বিদায় সেলুলয়েডের কবি

প্রকাশিত: ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২১

বিদায় সেলুলয়েডের কবি

মাসুদুল হাসান রনি 
ঘুমাতে যাবার আগে মেসেজটি এলো কোলকাতার বন্ধু,চলচ্চিত্র সংসদকর্মী সুরঞ্জিতের কাছ থেকে
” বুদ্ধ’দা নেই।”
বুদ্ধদা মানে আমাদের প্রিয় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।
সংবাদটি পেয়ে ভীষন মন খারাপ হয়ে গেল।
একজীবনে কত মৃত্যুসংবাদ শুনতে হবে, কত বেদনায় নীল হবো!
পরিচালক এবং সাহিত্যিক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর প্রয়ানের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্য জগতে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান হলো।
তার সাথে পরিচয় হয়েছিল ২০০৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। প্রথম দেখাতে আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি ও চলচ্চিত্র পরিচালক বিজন সেন উঠেছিলেন লা ভিঞ্চি হোটেলে।উৎসব চলাকালীন বিভিন্ন ক্লাব ও দুতাবাসে নৈশভোজে তাকে নিয়ে যেতাম আমি ও মাসুদরানা । ফেরার সময় ড্রপ করার জন্য আমাকে গভীর রাতে লা ভিঞ্চি হোটেলে যেতে হতো। বিদায় নেয়ার সময় দাদা বলতেন, আরে যাবে কোথায়, বসো কিছুক্ষন গল্প করি।
দাদার সাথে আমাদের সেই আড্ডায় পরিচালক বিজন সেন, গোলাম রাব্বানি বিপ্লবভাই, মাসুদ রানা থাকতেন। হোটেলের লবিতে কিংবা তার রুমে গল্প করতে করতে ভোর হয়ে যেত। তখন ঢুলু ঢুলু চোখে আমি আর মাসুদরানা উৎসব পরিচালক বিপ্লবভাইয়ের রুম দখল করে ঘুমাতাম।
ঢাকা ছাড়াও কোলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব, দক্ষিন কোলকাতায় তার বাসভবনে কত গল্প, স্মৃতি জমে আছে। একবার কোলকাতায় তার সাথে দেখা হবে জেনে ভোরের কাগজের সাংবাদিক রবিন শামসভাই মেলার জন্য তার একটি ইন্টারভিউ করতে বলেছিলেন। আমি করেছিলামও। কোলকাতা থেকেই ফিরে আমার নেয়া বুদ্ধদেব দা’র বিশাল একটা ইন্টারভিউ ভোরের কাগজে ছাপা হয়েছিল।
২.
বুদ্ধদেব দা’ ১৯৭৮ সালে তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দূরত্ব’ দিয়ে অন্য সবার কাছ থেকে নিজের জাতটা চিনিয়েছিলেন।সেই শুরু। তারপর থেকে ছক ভেঙে একাধিক সিনেমা করে গিয়েছেন । ‘তাহাদের কথা’, ‘উত্তরা’, ‘চরাচর’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, ‘বাঘ বাহাদুর’, ‘গৃহযুদ্ধ’,কালপুরুষ, জানালা-এর মতো অসামান্য সিনেমার জনক ছিলেন। ‘উত্তরা’, ‘তাহাদের কথা’-র জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক উত্তর যুগে বাংলা সিনেমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের সামনে। ছবির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। নির্দিষ্ট, ধরাবাঁধা ছকে এগিয়ে যাননি। বরং ছক ভেঙে এগিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের স্বকীয়তা।
সিনেমা থেকে, কবিতা থেকে শিল্পের নানান মাধ্যমে তাঁর সাবলীল এক যাতায়াত ছিল । তাঁর ভাবনায় শুধু এই উপমহাদেশের সিনেমা ছিল না, বিশ্বসিনেমায়ও রেখে রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ ছাপ।
৩.
তিনি কোন এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘আমি লোনলি নই, অ্যালোন। কিন্তু একা থাকতে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি এ কারণে, যেকোনও সৃষ্টিশীল মানুষ একা থাকতে ভালোবাসেন কিছুটা সময়।’
সত্যি তাই।
প্রয়ানের মধ্য দিয়ে আপনি সেই একাকিত্বকে চিরকালের জন্য বেছে নিলেন। যেখানে আপনি শান্তিতে থাকবেন। বিদায় দাদা, বিদায় সেলুলয়েডের কবি।
১০.০৬.২০২১
মন্ট্রিয়েল
ছবিঃ ভারতীয় দুতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নীতা ভুষনের বাসভবনে নৈশভোজে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বিজন সেন, সাখাওয়াত হোসেন হাওলাদার ও আমি। ২০০৩

ছড়িয়ে দিন