বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী

প্রকাশিত: ৯:০১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২১

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী

 

শওকত চৌধুরীঃ

একজন বাবা তাঁর সন্তানের জন্য কতভাবে অবদান রেখে যান; তার চুল চেড়া হিসাব কেউ কোনদিন বের করতে পারবে না। ‘বাবা’ শুধু একজন মানুষই নন, শুধু মাত্র একটি সম্পর্কের নামই নয়; এই নামটির মধ্যেই জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। হ্যাঁ, আজ আমি লিখতে বসেছি আমার বাবাকে নিয়ে, আমার সার্থক বাবাকে নিয়ে, যিনি তাঁর হৃদয়ের বিশালত্ব দিয়ে আমাদের বাবা হওয়ার সাথে সাথে হতে পেরেছিলেন পরিবারের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ ।
আজ আমার সেই বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরীর চির প্রস্থানের ২য় বার্ষিকী।

৬ ভাই এক বোনের মধ্যে আমার বাবা ছিলেন ৫ম ।
বড় ভাই মরহুম সামছুল আলম চৌধুরী শিক্ষকতা করতেন ,২য় ভাই মরহুম ইলিয়াসুর রহমান চৌধুরী ( সেনবাহিনী/ শিক্ষকতা/ ইউ পি সচিব / পোস্ট মাস্টার/ ইউ পি চেয়ারম্যান) ৩য় ভাই এবং চতুর্থ ভাই কৃষক ৫ম আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী ( ই পি আর এবং বাংলাদেশ রাইফেলস ) ছোটভাই মরহুম জহিরুল আলম চৌধুরী সেনাবাহিনীতে চাকুরি করতেন এবং পরবর্তীতে ব্যবসা ।
আমার বাবা সহ ৪ ভাই বৃটিশ এবং পাকিস্তান আমলে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ হওয়ার পর সরকারি চাকুরি করতেন ।

বড় ভাইয়ের ছিল শিক্ষকতা আর ৩ ভাই সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন । আমার চাচা জনাব মরহুম ইলিয়াসুর রহমান চৌধুরী পতন উষার ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান সহ দুই বারের চেয়ারম্যান ছিলেন ।
আমার বাবা ১৯৫০ সালে স্কুলে লেখাপড়া করা থাকাকালীন ই পি আরে যোগদান করেন । ৩৫ বছর সরকারি চাকুরি করেন ।
বাবা নেতা ছিলেন না সমাজ সেবক ছিলেন না সালিশি বিচারকও ছিলেন না তেমন কোনো পরিচিত মানুষ ছিলেন না কিন্তু জীবনে অনেক সফলতা আছে কখনো কাউকে বলতেন না বা ব্যবহার করে মানুষের বাহ্ বাহ্ পাওয়ার চেষ্টা করতেন না । একটা জিনিস বাবার মধ্যে বিদ্যমান ছিল আর তা হচ্ছে দেশের জন্য পরিবারের জন্য যখন যা প্রয়োজন তা করতেন ।
যেমন ১৬ বছর বয়সে যখন পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত, কারন কৃষিতে সফলতা না পাওয়া জমিজমা নিয়ে মামলা তখন পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা কাটাতে চাকুরিতে যোগদান করেন পরবর্তীতে যখন মাতৃভূমি হানাদারদের মাধ্যমে আক্রান্ত তখন ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করেন । এই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি নিজেও মারাত্মক ভাবে আহত হন । হাতের সৌল্ডার ভেংগে যায় কানের পর্দা ফেটে যায় পরবর্তীতে আর কখনোই ভাল করে কানে শব্দ শুনতে পারতেননা । যুদ্ধের সর্বশেষ ৩ মাস নতুন এবং বেসরকারি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব দিয়ে ভারতের চাকুলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয় ।
৩ মাস রাজনৈতিক নেতা সরকারি চাকুরিজীবি ছাত্র কৃষক শ্রমিককে ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব সফলতার সহিত পালন করেন ।
দেশ স্বাধীনের পর ঢাকা পিলখানায় পোস্টিং পান । সুস্থ হয়ে খেলাধুলা শুরু করেন চাকুরির পাশাপাশি । হকি খেলতেন এক পর্যায়ে বাংলাদেশ রাইফেলের মুল টিমে খেলার সুযোগ পান এবং সেরা খেলোয়ার হিসেবে মনোনীত হন ।
আমরা ৩ ভাই এক বোন ঢাকায় থাকি । আমাদের বাবা আমাদের লেখাপড়ার প্রতি খুবই দায়িত্ব পালন করতেন । ভাই বোনেরা যাতে ভাল স্কুলে লেখাপড়া করা সেটাও দেখতেন ।
আমার দুই বড়ভাই বাংলাদেশের অন্যতম একটি ভাল স্কুল বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুলে লেখাপড়া করেন । বড় ভাই সেলিম আহমদ চৌধুরী ব্যবসা , সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন । ২০১১ সালে পতন উষার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন । মেজো ভাই হাফিজ মাওলানা আতিকুর রহমান চৌধুরী পড়াশোনা শেষ করে লন্ডনে চলে যান এবং মসজিদে আবু বকর সিদ্দিক ক্রুফোর্ড খতিব এবং প্রধান ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন । আমাদের একমাত্র বোন এবং আমি স্ব-পরিবারে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।
আমাদের বাবা ২০১৯ সালে ১৫ই রমজান মৃত্যুবরণ করেন । সবার কাছে দোয়া চাই আমাদের বাবাকে মহান আল্লাহ পাক যেনো বেহেশতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন।

শওকত চৌধুরী,
ইংল্যান্ড প্রবাসী।