ভাল থাকুন জাফর ভাই

প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০১৯

ভাল থাকুন জাফর ভাই

শর্মিলা দেব

সকাল থেকেই বৃষ্টি। এই বৃষ্টির মধ্যে আমাদের বিষন্নতা আরো বাড়ছিল । শহরের আরেকটি নক্ষত্র খসে পড়ল গত ২৯শে মে। আমাদের সবার প্রিয় জাফর ভাই আর নাই। আজ দশটার দিকে তার লাশ প্রথমে আসে কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় কার্যালয়ে । সেখানে দলের মানুষেরা তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে । এরপরে প্রেসক্লাবে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে । সবশেষে ঈদগাহে জানাজার পর দরগায় সমাহিত করা হবে তাকে । বেলা দশটার পর আস্তে আস্তে রোদ উঠতে থাকে,শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।বিমর্ষ মনেও স্বস্তি লাগে যখন দেখি সব রাজনীতির অনুসারী মানুষ উপস্হিত হয়েছেন।ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আমাদের সাংসদ নেছার আহমদ । জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান সহ অনেক গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গ। সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এসেছেন কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান,সাধারন সম্পাদক মো; শাহ আলম, কাজি সাজ্জাদ জহির চন্দন, রুহিন হোসেন প্রিন্স,আস্লাম খান, আব্দুল্লাহ আল কাফীসহ বেশ কয়েকজন নেতা। বিভিন্ন জেলা থেকেও এসেছেন অনেকে । বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবু জাফর আহমেদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় । সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডার জামাল উদ্দিন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক জননেতা সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ গুরুতর অসুস্থ চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে মঙ্গলবার রাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তাঁকে গত ২০ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ২৭ মে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সিলেটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কৃতী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ অন্যতম। তিনি ১৯৫৪ সালের ১১ জুলাই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সৈয়দ মনোয়ার আলী এবং মা সৈয়দা আমিরুন্নেসা খাতুন। সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ ১৯৬৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচ এস সি এবং চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন । পরে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি জার্মানি যান।

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন । ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি সিলেটের বিভিন্ন পেশাজীবী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক এবং ১৯৭২ সালের সংসদে সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন । মৌলভীবাজার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।

চা–শ্রমিক নেতা বসন্ত বুনারজী হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৭২ সালে সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ প্রথম কারাবরণ করেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর আবার ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ফের তিনি গ্রেপ্তার হন এবং বিনা বিচারে দীর্ঘ এক বছর কারাগারে কাটান। এ ছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ সমান সক্রিয় ছিলেন। গণতন্ত্রের ওই উত্তাল আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার ভূমিকার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বিভিন্ন পেশাজীবী আন্দোলনেও শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। খেতমজুর আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকার কারণে খেতমজুর সমিতির সাংগঠনিক রাজনীতির শুরুর দিকেই তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।


স্কুল জীবনের শেষদিক থেকে বাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি।আমাদের মা চাইতেন,আমরা ভাইবোনেরা পড়ালেখা ছাড়াও আরো কিছু শিখি।তাই আমাদের খেলাঘর আসর নামে ছোটদের নাচ,গান,কবিতা শিখার জন্য ভর্তি করে দেওয়া হয়।সেখানেই আমরা জাফর ভাই এর পুরো পরিবার সম্বন্ধে জানতে পারি।একটি বিশাল মেধাবী পরিবার।তার ছোট তিন ভাই ইকবাল,মনি আর হেলাল আমার ছোট,আর সবাই বড়।ঘন্টার পর ঘন্টা ওদের বাসায় আড্ডা দিয়েছি কিন্ত কোনদিন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।খেলাঘর শেষ করে আমরা ছাত্র ইউনিয়ন করেছি,উদীচী করেছি,পার্টি অফিসে কয়েকদিন গিয়ে বলেছি,আমার দ্বারা হবে ন । সবাইকে দিয়ে সব হয় না,আমি এটার যোগ্য নই।জাফর ভাই দুংখ পেয়েছেন,কিন্তু স্নেহ থেকে সরিয়ে দেন নাই। তার পরিবারের সাথে আমার পরিবারের সবসময় যোগাযোগ আছে এবং থাকবে।আগে পরিবারে সময় দিতে পারতেন না,আমরাও তাকে পেতাম না।কিন্ত দেখতাম গেলে খুব খুশী হতেন।সময় নিয়ে গল্প করতে চাইতেন। কয়েক দিন আগে তিনি অসুস্হ শুনে অফিস থেকে ফিরে তাকে দেখতে যাই । গিয়ে গৃহকর্মী মহিলার কাছে জানতে পাই গতকালকে ছেলে প্রতীকসহ ভাবী তাকে ঢাকা নিয়ে গেছেন।বাসায় ফিরে আমার স্বামীর সঙ্গে এ কথা আলাপ করি ।তিনি প্রতীক এবং ভাবীর সাথে কথা বলেন।এভাবেই কখনও ভাল কখনও খারাপ চলছিল।তবু আশা ছিল ফিরে আসবেন । কিন্ত গত ২৯ মে রাতে যখন মোবাইল বেজে উঠল,তখন আমি আর আমার স্বামী কেউ ফোন ধরলাম না। শেষ রাতের ফোন কখনও ভাল খবর বয়ে আনে না,কিন্ত ফোনটা আবারও বাজতে লাগল । উঠলাম, তিনি চিন্তিতভাবে জানতে চাইলেন, কে? স্ক্রিনে দেখলাম আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান । কিছু না বলে ফোনটা এগিয়ে দিলাম ।তিনি জানালেন, জাফর ভাই আর নেই । খবরটা শুনে আমরা চুপ করে বসে রইলাম।শার্ট ইন করে পরা আমাদের চির তরুণ জাফর ভাই বেঁচে থাকবেন তার তিন সন্তানের মাঝে। আর আমরা তার দৃঢ় গলার বক্তৃতা শুনব না।যেখানেই থাকুন ,ভাল থাকুন জাফর ভাই ।