বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকেপড়া স্বাস্থ্যখাত

প্রকাশিত: ৫:২৬ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২১

বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকেপড়া স্বাস্থ্যখাত

খছরু চৌধুরী

মহান জাতীয় সংসদে সরকার ২০২১ — ২০২২ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছেন। বাজেটের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে যথেষ্ট আলোচনা- সমালোচনা হয়েছে। একই সময়ে বিগত অর্থ-বছরের সংশোধিত বাজেটও অনুমোদিত হয়ে থাকে। পত্রিকার ভাষ্যমতে স্বাস্থ্যখাতের ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করা সম্ভব হয়নি। তার মানে হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু বরাদ্দ সর্বনিম্ন হলেও যেটুকু বরাদ্দ রাখা হয় তা-ও খরচ করার সক্ষমতা স্বাস্থ্যবিভাগের নেই।

যে কেনো ধরনের খরচের সক্ষমতার সাথে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিনভাবে জড়িত। এই পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলার আগে আরও দু’টো কথা বলবার চাই। দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন হচ্ছে এবং আরও হবে। কিন্তু একই সাথের সত্যটা হলো নাগরিক জীবন দুর্নীতির একটা সর্বগ্রাসী সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করেছে। নৈতিকতার শক্তি বলে যে কথাটি চালু আছে সমাজে — সেই নৈতিকতার শক্তির একটা ধ্বস নেমেছে বলে মনে হচ্ছে। দুর্নীতি যে এখনই হচ্ছে — আগে ছিল না — বিষয়টি এমন নয়। দুর্নীতি আমাদের সংস্কৃতিরই একটা অংশ। কিন্তু আগেকার এবং এখনকার দুর্নীতির তফাতটা হলো — এখন কেউ দুর্নীতি করে ধরা পরলে আগের মত লজ্জা পাচ্ছে না! কাজেই লজ্জাবোধের সংস্কৃতিটা ধরে রাখতে না-পারলে দুর্নীতির প্লাবন-মহাপ্লাবনে সব শেষ হয়ে যাবে। নৈতিকতা ও লজ্জাবোধের সংস্কৃতিটা ধরে রাখার প্রধান উপায় হলো সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ব্যক্তিকে শাস্তির আওতাধীন করা।

সমালোচনাকে স্বাগত জানানোর মত সংস্কৃতি আমাদের এখানে এখনও গড়ে ওঠেনি। যে কোনো কঠোর সমালোচনায় সরকার ও আমলাতন্ত্র তেড়ে ওঠে। আমলাতন্ত্র না-বুঝলেও সরকারের বুঝা উচিত, সব সমালোচনা-ই তো আর বিরূপ বিরুদ্ধ চিন্তা নয় — অনেক সমালোচনা আছে যে গুলো দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। ভুলগুলো শুধরে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অতিমারীর দূর্যোগের ব্যবস্থাপনায় এই সুহৃদ সমালোচকদের চিনে নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।

করোনা সংক্রমণের শুরুতেই অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন এই দূর্যোগ সহজেই যাচ্ছে না। বছর দুই, তিন, চার তো থাকবেই। কেউ কেউ সম্ভাবনা দিয়ে বলেছেন ১০ বছর। আমাদের স্বাস্থ্য- ব্যবস্থাপকেরা স্বাস্থ্যখাতে চরম জনবল সংকট কাটিয়ে ওঠে ভারসাম্যপূর্ণ জনবল নিয়োগের যে লোক দেখানো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন — তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ইহাতে টেকসই চিন্তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দেশের জনগণের অনুপাতে স্বাস্থ্যখাতে প্রশিক্ষিত জনবলের সীমাহীন অভাব থাকায় কোভিড-১৯ মোকাবিলা করার শুরুতেই “স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ” নামের পেশাজীবী সংগঠনের যুগোপযোগী একটা প্রস্তাব ছিল। প্রস্তাবের সারমর্ম এইরকম, “দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় অকেজো প’রে থাকা ২৬২০ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট — স্যানিটারী ইন্সপেক্টরশীপকে মাঠপর্যায়ে কাজে নামানো। কর্মএলাকা বিভাজন করে তাঁদের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়ে স্যাম্পুল কালেকশন-সহ রোগের প্রতিরোধে কার্যক্রম শহর-গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া।” সংশ্লিষ্টরা এদিকে মনোযোগ দেননি। অন্তর্নিহিত কারণ চিকিৎসা বাণিজ্য সেটি বলার অপেক্ষা রাখেনা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, ভারতের ডেল্টা ভেরিয়েন্ট করোনার দ্রুত বিস্তৃতি ঘটছে। দেশের ৪০ টি জেলা উচ্চ ঝুঁকিতে। বাকিগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ। বিভ্রান্তির ও অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে আটকে পড়া স্বাস্থ্যখাতকে টেনে বের করে এনে — যা জনবল আছে ইহার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিকল্প কিছু আছে কি? আমাদের দায়িত্বশীল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের সবাই জানেন — রোগের প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে/ কমিউনিটিতে অবস্থান করে নিরন্তর কাজের জন্য স্যানিটারী ইন্সপেক্টর ছাড়া এদেশে দক্ষ কোনো হেলথ প্রফেশনাল নেই। সুতরাং করোনার সংক্রমণ মোকাবেলায় শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা কেন্দ্রিক চিন্তা না-করে কমিউনিটিতে অবস্থান করে রোগের প্রতিরোধ বিষয়ক চিন্তার বিস্তার ঘটালে জান ও অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখা সম্ভব হবে। ২৫ জুন ২০২১খ্রীস্টাব্দ।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট।

ছড়িয়ে দিন