ভব হয়নি- প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা ৯ জনের একটা তালিকা দিয়েছিলাম এজেন্ট করার জন্য। সেখানে দুজন ছাড়া বাকিরা সবাই নির্বাচনে পরিচালক পদপ্রার্থী। প্রার্থীদেরকে যে এজেন্ট করা যাবে না, এই কথা কোথাও উল্লেখ নেই। তবুও কমিশন তাদের এজেন্ট হিসাবে বিবেচনা করেনি।”

রুবানার কর্মপরিকল্পনা

বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের পোশাকখাতের ভাবমূর্তি নিয়ে কাজ করবেন বলে জানান রুবানা হক।

তিনি বলেন, “প্রথম কাজ হবে পোশাক খাতের ভাবমূর্তির ঘাটতি কাটিয়ে উঠা। বাংলাদেশ সস্তায় পণ্য দিচ্ছে বলে যে কথা প্রচলিত আছে সেটা বদলাতে হবে। সস্তায় কখনও ভালো জিনিস হয় না। শব্দটি হবে ‘কম্পারেটিভলি গুড প্রাইস’, সেই ট্রেন্ড চালু করতে আমাদের কাজ করতে হবে। দামের ব্যাপারে দর কষাকষিতে কখনই ছাড় দেওয়া যাবে না। বিজিএমইএ থেকে আমি এবং আমার প্যানেল সেই লক্ষ্যে কাজ করার উদ্যোগ নিতে পারি।

“যদি ফ্যাক্টরিগুলো মনে করে, দর কষাকষির ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য লাগবে আমরা তাহলে অবশ্যই নেগোসিয়েট করে দেব। সেটার জন্য আমরা আলাদা একটা সেল করব।”

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্পর্কে নিজের ভাবনা তুলে ধরে রুবানা হক বলেন, “ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাদের সবার কষ্ট হচ্ছে। অতিসত্বর তাদের পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে। কিছু দিন পর পর বেতন দিতে পারছেন না বলে আপনারা শুনতে পাচ্ছেন। এর ফলে অনেক ভদ্রলোক অনেক কষ্ট পাচ্ছেন। তাদের উত্তরণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পকে কী করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।”
সব কারখানাকে নিরাপদ করতে কাজ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে শেয়ার্ড বিল্ডিং গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আমাদের ছোট ছোট তিন লাইন, চার লাইনের ফ্যাক্টরিগুলোর অনেক শেয়ার্ড বিল্ডিং আছে। এসব ফ্যাক্টরির ফায়ার এবং ইলেক্ট্রিক্যাল সেইফটিটা যেন নিশ্চিত হয় সেই লক্ষ্যে আমাদের করণীয় আছে।”

ভবিষ্যতে পোশাক খাতে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান রুবানা।

“এই সেক্টরে একেবারেই স্বচ্ছতার প্রয়োজন আছে। গণমাধ্যম যদি আমাদের সঙ্গে থাকে এবং আমরা দুই পক্ষ যদি এক হয়ে কাজ করি তাহলে আমি নিশ্চিত, এই সেক্টরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে একেবারেই সময় লাগবে না।”

গার্মেন্ট মালিকদের প্রতি আহ্বান রেখে তিনি বলেন, “নিজেরা যেন একজন অন্যের বিরুদ্ধে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হই সেটাই হবে চ্যালেঞ্জ। সঠিক দামে পৌঁছাতে না পারলেও ফ্যাক্টরির চাকা চলতে হবে বলে অল্প দামে অর্ডার নিয়ে নেওয়া ঠিক হবে না। এই জায়গাটায় আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ ক্রেতারা যতই বলুক উনারা চলে যাবেন, আসলে উনারা যেতে পারবেন না। কারণ বাংলাদেশের মতো এমন দাম অন্য কোনো দেশ অফার করতে পারবে না।”

কারখানার নিরাপত্তার বিষয়ে বিদেশি ক্রেতাদের তদারকি প্রতিষ্ঠান অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সকে ‘শিগগিরই’ আদালতের নির্দেশ মেনে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আহ্বান জানান রুবানা হক।

তিনি বলেন, “অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স আমাদের জন্য অনেক করেছে, সেজন্য আমরা তাদের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন আমাদের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ কারখানাই ঠিক হয়ে গেছে। ফলে এখন আমাদের নজর দিতে হবে তাদের দায়িত্ব হস্তান্তরের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের দিকে। হাই কোর্ট অ্যাকর্ডকে আটটি শর্ত দিয়েছে। এই শর্ত মেনে যদি তারা থাকতে পারে তাহলে অল্প দিন থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031