বিশ্ববোধের তাড়নায় মুক্তধারার জল মিশুক তিস্তার জলে

প্রকাশিত: ১২:১৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০১৮

বিশ্ববোধের তাড়নায় মুক্তধারার জল মিশুক তিস্তার জলে

ফারজানা সিদ্দিকা

তখনো তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়ে ‘বিশ্বকবি’ হয়ে ওঠেন নি। তখনো ‘কবিগুরু’র তকমা জোটেনি তাঁর। কিন্তু এসব স্বীকৃতির আকাঙক্ষায় কিছু ভাবছেন বা লিখছেন এমন প্রমাণ তো পাওয়া যায়নি আজও। মহর্ষিভবনে ১৯১১-এর মাঘোৎসবে (বাংলা ১৩১৬) লিখলেন ‘বিশ্ববোধ’ নামক প্রবন্ধটি। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস থেকে ভবিষ্যত ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠত্বের পথ খুঁজলেন তিনি। কী করে শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে একটা জাতি? কী করে শ্রেষ্ঠ হয় মানুষ? সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলতে কাকে বোঝায়? সেই ভারতবর্ষ যেখানে তখনো কল্পনায়ও ছিল না বিভক্তির কোনো চিহ্ন;খণ্ডিত হবার আশঙ্কা!
প্রাচীন ভারতবর্ষে নরশ্রেষ্ঠরূপে যাদের খোঁজ মেলে তাঁরা মানুষ নন; ঋষি। কেমন ছিল সেই ঋষিদের স্বভাব? ‘বিশ্ববোধ’-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘যাঁরা পরমাত্মাকে জ্ঞানের মধ্যে পেয়ে জ্ঞানতৃপ্ত, আত্মার মধ্যে মিলিত হতে দেখে কৃতাত্মা, হৃদয়ের মধ্যে উপলব্ধি করে বীতরাগ, সংসারের কর্মক্ষেত্রে দর্শন করে প্রশান্ত। সেই ঋষি তাঁরা, যাঁরা পরমাত্মাকে সর্বত্র হতেই প্রাপ্ত হয়ে ধীর হয়েছেন, সকলের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছেন, সকলের মধ্যেই প্রবশে করেছেন।
ভারতবর্ষ আপনার সমস্ত সাধনার দ্বারা এই ঋষিদের চেয়েছিল। এই ঋষিরা ধনী নন, ভোগী নন, প্রতাপশালী নন, তাঁরা ধীর, তাঁরা যুক্তাত্মা।’
চেয়েছিল। ভারতবর্ষ এমন ঋষিদের চেয়েছিল। মানুষকে নয়? মানুষ একসময় ঋষি হতে চাইত। রাজারাও বোধ করি। তাই তো ‘রাজর্ষি’ শব্দটি অভিধানে জায়গা করে নিয়েছে যত শক্তভাবে, বাস্তবে ততটা নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ভারতবর্ষ এমন ঋষিদের জন্য সাধনা করেছিল, করেছে। ক্রিয়াপদ কি কেবল অতীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াবে না? যদি বাক্যটা এমনভাবে লেখা হয়, ভারতবর্ষ এমন ঋষিদের জন্যে সাধনা করছে, করবে। চমকে ওঠা ছাড়া গতি থাকে না যেন। অবাস্তব মনে হয় বাক্যটির শব্দগুলোকে। ভারতবর্ষ ভৌগোলিকভাবে ত্রিখণ্ড হয়ে গেছে; আর মননে চেতনায় বহুধা খণ্ডে বিচিত্র পথে চলমান প্রতিদিন। সে পথে আর যেই থাকুক; ঋষিদের চলাচল নেই!
মানবজন্মে যাঁরা সফলতা লাভ করেছেন উপনিষৎ তাঁদের ধীর বলেছেন, যুক্তাত্মা বলেছেন। ‘…তাঁরা সকলের সঙ্গে মিলে আছেন বলেই শান্ত, তাঁরা সকলের সঙ্গে মিলে আছেন বলেই সেই পরম একের সঙ্গে তাঁদের বিচ্ছেদ নেই, তাঁরা যুক্তাত্মা।’ সোজা কথায়, এ বাক্যের অর্থ দাঁড়ায় সকলের সঙ্গে মিলে থাকার মধ্যেই ‘পরম এক’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার কাজটি সম্পন্ন হয়। যখন সকলের থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তখন সেই ‘পরম এক’-এর সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। সকলের মধ্যে থেকে, সমগ্রতার বন্ধনেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। সকলের মধ্যে বাঁচা, সকলের জন্যে বাঁচা, সকলকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচা, সকলের স্বপ্নে বাঁচা, সকলের সুখে-দুঃখে বাঁচা। আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘যে লোক আপনাকেই বড়ো করে চায় সে আর সমস্তকেই খাটো করে। যার মনে বাসনা আছে সে কেবল সেই বাসনার বিষয়েই বদ্ধ, বাকি সমস্তের প্রতি উদাসীন। উদাসীন শুধু নয়, হয়তো নিষ্ঠুর। এর কারণÑপ্রভুত্বে কেবল তারই রুচি যে ব্যক্তি সমগ্রের চেয়ে আপনাকেই সত্যতম বলে জানে; বাসনার বিষয়ে তারই রুচি যার কাছে সেই বিষয়টি সত্য, আর সমস্তই মায়া। এই-সকল লোকেরা হচ্ছে যথার্থ মায়াবাদী।’
ভারতবর্ষ দ্বিখ- এবং পরবর্তীকালে ত্রিখ- হবার পর রবীন্দ্রনাথ সংজ্ঞায়িত ‘মায়াবাদী’র সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ‘বিশ্ববোধ’ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন বাংলা ১৩১৬-এ। বারো বছর পর বাংলা ১৩২৮-এ ঠিক এই বোধ বা দর্শন নিয়েই লিখলেন ‘মুক্তধারা’ নাটকটি। যার প্রথম নাম দিয়েছিলেন ‘পথ’।
১৩২৯-এ ‘প্রবাসী’তে নাটকটি সম্পূর্ণই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই নাটকের একটি সংলাপ ছিল এমন : ‘পৃথিবীতে কোনো একলা মানুষই এক নয়, সে অর্ধেক। আর-একজনের সঙ্গে মিল হলে তবেই সে ঐক্য পায়।’ ‘বিশ্ববোধ’ প্রবন্ধে ঋষির মধ্যে যে গুণ দেখছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শ্রেষ্ঠ হবার গুণ সেই গুণ বারো বছরের ব্যবধানে বাংলা ১৩১৬ থেকে ১৩২৮-এ মানুষের মধ্যে সম্প্রসারিত হলো। ‘পরম এক’ এর সঙ্গে ঐক্যে যুক্তাত্মা নয়, মানুষে মানুষে ঐক্যে পূর্ণ মানুষের রূপ খুঁজে পেলেন রবীন্দ্রনাথ।
‘বিশ্ববোধ’ প্রবন্ধটি আর ‘মুক্তধারা’ নাটকটি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসজাত বোধেরই পরম্পরা রক্ষা করেছে। ‘মুক্তধারা’ লিখছেন যখন তখন তিনি বিশ্বের কাছে স্বীকৃত কবি। নোবেল পুরস্কার পাবার সাত বছর অতিক্রান্ত। পৃথিবীতে কত কিছু ঘটে চলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-, নাইট উপাধি বর্জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আর হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যে ভাঙনের ইঙ্গিত। পৃথিবী জুড়ে আস্থাহীনতার সংকট, বিশ্বাসী-নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের অভাব, দেশে-দেশে মানুষে-মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধের আকাল, অবিশ্বাস আর ঘৃণার আঘাত। আর সেই সঙ্গে যন্ত্রের বিচিত্র উল্লম্ফন। ১৩২৯-এর ২১শে বৈশাখ কালিদাস নাগকে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘এই যন্ত্র প্রাণকে আঘাত করছে, অতএব প্রাণ দিয়েই সেই যন্ত্রকে অভিজিৎ ভেঙেছে, যন্ত্র দিয়ে নয়। যন্ত্র দিয়ে যারা মানুষকে আঘাত করে তাদের একটা বিষম শোচনীয়তা আছেÑকেননা যে মনুষ্যত্বকে তারা মারে সেই মনুষ্যত্ব যে তাদের নিজের মধ্যেও আছেÑতাদের যন্ত্রই তাদের নিজের ভিতরকার মানুষকে মারছে। …যাকে আঘাত করা হচ্ছে সে সেই আঘাতের দ্বারাই আঘাতের অতীত হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু যে-মানুষ আঘাত করছে আত্মার ট্রাজেডি তারইÑমুক্তির সাধনা তাকেই করতে হবে, যন্ত্রকে প্রাণ দিয়ে ভাঙবার ভার তারই হাতে। পৃথিবীতে যন্ত্রী বলছে, “মার লাগিয়ে জয়ী হব।” পৃথিবীতে মন্ত্রী বলছে, “হে মন, মারকে ছাড়িয়ে উঠে জয়ী হও।” আর নিজের যন্ত্রে নিজে বন্দী মানুষটি বলছে, “প্রাণের দ্বারা যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পেতে হবেÑমুক্তি দিতে হবে।” যন্ত্রী হচ্ছে বিভূতি, মন্ত্রী হচ্ছে ধনঞ্জয়, আর মানুষ হচ্ছে অভিজিৎ।’ কিন্তু এ চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ অভিজিৎকে ‘নিজের যন্ত্রে নিজে বন্দী মানুষটি’ কেন বলেছেন? অভিজিৎ নিজে কোনো যন্ত্র তো বানাননি। তবে কোন যন্ত্রে তিনি বন্দী হলেন? ‘মুক্তধারা’ নাটকে যন্ত্র বানিয়েছেন বিভূতি। রাজার আদেশে। রাজা অভিজিতেরই পিতা। তবে কি অভিজিৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে বন্দি মানুষ? যন্ত্র কেবল লোহা লক্কড় দিয়ে গড়া যন্ত্র নয়, রাষ্ট্রের নীতি কিংবা অবস্থান কখনো কখনো রাষ্ট্রকে যন্ত্রের মতোই বোধহীন, মানবতাবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করায়। রাষ্ট্র আর যন্ত্রে তখন আর কোনো তফাৎ থাকে না। দুটোই তখন অন্যের হাতের ক্রীড়নক। নির্মমতা হলো এই যে, আড়ালে থাকে মানুষের খোলসে হৃদয়হীন মানুষ।
মুক্তধারার জলধারায় রাজা রণজিৎ কুড়িয়ে পেয়েছিলেন অভিজিৎকে। পিতৃ¯েœহের ত্রুটি করেননি তিনি। যুবক হয়ে উঠলেন যখন অভিজিৎ, তাকে শিবতরাইয়ের শাসনভার অর্পণ করলেন। দুটো প্রদেশ পাশাপাশি। উত্তরকূট আর শিবতরাই। মাঝখানে মুক্তধারার স্রোতোধারা।
শিবতরাইয়ের প্রজাদের শায়েস্তা করতে কী কুবুদ্ধি চাপলো উত্তরকূটের রাজার মনে। মুক্তধারার জলধারায় বাঁধ দেবার জন্যে বিভূতিকে দায়িত্ব দিলেন। বছরের পর বছর ধরে বিভূতি ‘মুক্তধারার ঝরনাকে বাঁধ দিয়ে বাঁধতে লেগেছে।’ সে বাঁধ বারবার ভেঙে যায়, কত লোক, কত ঘর বাড়ি বাঁধ ভাঙার সময় ধুলোবালি-জলে চাপা পড়ে প্রাণ হারায়, গৃহহীন হয়। বিভূতি তাতে তোয়াক্কা করে না। শিবতরাইকে বশ করতে হবে। জলহীন শিবতরাইয়ের ফসলের মাঠ ধু ধু করবে, কৃষকের চাষের ক্ষেত শুকিয়ে কী পরিণতি হবে সেসব ভাববার সময় নেই বিভূতির। সে চায় যন্ত্র বানাবার কৌশল দিয়ে জয়ী হতে। সে চায় তার জ্ঞান প্রকাশের বিজয় মুকুট ছিনিয়ে নিতে। কী ভয়ানক যন্ত্র সে বানিয়েছে শিবতরাইয়ের লোকেরা শুধু নয়। তার নিজের গ্রামের লোকেরা দেখেও আঁতকে ওঠে। উত্তরকূটের সকলের মুখে বিভূতির জয় জয় রব। কোনো কান্নার জোরেই তার যন্ত্র এতটুকু টলবে না। ছেলেহারা সুমনের মা কাঁদুক, শিবতরাইয়ের কৃষককুল কাঁদুক বিভূতির জয়টীকার কাছে সকল কান্নাই তুচ্ছ হয়ে যায়। অথচ শিবতরাইয়ের প্রজারা বিশ্বাস করে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন কোনো মানুষ তা বন্ধ করতে পারে না।
যুবরাজ অভিজিৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মূলত পিতারই বিরুদ্ধে। প্রজাকুলের পক্ষে। যুবরাজ অভিজিৎ বিশ্বাস করে, ‘প্রীতি দিয়ে পাওয়া যায় আপন লোককে, পরকে পাওয়া যায় ভয় জাগিয়ে রেখে।’ তার আপনলোক প্রজারাই। প্রজাদের স্বার্থ, প্রজাদের বেঁচে থাকাতেই তার বেঁচে থাকার সার্থকতা। প্রজাদের মরণ, তার মরণ। মুক্তধারার জলপ্রবাহ বন্ধ হলে প্রজারা না খেয়ে মরবে, সে মরণ দেখা যে তার কাছে পাপ! যে ঝরনাতলায় তাকে কুড়িয়ে পাওয়া গেছে, সেই ঝরনার জলের শব্দে সে তার মাতৃভাষা শুনতে পায়। সে ভাষা তাকে আপন কর্তব্যের পথেই নিয়ে যায়। পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, পিতৃ¯েœহকে অস্বীকার করে নয় নিজের জীবন দিয়ে সে সকলের জন্যে পথ খুলে দেয়। বেঁচে থাকার পথ।
উত্তরকূটের রাজা রণজিৎ কেন খেপে উঠেছিলেন শিবতরাইয়ের প্রজাদের ওপর? উত্তরটি সেই পুরাতন। খাজনা আদায় হয়নি ঠিকমতো। দুর্ভিক্ষ, খরা কোনো দুর্যোগেই তো প্রজাদের খাজনা মাফ হয় না। তখন ভয় দেখানো, দমন-পীড়ন ছাড়া খাজনা আদায়ের পথটিই কেবল খোলা থাকে শাসনযন্ত্রের কাছে। শিবতরাইয়ের প্রজাদের অধিকারসচেতন করবার জন্যে ধনঞ্জয় নামক বৈরাগী চেষ্টা চালিয়ে যায়; যেমন দায়িত্ব নিতে হয় দু-একজনকেই বরাবর।
রাজা রণজিৎ আর ধনঞ্জয় প্রসঙ্গে একবাক্যে রবীন্দ্রনাথ যা উচ্চারণ করলেন তাতে তাঁর নিজের ও পূর্বপুরুষের জমিদারি কিংবা আজকের খাজনা/কর ইত্যাদি বিষয়ে হোঁচট খেতে হয়।
‘রণজিৎ : পাগলামি করে কথা চাপা দিতে পারবে না। খাজনা দেবে কি না বলো।
ধনঞ্জয় : না মহারাজ, দেব না।
রণজিৎ : দেবে না? এত বড়ো আস্পর্ধা?
ধনঞ্জয় : যা তোমার নয় তা তোমাকে দিতে পারব না।
রণজিৎ : আমার নয়?
ধনঞ্জয় : আমার উদ্বৃত্ত অন্ন তোমার, ক্ষুধার অন্ন তোমার নয়।
রণজিৎ : তুমিই প্রজাদের বারণ কর খাজনা দিতে?
ধনঞ্জয় : ওরা তো ভয়ে দিয়ে ফেলতে চায়, আমি বারণ করে বলি প্রাণ দিবি তাঁকেই প্রাণ দিয়েছিন যিনি।’
রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে প্রজারা প্রাণ নিয়ে বাঁচতেই তো চায়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন আপন স্বার্থ রক্ষায় অন্ধ হয়ে ওঠে তখন রাষ্ট্রের পেট থেকেই জন্ম নেয় অভিজিৎ, ধনঞ্জয়, কিংবা সঞ্জয়রা। উত্তরকূটের রাজা বিভূতির সহায়তায়, বিভূতির বিশ্বাস ও দম্ভকে ব্যবহার করে শিবতরাইয়ের জল বন্ধ করে দিতে চেয়েছেন। কৃষক সেচের জল না পেয়ে প্রাণ হারাক কেননা শিবতরাইয়ের কৃষককুল অবাধ্য, কেননা শিবতরাইয়ের চেয়ে ধনে-মানে বড়ো হতে হবে উত্তরকূটকে। এই রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধেই রবীন্দ্রনাথের শক্ত অবস্থান। ভারতবর্ষে মানুষের যে শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাস খুঁজেছিলেন সেই শ্রেষ্ঠত্বেই রচিত হবার কথা সভ্যতার জয়গান। সেখানে সকলকে একসঙ্গে যুক্ত করেই কাল থেকে কালান্তরের পথে যাত্রার আহ্বান থাকে। সেখানে উত্তরকূটের মতো ষড়যন্ত্র করে না পাশের প্রদেশের প্রজাদের বিরুদ্ধে। গোপনে জল বন্ধ করে প্রকাশ্যে সাহায্যের হাত বাড়ায় না। অভিজিৎ যেমন বলেছিলেন অকপটে : ‘ডান-হাতের কার্পণ্য দিয়ে পথ বন্ধ করে বাঁ-হাতের বদান্যতায় বাঁচানো যায় না।’ একদিকে মৈত্রী চুক্তি অন্যদিকে গোপন কূটচাল। দিনের আলোয় বন্ধুতা, অন্ধকারে শত্রুতা। এই কপটতার বিরুদ্ধেই রবীন্দ্রনাথ বার বার সাবধান করেছেন। বিশ্ববোধ প্রবন্ধে ‘যুক্তাত্মা’ শব্দটির ব্যবহার কোনো একক মানুষের জন্যে নয় যেমন, তেমনি কোনো একক রাষ্ট্রের জন্যেও নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় যতক্ষণ ‘যুক্তাত্মা’র প্রকাশ না ঘটবে ততক্ষণই দূরত্ব; অবিশ্বাস; শত্রুতা। রাজায়-প্রজায় যেমন তেমনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। ‘যুক্তাত্মা’র মূলে থাকে ‘আপন’ করে নেবার তীব্র আকাক্সক্ষা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মানুষ বিনাশ করতে পারে, কেড়ে নিতে পারে, অর্জন করতে পারে, সঞ্চয় করতে পারে, আবিষ্কার করতে পারে কিন্তু এইজন্যেই যে মানুষ বড়ো তা নয়। মানুষের মহত্ত্ব হচ্ছে মানুষ সকলকেই আপন করতে পারে। মানুষের জ্ঞান সব জায়গায় পৌঁছোয় না, তার শক্তি সব জায়গায় নাগাল পায় না, কেবল তার আত্মার অধিকারের সীমা নেই। মানুষের মধ্যে যাঁরা শ্রেষ্ঠ তাঁরা পরিপূর্ণ বোধশক্তির দ্বারা এই কথা বলতে পেরেছেন যে, ছোটো হোক, বড়ো হোক, উচ্চ হোক, নীচ হোক, শত্রু হোক, মিত্র হোক, সকলেই আমার আপন।’ কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়নে ‘মহত্ত্ব’, ‘আত্মা’, ‘আপন’ ইত্যাদি শব্দগুলো জায়গা পায় কি?
মুক্তধারা নাটকে ব্যবহৃত দুইটি স্থান উত্তরকূট আর শিবতরাই ভারতবর্ষের কোন ভৌগোলিক অবস্থানে পড়েছে তার খোঁজ করা হাস্যকর। কেননা জায়গাগুলো কাল্পনিক বলাই বাহুল্য। কিন্তু সত্যিই কি কাল্পনিক? শিবতরাই কি উত্তরবঙ্গের কোনো জায়গা নয়? আর মুক্তধারা ঝরনা কি কেবলই ঝরনা? নাকি তার অপর নাম তিস্তা? নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজার হেক্টর জমিকে উর্বর রাখার দায়িত্ব নিয়েছিল যে তিস্তা? হেলসিংকি রুল, জাতিসংঘ পানি প্রবাহ সনদ ১৯৯৭ এসব শব্দও কি খুব বেশি অচেনা?
শিবতরাইয়ের কৃষকের কান্নার সঙ্গে কি মিলে যায় তিস্তাপাড়ের কৃষকের চোখের জল? আর বিভূতির নব রূপায়ণ? সে প্রশ্ন তোলা থাক ভবিষ্যতের প্রজাদের কাছে।
অখণ্ড ভারতবর্ষে কতভাবেই না মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজেছেন রবীন্দ্রনাথ।  খণ্ডিত ভারতবর্ষে নতুনভাবে শুরু হোক শ্রেষ্ঠত্বের অন্বেষণ; রবীন্দ্রনাথের পথ ধরেই।