বিশ্বে আণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের বিপক্ষে সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা

প্রকাশিত: ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২১

বিশ্বে আণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের বিপক্ষে সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা

 

ননীগোপাল দেবনাথ

ব্রাজিল থেকে সুইডেন ৩১ টি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার প্রচেষ্টা করে, ১৭ টি দেশ আনুষ্ঠানিক অস্ত্রশস্ত্র কর্ম পরিকল্পনা ও কর্মসূচি আরম্ভ করে। পরিশেষে আজ প্রায় ২৫ বৎসর যাবৎ নয়টি দেশ আণবিক অস্ত্রের অধিকারি। দীর্ঘদিন দৃঢ় উদ্যম নিয়ে প্রচেষ্টা থাকলেও বিশ্বের সাঙ্ঘাতিক প্রাণ নাশক এই অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধির গতিরোধ করা দিনদিন কঠিনতম হতে চলছে।

বিগত ২০ বৎসর যাবত অধিকাংশ দেশ যারা আণবিক অস্ত্র সংগ্রহের জন্য উচ্চাভিলাষী তাদের মাঝে রয়েছে এমন কী লিবিয়া, সিরিয়ার মত দেশও। আগামী দশকে সম্ভবত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের অভিলাষকে সংযত রাখা কষ্টসাধ্য হবে বলে প্রতীয়মান। চীনের দ্রুত আঞ্চলিক ক্রম বর্ধিত কর্তৃত্ব এবং উত্তর কোরিয়ার উঠতি আণবিক অস্ত্রাগার পুনঃপুনঃ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকে স্মরণ করিয়ে দেয় আতঙ্ক, যদিও দুটি দেশই অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ শক্তি। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের যুদ্ধংদেহী কর্মসূচি সৌদি আরব ও তুরস্কের ভাবনাকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রাখছে। পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি কোন প্রকার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নয় যদিও, এটি সংক্রামক রোগের মতই যেন ছড়িয়ে পড়তে চাইছে। এর বাধা, দমন ও সংযম দুর্বল হতে থাকলে দ্রুত অকৃতকার্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশী এবং লাগামহীন হয়ে গেলে বিশ্ব এক নির্মম হুমকিতে পড়বে।

পারমাণবিক বিভাজনের সংকেত অনেক ক্ষেত্রেই অশুভ। আমেরিকা ও রাশিয়ার মাঝে অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ চুক্তির ফলে ১৯৯১ থেকে ২০১০ সালের মাঝে ৩৮০০০ ধ্বংসকারী অস্ত্র কমানো হয়েছে, ৭৯% হ্রাস । জোঁ বাইডেন ও পুটিন ২৬ জানুয়ারি ২০২১,একমত হয়েছেন, পরিশিষ্ট চুক্তি আরো পাঁচ বছর সম্প্রসারিত করতে — এক নব যাত্রা। এ সংবাদ সাধুবাদের যোগ্য, তবে অনুসরণের প্রত্যাশা অস্পষ্ট বা অনুজ্জ্বল। চীন, ভারত, উত্তর কোরিয়া এবং পাকিস্তান সবাই নিউক্লীয় ক্ষমতা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণে ব্যস্ত। বিশ্বব্যাপী নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি হতাশা ব্যঞ্জক। পরম তত্ত্ব এই আণবিক অস্ত্র বর্ধন না করার চুক্তি যদিও শক্তিকে শৃঙ্খলায় আনার ভিত্তি। এক নতুন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরের দ্বারা ৮৬ টি দেশ পারমাণবিক বোমার নিষেধাজ্ঞা জারি করে ২২ জানুয়ারি ২০২১ সালে। যার ফলে এখনো বোমার অধিকারি নয় তবে অভিলাষী এমন দেশের নৈরাশ্য লক্ষণীয়। আজ আমরা শান্তি অর্জনের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগামী বলা যায়।

আণবিক অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা যদি কার্যকর না হয়, নিরাপত্তার অবনতি ঘটতে থাকবে, কোন দেশ হয়ত ঔদ্ধত্য নিয়ে অবাঞ্ছিত বোমার ব্যবহার করতে পিছ পা হবে না। বিগত দশক গুলোতে আমেরিকা আণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের কিছুটা দমিয়ে রেখেছিল অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক বাধা নিষেধ জারি করে এবং প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে, যেমন ইরাক। তদ্ব্যতীত আজ আমেরিকার অর্থনৈতিক হালচাল আগের মত নেই। তাছাড়া ডোনাল ট্রাম্পের প্রচণ্ড উগ্র স্থায়িত্বের কালে বন্ধু প্রতিম দেশও আশাহত হয়েছিল। প্রয়োজনে আমেরিকা কতটা সুরক্ষা দিতে চাইবে বা কার্যকরী আধিপত্য দেখাতে সমর্থ হবে সেটি ভাববার বিষয়। সকলের দৃষ্টি এখন মি. বাইডেনের উপর, তিনি কতটা হারানো প্রত্যয় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।

বিবেচনা করা যাক আমেরিকার আণবিক চাদর যাহা বিস্তৃত এশিয়ার বন্ধুদের উপর। সমষ্টিগতভাবে বলা যায় অঙ্গীকার এমন ছিল, উত্তর কোরিয়া বা চীন, শিওল কিংবা টকিওকে আঘাত হানলে আমেরিকা সাথে সাথে জবাব দেবে পিয়ংইয়ং কী বেইজিংকে। বিগত কয়েক দশকে আমেরিকার এমন ভীতি প্রদর্শন বিশ্বস্ত বন্ধু্‌দের জন্য নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস ছিল। তখন আমেরিকার নিজ নগর বন্দর উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরিসীমার আওতার বাইরে ছিল। এখন আর তা নেই। আমেরিকার পিয়ংইয়ংকে আঘাতের পরিণামে স্যান-ফ্রান্সসিশকো ঝুঁকির মুখে থাকবে। এ পরিস্থিতির জন্য মি. বাইডেন আগের প্রতিজ্ঞায় বিমুখ হতে পারে, ফলে কিম্ জং উন্ সাহসী হতে পারে শিওলকে আঘাত করতে। তাই এখন দক্ষিণ কোরিয়া পুনঃ আণবিক অস্ত্রের অধিকারি হতে চাইলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও তাইওয়ানের মত গণতান্ত্রিক দেশের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবিকতা। মধ্য প্রাচ্যের কথা অবশ্য ভিন্ন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অনেকটা সঙ্কুচিত এবং অবসন্নের পথে। মি. বাইডেন বন্ধুত্ব পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছেন ইরানের সাথে, অপরদিকে তাদের অনেক পরমাণু রসদের আগামী কিছু দিনে মেয়াদ কালের অবসান হবে। তাছাড়া ইরান আবারো যদি মনস্থ করে তার পারমাণবিক শক্তি পেতেই হবে, সে-ক্ষেত্রে সৌদি আরবও চাইবে না পিছিয়ে থাকতে। মো: বিন সলমন, সৌদি যুবরাজ দেশের পারমাণবিক প্রয়োগশাস্ত্রের উচ্চাভিলাষী ও নিজ বিধি সংগত ক্ষমতার কিছু হিসাব নিকাশ পরীক্ষা করছেন। তুরস্কও অবশ্য একই অনুসরণ করতে চাইবে।

যদি পারমাণবিক শৃঙ্খলার বুনট হালকা হতে থাকে, প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়বে অস্ত্রের বিস্তৃতির গতিরোধ করা। তাই আজই কার্যকারী পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা, চীন, ইউরোপ ও রাশিয়া সমভাবে আগ্রহী আণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতিরোধ করতে। অপর দিকে জাপানের আণবিক অস্ত্রের মালিকানার প্রত্যাশা চীনের জন্য ভয়ানক দুঃস্বপ্ন।

পারমাণবিক শক্তিশালী দেশ গুলোকে মৌলিক বা প্রাথমিক দিকে নজর দিতে হবে সর্বাগ্রে। আজ আমেরিকা রাশিয়া নিশ্চিতভাবে বিশ্বের ৯০ ভাগ ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারি, প্রচেষ্টা শুরু হতে হবে তাদের হাত ধরে। আমেরিকার নিউক্লীয় ক্ষমতা ত্রয়ী, স্থলভাগে গুদামজাত, সমুদ্রে সাব-মেরিনে এবং আকাশে বোমারু বিমানে। স্থল ভাগে ক্ষেপণাস্ত্র অকার্যকর করলে প্রদর্শিত হতে পারে প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা ব্যতীত।

আমেরিকা ও রাশিয়ার মাঝে অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ চীনকে প্ররোচিত করার ক্ষমতা রাখে, অস্থিতিশীল স্ফীত পরিস্থিতি পরিহার করে সাহায্যপ্রদ হাত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে। এবং চীন সংযত থাকলে তার প্রভাব অবশ্যই পড়বে ভারত ও পাকিস্তানের উপর।

আমেরিকার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা হবে উত্তর কোরিয়া ও ইরানের স্নায়বিক অবস্থা শান্ত করতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া, মি. বাইডেন ইতোমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বন্ধন পুনরুদ্ধার করবেন।

আণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধির অগ্রগতি রোধে প্রয়োজন পারমাণবিক গবেষণার নির্ধারিত স্থানের উপর বিশ্বব্যাপী কঠোর নজরদারি। গুপ্ত বার্তা সংস্থা সহজবোধ্য ও পরিচ্ছন্নভাবে তুলে ধরতে পেরেছিল ইরানের মত দুর্বৃত্তায়ন। আজ বদ্ধদৃষ্টি থাকা চাই ও যথা সময়ের পূর্বে সাবধান বাণী দেয়া চাই, যে কোন প্রকার পারমাণবিক প্রযুক্তির পরিবর্তন পরিবর্ধনের উপর, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কের মত রাজনৈতিক অভিপ্রায় যেখানে প্রত্যক্ষ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিশ্বের পারমাণবিক রক্ষী বা প্রহরী, প্রশংসনীয় একটি কাজ করে চলছে, নিয়ন্ত্রণ করছে বেসামরিক পারমাণবিক নির্বাচিত স্থান এবং পুলিসবৎ আচরণের মাধ্যমে ইরানের কর্মসূচির উপর কঠোর পরিদর্শন ও সজাগ দৃষ্টি রেখেছে। যদিও সংস্থাটি অত্যধিকভাবে চাপের মুখে এবং আর্থিক তহবিল ক্ষীণ, তাছাড়া রয়েছে প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমহার বজায় রেখে চলার সামর্থ্যের দিক।