ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ আব্দুল কাদির স্মরণে

প্রকাশিত: ২:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২১

ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ আব্দুল কাদির স্মরণে

খছরু চৌধুরী

চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন সিলেট জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন ছিল — তা শতবর্ষী মানুষের মুখে মুখে শুনে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নদী পথ এবং পায়ে হেটে চলাচল। বাংলার তরুণেরা মূলতঃ পায়ে হেটে হেটে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুবক-তরুনদের সংঘটিত করতেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ভারত উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যুব-তরুনদের ব্যাপক অংশ গ্রহণে বেনিয়া বৃটিশরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির নানা কৌশল খুঁজতে থাকে। বিভাজনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগায় ধর্মীয় পরিচয় উন্মাদনা। ফলশ্রুতিতে ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাংলা ও বিহার অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়! বাংলার নোয়াখালী অঞ্চলে হিন্দু ও বিহার অঞ্চলে মুসলিম নিধন এতটাই বিভৎস আকার ধারণ করে যে, সিলেট অঞ্চলের কবিয়ালদের মুখে গান উঠে “বিনা দোষে বিহার দেশে হিন্দুয়ে কাটে মুসলমান/হায়রে আমার মুসলিমের পরাণ…..!” নিজের চোখের সামনে হিন্দু-মুসলমানের এরকম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার একটা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন কিশোর আব্দুল কাদির। গ্রামের প্রতিবেশী ও সম্পন্ন হিন্দুরা, খেলার সাথীরা যখন পরিবার- পরিজনের সাথে রাতের আধারে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছেন তখন কিশোর আব্দুল কাদির ছন্নছাড়াভাবে মনের কষ্টে গ্রামের রাস্তায় নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়াতেন! অনেক প্রশ্ন করতেন নিজেকে, সমাজের বড়দেরকে। কোনো প্রশ্নেরই যুথসই উত্তর পেতেন না!

বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মেদিনী মহল গ্রামের অবস্থা সম্পন্ন কৃষক পরিবারে ১৯৩৫ সালের ২০ জানুয়ারী জন্ম গ্রহণ করেন শেখ আব্দুল কাদির (পরবর্তীতে এলাকার মানুষের কাছে কাদির লন্ডনী নামে পরিচিত)। তাঁর পিতার নাম শেখ মোহাম্মদ কুদরত উল্লাহ। চার ভাই ও একবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বাবা-মা’ র কনিষ্ঠ সন্তান। গ্রামের পাঠশালা মানে তখনকার মাইনর স্কুলের পড়ালেখা শেষ করে মৌলভীবাজার শহরের কাশীনাথ-আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন ১৯৪৮ সালে। ধর্মের আলখেল্লা গায়ে মেখে ভারত পাকিস্তান নামের দু’টি দেশ জন্ম নিয়েছে সবেমাত্র। কিশোর আব্দুল কাদির ও তাঁর সহপাঠীরা স্কুলের বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠছেন। পাকিস্তানের জন্মের পর পরই পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একভাষার তত্ত্ব নিয়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে এসে বক্তৃতা দিলেন। উপস্থিত ছাত্ররা নো নো বলে প্রতিবাদ জানালো। পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ছাত্রদের মধ্যে জোরালো হতে থাকলো। এর প্রভাব এসে পড়তে থাকে দেশের মফস্বল শহরের স্কুল ছাত্রদের মধ্যে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন আব্দুল কাদির। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠায় লিফলেট বিতরণ, ছাত্রদেরকে নিয়ে মিছিল মিটিং সংগঠিত করণ ও আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর নিয়মিত।

১৯৫৪ সাল। পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে রাজনগর এলাকায় কাজ করছেন আব্দুল কাদির। তাঁর নেতা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষ। কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষের পরামর্শে গ্রামে গ্রামে গিয়ে যুক্ত ফ্রন্টের পক্ষে জনমত সংগ্রহ করছেন যুবক আব্দুল কাদির। ইতিমধ্যে পাকিস্তান সরকার কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষের রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের হয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করার কৌশল নেন। একই সময়ে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অনেক এলাকাতেই আওয়ামী লীগ জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংগঠিত ছিলনা। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষ উদ্যোগ গ্রহণ করে তৎকালীন রাজনগর থানা আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।

কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষ ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ এর সম্মেলন ও পূর্ণাঙ্গ থানা কমিটি গঠনের লক্ষ্যে তৎকালীন তুখোর ছাত্র নেতা ও থানা আওয়ামী লীগের নেতা ফকির টুলা গ্রামের মখদ্দুস বখত্, মেদিনী মহল গ্রামের আব্দুল কাদির, উত্তরভাগ ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান, ব্রাহ্মণ গাঁও গ্রামের কবির বখত্ ও হানিফ খান, ঘড়গাঁও গ্রামের আব্দুল বারি প্রমূখ নবীন-প্রবীণ নেতৃত্ব ও এলাকার শিক্ষিত যুবক-তরুনদের সাথে যোগাযোগ পূর্বক সমন্বয় সাধন করেন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ এর তৎকালীন সভাপতি রাজনগরের বানারাই গ্রামের কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন (পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী) এর অনুপ্রেরণায় ফেব্রুয়ারী কিংবা মার্চ মাসে থানা আওয়ামী লীগ এর প্রথম সম্মেলন আয়োজন করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দরা। সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ হয় ঘড়গাঁও মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। দুই দিন ব্যাপী সম্মেলনে সমগ্র থানা থেকে ২০০ জনের বেশি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সম্মেলনে আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খয়রাত হোসেন ও অলি আহাদ। সম্মেলন পরবর্তী ৫৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ থানা কমিটি ঘোষণা করা হয়। যে কমিটিতে সভাপতি নির্বাচিত করা হয় হাফেজ মৌলানা নাসির উদ্দীনকে, সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন কমরেড শশাঙ্ক শেখর ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মখদ্দুস বখত্ (বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক মিলন বখত্ এর চাচা) এবং সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মেদিনী মহল গ্রামের তরুন যুবক আব্দুল কাদির। রাজনগরের ভাটি অঞ্চলে আওয়ামী রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে এবং মেদিনী মহল, ফতেহপুর ও ধুলিজুরা গ্রামের যুবক তরুনদের দলে ভেড়াতে আব্দুল কাদিরের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

আব্দুল কাদির রাজনীতির পাশাপাশি নিজেকে একজন দক্ষ ফুটবলার ও খেলাধুলার সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সমসাময়িক কালে নিজ গ্রাম মেদিনীমহলের যুবকদের নিয়ে “ইয়াং ম্যান ফুল বাই ফুটবল ক্লাব” নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে মোছাম্মাৎ আমিরুন্নেছা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লন্ডন চলে যান ১৯৬৩ সালে। কিন্তু দেশ-গ্রামের মানুষের প্রতি ভালোবাসার টান মোটেও কমেনি। প্রবাসে থেকেও গ্রামের সহপাঠীদের মাধ্যমে ফুটবল ক্লাবের খোঁজ-খবর রাখতেন নিয়মিত। দেশের রাজনৈতিক সহকর্মী ও বন্ধু মহলের সাথে চিঠি-পত্রের যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৬৬ সালে বাঙ্গালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফার সমর্থনে লন্ডনে জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করা হলে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭০ এর নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাঙালি কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে বৈশ্বিক জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যার্থে চাঁদা সংগ্রহ করেছেন লন্ডনে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে।

মফস্বলের পাড়াগাঁয়ে জন্ম নেওয়া শেখ আব্দুল কাদির ছিলেন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনাদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি ছিল তাঁর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস। দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে লন্ডনের রোজী-রোজগার ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে আসেন। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজের বিদ্যাশিক্ষা কাজে লাগিয়ে পল্লী চিকিৎসকের সনদ গ্রহণ করেন এবং নিজের গ্রাম-সহ আশপাশের দশ গ্রামের মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কেউ কেউ তাঁর ওষুধ পত্রের দাম দিলেও এলাকার গরীব মানুষের ওষুধের মূল্য পরিশোধের সক্ষমতা ছিল না। এসময় তিনি লোকজনের কাছে পরিচিতি পান ডাক্তার কাদির লন্ডনী হিসেবে। যার কাছে গেলে চিকিৎসা ফ্রী, রোগের ওষুধও ফ্রী! এমন অবাক চরিত্রের দিল-দরিয়ার মানুষ সমাজে খুব বিরল! মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কার কি সমস্যা এগুলো জেনে বুঝে সমাধান করাটাই যেন তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন!

আজীবন সমাজসেবী, ভাষা সংগ্রামী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাদির লন্ডনী ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। ২৮ অক্টোবর ২০১২ খ্রিস্টাব্দ তারিখে এই মহৎপ্রাণ মানুষটি মৃত্যু বরণ করেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রয়াত কাদির লন্ডনীর কর্মজীবনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার এই লেখা। তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থরা কি তাঁর স্মৃতির প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানোর তাগিদ অনুভব করেন? প্রশ্নটা রেখে গেলাম সমাজ সচেতন সকলের কাছে। ১৫ জুন ২০২১, মৌলভীবাজার।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও কলামিস্ট।
তথ্যসূত্রঃ রাজনগর থানা আওয়ামী লীগ এর প্রতিষ্ঠাকালীন (১৯৫৬) কমিটির সহ-সভাপতি ও গ্রেটার লন্ডন আওয়ামী লীগ এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এর স্মৃতিচারণমূলক লেখা।

ছড়িয়ে দিন