বিলেতি বৃত্তান্ত

প্রকাশিত: ৬:৪৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৮

বিলেতি বৃত্তান্ত

শিরিন ওসমান
১৯৫০-১৯৬০ সালে ব্যাপক সংখ্যক সিলেটি মাইগ্রেশন সুবিধা নিয়ে বিলাত যাত্রা করেন। সেখানে তাদের কর্মসংস্থান হয় । এতে করে তারা সিলেটে তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা রাখেন। পর্যায় ক্রমে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বিলাতে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। সিলেটিরা তখন যৌথ পরিবার নিয়ে বাস করতো। বিলাতে থাকলেও দেশে বাবা মা ভাই বোনদের পারিবারিক জীবনের সব ধরনের সহায়তা করে যেতেন।নিয়মিত দেশে আসা যাওয়া করতেন। বিলাতে থাকলেও তাদের জীবন যাপনে নিজস্বতা বজায় রেখে চলতেন।

আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে বিলাতের সংস্কৃতির সাথে তারা একাত্ম হওয়া শুরু করলো। যেমন; মেয়েদের চাকুরী করা, উচ্চ শিক্ষায় মনযোগি হওয়া, কেউ আবার সেখানকার মূলধারার জীবনের সাথে মিশে যেতে থাকলো। তবে এরা সংখ্যায় অনেক কম। বিলাতিরা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট বলতে সিলেটি রেস্টুরেন্ট মনে করতো। সিলেটি সেফদের সুস্বাদু খাবার খেতে তারা সপ্তাহে অন্তত: একদিন সিলেটি রেস্টুরেন্টে যেতো। ইন্ডিয়ান কারি বিলাতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত এই রেস্টুরেন্ট ব্যবসার মাধ্যমে বহু সিলেটি রাতারাতি ধনী হয়ে গেলেন।তারা সিলেটে জমিজমা কেনা, গ্রামে বড় বিল্ডিং বানানো , মার্কেট তৈরী করা, চা- বাগানের মালিক হওয়া থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে অন্যান্য ব্যবসা করে নিজেদের জীবন যাপনের পরিবর্তন ঘটায়।

আপনারা ভাবতে পারেন কেন আমি এসব বৃত্তান্ত গাইছি ? সিলেটিদের অবস্থার উন্নয়নে নারীর ভুমিকা কতখানি ছিল সে বিষয় অনেকের অজানা রয়ে গেছে। আমি সেইসব নারীর অবদান নিয়ে অল্প করে কিছু বলতে চাই, যা আমি নিজে দেখেছি।

১৯৮০ সালে আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমি এবং আমার স্বামী ইংল্যান্ড যাই। আমরা সেসময় চারমাস ছিলাম। লন্ডন এবং তার আশপাশ শহর ঘুরে বেড়াই।স্কটল্যান্ডের এডিনবরা, বেলজিয়াম, হল্যান্ড যাই বেড়াতে। অনেক আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের বাড়ীতে থাকা হতো।

আমার একজন গৃহিনীর কথা প্রায় মনে পড়ে। ওই বাড়ীতে আমি দুই দিন থেকেছি। তাদের নিজস্ব রিস্টুরেন্টে একবেলা লাঞ্চ করেছি। ভদ্রলোক নিজর বাড়ীতে থাকেন। তিনি আর তার ছোট ভাই মিলে রেস্টুরেন্ট চালান । ছোট ভাই আমাদের জন্য ডে-অফ করে একদিন ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন যেগুলো আমরা একদিনে দেখতে পারবো।সন্ধার পর ঘরে ফিরে আসি। পরিচয় হয় ভাবীর সাথে।বাচ্চাদের সাথে। ছোট ভাই তখনো বিয়ে করেনি। বয়স ২৮/২৯ হবে তখন। ভাবী খুব আন্তরিক । কাজ করতে করতে গল্প করেন আমার সাথে। ভোর ছয়টায় ওঠেন।বাচ্চাদের নাস্তা খাওয়ান। সাথে টিফিন বক্স দেন।তিনজন বাচ্চা, দুই মেয়ে এক ছেলে। ওদের স্কুল বাসে তুলে দিয়ে আসেন আবার নিয়ে আসেন। ঘরের সব কাজ নিজে করেন।বাচ্চাদের সাথেও গল্প করি। ওরা প্রথমে একটু লজ্জা পাচ্ছিলো। পরে বেশ সহজ হয়। লন্ডনে তাদের জন্ম। আমি ওদের টেক্সট বুক গুলো দেখতে চাইলাম।ওরা একটু অবাক হয়। আমি বুঝতে পারি কেন অবাক হচ্ছে। ওরা যখন দেশে বেডাতে যায় তাদের গ্রামে, সেখানে আমার বয়সী মহিলা ইংরেজী বই পড়েন না। মিডিল ক্লাস সেকশন বাচ্চাদের মায়েরা পড়ান না।ওদের মাও যেমন তাদের পরিচর্যা করেন কিন্তু তাদের একাডেমিক বিষয়ে কিছু অবহিত নন। অবশ্য লন্ডনের স্কুলে ছাত্রদের যথেষ্ট যত্ন নেয়া হয়। সমস্যা হলে টিচারররা সমাধান করে দেন। ভাবী কাজ করেই যাচ্ছেন। রাত একটায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে স্বামী ঘরে ফেরেন। আমাদের দু্খ্য করে বলেন, সময় দিতে পারছেন না । কাজের অনেক চাপ।আমাদের ঘুরা কেমন হলো, রাতের খাবার খেয়েছি কীনা জানতে চাইলেন। ভাবী টেবিলে স্বামীর জন্য খাবার গরম করে আনলেন। ভাই ঘরের খাবার খান। রেস্টুরেন্টে কখনো খান না।খেয়ে ঘুমাতে যেতে রাত দুইটা আড়াইটা বেজে যায়।ভাই দেরী করে ওঠেন। কিন্তু ভাবীর দেরী করে ওঠা সম্ভব নয়। ভোর ছয়টায় উঠতে হবে। না হলে সংসারের চাকা বন্ধ হয়ে যাবে।গুনে দেখলাম ভাবী তিন সাড়ে তিন ঘন্টা দিনে ঘুমান।কোনো অভিযোগ নাই। তখন লন্ডনে শীত পড়েনি । ওই সময়ের ফ্যাশন ছিলো খোলামেলা পোষাক পড়া । ভাবী বললেন শীতকাল না থাকলে মনে হয় এদেশের মেয়েরা কাপড পড়া নিয়ে মাথা ঘামাতে না। আমাদের পরোটা করে নাস্তা খাওয়ালেন। বিকালে বাচ্চারা আসার পর ওদের নিয়ে ছবি তুললাম ভাবীকে সাথে নিয়ে। এই যে সুদুর সিলেটের গ্রাম থেকে এসে লন্ডনে সংসার করা। সংসারের সবার জন্য প্রানপন নিরবে খেটে যাওয়াএর মূল্যায়ন কতটুকু হয় জানিনা। এমনকি সন্তানরাও কী বোঝে মা তাদের জন্য কতখানি করে যাচ্ছেন? আঠারো বছর শেষ হলে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতো সেই সময়ে। ওদেশে পাত্র পাওয়া না গেলে দেশ থেকে পাত্র খোজা হতো। বেশীর ভাগ আত্মীয়দের মাঝে বিয়ে হতো।শুরু হতো ছোট্ট মেয়ের বিবাহিত জীবন। এতে তার মায়ের কাজ আরো বেড়ে যেতো। বেয়াই বাড়ীর খাতির যত্ন, নাতী নাতনী হলে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব।এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নারী সংসারকে এগিয়ে নিয়ে চলছে।

২০০৮ এ আমার স্বামী, তের বছরের পুত্র আর পনেরো বছরের কন্যা সহ লন্ডন এবং পেরিস ভ্রমন করি। লন্ডনে থেকেছি আমার স্বামীর চাচাতো বোন ফলক আপা লুৎফুর দুলাভাইয়ের বাসায়। তাদের মেয়ে তামান্নাlaw পাশ করেছে কেবল আর ছেলে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে।ক্লাস শুরু হয়নি। ওরা ফ্রি থাকাতে আমরা খুব মজা করে ঘুরেছি। গল্প আড্ডা সিলেটি ধুমধামের বিয়ের দাওয়াত,বিয়েতে আবার শাড়ী গিফট পেয়ে গেলাম।

দেখলাম লন্ডনের নতুন প্রজন্মের বিরাট পরিবর্তন । সবাই পডাশোনা করছে। চাকুরী করছে। বিয়ে করছে নিজের পছন্দে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজও হচ্ছে। শ্বাশুরী দ্বারা বৌ নির্যাতন বন্ধ নয় ,যেমন, বৌকে তার স্বামীর সাথে একসাথে বেডাতে না দেয়া। বৌকে দিয়ে ঘরের সব কাজ করানো, বাপের বাড়ী বেশী যেতে না দেয়া । বৌ মুখ বুজে সহ্য করে যেতো। আশ্চর্য ছেলে কোনো প্রতিবাদ করতো না। সব ক্ষেত্রে এমন নয়।স্বামী- স্ত্রী আলাদা সংসার করছে। বনিবনা না হলে ডিভোর্স খুব সাধারন ব্যাপার হয়ে গেছে তখন। পুরোপুরি বদলে গেছে। নতুন প্রজন্ম অন্য সব বিলাতি নাগরিকের মত জীবন যাপন করছে।

আরেক দল আছে, যারা প্রচন্ড ধর্মীয় ব্যারিকেডে জীবন যাপন করছেন।সে এক অন্য জগত।বলতে গেলে অনেক বলা যায়। তবে সে নিয়ে কিছু লেখা আমার কাজ নয় বলে মনে হয়।