বিজিবি পুনর্গঠনে ব্যাপক কাজ করছে সরকার ঃ প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ১১:১৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

বিজিবি পুনর্গঠনে ব্যাপক  কাজ করছে  সরকার ঃ প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকার এ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি পুনর্গঠনের আওতায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে । বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’
তিনি আজ সকালে রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরে বিজিবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ডকে একটি বাহিনীর অন্যতম চালিকা শক্তি আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার আবেদন থাকবে উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের কমান্ড মেনে চলবেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন। আর আপনাদের কোন সমস্যা হলে সেটা দেখার জন্য আমরাতো আছিই।’
‘কাজেই আপনারা সবসময় সততার সাথে নিষ্ঠার সাথে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন। যেন দেশ আজকে অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে,’যোগ করেন তিনি।

এরআগে, বিজিবি সদস্যরা মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।
কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি সুসজ্জিত খোলা জিপে করে প্যারেড পরিদর্শনকালে বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম এবং প্যারেড কমান্ডার কর্নেল এ এম এম খায়রুল কবির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
এছাড়া মটর শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুল রউফ পাবলিক কলেজের প্রায় ৬শ’ শিক্ষার্থী ‘স্বাধীনতা ও উন্নয়নের আগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’শীর্ষক ডিসপ্লে প্রদর্শন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিজিবি দিবস উপলক্ষে বীরত্বপূর্ণ ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিজিবি’র কর্মকর্তাদের মাঝে বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক-২০১৯, বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ এবং রাষ্ট্রপতি বর্ডার গার্ড পদক সেবা-২০১৯ বিতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে অংশ গ্রহণকারী প্যারেড কমান্ডার এবং অন্যান্য কন্টিনজেন্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এরআগে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরের বীরউত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন এবং বিজিবি মহাপরিচালক তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বীর-উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে বিজিবি সদস্যদের বিশেষ দরবারে অংশগ্রহণ করেন

অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেই আজকের এই অর্জন-এমন অভিমত ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, এটা আমাদের ধরে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। আমরা মাথা উঁচু করে চলবো এবং বিশ্বে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান আমরা করে নিতে সক্ষম হব।’

তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের কাছে এটাই আমরা চাই- আপনারা এদেশকে ভালবেসে সেদেশের মানুষের প্রতি কর্তব্য পালন করবেন।’
‘দেশ যদি উন্নত হয় তাহলে আপনাদের পরিবার-পরিজনরা এবং দেশের মানুষই উন্নত হবে। সে কথাটা সব সময় মনে রাখবেন,’ বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহ ও হত্যাকা- বিজিবি’র (তৎকালিন বিডিআর) ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। ঐ ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
প্রধানমন্ত্রী ঐ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,‘বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালকসহ যে সকল অফিসার, অন্যান্য সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি শহিদ হয়েছেন, আমি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।’
তিনি বলেন,‘বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী বিডিআর সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে এ বাহিনী এখন সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।’
জাতির পিতা দেশের স্বাধীনতা দিয়ে গেলেও দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ায় বাংলার জনগণকে তাঁর কাঙ্খিত অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই তাঁর এবং আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলেও প্রধানমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেলে দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে তোলার সুযোগ না পাওয়ায় এটা তাঁর দায়িত্ব মনে করে যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে এই কাজটি এগিয়ে নেয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায় ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ছিটমহল বিনিময় এবং সীমান্ত সুরক্ষা এবং বিজিবির আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরনে তাঁর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য সীমান্তের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় প্রথম পর্যায়ে ৩১৭ কিমি সীমান্তবর্তী রিং সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছে। ভারত ও মায়ানমার সীমান্তে ব্যাটালিয়ন সৃজনের মাধ্যমে ৫৩৯ কি:মি: অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৪৪২ কি. মি. সীমান্ত নজরদারীর আওতায় আনা হয়েছে।
জানুয়ারি মাসে অত্যাধুনিক ২টি হেলিকপ্টার বিজিবিতে যুক্ত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৩২৮ কি.মি. সীমান্তে স্মার্ট ডিজিটাল সার্ভিল্যান্স এন্ড ট্যাকটিক্যাল রেসপন্স সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ক্রয় করা হচ্ছে। ১২টি আর্মাড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) এবং ১০টি রায়ট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল ক্রয় করা হচ্ছে। সীমান্তের স্পর্শকাতর আইসিপি/এলসিপি সমূহে ভেহিক্যাল এক্স-রে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন এবং ‘বিজিবি ডগ স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে।
এছাড়াও তল্লাশী কার্যক্রম জোরদার করার জন্য ৬টি মেকানাইজড ইনস্পেকশন সিস্টেম ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্ত ডাটা সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। ডিজিটাল মোবাইল রেডিও (ডিএমআর) নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে সদর দপ্তর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিওপি’র সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ভূমিকম্পের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিজিবি যশোর অঞ্চলে ডিজেস্টার রিকভারি সাইট নির্মাণ করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিজিবি সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য সাতকানিয়ার ‘বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার এন্ড কলেজ’ এর পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গায় আরও একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, বিজিবি সদস্যদের জন্য নতুন র‌্যাংক ব্যাজ প্রবর্তন, জেসিওদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি,বিজিবি’র সকল স্তরে বেতন-ভাতার বৈষম্য দূর, যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভাগীয় অফিসার পদে পদোন্নতি এবং সীমান্ত ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
এছাড়া ২ মাসের বাৎসরিক ছুটি ও অগ্রিম বেতন প্রদান, পারিবারিক রেশন, ৩ বছরের নীচের সন্তানদের পূর্ণ স্কেল রেশন প্রদানসহ বিজিবি সদস্যের প্রতিবন্ধী সন্তানদের অবসরের পূর্ব পর্যন্ত নগদ মূল্যে রেশন প্রদান করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজিবিতে বিদ্যমান ৫টি হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ২০৫ জন কর্মচারীর দেশে-বিদেশে চিকিৎসার জন্য বিজিবি স্বাস্থ্য সহায়তা প্রকল্প তহবিল থেকে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিজিবি তথা তৎকালিন বিডিআর সদস্যদের আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে তৎকালীন ইপিআর-এর বেতারকর্মীরা এই পিলখানা থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সমগ্র দেশে ওয়্যারলেস যোগে প্রচার করায় ইপিআরের (তৎকালিন) সুবেদার মেজর শওকত আলীকে পাক হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে।’
অনুষ্ঠানে ১৯৭৪ সালে বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণ বাজিয়ে শোনানো হয়। সেই ভাষণের আলোকে এই বাংলার মাটি থেকে চোরাকারবারী, দুর্নীতি এবং সমাজ বিরোধীদের উৎখাতে এই বাহিনীর সদস্যদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহবানের সঙ্গেও একাত্মতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেইসাথে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার পুনর্বাসনে বিজিবি’র ভূমিকার প্রশংসা করেন।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031