ভাইরাসের জগতে একচক্কর

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০

ভাইরাসের জগতে একচক্কর

কামরুল হাসান

যখন সে এসেই পড়েছে ঘাড়ে আর ধরাশায়ী করছে সৃষ্টির সেরাজীব মানুষকে, তাকে নির্বিচার গণহত্যাই বলা যায়, বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত পৃথিবীতে আর চেঙ্গিশ খানের সৈন্যবাহিনীর চেয়েও হিংস্ররূপে নিধন করছে প্রতাপশালী মানুষকে, তখন তো এ সম্পর্কে জানতেই হয়। চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে আক্রান্ত করেছে পৃথিবীর ১৯৮টি দেশের সাড়ে আট লক্ষ মানুষকে, ইতিমধ্যে হত্যা করেছে ৪১ হাজার মানুষকে।

আক্রান্ত হয়ে এই প্রথম আমরা ভাইরাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হলাম, নইলে এ নিয়ে পড়াশোনা করেন জীববিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও অনুবিজ্ঞানীরা। ভাইরাস হলো অতিক্ষুদ্র এক অনুজীব যা খালি চোখে তো দুরের কথা, সাধারণ অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা যায় না। ভাইরাস দেখতে অপটিকাল মাইক্রোস্কোপ লাগে। মানব বা প্রাণী দেহের কোষের সংস্পর্শে এসেই এটা নিজেকে বৃদ্ধি করতে পারে, অন্যথায় নয়। ভাইরাস কেবল মানুষকে নয়, সকল প্রাণীকে আক্রান্ত করে। গাছও এ থেকে রক্ষা পায় না, এমনকি রক্ষা পায় না অন্য আনুজীব। যেমন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, যদিও কোনো কোনো ভাইরাসের আকার একটি ব্যাকটেরিয়ার, সেটিও অনুজীব, একশভাগের একভাগ।

দিমিত্রি ইভানোস্কি নামের একজন রাশান উদ্ভিদবিদ ১৮৯২ সালে লক্ষ্য করেন একপ্রকার ব্যাকটেরিয়া-অনুরূপ ছত্রাক তামাক পাতাকে খেয়ে ফেলছে ( এ থেকে প্রমাণিত তামাক কেবল মানুষেরই পছন্দ নয়, ক্ষুদে অনুজীবও তাকে পছন্দ করে। নেশাখোর মানুষ ও ভাইরাসে তবে মিল আছে!)। তাঁর এই আবিষ্কারের মাধ্যমে মানবজাতি প্রথম জানতে পারে ভাইরাস নামের এক ভিন্ন অনুজীব আছে, যা ব্যাকটেরিয়া নয়। এ আবিষ্কারের কারণে দিমিত্রি ইভানোস্কিকে ভাইরাসের জনক ( না, তিনি এর জন্ম দেননি) বলা হয়, এবং ভাইরাসশাস্ত্রের স্থপতিদের একজন বলে গণ্য করা হয়। ১৮৯৮ সালে ফরাসী জীববিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরনিক একে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাইরাস হিসেবে আবিষ্কার করেন। এটিই ভাইরাসশাস্ত্রে বহুল আলোচিত টোবাকো মোজাইক ভাইরাস নামে খ্যাত। মার্টিনাস ৫০০০ ভাইরাসের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন।

আমাদের পরিবেশে কিন্তু লক্ষ লক্ষ ভাইরাস ঘুরে বেড়ায়, বেশিরভাগই কোনো ক্ষতি করে না, সৌভাগ্য করোনার মতো প্রাণঘাতী একটিও নয়। দুনিয়ার সকল ইকোসিস্টেমেই, যেমন পুকুর একটি ইকোসিস্টেম (ecosystem), হাজার হাজার ভাইরাস রয়েছে, মানুষসহ পৃথিবীর সকল প্রাণী, উদ্ভিদ ও অনুজীবের ভেতর এই ভাইরাস বাস করে। তার নিজের ঘর নেই বলেই অন্যের ঘরে বাস করে। জীবের কোষ আক্রমণ করার আগে ভাইরাস একটি স্বাধীন কণা (ভিরিয়ন) হিসেবে থাকে যার ভেতরে তিনটি জিনিষ থাকে। (১) একটি জেনেটিক উপাদান, ডিএনএ (DNA) বা আরএনএ (RNA)-র একটা লম্বা অনু, যার ভেতরে একটি প্রোটিনের গঠন বা স্ট্রাকচার লিপিবদ্ধ (২) জেনেটিক বস্তুটিকে ঢেকে রাখা একটি প্রোটিন আবরণ (capsid) (৩) একটি ফ্যাট বা লিপিডের আবরণ। ভাইরাসের আকৃতি সবই জ্যামিতিক, হেলিকাল থেকে আইসোক্রমিক।

ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীতে এলো তা নিয়ে জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলে ব্যাকটেরিয়া থেকে এর জন্ম, কেউ বলে প্লাজমিডস নামক কোষ থেকে কোষে চলাচলকারী ডিএনএ থেকে এর উদ্ভব। বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ভাইরাস কিন্তু এক অত্যাশ্চর্য ভূমিকা পালন করে। আমরা যাকে বলি জেনেটিক ডাইভারসিটি বা জীববৈচিত্র্য তা সম্ভব হয় আনুভূমিক জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ভাইরাসের ভূমিকা যৌন প্রজননের সমতুল্য না হলেও তুলনীয় তো বটেই।

কোন কোন জীববিজ্ঞানী ভাইরাসকে জীবনের একটি রূপ মনে করেন। কেননা, সেটি জেনেটিক কোড বহন করে, নিজের বংশবৃদ্ধিতে সক্ষম আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের (natural selection) মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করে। ভিন্নমতধারীদের যুক্তি হলো জীবসৃষ্টির মৌলিক উপাদান কোষের গঠন (cell structure) ভাইরাসের নেই।

ভাইরাস বহুভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গাছ থেকে গাছে ছড়িয়ে পড়ে বৃক্ষরস ( plant sap) খায় এমন পতঙ্গের মাধ্যমে। এ রস হতে পারে কান্ড, পাতা ফুল বা ফলের। অসুস্থ প্রাণীর দেহ থেকে রক্তপায়ী পতঙ্গের, যেমন মশা, মাধ্যমে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি বা কাশি থেকে, করোনা ভাইরাসও তাই। তবে তা হাত থেকে স্পর্শের মাধ্যমে চলে আসতে পারে নাক বা চোখে বা গলায়। পরিপাকতন্ত্রের সংক্রামক নরোভাইরাস বা রোটাভাইরাস ছড়ায় খাবার ও পনির মাধ্যমে। এইডসের ভাইরাস, আমরা জানি ছড়িয়ে পড়ে যৌনমিলন বা রক্ত পরিবহনের (blood transfusion) মাধ্যমে। এইডস, যা মারণব্যাধি হয়ে এসেছিল, এখনো তাই আছে, তা কিন্তু করোনার তুলনায় নস্যি। কেননা এইডসের নিয়ন্ত্রক মানুষ নিজেই, আচরণগত সংশোধন বা সতর্কতার সাথে সে এর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু করোনা আক্রমণ করে নিরাপরাধকে, যে মানুষ নিরস্ত্রও বটে।

সুখের খবর হলো ভাইরাস মানবদেহকে আক্রান্ত করলে মানবদেহ সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) গড়ে তোলে। ফলে বেশিরভাগ ভাইরাস কাবু হয়ে পড়ে, কোনো ক্ষতি করতে পারে না। করোনা হয়তো আমাদের অনেকের দেহেই প্রবেশ করেছে, কিন্তু যাদের ইমমিউন সিস্টেম শক্তিশালী তারা হয়তো সামান্য কাশি বা সর্দি ছাড়া তেমন টের পাননি। কেবল যাদের ফুসফুস নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বা দুর্বল, প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল, যেমন বৃদ্ধদের, বা যারা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত তারাই শিকার হচ্ছেন করোনার। ইতালী বা স্পেনে যারা মারা গেছেন তারা বেশিরভাগ সত্তরোর্দ্ধ, আশি ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ।

মানবদেহে ভ্যাকসিন এই কাজটিই করে। সে মানবদেহে একটি কৃত্রিম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে দেয়। তবে কোনো কোনো ভাইরাস, যেমন এইডসের ভাইরাস HIV, ভাইরাল হেপাটাইটিস ও HPV সংক্রমণের ভাইরাস আমাদের দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরাস্ত করে বিজয়ী হয়। করোনা ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন বা টিকা না থাকাতেই মানবজাতি ঝুঁকির মুখে আছে। সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা অবশ্য জোর লড়াই করে যাচ্ছেন করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য। তারা সফল হবেনই।

ভাইরাস শব্দটি যে ল্যাটিন শব্দ থেকে এসেছে তার অর্থ poison বা বিষ।দিমিত্রি ইভানোস্কিও তাকে বলেছিলেন ব্যাকটেরিয়ার বিষ। ইতিহাসে এই শব্দটি প্রথম গৃহীত হয় ১৭২৮ সালে, দিমিত্রি ইভানোস্কির অনুবীজটিকে শনাক্ত করার ১৬৪ বছর আগে। একে বলা হয় এমন একটি এজেন্ট যা সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায়। ভাইরাসকে তিনভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, ১। এর সংক্রমনের শক্তি ২। ফিল্টার অতিক্রমের ক্ষমতা ৩। জীবন্ত হোস্টের প্রয়োজনীয়তা দ্বারা।

করোনা অর্থ মুকুট বা crown। এটিও ল্যাটিন শব্দ। শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে তাকে দেখায় সাধুর মাথায় যেমন পবিত্র মুকুট (Halo) থাকে তেমনি, যাকে ঘিরে আছে সূর্যের মতো একটি উজ্জ্বল বলয়। কী রূপ তার! কী বিধ্বংসী রূপ! সে আবার রূপ বদলানোর দক্ষ যাদুকর, যার ভেলকি দেখে সন্ত্রস্থ পৃথিবীর মানুষ। করোনা একটি গোষ্ঠীর নাম যার ভেতরে অনেকগুলো করোনা ( যে কারণে এটিকে বলা হচ্ছে কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাস) সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বর ও সর্দি থেকে তীব্র শ্বাসকষ্টের উপসর্গ তৈরি করে, পরে আক্রমণ করে ফুসফুসকে, ফুসফুসে সে দ্রুত ফাইব্রোসিস ঘটায়, অর্থাৎ ফুসফুসের কোষ ও টিস্যুগুলোকে অকেজো করে দেয়। আগে ভাইরাস আসতো প্রাণীদেহ থেকে সার্স এসেছিল বেড়াল থেকে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্স এসেছিল উট থেকে। করোনা ধারণা করা হয়, কোনো সামুদ্রিক প্রাণী হতে, উহানের সামুদ্রিক খাবারের দোকানে যা বিক্রি হতো, এসেছে। ভয়ের ব্যাপার করোনা এখন ছড়াচ্ছে মানুষ থেকে মানুষে।

এই শক্তিশালী অনুজীব যা সন্ত্রস্থ করে তুলেছে গোটি পৃথিবীকে, অকেজো করে তুলেছে মানুষের সকল মারণাস্ত্র ও সমরযন্ত্রকে, গৃহবন্দী করে ফেলেছে পৃথিবীর সকল প্রতাপশালী রাজা ও রাষ্ট্রনায়ককে, সৈন্যবাহিনীকে প্রমাণ করেছে অকার্যকর, তাকে নির্মূল করতে নিবেদিত আছেন পৃথিবীর জীববিজ্ঞানীরা। তাদের হাতেই আমাদের করোনা উদ্ধার! মানুষকে বারবার ফিরতে হয় বিজ্ঞানের দরোজায়।

পুনশ্চ: একজন কবি, যে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিষয় পড়ায়, তার এই বিজ্ঞানচর্চা অনেকের মনে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আনতে পারে। সবিনয়ে বলে রাখি, আমি বিজ্ঞানেরই ছাত্র, বছর দেড়েক মেডিকেল কলেজেও পড়েছি। তবে সেসব কিছু নয়, এ লেখার উৎস ইন্টারনেট। এ বিষয়ে ভালো লিখতে পারবেন আমার চিকিৎসক বন্ধুরাই। আমার লেখার ভুল সংশোধন বা শ্রীবৃদ্ধি তারা করতে পারবেন।

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031