বুদ্ধিজীবীগণের বিকাশে রাষ্ট্রও হতে পারে প্রতিবন্ধক

প্রকাশিত: ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২১

বুদ্ধিজীবীগণের বিকাশে রাষ্ট্রও হতে পারে প্রতিবন্ধক

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

রাষ্ট্র শাসকবৃন্দের প্রাচীনতম কৌশল প্রক্রিয়ার প্রধান একটি স্তর হিসেবে পরিগণিত হয় নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ফ্যাসিজম শব্দ পৃথিবীর রাজনৈতিক সমাজে তীব্র ভাবে আত্মপ্রকাশ করে। ফ্যাসিজম হচ্ছে রাষ্ট্রের শাসকদলের সবচেয়ে কঠোর একটি সিদ্ধান্ত। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্তরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়। সমকালীন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফ্যাসিজম এর বিভিন্ন প্রয়োগ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনই এর রূপরেখাও পরিবর্তীত হয়েছে। ভারতের নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয়দের একজন কবিই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন পৃথিবীর একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবীদ। বিশেষ করে তিনি বাঙালী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একজন প্রধানতম দার্শনিক ছিলেন। ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে ভারতের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। আবার ইংরেজ শাসনামলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারটি লাভ করেছিলেন।আবার অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় লক্ষ্য করা গিয়েছে কবি দাউদ হায়দার থেকে শুরু করে সালমান রুশদি পর্যন্ত অনেকেই আজ নির্বাসনে রয়েছেন যুগের পর যুগ কাল। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রে এমন ঘটনা রয়েছে অনেক অনেক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের মাত্র দুই দিন পূর্বে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করে হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের। শুধুমাত্র হত্যা ও নির্বাসনের মাধ্যমে নয় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রের অনেক সংস্হাগুলোও আজকাল নানাভাবে সক্রিয় রয়েছে। কিন্ত এই কঠোর সিদ্ধান্তের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া আর কোন কোন বিষয়বস্ত রয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতেই এখন উপস্থাপন করা যেতে পারে এখানে। পোস্ট-কমিউনিজম কাউন্টার-রেভ্যুলুশান যুগে প্রবেশ করে নিও-স্টানিল কস্টিউমধারী লাল-মগজের অনেকেই যখন পূনরায় রাশিয়ার জনগনকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তাদের অন্যতম একজন রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী হলেন বরিস নেমস্তভ। তাকে ২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় নির্জন ক্রেমলিন প্রাসাদের কাছে ছয়টি বুলেট দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। রাশিয়ার মানুষের মনে ধারনা ছিল তিনি হয়তো রাশিয়ার নতুন জীবনের জন্মদাতা হয়ে উঠবেন এবং নির্বাচিত হবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে। রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করা ব্রিটিশ সাংবাদিক আন্দ্রেই অস্রোভস্কি তার ‘দা ইনভেনশন অব রাশিয়া’ গ্রন্থে গর্ভাচেভ থেকে ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামলের কথা বর্ণনা করতে যেয়ে গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। হলিউডের জেমস বন্ড মুভির একটি ডায়লগ গত কিছুদিন পূর্বের পোস্ট-ডিনার সময়ে আমার রাতের ঘুমে এক প্রকারের ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছিল। রাশিয়ায় অভিনীত সেই সিনেমায় একটি ডায়লগ এমনই ছিল-‘এদেশের প্রতিটি চোখ রাষ্ট্রের চোখ।’ একটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে হলিউডের একটি সিনেমার একটি বাক্যে শুধুমাত্র। আর বাস্তবতা হয়তো আরও কঠিন ও কঠোরত। কয়েকদিন পূর্বে রাশিয়ার নভেয়া গেজেতা’র এডিটর-ইন চিফ দিমিত্রি এন্ড্রিয়াভিচ মুরাতভ যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন তখন মনে হয়েছিল এই কঠোর নজরদারির রাষ্ট্র রাশিয়া ও পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেশে নভেয়া গেজেতা’র মতো কঠোর সমালোচক একটি পত্রিকার প্রধান সম্পাদক দিমিত্রি মুরাতভ কি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দ্বারা নির্মিত দেয়ালটি তাহলে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হলেন। এই প্রশ্নের উত্তর হা এবং না দুটোই। বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের দানবীয় শাসকের মিলিটারি সৈনিক দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দৈনিক ইত্তেফাকের ফটকের সামনেই রাষ্ট্রের একজন শক্তিশালী কবিকে রাস্তায় থামিয়ে চুল কেটে দিয়েছিল। কবির বয়স তখন সত্তরের গণ্ডিও অতিক্রম করেছে। এবং তিনি কল্লোল যুগের বাঙালীর কবি, যাদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঝাঁকরা চুল। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে কথা-সাহিত্যিক রাহাত খানের মাঝে লক্ষ্য করা গিয়েছিল এক করুন আক্ষেপের সূর। যা আমাদের কাছে অজানা। কি কারনে তিনি মৃত্যুর সন্দ্ধিক্ষণে বিভ্রান্ত ও অতৃপ্ত ছিলেন। আমাদের জানা নেই। মানুষ তার জন্মভূমিতে বেড়ে ওঠে প্রাকৃতিক কিছু বৈশিষ্ট্যের মাঝে। অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পরে। সমাজে তার প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণ মানুষের চিন্তার অনিয়ন্ত্রন সমাজ জীবনকে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরে বুদ্ধিজীবীদের স্বাভাবিক বিকাশলাভ। হত্যা ও নির্বাসনের চেয়েও সেটা কোন অংশে কম নয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জ্ঞান চর্চার স্বাধীনতা থাকা স্বত্তেও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যখন শূন্যতার সৃষ্টি হবে এবং আবেগ-অনুভূতিকে ধ্বংস করে ফেলার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে তখন রাষ্ট্রের ভীত দূর্বল হয়ে পরবে। প্রকৃত অর্থেই বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতা ও চিন্তার শক্তিও সেক্ষেত্রে অনেক অকার্যকর ও দূর্বল হয়ে পরবে। পোস্ট-পেন্ডামিক নিউ-ওয়ার্ল্ডে বিশ্বময় বিভিন্ন পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে পৃথিবীকে। উৎপাদনের সুষম বন্টন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করবে উন্নত রাষ্ট্রগুলো। মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে নানা চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব পুঁজিবাজারে বিভিন্ন সূচক ওঠানামা করবে। পণ্যের সুষম বন্টন পৃথিবীর মানুষের মৌলিক দাবির ভিত্তিতেই উৎপাদনের দিকেই পৃথিবীকে এগুতে হবে। উৎপাদনের বৃদ্ধির সাথে ঘাটতির যে সম্পর্ক স্থাপন হবে সেই সূচক সমৃদ্ধির প্রকৃত ঈঙ্গিত বহন করবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও প্রসঙ্গ জনসমাজেও প্রতিফলিত হবে। উদার রাষ্ট্রের নীতিমালা বাস্তবায়ন না হলে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি পাবার আশংকা অনেক বেশি থাকবে। এসব নানা কারনে ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সমাজে বুদ্ধিজীবীদেরও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পতিত হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। রাষ্ট্রের জন্য সেটা অত্যন্ত কুফল বয়ে আনবে নিঃসন্দেহে। পৃথিবীময় স্হবিরতার পর জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষার যে নতুন যুগের শুরু হয়েছে তার সঠিক স্বরূপ উন্মোচন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক।।

ছড়িয়ে দিন