ঢাকা ১৪ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


বৈশাখ এখন বৈশাখ তখন

redtimes.com,bd
প্রকাশিত এপ্রিল ১৯, ২০২১, ০৪:৪৪ অপরাহ্ণ
বৈশাখ এখন বৈশাখ তখন

শেলী সেনগুপ্তা
‘এসো হে বৈশাখ এসো, এসো’—- বাঙালি বৈশাখ আহ্বান করে বিশ্বকবির পংক্তিমালার সাথে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। এবং বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য অংশ। মানুষের চক্ষু,কর্ণ, নাসিকা মতোই অন্যতম উপাদান পহেলা বৈশাখ। আমাদের জাতিগঠনেরও অন্যতম উপাদান এটি। পহেলা বৈশাখকে নবর্ষ হিসেবে ধরা হয়েছে সম্রাট আকবরের আমল থেকে। তাহলে কি তারও আগে পহেলা বৈশাখ ছিলো না? ছিলো, তবে তখন এটি ছিলো একটু অন্য রকম।
কৃষির সাথে বাঙলা নববর্ষের নিবিড়তা এ সন প্রবর্তণের শুরু থেকে। বাংলাদেশের কৃষিকাজের সাথে ঋতুর ঘনিষ্ট সম্পর্ক। ঋতুর ওপর ভিত্তি করে চলে কৃষিকাজ। বাঙলা নববর্ষের মূল উৎসব হালখাতা। চিরচারিত অনুষ্ঠানটি আজো প্রচলিত, আজো পালিত হয়ে থাকে। তবে কিছুটা রুপান্তরিত হয়েছে লোকজ উৎসবে। কিছু অনুষ্ঠান সংযোজিত হয়েছে আবার কিছু বিলুপ্ত হয়েছে। পহেলা বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করার আয়োজন শুরু হয়েছিলো ১৯৬৭ সালে। রমনার বটমূলেই প্রথম আয়োজন হয়েছিলো ছায়ানটের উদ্যোগে। বাঙ্গালি সংস্কৃতি ধ্বংস করার যে অপচেষ্টা তদানীন্তন পাকিস্তানে শুরু হয়েছিলো তার প্রতিবাদে সাড়ম্বরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শুধু রমনার বটমূলেই নয় সারাদেশেই পহেলা বৈশাখকে বরণ করা হয় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈশাখী মেলা। এ মেলায় নাগরদোলা, তালপাতার বাঁশি এবং সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়, গ্রামবাংলার মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই মেলার। যার যার যা দরকার এক বছরের জন্য তা সংগ্রহ করে রাখে।
এদিন ঘরে ঘরে থাকে পান্তাভাত, ইলিশ ও নানা পদের ভর্তা। কখনো এই পান্তা-উৎসব আরো বড় আকারে অনেকের সাথে মিলেমিশে পালন করা হয়। বৈশাখী মেলা পরিবার, সমাজ, গ্রাম এর জনগণের মিলন উৎসব। ধর্মের ডামাডোলের বাইরে গিয়ে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান। গ্রামের সবাই একসাথে মিলেমিশে এ দিনটি পালন করে। এভাবেই এটি হয়ে গেছে বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশ।
পহেলা বৈশাখের সকালে নতুন সাজে সেজে তরুণ-তরুণীরা র‍্যালী বের করে। সুন্দর সাজে সেজে প্রিয়জনদের সাথে মেলায় ঘুরে বেড়ায়। সুস্বাদু খাবারের আয়োজন থাকে। পরস্পরের সাথে কুশল বিনিময় করা হয়। প্রচলিত কথা, ‘ বছরের প্রথম দিনটি ভালোভাবে কাটলে সারা বছর ভালো কাটবে’। এ সুযোগটি কেউ হারাতে চায় না।
সমতল ভূমির মানুষের মতো আদিবাসীরা নববর্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় নানা নামে ও প্রকরণে নববর্ষ অনুষ্ঠান উদযাপন করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালা বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয়। চাকমারা একে ‘বিজু’ নামে ডাকে। মারমারা বলে ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরা রা বলে ‘বৈষুক’ এবং তঞ্চঞ্যা সম্প্রদায় বলে ‘বিসু’। যে নামেই ডাকুক না কেন, নববর্ষ খুব সমারোহেই পালন করা হয়। সারা বছরের অপেক্ষা এই দিনটির জন্য।
বাংলাদেশে বৈশাখ আসে কখনো রোদের তীব্রতা ও ঔজ্জ্বল্য নিয়ে, আবার কখনো বজ্রপাতের ভয়াল ভ্রুকুটি নিয়ে। তবুও মানুষ আবাহন করে বৈশাখকে। বৈশাখের কাছ থেকেই মানুষ শেখে প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার সূত্র। পুরাণো সব গ্লানী থেকে মুক্ত হয়ে নতুন প্রভাতের জন্য আকুলতা, সেতো বৈশাখেরই দান।
এমনই প্রাণের বৈশাখকে গত দু’বছর মনের মতো করে বরণ করা হয় নি। বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতি বাংলার মানুষকে পেছন থেকে টেনে রেখেছে। তাই বলে প্রাণের আকুতি কিছু কম ছিলো না। এসময় যার যার ঘরে বসে প্রার্থনার হাত তুলে বছরের প্রথম ঋতুকে বরণ করা হয়েছে।
এই বৈশাখে প্রার্থনা সব অপশক্তি থেকে মুক্তি। অসাম্প্রদায়িক একটি স্রোতস্বিনী দরকার, যার স্বচ্ছতোয়া ধুয়ে দেবে মানুষের সব পাপ, ধুয়ে দেবে মানবিক বোধের জঞ্জাল। মানুষের মধ্যে জাগিয়ে দেবে বেঁচে থাকার অন্যতম বোধ। জাগিয়ে তুলবে বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নববর্ষের প্রাকৃতিক উৎসব প্রতিনিয়ত সে ডাকই দিচ্ছে। আহ্বানের জয় হোক।
এ ভূখন্ডের সব মানুষের মন আনন্দে নেচে উঠবে। সব পাপ এবং অশান্তি থেকে মুক্ত হোক ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভূখন্ড।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031