বিড়ালে বাঘের টুঁটি চাপিয়া ধরিল

প্রকাশিত: ১:১১ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০২১

বিড়ালে বাঘের টুঁটি চাপিয়া ধরিল

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনাকে আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যম সকল প্রকারের প্রত্যাশা নিয়ে আকুল আবেদন জানিয়ে চলেছে। নিশ্চয়ই আপনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। আমি সহ গোটা জাতি যখন আপনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের চল্লিশ তম বছরের আনন্দঘন মুহুর্তে দিবসটি উদযাপনে ব্যাস্ত ঠিক সেদিন দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা ধরে চলতে থাকে গণমাধ্যমের ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা।আপনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর থেকে এদেশে ঘুষ-দূর্নীতি বিরুদ্ধে এক প্রকারের যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন। এই জনসমাজে আপনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে দূর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলমান। ঠিক যেনো মুদ্রার উল্টোপিঠের আরোহীরা আপনার সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কতিপয় অসৎ ব্যাক্তি নানা কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে চলেছে দীর্ঘদিন। এসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছেও। গতকাল যখন ঘটনার সূত্রপাত ঘটে সে সময়ে আমি একজন সাবেক কূটনীতিবিদ ও আমলার সাথে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝরে সজাগ হয়ে জানতে পারলাম স্বাস্থ্য বিভাগের একটি ঘটনা। একজন আমলার অফিসকক্ষে একজন জেষ্ঠ্য সাংবাদিকের টুঁটি চেপে ধরার ঘটনা বাংলাদেশে ইতিপূর্বে আর ঘটেনি। আমরা দেশবাসী যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের উদযাপনে ব্যস্ত ঠিক তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ( বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ ) কাজী জেবুন্নেছা বেগম প্রথম আলোর জেষ্ঠ্য সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ের এক কক্ষে পাঁচ ঘন্টা আটকে রেখে শারীরিক হেনস্থার পাশাপাশি একটি মিথ্যা ঘটনার নাটক সাঁজিয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। রোজিনা ইসলাম দীর্ঘদিন প্রথম আলো পত্রিকায় স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। এসব রিপোর্ট এর ভিত্তিতেই সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করে দূর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিয়ে যাচ্ছিল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে এলো জনসমাজে। দূর্নীতিবাজদের এত বড় দূঃসাহসের নেপথ্যে তাহলে কোন অপশক্তির হাত রয়েছে। সরকার কি তাদের বিরুদ্ধে এখনই দ্রুত ব্যাবস্থা গ্রহণ করবে? জনগনের অর্থে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার স্বাস্থ্য সেবাকে প্রান্তিক জনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর সেসময় দূর্নীতির সাথে জড়িতরা সরকারের ভাবমূর্তি বারবার বিনষ্টে ব্যস্ত সে বিষয়টি যে সরকারের অজানা রয়েছে সেটাওতো না। একজন দূর্নীতিবাজ আমলা প্রকাশ্যে সচিবালয়ের কক্ষে একজন জেষ্ঠ্য সাংবাদিকের টুঁটি চেপে ধরার বিষয়টি সংবাদপত্র ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য ভয়ংকর হুমকি। সংবাদপত্রের কন্ঠরোধ করবে দূর্নীতিবাজ আমলারা আর সে দায় সরকার তার নিজের কাঁধে নিতে পারে না। স্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগমের কানাডায় ৩টি, পূর্ব লন্ডনে ১টি, ঢাকায় ৪টি ও গাজীপুরে ২১ বিঘা সম্পত্তি ছাড়াও ব্যাংকে শত শত কোটি টাকার প্রমান পাওয়া গেলেও তার বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়নি এখনো। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের রিপোর্টে স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক দূর্নীতির চিত্র প্রকাশ হয়েছে করোনা মহামারীর দূঃসময়ে। সেসব অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলোর ভিত্তিতেও সরকার অনেক তথ্য পেতে সক্ষম হয়েছে। নির্যাতন ও শারীরিক হেনস্থার পর শাহবাগ থানায় মামলার পর রোজিনা ইসলামকে গতরাতে গ্রেফতার করে থানায় রাখা হয়েছিল এবং সকালে তাকে কোর্টে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় জনসমাজে ও পেশাজীবি সমাজে তীব্র নিন্দার ঝর উঠেছে।

পাকিস্তান আমলে সচিবালয়ে গণবিরোধী গোপন তৎপরতা ফাঁস করার দায়ে কিংবদন্তীর সাংবাদিক ফয়েজ আহ্‌মেদকে সচিবালয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সচিবালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ অবস্থাতেও পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৪ সালে ফয়েজ আহ্‌মেদ বিপুল ঝুঁকি নিয়ে প্রায় চুরি করেই এনেছিলেন একটা তথাকথিত ‘গোপন’ নথি, সেই সংবাদটি পুরো পাতা জুড়ে শিরোনাম হয়েছিল দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায়: “শতাধিক বৃত্তি থেকে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত”।ফয়েজ আহমেদকে এই প্রতিবেদন করার দায়ে কারাগারে যেতে হয়নি। এই কলামটি লেখার সময় রোজিনা ইসলাম আদালতে ছিলেন এবং জানা গিয়েছে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ এর ভিত্তিতে পুলিশ রিমান্ড চাইলে মহামান্য আদালত রিমান্ড নামন্জুর করেছেন। জামিনের বিষয়টি সম্পর্কে মহামান্য আদালত একদিন পর বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন। কিন্ত একজন সৎ সাংবাদিককে দূর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরার জন্য আজ এই স্বাধীন দেশে তাকে কারাগারে যেতে হলো সেই বিষয়টি অবশ্যই গোটা জাতির জন্য একটি অশনি সংকেত। এদিকে মূল ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কক্ষে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকলে সচিবালয় সাংবাদিক ফেডারেশন এর নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলনটি বয়কট করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে (বিএসআরএফ) সচিবালয় সাংবাদিক ফেডারেশন এর কক্ষে একটি জরুরী মিটিং চলছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্র হিসেবে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে সেসময় দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র চলমান। এখনো দেশ থেকে দূর্নীতি দূর করা যায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য যেমন একটি চ্যালেঞ্জ দূর্নীতি দূর করা তেমনই বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের গণমাধ্যম পূর্বের মতো সব সময়ই দূর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে সে বিষয়ে কোন মহলেই কোন দ্বিধা ও সংকোচ বোধের কোন কারন নেই। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার বিষয়টিও আরও শক্তিশালী করতে হবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। মনে রাখতেই হবে, সংবাদপত্র গণসমাজের দর্পণ। এই দর্পণ ভাঙ্গার অপচেষ্টার ফলাফল কোনকালেই ভালো হবে না। আজ বিড়ালে বাঘের টুঁটি চেপে ধরলেও এই বিড়ালকে অবশ্যই বধ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ছড়িয়ে দিন