ঢাকা ১৪ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


ভারত বিদ্বেষ ও সাংস্কৃতিক ভাবনা

redtimes.com,bd
প্রকাশিত মার্চ ২৫, ২০২১, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
ভারত বিদ্বেষ ও সাংস্কৃতিক ভাবনা

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তী। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করছে করোনা মহামারীর সংকটকালে বিভিন্ন রক্ষণশীলতার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তীতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাড়া আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সত্যিকার অর্থেই একটি গৌরবের অংশ। ইতিহাসে ইহা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে চিরকাল। স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তী একদিন হয়ে থাকবে আমাদের ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে। কারন, বাংলাদেশ এই করোনা মহামারীতেও ঐতিহাসিক এই অধ্যায়ের সফলতা এনে দিতে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণ করেছেন। একদা মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার সাহেব বাংলাদেশকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। নব্য স্বাধীনতা লাভ করা যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি রাষ্ট্রকে পৃথিবীর শক্তিধর একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তি যখন এই ধরনের মন্তব্য করবেন তখন ধরে নিতে হবে সেই রাষ্ট্রের উপরে উঠে আসাটা কতটা বিশুদ্ধ। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্তরে বিশ্বসংঘ দ্বারা বিবেচিত। বাংলাদেশের জিডিপি আজ পাকিস্তানের চেয়ে উপরে রয়েছে। বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র আজ সুনজরে বিবেচনা করছে। বিশ্ব মহামারীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন ধারাবাহিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত না হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শুভেচ্ছা বার্তা আমাদের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বর্তমান পৃথিবীর একজন জনপ্রিয় নেতা। তার পিতা ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। মিঃ ট্রুডো এক ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বলেছেন, তার পিতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে ঢাকা সফরে এসেছেন তার শুভেচ্ছা প্রকাশ করতে। ঢাকা এসেছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী এসেছেন ঢাকায় স্বাধীনতার শুভেচ্ছা জানাতে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডঃ লোটে শেরিং বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানাতে ঢাকা এসেছেন ইতিমধ্যেই। আর ঢাকা সফরে আসবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামী ২৬ মার্চ। মহাচিনের প্রেসিডেন্ট জিন পিং একটি ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ন জয়ন্তীতে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। করোনা মহামারীর জন্য গোটা বিশ্বই বিপর্যস্ত আজ। প্রতিটি রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচি শিথিল রাখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য সার্ক দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানরা স্বশরীরে ঢাকা এসেছেন। জানিয়েছেন শুভেচ্ছা। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অনন্য উদাহরন হয়ে থাকবে চিরদিন আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসে। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র নীতির মূলনীতি প্রমান করতে স্বার্থক হয়েছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করার মধ্য দিয়ে। প্রতিটি রাষ্ট্র আজ বাংলাদেশকে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। তবে আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করতে যেয়ে আভ্যন্তরীণ একটি সংকটের নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে সেটা আমাদের সমাজের একাংশের ভারত বিদ্বেষ। বিশেষ করে বলতে গেলে বাম রাজনীতির অনুসারীদের মাঝে এর প্রভাবটা লক্ষ্য করা গিয়েছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর আর মাত্র তিনদিন বাকি। অথচ আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করেছি সংঘর্ষের মতো একটি ঘটনা ঘটতে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিলো আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নরেন্দ্র মোদীর কুশ-পুত্তলিকা দাহের। তারা যখন মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাদের উপর হামলা চালায়। ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমাইয়া সেতু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসমানি আশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা মেঘ মল্লার বসু, ছাত্রফ্রন্ট নেতা প্রগতি বর্মণ তমা, সোমাসহ অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী। ভারত বিদ্বেষ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংঘর্ষ আমি কোনভাবেই সমর্থন করিনা, আশাও করিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল। স্বাধীনতার পেছনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে বেগবান করেছিল পঞ্চাশ বছর পূর্বে। আজ পঞ্চাশ বছর পার করে এসে যখন আমি দেখতে পেলাম তার নূন্যতম প্রতিফলন নেই ইতিহাসের তখন মনের মাঝে একটা ভয়ের জন্ম হলো। ভয় একারণেই হলো যে আমরা কি আজকের ছাত্র সমাজের প্রতি কোনরূপ অবহেলা করে ফেলেছি। যার জন্য আজ আমাদের রাজনৈতিক ছাত্র সমাজ বিভ্রান্তির দরজায় কড়া নাড়ছে বারবার। আজকের ছাত্র সমাজ আমাদের রক্ত প্রবাহের অনন্য প্রতীক। তাদের তাহলে কারা এই ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে বারবার। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের ছাত্র সমাজের হাতে ছিল অমূল্য সব সম্পদ। তাদের মিছিলের ভাষা, রাজনীতির ভাষা ও শ্লোগানের ভাষা হতে পারতো অনেক অহংকারের ও গৌরবের। সেটাতো হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরোধীতা হোক আর ভারত বিরোধীতাই হোক সেটা কি আমাদের ছাত্র সমাজের একমাত্র এজেন্ডা যেটা বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে আজ রক্ত দিতে হবে। বিষয়টির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। ভারত বিদ্বেষ এর জন্মটা নিশ্চয়ই একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা যেটা হঠাৎই জন্ম হয়েছে। এবং এখনো সেটা টিকিয়ে রাখার একটি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ভারত বিদ্বেষ আমাদের এই অঞ্চলে কেউ কখনো লক্ষ্য করেনি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, শের ই বাংলা একে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মনি সিংহ, কমরেড মোজাফফর আহমেদ, মাওলানা ভাসানী, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের কোনো নেতাই কোনো কালে ভারত বিদ্বেষ প্রদর্শন করননি।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট এর পর থেকে যখন আমরা পাকিস্তানের একটি অংশ হয়েছিলাম তখনও এই অঞ্চলের নেতারা ভারত বিদ্বেষের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নেয়নি। ১৯৪৭-১৯৭১ পর্যন্ত ভারত বিদ্বেষতো নয়ই বরং আমরা দেখেছি মুসলিম লীগ, জামত-ই ইসলাম, নেযামে ইসলাম ও কতিপয় রাজনৈতিক দল ছাড়া বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের পাকিস্তানের বিপক্ষেই অবস্থান নিতে। ছাত্র সমাজেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানের অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ সর্ব প্রথমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া জামাত -ই ইসলাম এখনো পাকিস্তানের পক্ষেই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে চলেছে। কিন্ত প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের বাম রাজনৈতিক ধারায় ভারত বিদ্বেষ নতুন শংকার জন্ম দিবে বলে আমি মনে করছি। স্বাধীনতার পূর্বে ভারতের সংবিধান সৃষ্টি হয়নি। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারত শাসিত হয়েছে ১৯১৯ সালে ও ১৯৩৫ সালের ভারত এক্টের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট মধ্য রাতে ভারত স্বাধীন হয়। ১৫ আগষ্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতার দুই বছর পরে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের সংবিধান বিল আকারে পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান পাস হয়। এর একুশ বছর পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। স্বাধীন ভারত ও তার সংবিধান এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের জন সমাজে, রাজনীতিতে ও অর্থনীতিতে কখনোই কোন প্রভাব বিস্তার করেনি। আজ যে কথাটি বলা হয়ে থাকে সাম্রাজ্যবাদী স্টাইলে ভারত বাংলাদেশের উপর কর্তৃত্বের হাত প্রসারিত করেছে তার যথার্থ ব্যাখ্যার প্রয়োজন। বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালেই ভারত বাংলাদেশের এক কোটি অসহায় মানুষের আশ্রয় স্হল ছিলো। মুক্তি বাহিনীর প্রশিক্ষণ হয়েছে ভারতেই। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের সদর দফতরও ছিলো কোলকাতা শহরে। প্রাচীন যুগ থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক একই কেন্দ্রে বিকশিত হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক একটি বড় বিষয়। এমনকি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে বাংলাদেশের উপর কোন চাপ ছিলোনা। ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপদ ছিলো। বাংলাদেশের ভূখন্ডে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন লক্ষ্য করা যায়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংশে ভারত মিত্র বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছিল। লক্ষ্য করা যাবে যে ভারত বিদ্বেষ এর সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর। ১৯৭১ সালের পূর্বের ইতিহাসে ভারত বিদ্বেষ এর কোন চিহ্ন নেই, প্রমানপত্রও নেই। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে,১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চের দখলদ্বারিত্ব নিয়েছিল সামরিক শাসকবৃন্দ। এসময়ই পাকিস্তানের সাথে পুনরায় নতুন একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। সেই সম্পর্কের প্রথম অধ্যায় ছিল ধর্মীয় নেতা যুদ্ধাপরাধী অধ্যাপক গোলাম আযমকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্ব প্রদান করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে লক্ষ্য করা গেলো ভারত বিদ্বেষ এর বীজ বপন করতে। ভারত বিদ্বেষকে এক সময় রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল সামরিক শাসন আমলগুলোতে বাংলাদেশে। অথচ বাংলাদেশের দুজন সামরিক শাসকের মধ্যে একজন জিয়াউর রহমান শিক্ষালাভ করেছেন ভারতে। এবং অপরজন হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ জন্মসূত্রে একজন ভারতীয়। এরশাদ এর মৃত্যুর পর ভারতে তার আদি পিতৃনিবাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে কিছুদিন পূর্বেও জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা হয়েছিল প্রবল ভাবাবেগ ও শ্রদ্ধার সাথেই। তারপরও বলা চলে, ভারত বিদ্বেষ বিষয়টির জন্ম তাদের শাসনামলেই এবং যা আজও চলমান। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে বাংলাদেশের বানিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর। রাষ্ট্রের সীমারেখার বিষয়ে দুই দেশের গভীর মনোযোগ বরাবরই নজরে পরেছে। তবে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও চোরাচালান এবং অবৈধ পারাপার বরাবরের মতো ঘটে থাকে সেটাও অনস্বীকার্য। দুই দেশেই বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ও আলোচনা হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে জঙিবাদ সম্পর্কে দুই দেশ একত্রে কাজ করছে। জঙি-সন্ত্রাসীদের আদান-প্রদানে দুই দেশেই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির নজির সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে উলফা নেতা গ্রেফতার হবার পর বিষয়টি সম্পর্কে দুই দেশ সতর্ক অবস্থানে গিয়েছে। তিস্তার পানি বন্টন দুই দেশের জন্যই একটি একক সংকট। এশিয়ান রিজিয়নে দক্ষিন এশিয়া একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। পৃথিবীর মূল্যবান ধাতব সম্পদের ভান্ডার এখানেই। আর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক সম্পদ। এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য ও অর্থনীতির পরিবর্তন ঘটানো যেতো অনেক দশক পূর্বেই। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ভারতের স্বাধীনতার পরও সেটা সম্ভব ছিল না পাকিস্তানের সাথে ভারতের সুসম্পর্কের অভাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা কিছুটা প্রশংসিত হলেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেননি তিনি। বরং ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিটি সমালোচিত হয়েছিল কোন কোন মহলে। মৌলিক অবকাঠামোগত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটেনি মূলত। যেমন, ট্রানজিট, সমুদ্র বন্দরের ও রেলপথ-সড়কপথের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে আজ দুই দেশের জনগনের ভাগের আরো বেশি পরিবর্তন ঘটতে পারতো। আজ ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আন্ত-সম্পর্কের ভিত্তিতেই তাদের বানিজ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। সেটা ভারত এবং বাংলাদেশের মাঝেও অনেক আগে ঘটতে পারতো। এর অর্থ যদি ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তখন বিদ্বেষ এর জন্ম নেয়া স্বাভাবিক। তবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর কোন ক্ষেত্রে সংকট ও আশংকার কারন থাকলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই জাতীয় মতামতের গুরুত্ব প্রাধান্য পাবে। অন্যথায়, ভারত বিদ্বেষকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবনতা থেকে দূরে সরে আসা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশের উচিত স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে ভারতের সাথে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করা। ভারতের রয়েছে বিশাল ভূখন্ড এবং প্রাচীন ও আধুনিক একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সভ্যতা।

চলচিত্র ও নাট্যকলায় বাংলাদেশ ভারতের সাথে নতুন নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক বাজারের অংশীদার হতে পারবে। ভারত বিদ্বেষ নয় বরং বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কের ভিত্তিতেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আগামীতে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কালে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এই সময়েই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। এটাই হবে বাংলাদেশের ভাগ্যের বহুমাত্রিক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031