বিষাদ-সিন্ধুর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি

প্রকাশিত: ১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২০

বিষাদ-সিন্ধুর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি

সৌমিত্র শেখর

ছোটো করে আমরা যাকে বইমেলা বলি ওটার পোশাকি নাম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। তো, ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তা’র কোনো একদিন মেলা শেষে ফিরছি। দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরের বাইরের ফুটপাতেও বই নিয়ে বসেছেন এক হকার। আগে এখান অবধি হকার বসতে দেখতাম না। এখনতো পুরো ক্যাম্পাসটাই হকারের রাজত্ব হয়ে গেছে– চাটনি-চুড়ি-চানাচুরের সঙ্গে বইওয়ালাও এসেছে দেখে কৌতুহলবশত দাঁড়ালাম। সঙ্গে ছিল আমার এককালের সুযোগ্য ছাত্র, এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইমন সালাউদ্দিন। ‘পঞ্চাশ’ ‘পঞ্চাশ’ বলে হাঁকছেন হকার, যেটা নেব সেটাই ‘পঞ্চাশ’! কী কী বই আছে, চোখ বুলালাম একনজরে। দেখলাম হরেক রকমের বই। আমার আগ্রহের লেখকের বইও পেয়ে গেলাম। তুললাম হাতে। কিনবো বলে নয়, দেখবো বলে। কারণ এই লেখকের রচনাবলি আমার ঘরে আছে। তাছাড়া আমার গবেষণাজীবনের শুরুই হয়েছিল এই লেখকের লেখা নিয়ে। ফলে তাঁর লেখা বই আমার কাছে নতুন নয়। বইটি হাতে তুলে দেখি, সস্তার তিন অবস্থা নয়, এখানে সস্তার একেবারে পাঁচ অবস্থা! আমি শংকিত, আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এই ‘পাঁচ অবস্থা’র শিকার হতে পারে।

বইটি হাতে নিয়ে দেখলাম: দারুণ চকচকে প্রচ্ছদ, বাঁধাই ভালো, নিউজপ্রিন্ট নয় সাদা কাগজ, ছাপাও ঝকঝকে। আর দাম? তিনশ বিশ টাকার বই মাত্র পঞ্চাশ টাকায়! এত সস্তায় বই, তাও আবার হলের সামনে, ক্যাম্পাসের ফুটে? অবিশ্বাস্য! ধন্যবাদ কর্তৃপক্ষ, ফুটপাতে এভাবে হকার বসানোর অনুমতি দেওয়ার জন্য!! ভবিষ্যতে এই হকারদের সারি নীলখেত অবধি পৌঁছানো হোক! কোনো ছাত্র ভাবতে পারে, বইটি কিনেই নিই। ফোর্থ সেমিস্টারেইতো পাঠ্য। লাগবেই। একটু আগেই কিনি। একজন ছাত্রী বলবে, গ্রামের করিমুল্লাহ মামুকে পাঠিয়ে দিই, তিনি চেয়েছেন– বইপাগল লোকটা। সত্যি, কেতাবি ভাষায় যাকে ‘বহিরঙ্গীয় পারিপাট্য’ বলে সেটিতে বইটি শয়ে শ। কিন্তু এর ফাঁকিটা সর্বত্র। এই ফাঁক ও ফাঁকিযুক্ত বই পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পাঠক, ছাত্রছাত্রীরা নম্বরও পাবে না প্রত্যাশা মতো। প্রথমেই উল্লেখ করা যাক, মূল বইটির নাম কিন্তু ‘বিষাদ-সিন্ধু’ এবং এর লেখকের নাম ‘মীর মশাররফ হোসেন’। জানিয়ে রাখি, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ লিখতে হাইফেনটি দিতেই হবে; ওটি না-দিলে চলবে না। এই বইয়ে দেখছি–

গ্রন্থনাম আছে এভাবে:

  • ‘বিষাদ সিন্ধু’ (প্রচ্ছদপৃষ্ঠা, টাইটেলপৃষ্ঠা, ইনারপৃষ্ঠায়)
  • ‘Bishat Sindu’ (‘বিশাত সিন্দু’) (ইনারপৃষ্ঠায়)

লেখকনাম আছে এভাবে:

  • মীর মোশাররফ হোসেন (প্রচ্ছদপৃষ্ঠায়)
  • মীর মশার্ ফ হোসেন (টাইটেলপৃষ্ঠায়)
  • মীর মশারর্ ফ হোসেন (ইনারপৃষ্ঠায়)
    শুরুতেই পাঁচ জায়গায় এ অবস্থাকে আপনি নিশ্চিতভাবেই ক্লাসিক গ্রন্থটির পঞ্চত্বপ্রাপ্তি বলে অভিহিত করতে পরেন। না-জানি ভেতরে কী আছে! কোথায় কোথায় বাদ গেছে, কোথায় কার লেখা থেকে এটা ওটা ঢুকিয়ে দিয়েছে! আর বানান-বাক্য বিন্যাসের কথা বাদই দিলাম। এ বই কি পাঠযোগ্য? এমন বই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্রি হয়, ছাত্রছাত্রীসহ বহুজন তা কেনেন, পড়েন এবং ‘পড়েন’! শেষ ‘পড়েন’টি ‘পতিত’ হওয়া অর্থে। সত্যি, কী বিভ্রমেই না পড়ছেন আমাদের পাঠককুল! বইটিতে অর্থমূল্য শুধু টাকায় নয় আছে ‘ইউএস’ ডলারে দেওয়াও। কিন্তু সেখানেও না-হেসে পারবেন না: লিখছে ‘ইউস’ ডলার!

এখন কথা হলো, এই দুঃখ কি শুধু ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ক্ষেত্রেই সত্য? না। ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ক্ষেত্রেই শুধু এই বিষাদময়তা নয়। আমি ফুটপাতে ‘পথের প্যাঁচালী’, ‘ঝড়া পালক’, ‘শেসের কবিতা’, ‘বিশের বাসি’ ইত্যাদি দেখেছি; দেখেছি রবীন্দ্রনাত ঠাকুর, জীবানন্দ দাস, বুদ্ধুদেব বসুর লেখা বই। এবার না-ভেবেই বলুন, এগুলো কী বই? কিন্তু এ-ও বলছি, ফুটপাত থেকে আমি অনেক ‘অমূল্য’ বই আর পত্রিকা পেয়েছি। তাই আজো আমি হাঁটাপথে বইয়ের পসরা পেলে দাঁড়িয়ে যাই, চোখ বুলাই দুপুরের তপ্ত রোদ কিংবা রাত্রির আঁধারেও– তা-সে নীলখেত হোক, বাংলাবাজার হোক অথবা হোক কলেজস্ট্রিট!
সশ ১৭ই এপ্রিল ২০২০

সৌমিত্র শেখর ঃ অধ্যাপক ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়

ছড়িয়ে দিন