বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হোয়াইট কালার শ্রমিকদের…

প্রকাশিত: ২:০৩ অপরাহ্ণ, মে ২, ২০১৮

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হোয়াইট কালার শ্রমিকদের…

অদিতি ফাল্গুণী

`সাদা সর্দার বলে হেসে হেসে
সাদা সর্দার বলে হেসে হেসে
কালো নিগারের দেখো দুঃসাহস
তোর যদি জয় হয়,
হবে না সূর্যোদয়
দুনিয়াটা হবে তোর বশ
হো হো হো হো- দুনিয়াটা হবে তোর বশ।।’

: গণঙ্গীতের অমর শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই অনবদ্য লিরিকস ও সুর আমাদের অনেকেরই চেনা। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা পূর্ব ইউরোপীয় ব্লকের ধসে পড়ার পর পাল্টে গেছে মাও সে তুংয়ের চীণও- যেমনটা ওপার বাংলার শিল্পী জানিয়ে দেন তাঁর গীটার বাজিয়ে। আজকের পৃথিবী চলছে মার্কিনী ইউনিপোলার অর্ডারে।

তবে, আজ আমাদের দেশের কারখানার শ্রমিকদের ভয়ানক জীবনের কথা বাদই দিই। সত্যি বলতে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হোয়াইট কলার শ্রমিকদেরও দিনে আট ঘণ্টা কাজের পাশাপাশি আট ঘন্টা ঘুমের অধিকার/সুযোগ/সৌভাগ্য- যা-ই বলেন- নেই। ফেসবুক ইউজার আমার বন্ধু-বান্ধবীরা যারা মাসে ন্যূণতম ৩০,০০০-১,০০,০০০/ + অবধি আয় করেন, কেউই বোধ করি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না যে দিনে আট ঘণ্টা ঘুমোতে পারেন। ছয় ঘণ্টা ঘুম হলেই সেটা সৌভাগ্য! অফিসের আট ঘণ্টা, পথে যানজটে চার ঘণ্টা, কাজে বের হবার আগে বাসায় প্রস্তত হবার ও ফিরে নিজেকে গোছানোর চার ঘন্টা- ১৬ ঘণ্টা এভাবেই লেগে গেলে যে কর্মজীবী কাজের বাইরে লেখালিখি বা ছবি আঁকা বা সঙ্গীত সাধনা জাতীয় কিছু একটা করতে চান, তার হাতে প্রতিদিন কতটা সময় থাকে? ঘুমে ৫-৬ ঘণ্টাই না হয় ধরলাম! নারী হলে ঘর-সংসারের কাজ (রান্না, সন্তান লালন-পালন, দাম্পত্য জীবন) হিসাব করে নিন। একজন অবিবাহিত কর্মজীবী ও সৃজনশীল নারী ‘না জানি কত কি করে বেড়ায়’ বলে যারা ভাবেন তাদের পক্ষে বোঝাও সম্ভব নয় যে কেবলমাত্র আক্ষরিক অর্থেই একাকী থাকা হয়তো একজন কর্মজীবী ও সৃজনশীল নারীকে বছরের পর বছর পেশা ও সৃজনশীলতা করার সুযোগ দেয় (সেটা জীবনের ভাল সমাধান কিনা তা’ পরের প্রশ্ন)। আর পাশাপাশি একজন কর্মজীবী+বিবাহিতা মা+সৃজনশীল নারীর ভয়ানক যুদ্ধটা আমার ভাবতেই দমবন্ধ লাগে। এই ঢাকা শহরে! তারপরও আমি কেমন সৃজনশীল বা কেমন লেখক? আসল কথা হচ্ছে ২২-২৩ বছর বয়সে চাকরিতে ঢোকার পর থেকে আমার বই পড়ার অভ্যাস কার্যত: নেই। পড়া হয় না তা’ নয়। তবে ঐ একটা বিষয়ে গল্প লিখছি বা কোন অনুবাদ করছি বা প্রবন্ধ লিখছি…তখন সে বিষয়ে পড়া হয়। আগের মত র‌্যান্ডম পড়া বা প্রকৃত পড়াটা হয় না যা একজন সাহিত্যকর্মীর জন্য খুব ক্ষতিকর। তারপর ত’ এই ফেসবুক জমানা তার ভাল-মন্দ সব কিছু মিলিয়ে আছেই। সেখানে সময় দিতে দিতে কিছু ঝটিতি পড়া (খবরের লিঙ্ক বা একটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ, কোন লেখক বন্ধুর কবিতা বা গল্প ইত্যাদি) হয় প্রচুর সময় বিনষ্টির পাশাপাশি। এতকিছুর পরও কর্মজীবী+ সৃজনশীল হলে মাঝে মাঝেই আপনাকে কেরিয়ারের ভাল সুযোগ ছাড়তে হয় অথবা অত ভাল সৃজনশীল কাজ করা চলে না। লীণা নামে এক বন্ধু (‘প্রগতির পরিব্রাজক দল’ নামক পাঠচক্রে পরিচয় হয়েছিল) একবার দৈহিক সুস্থতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে দিনে আট ঘণ্টা অফিস করার পর বাড়ি ফিরে যে বই পড়তে পারে, সে দৈহিক ভাবে সুস্থ। লীনা পাঠচক্রে নিয়মিত পড়ে আসত। আমি পারতাম না বলে পরে এসকেপ করি। তখনি মেনে নিয়েছিলাম আমার আনফিটনেস। সেই লীণা পরে ক্যান্সারে মারা গেল। মৃত্যুর আগে বিয়ে করেছিল। আমি ত’ সারভাইভর ঐ একই অসুখের। যাহোক, আজকের ঢাকায় এটাই একটা প্রশ্ন হতে পারে যে দিনে আট ঘন্টা ঘুমের অধিকার ক’জন কর্মজীবীর আছে? ভাই ও বোনেরা- হাত তোলেন! কারখানার শ্রমিকের কথা আর না-ই বা বলি! আসেন- আমাদের সবার- মধ্যবিত্তদের জীবন বিন্যাসের কথাই না হয় এই মে দিবসে আজ ভাবি।