বয়ানে রামাদান ০৩

প্রকাশিত: ১০:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১

বয়ানে রামাদান ০৩

–চৌধুরী হাফিজ আহমদ
রাব্বি জিদনি ঈলমা , সকল কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রতি শুকরিয়া আদায় করছি অবনত চিত্তে যিনি আমাদের আজকে ৩ সিয়াম পালনের সুজুগ দিয়েছেন। রামাদান মাসের এই ৩য় দিনে অবস্তান করছি যেন বুঝতেই পারছিনা কি করে এই দিন গুলা অতিক্রম করলাম , রামাদানের এত দ্রুত দিনগুলা অতিক্রম করে বলেই আমাদের মহানবী সঃ রামাদানের প্রস্তুতি নিতেন রজব মাস থেকেই – তিনি দুআ করতেন আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শা`ব্বান ওয়া বাল্লিগ না রামাদান – এই দুআ থেকেই অনুমান করা যায় কত আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া দরকার , আমরা মানুষরা খুব দ্রুতগামী চাই সব কিছু যেন দ্রুতই হোক কিন্তু এখানেই আল্লাহ বলেছেন শান্ত ধীর স্তির হয়ে চলার কথা – শান্তি বা সালামাতি এমন এক নিয়ামত যা অনেকেই বুঝেনা – সালাত আদায়ে কিংবা সিয়ামের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি খুব দ্রুত চিন্তা চেতনা বিরাজ করে – সালাতে দণ্ডায়মান হলেই আমাদের সকল কাজ একসাথে মনে তাগাদা দেয় যেন সালাতের চাইতে অন্যান্য কাজ গুলা খুব প্রয়োজনীয় – বাস্তবে কিন্তু তা নয় – যাহারাই সালাত আদায়ে যত্ন নিয়েছেন এবং শান্ত ভাবে সালাত আদায় করেছেন তাহারাই দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াব হয়েছেন , সালাত ব্যাপারটাই হচ্ছে নিয়মিত আল্লাহর ক্লাসে উপস্তিত থাকা , যে সময় নির্ধারিত করা হয়েছে সেই সময় থেকে শেষ হবার আগে হাজিরা দিয়ে খাতায় শুন্যস্তান পুরন করাই হচ্ছে শর্ত , সালাতের উপস্তিতিতে নিয়মিত হতেই মাসজিদে বা একের অধিক হলেই জামাত আদায় করার ব্যবস্তা করা হয়েছে – এখন যদি ক্লাসে এসেই তাড়াহুড়া শুরু করি তা হলে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য এখন দিনে দিনে সালাত আদায়ে সময় কে অল্প ব্যবহার করি আবার অপর দিকে বক্তৃতা বা অন্যান্য ঘোষণায় সময় ব্যয় করি বেশী রামাদানে তারাবীহ সালাত আদায়ে তো এত দ্রুত আল কোরআন তিলাওয়াত করা হয় যা শ্রবনে শুধু শুনাই যায় বাস্তবে বুঝা কষ্টকর , রকেট গতিতে তিলাওয়াতে ফায়দা থেকে ক্ষতি ই হচ্ছে , সমাজ থেকে যেন শান্তি গায়েব হচ্ছে প্রতিনিয়ত – শান্ত বা শান্তিতে সালাত আদায় ঈমানের অন্যতম শর্ত – রামাদানের সিয়ামে ও আমাদের রয়েছে খুব তাড়াহুড়া , এই অশান্ত অস্বস্তি সিয়ামের পবিত্রতা নষ্ট করে । সিয়াম পালনের পরে রাত্রে যে সালাত আদায় হয় এর নাম ই হচ্ছে তারাবীহ যার অর্থই হচ্ছে থেমে থেমে করা – মধ্য প্রাচ্যের অনেক মাসজিদে এই তারাবীহ সালাত আদায় হয় একদম মধ্য রাত্রি পর্যন্ত – এর পরে কিয়ামুল লাইল আদায়ে একদম সাহুরির সময় হয়ে যায় এক কথায় পুরা রাতটাই কাঠে ইবাদতে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে , অবশ্য সকল দেশ এক রকম নয় একেক দেশের একেক আইন ও রীতি থাকে – তা মেনে মানান সই ব্যবস্তা নেয়া উচিত , মুসলিম জাতির কাছে রামাদান অবশ্যি করনীয় ও নির্ধারিত বিষয় তাই আগে প্রস্তুতি নিয়ে ছুটি নিলেই সুবিধা । যে ভাবেই হোক না কেন চাইলে উপায় বের হবেই কিন্তু তাড়াহুড়ার কোন স্তান নাই ইবাদত বন্দেগীতে তা খেয়াল রাখা উচিত , রামাদান মাসের রয়েছে কয়েকটি স্তর প্রথম ভাগে আছে ১০ দিন মধ্য ভাগে ১০ দিন শেষে কখনো ৯ আবার কখনো ১০ এই তিন স্তরের প্যাকেজ ভিন্ন ভিন্ন , আমরা এই প্রথম ভাগে এখনো অবস্তান করছি – এখন থেকেই ২য় প্যাকেজে টিকে থাকতে এখন থেকেই তৈরি হতে পারি – আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়াবান তিনি দয়া করতে ক্ষমা করতেই পছন্দ করেন তিনি এক এবং অভাবহীন তিনি দিতে জানেন নিতে হয়না , তবে তিনি যা পছন্দ করেন তা হচ্ছে বিনয় নম্রতা এর মধ্যে অন্যতম , তাহার প্রতি অবিচল আস্তা নিয়ে যখন গোলামি শুরু করা হবে তখন তাহার দেয়া নিয়ম কানুন মেনে চলাই হচ্ছে আমাদের কাজ – তাহার সকল নিয়ম মেনে চলাই আমাদের জন্য প্রথম – তাহার কাছেই আত্মসমর্পণ করে দেয়া উত্তম , এই তাওবার সুজুগ এনে দেয় রামাদান – ভাবতে শিখায় – উন্নত চরিত্র ঘটনে সহায়ক – ভাল সকল অভ্যাসের মহা সম্মিলনে শিখার রয়েছে প্রচুর । এমন শিক্ষা অন্য মাসে আমরা নিতে পারিনা এর কারন হচ্ছে সকল মাসের জন্য ই রামাদান এক অনুকরণীয় শিক্ষক , মানব জিবনে রামাদান একাই এক দৃষ্টান্ত । এই যে শিক্ষা তার জন্য চাইতে হবে আল্লাহর কাছে – শিক্ষার মত মুল্যবাদ ধন একমাত্র তিনি ই দান করে থাকেন যাহাকে ইচ্ছা তাহাকেই তিনি দেন – আ ল কোরআনে বর্ণিত আছে নবী রাসুল আঃ থেকে নিয়ে যত জন তাহার কাছে চেয়েছেন তিনি তাহাদের দান করেছেন শিক্ষা , হজরত আদম আঃ কে সৃষ্টি করে তাহাকে বলা হয়েছিল তিনি কি চান – সায়িদিনা আবুল বাশার নবীয়ে আউয়াল হজরত আদম আঃ চেয়েছিলেন “ আকল “ এর মাধ্যমে ই তিনি জমিনে আল্লাহ প্রদত্ত ইন্টারনেট লাইন চারিদিকে নিয়েছেন , সেই লাইন থেকেই সকল নবী রাসুল আঃ আজমাঈন শুধু সুইচ অন করেছেন , নবী নয় রাসুল ও নয় এমন কিছু ব্যক্তিদের ও তিনি জ্ঞান দান করেছেন এর মধ্যে অন্যতম জনাব হজরত লুকমান হাকীম আঃ তাহাকে আল্লাহ রাব্বুল আ আমিন ইচ্ছে করেই জিগ্যেস করেছেন লোকমান কি চাও – জবাবে তিনি জানিয়েছেন আমি চাই আপনার দয়া ও করুনা আমাকে যদি খিদমতে রাখেন তবেই আমি খুশী – তখন টাহাকে এমন ঈলম দিয়েছেন যা অন্য মানুষ কে দান করেন নাই – এই জ্ঞ্যানের যত ভাণ্ডার আছে তার সব কিছুই দান করেছেন আমাদের নবী মূহাম্মাদ সঃ কে , কারন তিনি ই একমাত্র আখেরি তাই আল কোরআনের মত ভাণ্ডার দিয়ে এক সাথে আমরা মানব জাতিকেই সমৃদ্ধ করেছেন – এই মহা সম্পদ ভাণ্ডার আল কোরআন জনাবে মুহাম্মাদ সঃ সম্পূর্ণই বিলিয়ে দিয়েছেন উম্মাহের প্রতি -এই রত্ন আল কোরআনের জন্ম মাস রামাদান তাই শিক্ষাই বিলিয়ে যাচ্ছে আবহমান কাল থেকে । রামাদানে আল কোরআনের চর্চা আমাদের জন্য অবশ্যই করনীয় – যত বেশী আল কোরআন পাঠে মনোযোগী হবো ততোই পাচ্ছি আলাদিনের চেরাগ , কোরআনের মত সম্পদ নিজের কাছে থাকলে দুনিয়াতে আর কিছুর ই দরকার পরেনা ,রামাদান মাসে সকল ভাল কাজের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আল কোরআনের সাথে কথোপকথন , শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত বার পারব পাঠ করব মর্ম অনুধাবন করার চেষ্টা করব । নিজের যে সকল দায়িত্ব সে গুলা পালন ও করতে হবে – এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে স্বজন আত্মীয়ের হক্ক প্রদান – গরিবদের প্রাপ্য দেয়া -অন্যের উপকার করা , এই উপকার হতে পারে দুআ করে ও এমন এমন দুআ আছে যা করলে সবাই ফায়দা পাবে – মৃত দের মাগফিরাত কামনা – এতে সাওয়াব যেমন আছে তেমনি নিজের ও আখিরাতের কল্যান রয়েছে – আল কোরআনে এমন কিছু দুআ চাইতে বলা হয়েছে যার কারনে বরকত নাজিল হয় , “ ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ আনতা ওয়ালি ই ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ তাওআফানি মুসলিমাং ওয়াল হিক্কনি বিস সওালিহিন “` আল্লাহুম্মা আ ইন্না আলা জিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনী ইবাদাতিক/ বিসমিল্লাহিল লাজি লা ইয়াদুর রু মায়াস মিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামাই ওয়াহুয়াস সামিউল আলিম /আল্লাহুম্মা আখরিজ নি মিনাজ জুলুমাতি ইলান নুর / সুরা ফাতিহা সম্পূর্ণ তিলাওয়াত ই একটি দুআ / হাদিস শরিফে আছে এই রকম আরও অনেক অনেক দুআ যা সারা দিন চলতে পথেই চাওয়া সম্ভব , হাটা চলার সময়ে কথা না বলে আমরা যদি বলি মনে মনে – ইয়া আল্লাহ আমাদের সৎ পথ দেখাও আমাদের সৎ পথে কামাঈ দাও আমাদের সকল কিছুতে বরকত দাও , নিজের ইচ্ছার সব কথাই যদি বলি তা হলে ক্ষতি নাই – রামাদানে কোন দুআ ই ফেরত দেয়া হয়না , মা বাবার জন্য দুআ করা এক মহা মুল্যবান দায়িত্ব , বেচে থাকুন বা মৃত তাহাদের জন্য মাগফিরাতের দুআ করতেই হবে । নিজেদের সন্তান স্বামী স্ত্রির পরিবার পরিজন সকলার জন্য চাইলে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশী – আমি প্রায় ই বলি একে অন্যে দুআ করলে আমাদের দৈনন্দিন যে সকল সমস্যা থাকে তার ৯৯% ভাগ সমাধান আপনা আপনি ই হয়ে যাবে । আমাদের অঙ্গন থেকে বিদায় নেবে হিংসা – গিবত শত্রুতার মত জাহান্নামের আমল । জাহান্নামের আমলের মধ্যে হিংসা খুব মারাত্মক যে জ্বলতেই থাকে এই হিংসার আগুন যাহাদের মনে থাকে তাহাকে নিভানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে সিয়াম সাধনা – এবারে আমরা নিজে নিজের সাথেই পন করি আর কাউকে জেদ বা হিংসা করবনা ইচ্ছে করে কাহারো ক্ষতি করবনা , এতে করে নিজের মনের মধ্যেই দেখবেন কাজ করছে সংশোধনীর । আল্লাহ তাই চান বান্দাহ যেন নিজে নিজে অনুতপ্ত হয় এবং ফিরে আসে সত্য ও সৎ পথে – তখনি তাওবাহ কবুল করেন । রামাদান এর বয়ান এক দিনে বা সপ্তাহে মাসে বা বছরে শেষ হবেনা এই নির্ধারিত বিষয়ে জীবন চলে যাবে কিন্তু শেষ হবেনা জান্নাতের মতই চলমান বহমান রামাদান , যত দিন চলবে আলোর ফুয়ারা কমবে না , আমার জিবনের ৫০ টি রামাদান থেকে আমি শিখতেছি প্রত্যেক বছর ই যেন আমার কাছে নতুন করে রামাদান প্রবেশ করে নতুন অভিজ্ঞ্যতা সঞ্চয় করি এবং নতুন করে শিখি , এই যেন আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতের প্রকাশ , আল্লাহ যেন আমাদের সকলের তাওবা কবুল করেন এবং আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত কে উজ্জল করতে যা যা লাগে সেই শিক্ষা আমাদের দান করেন । রামাদানে প্রত্যেক দিন ই আমরা ভুল করি সেই ভুল গুলাকে যেন শুধরে নিতে পারি নিজ থেকেই তা খেয়াল রাখা প্রয়োজন , যেমন আমি গত কালকে ২ টি ভুল করেছি , যখন তা ঠের পেলাম আমি সঙ্গে সঙ্গে তা শোধরে নিয়েছি দেরী না করেই । এই রকম কাজ সকলেই যদি করি তা হলে সমাজ থেকে দূর হবে অসঙ্গতি – এই সব শিক্ষার ভাণ্ডার নিয়ে রামাদান এসেছে এখন আমরা যদি না শিখি তা হলে ব্যর্থতা আমাদের এবং এর জন্য আমাদের ই ভুগতে হবে । যে যেখানে আছেন সেখানের অবস্তা অনুযায়ী ব্যবস্তা নিয়ে ভুমিকা নিন – নিজে শিখুন অন্যকে শিক্ষা নিতে দিন স্তানিয় ঈমাম সাহেবদের সাথে আলোচনা করুন – রামাদানে কি কি করনীয় কি কি বর্জনীয় তা মেনে চলুন , নিজেকে উজার করে দিন আল্লাহর কাছে সিজদায় লুঠিয়ে পরুন – লম্বা লম্বা সিজদায় আল্লাহর সাথে কথা বলুন – সকল সমস্যার ব্যাপারে সিজদায় ই পেশ করুন এবং আদায় করে নিন আপন আপন দাবী দাওয়াহ , হয়ত এই রামাদান ই আমাদের শেষ রামাদান হতে পারে – গতবারে ও আমাদের মধ্যে ছিলেন অনেকেই আজকে আমরা জানি তাহারা কবরবাসী , আমার জন্য ও এই রামাদান আখেরি হতে পারে তাই জান্নাত বাসী হতে আপণা আপনি ই চেষ্টা করুন – তাসবিহ তাহলিল তাওবা কে সাথী করুন এবং কামিয়াবি হাসিল করুন – প্রতিদিনের মত আমি ও দুআ প্রার্থী । আল্লাহ যেন আমাদের এই রামাদানে কবুল করেন ও মাফির সাথে সকল কিছুতে বরকত দান করেন । বারমিংহাম ১৫-০৪-২০২১